রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট

যে মানবিক বিপর্যয়ের নিকটবর্তী কোন সমাধান নেই

রোহিঙ্গা শিশুরা রান্নার জন্য জ্বালানী সংগ্রহ করছে
UNICEF/UN0203362/Sokol

বর্তমান পরিস্থিতি

এক বছর আগে মিয়ানমারে সহিংসতার মুখে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসা লাখ লাখ ভয়ার্ত রোহিঙ্গার ঢল নেমেছিল বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলের সৈকতে।

তাদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই ছিল শিশু। তারা বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন রাখাইনে বীভৎস আক্রমনের কথা; আত্মীয়স্বজন, ঘরবাড়ি ও প্রতিবেশীদের হারানোর কথা।

মিয়ানমারের সীমানার অদূরে, বাংলাদেশের কক্সবাজারের পাহাড়গুলোতে গাদাগাদি করে বাস করে ৯১৯,০০০ রোহিঙ্গা। পাহাড়ি বনভূমি উন্মুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই আশ্রয় শিবির। পার্শ্ববর্তী টেকনাফ ও উখিয়াতেও গড়ে উঠেছে বেশ কিছু ক্যাম্প।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের মধ্যে বেশীরভাগ, প্রায় ৭০০,০০০ জন এসেছেন ২০১৭ সালের আগস্টের শেষের দিকে রাখাইনে বড় মাপের সহিংসতা শুরু হবার পর। বাকিরা পাড়ি দিয়েছিলেন আগেই, বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন এড়াতে।

বাংলাদেশের সরকারের নেতৃত্বে, এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন দেশের সহযোগিতায় রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে এড়ানো গেছে অনেক বড় বিপর্যয়। জরুরি অবস্থার প্রথম থেকেই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ত্রান ও মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য কাজ করেছে ইউনিসেফ ও বিভিন্ন বেসরকারি ও দাতা সংস্থা।  

রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুলোতে মানবাধিকার কর্মীদের কাজের পরিধি বেড়ে এখন অনেক বড় আকার ধারণ করেছে। কিন্তু পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের সাহায্য করার ক্ষমতা এখনও অনেক কম।   

সঙ্কটের প্রথম দিনগুলোর চরম বিশৃঙ্খলা পার করে অনেক দূর এগিয়ে এসেছি আমরা। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবির ও তাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশীদের জীবনে নেমে এসেছে এক ধরনের স্বাভাবিকতা। কিন্তু এই স্বাভাবিক অবস্থা সবসময় টিকবার নয়।

রাখাইনে বীভৎস হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের স্মৃতি, ঘরবাড়ি হারানোর যন্ত্রণা রয়ে গেছে লাখ লাখ মানুষের  মনে।   

“এই বিপর্যয় খুব তাড়াতাড়ি মোকাবেলা করতে হবে। রোহিঙ্গাদের  – বিশেষ করে তাদের শিশুদের  – দাবী ও প্রাপ্য এর চাইতে কম হতে পারেনা,” – ম্যানুয়েল ফনটেইন, ইউনিসেফের জরুরি অবস্থা বিষয়ক পরিচালক

শিশুদের জন্য বিপদজনক স্থান

কঠিন পরিবেশকে শিশুদের জন্য নিরাপদ করে তুলতে হবে

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো আগের তুলনায় এখন অনেক গোছানো। এক বছর আগে, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা  ত্রানে পাওয়া প্লাস্টিকের চাদর ও বাঁশ দিয়ে পাহাড়ের গা ঘেঁষে কোন রকমে আশ্রয় তৈরি করছিলো।

সেই সময়কার কাদাভরা রাস্তাগুলো এখন ইট দিয়ে স্থায়ী করা হয়েছে। বালির ব্যাগ এবং বাঁশের সেতু ব্যাবহার করে খাড়া পাহাড়গুলোতে চলাফেরা সহজ করা হয়েছে। রাস্তায় আলো দেওয়ার জন্য বসানো হয়েছে আরো অনেক সোলার বাতি। শরণার্থী পরিবারগুলোর জন্য বিপদ একটু হলেও কমিয়ে আনা হয়েছে।

ঘিঞ্জি এই আশ্রয়গুলোতে রোহিঙ্গা শিশুদের খেলাধুলা ও বিকাশের জন্য ১৩৬ টি শিশুবান্ধব কেন্দ্র চালায় ইউনিসেফ। সহিংসতার শিকার এই শিশুদের অনেকেরই প্রয়োজন মানসিক সাহায্য। তাদের মানসিক অবস্থা স্বাভাবিকে ফিরিয়ে আনার জরুরী কাজটি করে যাচ্ছে শিশুবান্ধব কেন্দ্রের চিকিৎসক, সমাজকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকরা।  

“এই কেন্দ্রগুলো ক্যাম্পের সকল শিশুদের জন্য উন্মুক্ত। তারা এখানে তাদের মত করে খেলতে, ছবি আঁকতে ও পড়তে পারে। শিশুরা এখানে ব্যাস্ত থাকলে তাদের বাবা-মা নিশ্চিন্তে তাদের কাজ করতে পারে,” বলেন উইলিয়াম কলি, কক্সবাজারে ইউনিসেফের চাইল্ড প্রোটেকশন প্রোগ্রাম ম্যানেজার।

রোহিঙ্গা পরিবারগুলো তাদের আচার অনুযায়ী কিশোরী মেয়েদের ঘর থেকে বের হতে মানা করে। রাখাইনে সেই সীমানা ছিল তাদের গ্রামের বাড়ির উঠান। এখন রোহিঙ্গা কিশোরীদের দিন কাটে ছাপড়া ঘরের চার দেওয়ালের মাঝে। কাজের মধ্যে আছে শুধু রান্নাবাড়া ও ঘর পরিষ্কার রাখা। যৌন হামলা ও পাচারেরও ভয়ে থাকে তারা।

বাড়ি তৈরির জন্য বাঁশ বহন করে নিয়ে যাছে রোহিঙ্গা শিশুটি
UNICEF/UN0226383/BROWN

ওদের কথা মাথায় রেখে ইউনিসেফের সাহায্যে ক্যাম্পের সমাজকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে ক্লাব তৈরি করেছে। ওয়ার্ড ভিত্তিক এই ক্লাবগুলোর সদস্য ৬০,০০০ রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরী। ক্লাবগুলোর মাধ্যমে তারা জীবনে চলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং শিশু অধিকার বিষয়ক জ্ঞান পেয়ে থাকেন। বাল্যবিয়ে, শিশু শ্রম ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা হয়। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়েও  অনেক সাহায্য দেওয়া হয় ক্লাবগুলোর মাধ্যমে।        

রোহিঙ্গা শিশু ও তাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশি শিশুদের মধ্যে সৌহার্দ তৈরি করাও ইউনিসেফের একটি লক্ষ্য। “এই বিপর্যয়ে রোহিঙ্গাদের সাহায্যে সবার আগে এগিয়ে এসেছিল এখানকার স্থানীয়রা। এর জন্য অনেক কষ্টও পোহাতে হয়েছে তাদের,” বলেন জিন মেটেনিয়ের, ইউনিসেফের কক্সবাজার ফিল্ড অফিসের প্রধান।

“আমরা আমাদের কাজ দ্বিগুন করছি যাতে বাংলাদেশি শিশুরা তাদের সহানভূতির জন্য কোন ক্ষতির সম্মূখীন না হয়।”

একটি প্রজন্মের হারিয়ে যাওয়া রোধ করা

কিশোর-কিশোরীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা সম্প্রসারণ

রাখাইনে ২০১৭ সালের বিপর্যয়ের পর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা নতুন শরণার্থীদের মধ্যে ৩৮১,০০০ রোহিঙ্গা শিশুর জরুরী শিক্ষার ব্যাবস্থা করা ছিল একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ।   

১৪ বছরের ছোট শিশুদের অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু করে ইউনিসেফ এবং সহযোগী সংস্থ্যাগুলো। ২০১৮ সালের জুলাইয়ের মধ্যে প্রায় ১৪০,০০০ শিশুকে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসা হয়।

প্রশিক্ষন দেওয়া হয় ৩০,০০০ এরও বেশী শিক্ষককে, যাদের মধ্যে আছে বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের নাগরিক। অনেককাল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এই জনগোষ্ঠীর পড়ালেখার প্রতি আকাঙ্খা নজর কাড়ার মত। প্রতিদিন রোহিঙ্গা শিশুদের ঢল নামে ইউনিসেফের শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে।

কিন্তু রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীরা আমাদের কাছে প্রায়ই একটি ক্ষোভ প্রকাশ করে। তারা এই শিক্ষাযজ্ঞ থেকে বঞ্চিত বোধ করে।

“এখানের স্কুলগুলোতে ছোট বাচ্চারা যায়। কিন্তু আমার বয়সের ছেলেদের জন্য ওখানে কিছু নেই। স্কুলে না পড়তে পেরে আমার মনে খুব কষ্ট হয়,” জানায় মোহামেদ, একজন রোহিঙ্গা কিশোর।

রাখাইন থেকে পালিয়ে আসার সময় একটি হাত হারায় মোহামেদ
UNICEF/UN0227741/BROWN

রাখাইনের সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসার সময় একটি হাতে আঘাত পায় সে। পরে তা কেটে ফেলতে হয়। নকল হাতের চাইতে পড়ালেখা জানা জরুরী,” বলে মোহামেদ। 

“আমরা খুব দ্রুততার সাথে এবং প্রচুর সংখ্যায় শিক্ষা কেন্দ্র তৈরি করেছি,“ বললেন বিবেক শর্মা পউদ্যাল, ইউনিসেফে শিক্ষা কার্যক্রমের ভারপ্রাপ্ত প্রধান। “এখন আমাদের সেখানকার পড়ালেখার মান বাড়াতে হবে এবং কিশোর-কিশোরীদের অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।”

রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা নিয়ে নতুন একটি পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রত্যেকটি শিশুর দৈনিক শিক্ষার সময় এখন দুই ঘণ্টা, সেটা বাড়িয়ে চার ঘণ্টা করা হবে। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখার ব্যাবস্থা করা হবে। পড়ানো হবে ইংরেজি, বার্মিজ এবং রোহিঙ্গাদের স্থানীয় ভাষায়।   

এই পরিকল্পনায় অনেক উচ্চকাংখী বললেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি এদওয়ার্ড বেগবেদার। “কিন্তু এই সময়টিতে শিক্ষায় বিনিয়োগ না করলে, এই প্রজন্মের শিশুরা আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাবে। জীবনে এবং এই বিশেষ পরিস্থিতিতে চলার মত জ্ঞান তাদের থাকবে না। মিয়ানমারে ফিরে গেলেও তারা সামাজিক কর্মাকান্ডে অংশগ্রহণ করতে পারবে না।”

শরনার্থী ও স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ পানি

বেশীরভাগ রোহিঙ্গা পানির জন্য অসংখ্য টিউবওয়েলের ওপর নির্ভর করে

করে“ক্যাম্প শরণার্থীদের এবং তাদের বাংলাদেশি প্রতিবেশীদের পানি পান, রান্নাবাড়া আর জিনিসপত্র ধোওয়ার জন্য প্রায় দৈনিক ১.৬ কোটি লিটার পানি প্রয়োজন হয়, বলেন রাফিদ সালিহ, যিনি ইউনিসেফের ‘পানি, পয়নিষ্কাশন ও হাইজিন’ বিশেষজ্ঞ।          

“সবার কাছে পানি পৌঁছে দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তার ওপর আমাদের প্রায় ৫০,০০০ ল্যাট্রিন বানিয়ে সেগুলোর রক্ষনাবেক্ষন করতে হবে।”

দুর্গম পাহাড়ে গড়ে ওঠা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ৮,০০০ এর বেশী পানি তোলার পয়েন্ট রয়েছে, কিন্তু ৮০ শতাংশ বাদে অন্যগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

বিপর্যয়ের শুরুর দিকে স্থাপিত অনেক টিউবওয়েল -- যেগুলোর জায়গা নির্ধারণে ভুল ছিল, দূষিত হয়ে গেছে অথবা পানি শুকিয়ে গেছে -- সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

প্রায় ৮,০০০ ল্যাট্রিন বন্ধ করে দিয়ে, সেগুলো অন্য জায়গায় সরিয়ে, আরো ভালো মানের ল্যাট্রিন তৈরি করার কাজ করছে ইউনিসেফ। আধুনিক উপায়ে ল্যাট্রিন থেকে বর্জ্য সরিয়ে নেওয়ার কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যদিও বড় পরিসরে স্থাপনার জন্য ক্যাম্পে জায়গা পাওয়া একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

চাকমাপুরে টয়লেটের বর্জ্য অপসাণের কাজ
UNICEF/UN0227744/BROWN

উনচিপ্রাং আশ্রয় ক্যাম্পে টিউবওয়েল ব্যাবহার করা যায়না। এই পাহারগুলোতে ভূতলে জমে থাকা পানির উৎস খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।

তাই সেখানে ইউনিসেফের সাহায্যে এবং অক্সফামের পরিচালনায় দুইটি পানি শোধনাগার তৈরি করা হয়েছে। সেখানে পাহাড়ি ছড়ার পানি দুষণমুক্ত করা হয়। সে পানি ফোটানো ছাড়াই সরাসরি পানের যোগ্য।

“একটি শোধনাগার প্রত্যেকদিন ৩০০,০০০ লিটার পানি সরবরাহ করে। এই পানি গিয়ে পৌছায় অনেক গুলো পানি তোলার পয়েন্টে, যেখান থেকে উঞ্চিপ্রাং-এর রোহিঙ্গা আর চাকমারা ও রইকুম পাড়ার বাংলাদেশীরা পানি সংগ্রহ করে,” বলেন অক্সফামের প্রোগ্রাম অফিসার কাজল বর্ধন।         

প্রায় ২০০,০০০ বাংলাদেশি ও ১৫০,০০০ রোহিঙ্গা শরণার্থীরা নিরাপদ পানি ও পয়নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ব্যাবহার করতে পারবেন ২০১৮ সালের মধ্যেই। এজন্য জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাথে একযোগে খনন করা হচ্ছে চারটি গভীর নলকুপ।

ডঃ কাজী ইসলাম। কুতুপালং ক্যাম্পের একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রের নেতৃত্বে আছেন এই স্বাস্থ্য কর্মী। ইটের তৈরি নীল রঙের স্বাস্থ্য কেন্দ্রটিতে ভিড় লেগে থাকে সকাল থেকেই। কেন্দ্রটি আগে বাঁশের তৈরি ছিল, কিন্তু এখন ইট সিমেন্ট দিয়ে পাকা করা হয়েছে। 

শরনার্থী ও স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্য সেবা

বিপর্যয় এড়াতে দৈনিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আশ্রয় ক্যাম্পের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো

“এই বছরে এ পর্যন্ত আমরা ১,৭০০ নবজাতককে চিকিৎসা দিয়েছি,” জানান ইউনিসেফ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হেলেন চাকমা। “রেফেরাল গুলো স্থানীয়দের থেকেও আসে এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো থেকেও। এই ইউনিটটি সবাইকে সাহায্য করে।”

“এখানে প্রত্যেকটি দিন আমরা নতুন কিছুর সম্মুখীন হই। কিন্তু বেশীরভাগ রোগী পাই ডাইরিয়ার অথবা ঠাণ্ডা-কাশির,“ বললেন ডাঃ ইসলাম।         

তিনি সকাল থেকে অনেকজন রোগী দেখে ফেলেছেন। যক্ষ্মার এক রোগীকে কাছের একটি ক্লিনিকে পাঠিয়েছেন। এক নারী এসেছিলেন তার ছোট শিশুকে দেখাতে, যে হয়তবা প্রতিবন্ধি। ক্যাম্পে আসা যাওয়ার ব্যাস্ত রাস্তাগুলোতে প্রায়ই দুর্ঘটনা হয়। এরকম একটি দুর্ঘটনায় আহত হয়ে একটি ছোট মেয়ে সকালে এসেছিল চিকিৎসা নিতে।      

ডাঃ ইসলামের এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির চাইতে বড় আরো ছয়টি প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র রয়েছে রোহিঙ্গা আশ্রয় ক্যাম্পগুলোতে। এসব কেন্দ্রগুলোর চিকিৎসক, কর্মী ও সেচ্ছাসেবীদের অক্লান্ত কাজের কারণে অসুস্থ পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকা রোহিঙ্গাদের মধ্যে অসুখ ছড়ানোর বড় ধরনের সম্ভাবনা বারবার মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসার আগে রাখাইনের রোহিঙ্গাদের টিকা সম্মন্ধে কোন ধারনা ছিলনা। টিকা সম্মন্ধে বিভিন্ন মিথ্যা গুজবে বিশ্বাস করতেন এই শরণার্থীরা। সেসব ভুল বিশ্বাস থেকে তাদেরকে দূরে সরিয়ে এনে, তাদের শিশুদের জরুরী টিকা দেওয়ার কাজটি ছিল খুব কঠিন।

নবজাতকের জীবন বাঁচাতে বিশেষ যত্ন
UNICEF/UN0226424/BROWN

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভয় ছিল যে ক্যাম্পগুলোতে যে কোন অসুখ মহামারীর আকার ধারন করতে পারে। কিন্তু পরপর অনেকগুলো টিকাদান কর্মসূচী - ১০ মাসে নয়টি – স্বাস্থ্য সুরক্ষার কাজ অনেক এগিয়ে নিয়েছে। তারপরও ভয় তৈরি হয় যখন হাম ও ডিপথিরিয়ার মত অসুখে আক্রান্ত হয় ক্যাম্পের অনেকে।  

সমস্যা হল, নতুন করে টিকা দেওয়ার সময় আসলে রোহিঙ্গাদের আবার বুঝিয়ে, তাতে উৎসাহী করাটা আমাদের জন্য এখনও কঠিন।

“পালিয়ে আসা এই মানুষদের স্বাস্থ্যের অবস্থা ছিল খুব নাজুক। তাদের আগে কখনো টিকা দেওয়া হয়নি। আমরা যেরকম আশঙ্কা করেছিলাম তার চাইতে অনেক কম সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়েছে আমাদের,” বলেন ইউনিসেফ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ইউলিয়া উইদিয়াতি।  

কক্সবাজারে রয়েছে আরেকটি চিত্র। ছোট এই জেলা শহরটিতে শরণার্থীদের ঢল নামবার পর স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ এখন অনেক বেড়েছে।

ইউনিসেফের সাহায্যে পরিচালিত অসুস্থ বা সময়ের আগেই জন্মেছে এমন নবজাতকদের জন্য বিশেষ ইউনিট রয়েছে কক্সবাজার জেলা হাসপাতালে। এখানে স্থানীয় নবজাতকদের পাশাপাশি অসুস্থ রোহিঙ্গা নবজাতকদেরও চিকিৎসা করা হয়।

লুকিয়ে আছে ঘাতক

রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য মারাত্বক চরম অপুষ্টি বা স্যাম একটি বিরাট স্বাস্থ্য ঝুঁকি

বালুখালি ক্যাম্পে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করেন ১৮ বছর বয়সের আমিনা আক্তার।

এই ক্যাম্পের ২৫০ জন কমিউনিটি সেচ্ছাসেবকদের মধ্যে তিনি একজন। বিশাল এই আশ্রয়ক্যাম্প টহল দেন তারা। খুঁজে বের করেন অপুষ্ট আর খুব কম ওজনের শিশু যাদের বয়স পাঁচ বছরের নিচে।

আমিনা তার কাজে যোগ দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে জমজ বোন আসিয়া ও রোবিনাকে খুঁজে পান। মারাত্বক চরম অপুষ্টি বা সিভিয়ার একিউট ম্যালনিউট্রিশনের (স্যাম) কারণে খুব অসুস্থ্য হয়ে গিয়েছিলো। শরণার্থী সমস্যার শুরু থেকেই, রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য চরম অপুষ্টি বা স্যাম একটা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি।

“এক বছর জরুরী ভিত্তিতে কাজ করার পর এখন একটা ব্যবস্থা দাঁডিয়ে গেছে। আমরা কমিউনিটির লোকদের প্রশিক্ষন দিয়ে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় পরিবারদের এখনকার এবং ভবিষ্যতের পুষ্টি প্রয়োজন পূরনের কাজ করছি,” বলেন ইউনিসেফ পুষ্টি দলের প্রধান সায়রা খান

অপুষ্টির কারণগুলো আছে ক্যাম্পের পরিবেশেই। পরিষ্কার পানির স্বল্পতা, মায়ের দুধ খাওয়ানোর জন্য সঠিক পরিবেশ না থাকা এবং বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবারের স্বল্পতা যা বাড়ন্ত কিশোর-কিশোরী, মা এবং ছোট শিশুর সুস্বাস্থ্যর জন্য অত্যন্ত জরুরী।

স্যাম বা মারাত্বক চরম অপুষ্টির ঝুঁকি এখনও একটা বড় সমস্যাঃ ইউনিসেফের গণনা মতে ৫০,০০০ এরও বেশী ৫ বছরের ছোট শিশুদের এই অসুখের চিকিৎসা দরকার হবে ২০১৮ সালে।

গুজব মোকাবেলা

ক্যাম্পের দ্রুত পরিবর্তনশীল অবস্থার সাথে খাপ খাওয়াতে শরণার্থীদের সাহায্য করছে মডেল মায়েরা

প্রায় ১০ লাখ মানুষের আশ্রয়ক্যাম্পের অলিগলিতে চলতে থাকে অনেক গুজব। অল্প জায়গায় গাদাগাদি করে থাকা শরণার্থীদের ঘড়ে ঘড়ে খুব দ্রুত ছড়িয়ে যায় খবর।

টেলিভিশন, রেডিও বা অন্য কোন মিডিয়া থেকে তথ্য পাওয়ার অবকাশ নেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। এখানে মুখের কথাই সব – হোক সেটা ক্যাম্পের কোন গল্প, অথবা স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেবা সংক্রান্ত গুজব।

টিকা বিষয়ে খুব কম ধারণা ছিল রাখাইনের রোহিঙ্গাদের। বাংলাদেশে আসার পর অপরিহার্য এই সেবা নিয়ে তাদের মধ্যে তৈরি হল বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণা। উদাহরণগুলো এরকম। একসময় তারা ধারণা করা শুরু করলেন যে মেয়েদের হামের টিকা দিলে তারা আর মা হতে পারবেন না। টিকা দিলে রোহিঙ্গা মোসলমানদের শিশুরা খ্রীষ্টান হয়ে যাবে, এরকম একটা গুজবও ছিল এসময়।

এরকম বিপজ্জনক গুজবের প্রতিকার না করলে ক্যাম্পের সেবাগুলোর পেছনের ভালো উদ্দেশ্যগুলো  শরণার্থীদের বোঝানো যাবেনা। এজন্য ইউনিসেফের উদ্যোগে ২৪০ জন স্বেচ্ছাসেবীর দল তৈরি করা হয়েছে – যাদেরকে বলা হয় ‘মডেল মাদারস’ বা আদর্শ মা।

মডেল মাদারস্‌ বা আদর্শ মা
UNICEF/UN0228989/Brown

৫০ বছর বয়সী রোহিঙ্গা নারী নুর বেগম একজন ‘মডেল মাদার’। তিনি নিজে একজন মা এবং তার ঘরে নাতিরাও আছে। তার কাজ রোহিঙ্গাদের ঘরে ঘরে গিয়ে সঠিক তথ্য দেওয়া। সন্তানস্বম্ভবা মায়েদের বাড়িতেই তার যাওয়া হয় বেশী।

“আমি এই মায়েদের বলি যে বাচ্চা হওয়ার ব্যাথা উঠলে ধাত্রী কে ডাক দিবা। কারণ বাচ্চা হওয়ার সময় কোন সমস্যা হলে ধাত্রীই পারে সেগুলোর মোকাবেলা করতে,” জানান তিনি।

“ছোট শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো যে কি জরুরী সেটাও তাদের জানাই, বিশেষ করে কমবয়সী মায়েদের।“

ব্যাক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও অনেক কথা বলেন ‘মডেল মায়েরা’। “এখানে যারা থাকে, তাদের অনেকেই পরিচ্ছন্নতা সম্বন্ধে কিছু জানে না। আমি তাদেরকে বলি যে ঘর পরিষ্কার রাখলে অসুখ-বিসুখ দূরে থাকে,“ বলেন নুর বেগম।

“আমাদের একটা বড় ঝামেলা হল ছোট মেয়েদের বিয়ে আটকানো। বাবা-মায়েরা খুব কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিতে চান, এমনকি ১৩ বা ১৪ বছর বয়সের মেয়েদেরও। আমার কথা একটাই। ১৮ বছর হওয়ার আগে কোন বিয়ে না,” বললেন নুর বেগম

সহকর্মী সংস্থ্যা ব্র্যাকের মাধ্যমে আরো ৮০০ রোহিঙ্গা কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবকদের সাহায্য করে ইউনিসেফ। এর বাইরেও, রোহিঙ্গাদের জন্য অনুষ্ঠান তৈরি করে ক্যাম্পে রেডিও সম্প্রচারের ব্যাবস্থা করেছে ইউনিসেফ। রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে রেডিও লিসেনারস ক্লাবও তৈরি করা হয়েছে। এই ক্লাবগুলোর সদস্যরা রেডিওতে উপস্থাপিত রোহিঙ্গাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবন নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন।

“গুজব ছড়ায় দাবানলের মত। এর ফলে আমাদের কাজে অনেক বাধা তৈরি হয়, বিশেষ করে টিকাদানের ক্ষেত্রে,” বলেন অরুনিমা ভাটনাগার, ইউনিসেফের কমিউনিকেশন ফর ডেভলপমেন্ট অফিসার।    

“কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক ছাড়াও আমরা মসজিদের ইমাম ও সমাজের অন্য নেতাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ এই  কাজে নিয়ে থাকি।”

তাছাড়াও ইউনিসেফের সাহায্যে ১২টি তথ্য ও প্রতিক্রিয়া জানার কেন্দ্র আছে ক্যাম্পগুলোতে। সেগুলোর মাধ্যমে সঠিক তথ্য প্রচার করা হয় এবং সেগুলোকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার আহবান করা হয়।

 

এই লেখাটির উৎস ইউনিসেফের ‘চাইল্ড এলার্ট – ফিউচারস ইন দ্যা ব্যালেন্স’। রোহিঙ্গা শিশু ও ইউনিসেফের কাজ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন পুরো প্রতিবেদন।