কোভিড-১৯ এর প্রস্তুতি এবং মোকাবিলা
শিশু এবং পরিবারগুলো কীভাবে কোভিড-১৯ সংক্রমণ থেকে নিজেদের এবং তাদের কমিউনিটিকে সুরক্ষিত রাখতে পারবে সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাতে তারা পায় তা নিশ্চিত করছে ইউনিসেফ।
- বাংলা
- English
২০২০ সালের বসন্তে কোভিড-১৯ এর হুমকি সুস্পষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউনিসেফ ও তার সহযোগীরা ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে যোগাযোগ ও কমিউনিটির সম্পৃক্ততা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, সুরক্ষা ও ওয়াশ পরিষেবা প্রদানসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম সর্বোচ্চ মাত্রায় অব্যাহত রাখতে এবং রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি শিশু এবং তাদের পরিবারগুলোর জন্য ঝুঁকি কমিয়ে আনতে বেশকিছু প্রতিরোধ ও পূর্বসতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে যোগাযোগ ও কমিউনিটি সম্পৃক্ততা
শিশু এবং পরিবারগুলো কীভাবে কোভিড-১৯ সংক্রমণ থেকে নিজেদের এবং তাদের কমিউনিটিকে সুরক্ষিত রাখতে পারবে সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাতে তারা পায় তা নিশ্চিত করছে ইউনিসেফ।
এই রোগের লক্ষণসমূহ কী, কীভাবে এই রোগের সংক্রমণ রোধ করা যায় এবং কোথায় স্বাস্থ্যসেবার সন্ধান করতে হবে – এই সংক্রান্ত বিষয়গুলো যাতে শিশু ও পরিবারগুলো বুঝতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য ২০০ ধর্মীয় নেতা ও স্বেচ্ছাসেবকসহ প্রশিক্ষিত ৬৫০ জনের একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে ইউনিসেফ ও তার সহযোগী সংগঠনসমূহ।
ইউনিসেফের সহযোগীরা রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি কমিউনিটিগুলোতে কোভিড-১৯ সম্পর্কিত তথ্য ছড়িয়ে দিতে রোহিঙ্গা, বার্মিজ ও বাংলা ভাষায় রেডিওতে অনুষ্ঠান প্রচার, ভিডিও, মোবাইল বার্তা ও লিফলেট ব্যবহার করে।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় কমিউনিটির ১ হাজার ১৪৬টি ইসলামিক কেন্দ্র কক্সবাজারের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে মসজিদ ভিত্তিক বার্তা প্রদানের মাধ্যমে পুরো জেলায় ১৯ লাখ মানুষকে সম্পৃক্ত করছে। শরণার্থী শিবিরগুলোতে মসজিদ-ভিত্তিক বার্তা প্রদানের মাধ্যমে ৮ লাখ ৬০ হাচার মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও কোভিড-১৯ মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপের অংশ হিসেবে শিক্ষাকেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষকরা পারিবারিক পর্যায়ে বাবা-মা ও যত্নদানকারীদের সঙ্গে ছোট ছোট সচেতনতামূলক সেশনের সময় স্বাস্থ্যবিধি ও হাত ধোয়ার বার্তাগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরছেন।
স্বাস্থ্যবিধির প্রচারণা
আটটি শরণার্থী শিবিরে অবস্থানরত ২ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা, যাদের অর্ধেকের বেশিই শিশু, তারা যাতে পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও সাবান পায় তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে ইউনিসেফ শিবিরগুলোতে নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি কার্যক্রম জোরদার করছে।
ইউনিসেফের স্বাস্থ্যবিধি প্রচার-বিষয়ক সহযোগীরা খেলা এবং শিশু-কেন্দ্রিক শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের সাবান দিয়ে হাত ধোওয়া, স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক শিক্ষা দিচ্ছে। রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য শিশুদেরকে তাদের বাড়িতে এবং তাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচারকারী হিসেবে কাজ করতেও উৎসাহিত করা হয়।
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা যেহেতু ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়, সেহেতু এটা কোভিড-১৯ সংক্রমণের বাড়তি ঝুঁকিও তৈরি করেছে। ইউনিসেফের অংশীদাররা কমিউনিটিগুলোকে নিরাপদ রাখার জন্য পানির পাম্প, ল্যাট্রিন ও গোসলখানাসহ শিবিরগুলোর বিভিন্ন স্থান জীবাণুমুক্ত করছে।
স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন
কক্সবাজারে কোভিড-১৯ নিয়ে প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে স্বাস্থ্যসেবাগুলো আরও উন্নত করতে বাংলাদেশ সরকার এবং স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে ইউনিসেফ।
বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা কমিউনিটির রোগীদের জন্য স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ইউনিসেফ সেখানে ২০০ শয্যার একটি কোভিড-১৯ আইসোলেশন অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টার স্থাপন করছে। স্বাস্থ্য খাতের লক্ষ্য হলো, গোটা জেলায় এর শয্যা সংখ্যা বাড়ানো।
তাছাড়া, ইউনিসেফ রামু ও চকোরিয়ায় ডাক্তারি যন্ত্রপাতি, ওষুধ এবং আইসোলেশন সেন্টার ও চিকিৎসা কেন্দ্রের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে কক্সবাজার জেলায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানকারী স্বাগতিক বাংলাদেশিদের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নেও সরকারি কার্যক্রমকে সহায়তা করছে।
ইউনিসেফ ১৪টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে অত্যাবশ্যকীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে। প্রায় এক লাখ ৮৫ হাজার রোহিঙ্গা শারণার্থীকে এর মধ্যেই এই স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়েছে, যাদের অর্ধেকের বেশি শিশু। এসবের মধ্যে রয়েছে পাঁচটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, যেখানে সপ্তাহে সাতদিন ২৪ ঘণ্টাই স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয় এবং নিরাপদ সন্তান প্রসব সেবাও এর অন্তর্ভুক্ত।
পুষ্টি নিশ্চিতকরণ
ইউনিসেফ মারাত্মকভাবে অপুষ্টির শিকার রোহিঙ্গা শিশু, বিশেষ করে কোভিড-১৯ আক্রান্তদের সংস্পর্শে যাদের বড় ধরনের জটিলতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তাদের অপরিহার্য সেবাসমূহ দিয়ে চলেছে।
চল্লিশ শতাংশের বেশি রোহিঙ্গা পরিবার পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার পায় না এবং তাদের খাবারে কোনো বৈচিত্র্যও নেই। অন্যদিকে পাঁচ বছরের কম বয়সী রোহিঙ্গা শিশুদের ১১ শতাংশই মারাত্মক অপুষ্টিতে ভোগে।
তবে ইউনিসেফ ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির যৌথ সহায়তায় পরিচালিত ২৭টি পুষ্টি কেন্দ্রের মাধ্যমে সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মক অপুষ্টির শিকার শিশুদের আশ্রয় ও চিকিৎসা প্রদান এবং ফলোআপ সেবা দিয়ে চলেছে।
মারাত্মক অপুষ্টির শিকার শিশুর মা-বাবাদের এক সপ্তাহের বদলে একসঙ্গে এক মাসের রেডি টু ইউজ থেরাপিউটিক ফুড (আরইউটিএফ) দেওয়া হয়েছে, যাতে তাদের পুষ্টি সেন্টারে কম আসতে হয়। তবে শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে মারাত্মক অপুষ্টির শিকার শিশুরা ফলোআপ সেবা নিতে প্রতি দুই সপ্তাহে একদিন পুষ্টি কেন্দ্রে আসতে পারে।
পাঁচ বছরের কম বয়সী রোহিঙ্গা শিশুদের ১১ শতাংশই মারাত্মক অপুষ্টিতে ভোগে।
এর আগে প্রতি মাসের জন্য কমিউনিটি নিউট্রিশন ভলান্টিয়ার বা পুষ্টি কার্যক্রমের স্বেচ্ছাসেবকরা অপুষ্টির শিকার ছয় মাস থেকে পাচ বছর বয়সী এক লাখ ১৩৫,০০০ শিশু চিহ্নিত করে। তবে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে কোভিড-১৯ প্রতিরোধের উদ্যোগ ও মানবিক সহায়তা কার্যকম হ্রাস পাওয়ায় অপুষ্টিতে ভোগা শিশু চিহ্নিতকরণ কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রয়েছে।
কোভিড-১৯ সংকটের এই সময়ে ইউনিসেফ মারাত্মক অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের চিহ্নিত ও তাদের কমিউনিটিকে সহায়তা করার বিষয়ে এই বিশেষ স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের মা ও কিশোরীরা কিভাবে তাদের শিশু সন্তান/ভাই বোনের উপরের বাহুর মধ্যবর্তী স্থানে একটি রঙিন টেপ লাগিয়ে পরিমাপ করবেন – সে বিষয়ে স্বেচ্ছাসেবকরা আগেই তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। রঙিন টেপ দিয়ে পরিমাপের এই বিষয়টি অপুষ্টির তীব্রতা নির্দেশ করে।
এই পদ্ধতির ইতিবাচক ফলও এরইমধ্যে পাওয়া গেছে। ২০২০ সালের মার্চ মাসে লকডাউনের প্রাথমিক পর্যায়ের তুলনায় মে মাসের মাঝামাঝি পুষ্টি কেন্দ্রে নতুন ভর্তি বেড়েছে চারগুণ। যদিও কোভিড-১৯ প্রতিরোধে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে সহায়তাকর্মীদের চলাফেলা এখন নিয়ন্ত্রিত, তবু ইউনিসেফ সেখানে আরও বেশি সংখ্যক মা ও সেবা প্রদানকারীকে ওই প্রশিক্ষণ দিতে কর্মসূচিটির কার্যক্রম সম্প্রসারিত করছে।
শিশুদের সুরক্ষা
ইউনিসেফের লক্ষ্য হলো নজিরবিহীন এই মহামারির মধ্যে শিশুদের অবশ্যই অগ্রাধিকারে রাখতে হবে এবং সেটা তাদের অবস্থান নির্বিশেষে, তারা যেখান থেকেই আসুক অথবা সেখানেই বসবাস করুক। একটি শিশু সব সময়ই একটি শিশু।
শিশুরা যখন লেখাপড়া ও স্বাভাবিক রুটিনের বাইরে থাকে এবং তাদের মা-বাবাও যখন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্যস্ত, তখন তারা অবহেলা, শোষণ ও অপব্যবহারের উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে থাকে। তাই শিশুদের অবশ্যই সুরক্ষা দিতে হবে।
ইউনিসেফের প্রায় দুই হাজার সহযোগী এবং স্বেচ্ছাসেবীর নেটওয়ার্ক শিশু ও তাদের পরিবারগুলোকে সুরক্ষা বার্তা সরবরাহ করে চলেছে। পাশাপাশি সহিংসতা, শোষণ, অপব্যবহার ও অবহেলার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।
এই মহামারির আঘাত এবং ক্রমবর্ধমান ভয় ও উৎকণ্ঠার মধ্যে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সহযোগিতা করার জন্য ইউনিসেফের সহযোগীরা শিশু, নারী, মেয়ে ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা থেকে রক্ষা পাওয়া সকলকে সুরক্ষা সেবা দিয়ে চলেছে। এর মধ্যে রয়েছে, কেস ম্যানেজমেন্ট, পরামর্শ ও মনো-সামাজিক সেবা।
যদিও এই মুহূর্তে ইউনিসেফের বিভিন্ন কার্যক্রম যেমন, নারী ও মেয়েদের জন্য নিরাপদ স্থান, কিশোরীদের বহুমুখী কেন্দ্র ও শিশু কেন্দ্রগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে, তবু একক কোনো পরামর্শ সভা অথবা কমিউনিটির সঙ্গে কোভিড-১৯ সম্পর্কিত তথ্য বিনিময়ের জন্য সেবাগুলো চালু রয়েছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ক্রমবর্ধমান ও প্রলম্বিত শরণার্থী পরিস্থিতি এই মহামারির কারণে আরও জটিল হয়ে উঠছে। পাশাপাশি জটিল হয়েছে শিশুদের, বিশেষ করে মেয়ে ও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের সহিংসতা, পাচার ও অন্যান্য বিপদ থেকে রক্ষা করার মতো বিষয়গুলো।
শিক্ষা কার্যক্রম
কোভিড-১৯ সংকট শুরুর আগেই ইউনিসেফ ও তার সহযোগীরা দুই হাজার পাঁচশ’ শিক্ষা কেন্দ্রে নিবন্ধনের মাধ্যমে দুই লাখ ১৬ হাজার রোহিঙ্গা শিশুর লেখাপড়ার সুযোগ নিশ্চিত করে।
২০২০ সালে ইউনিসেফ রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে বড় এবং নতুন ধরনের একটি ধাপে পদার্পণের কথা ছিল। বাংলাদেশ সরকারের যুগান্তকারী এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২০ সালের প্রথমার্ধে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে পাইলট ভিত্তিতে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম চালু করার পথে ছিল ইউনিসেফ। দুঃখজনকভাবে সেই উদ্যোগ এখন কোভিড-১৯ এর কারণে স্থগিত রয়েছে। পাশাপাশি কোভিড-১৯ থেকে রক্ষায় পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সেখানকার সবগুলো শিক্ষা কেন্দ্রও সাময়িক বন্ধ রয়েছে।
পাইলট কার্যক্রমটি যখন চূড়ান্তভাবে শুরু হবে তখন শুরুতে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির ১০ হাজার রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীকে এতে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। এই পাইলট প্রকল্পের অধীনে অল্প বয়সী শিশুদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বয়স্ক শিক্ষার্থী যাদের বর্তমানে শিক্ষার সুযোগ কম, তাদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
স্কুল ও শিক্ষাকেন্দ্র বন্ধ
কমিউনিটি পর্যায়ে কোভিড-১৯ সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশ সরকার ২০২০ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি সারাদেশে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে। ওই সিদ্ধান্তের আলোকেই রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের সব শিক্ষা কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।
এই অবস্থা আগামী কয়েক বছর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে, বিশেষ করে নাজুক পরিস্থিতিতে থাকা জনগোষ্ঠীর ওপর এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। পূর্বের জরুরী অবস্থার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, শিশুরা যত লম্বা সময় স্কুলের বাইরে থাকে, পরবর্তীতে তাদের স্কুলে ফেরার সম্ভাবনা ততটাই কমে যায়।
এমন পরিস্থিতিতে ইউনিসেফ জরুরিভিত্তিতে রোহিঙ্গা শিশুদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার জন্য বিকল্প পথ খুঁজছে। ইউনিসেফ এরইমধ্যে রোহিঙ্গা শিশুদের লেখাপড়ায় সহায়তা করতে তাদের মা-বাবা ও যত্নকারীদের নির্দেশনা প্রদান এবং স্বাস্থ্য ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌছে দিতে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের শিক্ষকদের একটি নেটওয়ার্ক চালু করেছে।
পরিবার ও সেবাদানকারীদের মাধ্যমে ঘরে থেকে লেখাপড়া করতে ইউনিসেফের সহযোগীরা সচিত্র বই, অডিও বার্তা ও ওয়ার্কবুক বা অনুশীলন বই প্রদান করে সহায়তা করছে।
তবে এক্ষেত্রে সাক্ষরতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। মা-বাবার যদি লেখাপড়া না থাকে, তবে তারা তাদের সন্তানদের পড়াশোনা তদারকি করতে পারেন না। বাস্তবতা হলো, বহু রোহিঙ্গা বাবা-মা অশিক্ষিত। তাই ঘরে থাকা শিশুদের যত্নকারীর মাধ্যমে পদ্ধতিগত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
শিশুদের প্রাক-রেকর্ডকৃত পাঠ সরবরাহের জন্য বিকল্প হিসেবে ইন্টারেক্টিভ রেডিও নির্দেশিকার মতো স্বল্পমূল্যের প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনাধীন রয়েছে। তবে ইউনিসেফ কোভিড-১৯ এর কারণে সৃষ্ট নজিরবিহীন এই পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে রোহিঙ্গা শিশুদের পড়াশোনার সর্বোত্তম উপায়ের অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দাতা বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে সেতুবন্ধন গড়ে তোলা
মানবিক সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকায় পরিষেবা প্রদান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যা স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে সেতুবন্ধন তৈরি করে, শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সুরক্ষা প্রদান করে এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সেবা প্রদান নিশ্চিত করার মাধ্যমে করা।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আগমন কক্সবাজার জেলার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে, যা আগে থেকেই বাংলাদেশে শিশুদের কল্যাণের জন্য বিভিন্ন সূচকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে ছিল। ফলস্বরূপ, ইউনিসেফ এবং অন্যান্য সহযোগী সংস্থাগুলো জরুরি শরণার্থী পরিস্থিতি মোকাবিলার সাথে সাথে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনের দিকে গভীরভাবে মনোনিবেশ করেছে। এই প্রচেষ্টার মধ্যে রয়েছে তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের শনাক্ত করা, নিরাপদ পানি সরবরাহের জন্য গভীর নলকূপ স্থাপন করা এবং সরকারি সেবাকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে হাজার হাজার ছোট শিশুর জন্য স্বাস্থ্য পরামর্শ প্রদান করা। অসুস্থ নবজাতকদের সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ইউনিসেফ কক্সবাজার জেলায় পাঁচটি বিশেষায়িত নবজাতক সেবা কেন্দ্রে সহায়তা দেয়।
হাজার হাজার বাংলাদেশি কিশোর-কিশোরী যাতে নিরাপদ সুরক্ষামূলক পরিবেশে জীবন দক্ষতা, সাক্ষরতা, গণনা করা এবং প্রাক-বৃত্তিমূলক দক্ষতা শিখতে পারে সেজন্য বহুমুখী শিশু ও কিশোর কেন্দ্র তৈরি করার মাধ্যমে ইউনিসেফ কক্সবাজারে তার শিশু সুরক্ষা কর্মসূচিটি বিস্তৃত করেছে। ইউনিসেফ বাবা-মা, কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ ও অংশীদারদের সমন্বয়ে গঠিত কমিউনিটিভিত্তিক শিশু সুরক্ষা কমিটিগুলোকে শক্তিশালী করেছে, যে কমিটিগুলো শিশু বিয়ে, নিগ্রহ ও শোষণের মতো সুরক্ষা বিষয়গুলো প্রতিরোধ করার জন্য অগ্রগামী কমিউনিটি মনিটরিং ও রিপোর্টিং ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। স্কুল পরিচালনা কমিটিগুলো যাতে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে সেজন্য তাদের সহায়তা দিতে কার্যকরী অনুদান প্রদানের মাধ্যমে ইউনিসেফ কক্সবাজার জেলার সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহায়তা দিচ্ছে। এই অনুদানের অর্থ ৬৬২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ লাখ ২০ হাজার শিক্ষার্থীকে সহায়তা দিচ্ছে।
সামনে তাকানো
লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজারে নিরাপত্তার সন্ধান শুরু করার তিন বছর পরে উদার মনোভাব সম্পন্ন দাতাদের সহায়তায় এবং বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে ব্যাপক মানবিক প্রচেষ্টায় রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবিরের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়েছে। তবে কাজ কোনোভাবেই শেষ হয়ে যায়নি এবং কোভিড-১৯ যে বিপদের হুমকি তৈরি করেছে তাতে অবস্থা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। রোহিঙ্গা শিশু এবং তাদের পরিবার এখনও তাদের দৈনন্দিন বেঁচে থাকা ও সুস্থতার জন্য মানবিক সহায়তা ও ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল।
কোভিড-১৯ মহামারির আগে, ইউনিসেফ ও তার সহযোগীরা অন্যান্য সহায়তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে একত্রে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতিদিনের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে কাজ করে আসছিল। তবে তাদের দীর্ঘমেয়াদি চাহিদাগুলো মেটাতে, বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের শিক্ষা চাহিদা মেটানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে, যার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পূর্ণ সমর্থন প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদে, এত লোকের পক্ষে এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে বসবাস করা মোটেই টেকসই নয়, যেখানে রোগের প্রাদুর্ভাব, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা এবং ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।
চূড়ান্তভাবে, এই সংকটের সমাধান আছে মিয়ানমারেই। বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা সমাজের পূর্ণ সদস্য হিসেবে তাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিতে ও সৌহার্দ্যময় পরিবেশে বসবাস করার জন্য নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে তাদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার আশা এবং আকাঙ্ক্ষা বারবার প্রকাশ করেছে। ইউনিসেফ মিয়ানমার সরকারকে এমন একটি পরিস্থিতি গড়ে তোলার আহ্বান জানায়, যাতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ ধরনের প্রত্যাবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়।
রোহিঙ্গা শিশু ও তাদের পরিবারগুলো যাতে নিজেদের সম্ভাবনার বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয় এবং আরও উন্নত ভবিষ্যতের আশা ধরে রাখে সেজন্য তাদের অধিকারের স্বীকৃতি আদায়ে ইউনিসেফ কাজ করে যাচ্ছে।