রোহিঙ্গা সংকটের ছয় বছর

রোহিঙ্গা শিশু ও পরিবারগুলো অকল্পনীয় ভয়াবহতার শিকার হয়েছে। তাদের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইউনিসেফ তার পার্টনারদের (অংশীদারদের) নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

ইউনিসেফ
Noor Karima, 10, lives in Camp 24 in the Leda Rohingya refugee camps in Teknaf, Cox’s Bazar.
UNICEF/UN0842275/Himu

২০১৭

আগস্টের শেষ দিকে মিয়ানমারে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে লাখ লাখ আতঙ্কিত রোহিঙ্গা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে চলে আসে।

নিজেদের ঘরবাড়ি, সহায়-সম্বল, লোকালয় পেছনে ফেলে অনেকে মাছ ধরার নৌকায় গাদাগাদি করে উঠে বাংলাদেশে চলে আসে। বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ তখন তাদের কাছে কোনো বিষয় হয়ে দাঁড়ায়নি।

Rohingya children and families
UNICEF/UN0119964/Brown
Rohingya children and families, Bangladesh.

UNICEF/UN0119957/Brown

Others made the journey on foot…

Rohingya children and families, Bangladesh.

UNICEF/UN0139416/LeMoyne

Walking for days through dense forests and across hilly terrain.

Rohingya children and families, Bangladesh.

UNICEF/UN0136998/LeMoyne

Many of them were children, pregnant women, sick or elderly.

বাংলাদেশের সৈকতে,  ধান ক্ষেতে যখন শরণার্থীদের ঢল নামছিল, সে সময় অনেকে তাদের আশ্রয়ের জন্য তাঁবু দিয়ে ছোট ছোট ঘর তৈরি করেছিল। কিন্তু আগতদের বেশির ভাগেরই থাকতে হয়েছিল খোলা আকাশের নিচে। তারা ছিল বিধ্বস্ত, রোগ, শোক ও  ক্ষুধায় কাতর। তাদের সাথে ছিল  কেবল অবর্ণনীয় সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতার সব অভিজ্ঞতা, যা তাদেরকে পালাতে বাধ্য করেছিল।

Rohingya children and families, Bangladesh.
UNICEF/UN0137004/LeMoyne দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্লান্ত ছেলেটি ধানখেতে ঘুমিয়ে রয়েছে; মেঠো পথ ধরে এমন আরও অনেক শরণার্থী পরিবার বাংলাদেশের কক্সবাজারের পালং খালি গ্রামের দিকে হেঁটে চলেছে।

হামলা ও নৃশংসতার  মুখে সর্বশেষ শরণার্থীর ঢলে যারা এসেছিল, তারা এর আগে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া তিন লাখের মতো রোহিঙ্গার সঙ্গে ‍এবার যুক্ত হল। সব মিলিয়ে এটা হয়ে উঠল  বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির।

Embedded video follows
UNICEF

শরণার্থীদের বিপুল ঢল নামার সঙ্গে সঙ্গে ইউনিসেফ তার চলমান মানবিক সহায়তা আরও জোরদার করে। রোহিঙ্গাদের জন্য ইউনিসেফের এই সহায়তা এর আগের ২০১৬ সালের অক্টোবরে শরণার্থীর ঢল আসা থেকেই দেওয়া হচ্ছিল। হঠাৎ করে আসা লাখ লাখ মানুষের মাথা গোজার ঠাঁই এর ব্যবস্থা করার জন্য যেভাবে অপরিকল্পিতভাবে অস্থায়ী ঘর গড়ে তোলা হচ্ছিল, তাতে শরণার্থীদের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। সেখানে রোগ-বালাই বিশেষ করে ডায়রিয়া  ছড়িয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতিতে ইউনিসেফ দ্রুত হাজার হাজার শরণার্থীর জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করে। তখনও দলে দলে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে রোহিঙ্গারা আসছে। জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থাসমূহ ও বাংলাদেশ সরকারসহ সকল পার্টনারদের (অংশীদারদের) সঙ্গে কাজের মধ্য দিয়ে ইউনিসেফ সেখানে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ ছাড়াও পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিতে থাকে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ডিটারজেন্ট গুঁড়া, সাবান, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, পানি ধরে রাখার জন্য কলস ও জগ, শিশুর ন্যাপি, স্যানিটারি ন্যাপকিন ও তোয়ালে।

Rohingya children collecting water. Bangladesh
UNICEF/UN0137002/LeMoyne রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাংলাদেশে প্রবেশের পর পানি বিতরণ করা হচ্ছে।

নতুন আসা এসব রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে জীবননাশক ডায়রিয়া থেকে সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে অক্টোবরের শুরুর দিকে কক্সবাজারে বড় ধরনের কলেরা প্রতিষেধকের ক্যাম্পেইন চালানো হয়। সেসময়, ২০০টিরও বেশি ভ্রাম্যমাণ টিমের মাধ্যমে নয় লাখের মতো টিকা্র ডোজ প্রদান করা হয়। সেটা ছিল এ যাবৎকালের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুখে খাওয়ার কলেরা টিকা প্রদানের ক্যাম্পেইন।

An Oral cholera vaccination campaign in Rohingya camp in Bangladesh
UNICEF/UN0139612/LeMoyne বাংলাদেশের কক্সবাজারের ঘুমধুমে একটি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশু ইউনিসেফ-প্রদত্ত কলেরা ভ্যাকসিনের একটি ডোজ খাচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকার, শিবির ও অস্থায়ী বসতিগুলোতে ৬ সপ্তাহ থেকে ৬ বছর বয়সী রোহিঙ্গা শিশুদের ডিপথেরিয়াসহ অন্যান্য রোগের টিকা দেওয়ার ক্যাম্পেইন করলে তাতেও সহায়তা দেয় ইউনিসেফ ও এর পার্টনাররা। রোহিঙ্গা ঢল শুরু হওয়ার দুই মাসের মধ্যে ইউনিসেফ ও এর পার্টনাররা এক লাখ ২৮ হাজার শরণার্থীকে বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং এক লাখ ৯০ হাজার শরণার্থীর পয়ঃনিষ্কাশনের (স্যানিটেশন) ব্যবস্থা করে। ঘনবসতিপূর্ণ ঐ এলাকায় রোগ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে এটা ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ।

তাৎক্ষণিক জীবনরক্ষাকারী সহায়তার পাশাপাশি এবার প্রয়োজন ছিল শরণার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার। যে বীভৎস অভিজ্ঞতার মুখে মিয়ানমার থেকে লাখ লাখ মানুষের এই ঢল নেমেছিল, তা মানবিক দুর্গতির এক বিরাট দৃষ্টান্ত। মানসিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল দেশান্তরী হওয়া বিপুল সংখ্যক এই শিশু ও তাদের পরিবারগুলো। ফলে, শরণার্থী শিশুদের পক্ষে তখন পড়াশোনায় ফেরাটা কঠিন হয়ে পড়ে। একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বা স্থান পাওয়াটাও ছিল তাদের জন্য দুষ্কর, যেখানে তারা কেইস ম্যানেজমেন্ট, বিশেষায়িত সেবার জন্য রেফারেল সুবিধা, মনোসামাজিক কাউন্সেলিং এবং জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে।

Rohingya children play at learning centre, Bangladesh
UNICEF/UN0126495/Brown বাংলাদেশের কক্সবাজারের বালুখালী অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরের একটি শিশুবান্ধব স্থানে রোহিঙ্গা শিশুরা খেলছে।

তাই তাদের জন্য এমন জায়গার ব্যবস্থা করা হয়, যেখানে তারা খেলাধুলা করা ও বন্ধু তৈরির সুযোগ পাবে  এবং মাঝে মাঝে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও আবার শিশু হয়ে ওঠার স্বাধীনতা পাবে ।

২০১৮

২০১৭ সালের আগস্ট থেকে শুরু করে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ নাগাদ আনুমানিক সাত লাখ ২০ হাজার মানুষ বাংলাদেশে চলে আসে । বিপুল সংখ্যক এই মানুষ আসার কারণে  মানবিক সহায়তার জরুরি প্রয়োজন দেখা দেয় । খালি হাতে আসা রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর টিকে থাকার উপায় ছিল সহায়তা হিসেবে পাওয়া পানি, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী। দেশান্তরী মানুষের এই ঢলে রোগের প্রাদুর্ভাবের বড় ঝুঁকি তৈরি হয় । অসহায় শিশুরা নানা রকম বঞ্চনা, মানব পাচার, শিশুশ্রম,  জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতাসহ  অন্যান্য নিপীড়নের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে ।

এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের মওসুমও ঘনিয়ে আসে। শিবিরের ভঙ্গুর ঘরগুলো নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়-পাহাড়ের ঢালে কিংবা বেলে মাটিতে গড়ে তোলা এসব ঘর ভেসে যেতে পারে নিমিষেই ।

A Rohingya child, Bangladesh
UNICEF/UN0204929/Sokol ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসের ঝড়ে কক্সবাজারের একটি শরণার্থী ক্যাম্প ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়; শিশুটি আশ্রয়কেন্দ্রের বাইরে আশ্রয় নিয়েছে।

এপ্রিলের শেষ দিকে শুরু হল বৃষ্টি। সেসময় প্রায় ৫৫ হাজার শিশুসহ এক লাখেরও বেশি মানুষের বন্যা ও ভূমি ধ্বসের  কবলে পড়ার  ঝুঁকি দেখা দেয়। শিবিরের ওপর দিয়ে ঝড়ো বাতাস  বয়ে গেলে অনেক শিশুকে দেখা যায় তাদের ঘরের ছাদে বসে আছে, যাতে বাতাসে ঘরের প্লাস্টিকেরছাউনি উড়ে না যায়।

ঝড়ে যাতে ঘরের প্লাস্টিকের ছাদ উড়ে না যায়, তাই শিশুটি ছাদের উপর বসে আছে। ছবিটি কক্সবাজারের একটি শরণার্থী শিবির থেকে তোলা।
UNICEF/UN0204926/Sokol

ঘূর্ণিঝড়ের মওসুমের প্রস্তুতি হিসেবে ইউনিসেফ ইতিমধ্যে জরুরি পরিস্থিতিতে বিতরণের জন্য বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন সামগ্রী  শরণার্থীদের কাছে সহজে পৌঁছে দেওয়া যায় এমন জায়গায় নিয়ে রেখেছে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ‘ডিগনিটি কিটস' এরও মজুদ বাড়িয়েছে । সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হলেও যেন তা সামলানো যায় সেজন্য ইউনিসেফ ও পার্টনারেরা দ্রুত মাথা গোজার ঠাঁই তৈরির লক্ষ্যে ত্রিপল ও লোহার কাঠামোসহ অন্যান্য সরঞ্জামও প্রস্তুত রেখেছে ।

তবে হাজার হাজার শিশু ও তাদের পরিবারগুলো যে পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করছিল সেখানে কোনো গাছ, পাথর  বা ছোট গাছপালা ছিল না যেটা বেলে মাটি আটকে রাখবে। সেখানে একটানা ভারী বৃষ্টিতে কাদা তৈরি হয় এবং বন্যায় ও ভূমিধ্বস  হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।  এমনকি ঝোড়ো বাতাসেই শত শত ঘর ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে যায়।

২০১৮ সালের আগস্ট মাস; শরণার্থীর ঢল শুরু হওয়ার ঠিক এক বছর। অন্তত,  সরকারের নেতৃত্বে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবিক ত্রাণ সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহায়তায়, এই মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিণতি মোকাবেলা করা গেছে।

এরপরেও বহু চ্যালেঞ্জ থেকে যায়।

সংকটের প্রথম দিকের গোলমেলে অবস্থা থেকেই ইউনিসেফ এবং বিভিন্নি এনজিও ও মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মৌলিক সেবাগুলো দিয়ে আসছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ব্যাপকভাবে বাড়ানোও হয়েছে। তবে শরণার্থীদের প্রয়োজনের তুলনায় তা এখনো অপ্রতুল।

গোলমেলে ওই পরিবেশকে শিশুদের জন্য নিরাপদ করাটা ছিল ইউনিসেফ ও এর সহযোগীদের অগ্রাধিকার তালিকায় সবার উপরে। শরণার্থী শিবিরের ভিতরে ও বাইরে জেন্ডারভিত্তিকি সহিংসতা ও পারিবারিক সহিংসতার খবর আসতে থাকে। শিবিরের বাইরেও রোহিঙ্গা  শিশুদের  (বিশেষ করে কন্যাশিশু) যৌন নির্যাতন ও নিপীড়ন, পাচার ও শিশুশ্রমের ঝুঁকির সৃষ্টি হয়।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউনিসেফ ও তার পার্টনারেরা  কিশোরী ও কন্যাশিশুদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিয়ে তাদের কেস ম্যানেজমেন্ট কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে। কন্যাশিশুদের বিষয়গুলো দেখা, তাদের কথা এবং তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অনেক কন্যাশিশু ‘অ্যাডোলেসেন্ট ক্লাব’ এযোগ দেয়। এরমধ্যে ২০১৮ সালের আগস্ট নাগাদ শরণার্থী শিবিরগুলোতে ১৩০টিরও বেশি শিশুবান্ধব জায়গা গড়ে তোলা হয়। চরম নিষ্ঠুরতার মুখে নিজেদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে আসা এই শিশুদের জীবনে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২০১৯

জরুরি পরিস্থিতিতে শিশুরা তাদের প্রিয়জন ও ঘর-বাড়ি হারায়। তারা বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্য সেবা ও খাবার পায় না। তারা  নিরাপত্তার অভাবে ভোগে; প্রতিদিন যেন তাদের জন্য এক নতুন যুদ্ধ । শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। শরণার্থী সংকটের শুরু থেকে নতুন আসা লাখ লাখ শিশুকে স্কুলে ভর্তি করাটা ছিল ইউনিসেফ এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে এর পার্টনারদের  জন্য বিরাট এক চ্যালেঞ্জ।

২০১৯ সালের জানুয়ারি নাগাদ (যেহেতু নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হচ্ছিল) রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর এক লাখ ৪৫ হাজারের বেশি শিশু ইউনিসেফের সহায়তাপুষ্ট শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে যোগ দেয় । সম্প্রসারিত শিক্ষা মডিউল ও পাঠ পরিকল্পনাসহ নতুন ও পুরাতন শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে যুক্ত করার মাধ্যমে শরণার্থী শিবিরগুলোতে শিক্ষার গুণগত মানও  উন্নত হতে শুরু করে ।

A Rohingya girl child wrote on blackboard.
UNICEF/UN0326952/Brown কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে ইউনিসেফ-সমর্থিত একটি শিক্ষকেন্দ্রে চকবোর্ডে লিখছে একটি রোহিঙ্গা শিশু।

মে মাস নাগাদ ইউনিসেফ কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে প্রায় দুই হাজার শিক্ষা কেন্দ্রের উদ্বোধন করে। এসব শিক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষক সংখ্যা  চার হাজারের মতো, যারা ইউনিসেফের পার্টনারদের  বিভিন্ন কর্মসূচি থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।

ইউনিসেফের কক্সবাজার ফিল্ড অফিসের প্রাক্তন এডুকেশন ম্যানেজার চার্লস অ্যাভেলিনো বলেন, “শুরুতে আমাদের শিক্ষা সরঞ্জাম ও কোনো ধরনের পাঠ্যক্রম ছিল না। তখন শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে মূলত খেলাধুলা ও ছবি আঁকা শেখানো হত। এখন আমরা একটি কর্নার চালু করেছি। আমরা এখন দক্ষতাভিত্তিক শিখন পদ্ধতি চালু করছি।” 

শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রগতি এলেও অনেক শিশুর, বিশেষ করে বয়সে একটু বড় শিশুদের, শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে যায়। সংকটের দুই বছরেও কিশোর-কিশোরীদের বেশির ভাগ শ্রেণিকক্ষে বা বৃত্তিমূলক শিক্ষায় যোগ দিচ্ছিল না। কিশোর-কিশোরীদের জন্য শিবিরগুলোতে করার তেমন কিছুই ছিল না। এসব চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে ইউনিসেফ ও এর পার্টনারেরা  ১০০ এর মতো অ্যাডোলেসেন্ট ক্লাব গড়ে তোলে। এর মধ্য দিয়ে তরুণদের সম্পৃক্ত করে বহুমুখী  এই কেন্দ্রগুলোর একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়, যেখানে মনোসামাজিক সহায়তার পাশাপাশি স্বাক্ষরতা, গণনা, জীবন দক্ষতা ও বৃত্তিমূলক দক্ষতা তৈরিতে ক্লাস নেওয়া হয়।

Embedded video follows
UNICEF

বিপুল সংখ্যক এই শরণার্থীর আগমনের ফলে সৃষ্ট হয়েছে বিভিন্ন ধরনের সব চ্যালেঞ্জ। ইতিমধ্যে, রোহিঙ্গাদের আগমন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বিরাট সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলেতে শুরু করে দিয়েছে। বনভূমি উজাড় করে শরণার্থী শিবির তৈরির কারণে প্রভাবিত হচ্ছে ওই এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা। শিশুদের কল্যাণের দিক দিয়ে গোটা দেশের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকা কক্সবাজারের এই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর এই শরণার্থী সংকট নতুন করে চাপ তৈরি করেছিল।

ফলশ্রুতিতে, ইউনিসেফ ও অন্যান্য সংস্থা স্থানীয় এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর (হোস্ট কমিউনিটির) প্রয়োজনীয়তার দিকেও নজর দেয়। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের খুঁজে বের করে তাদের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়, বিশুদ্ধ খাবার পানির সংস্থানের জন্য গভীর নলকূপ বসিয়ে দেওয়া হয় এবং হাজার হাজার শিশুকে সরকারি স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।

এছাড়া ইউনিসেফ বাংলাদেশি এনজিও ব্র্যাকের সঙ্গে পার্টনারশীপের ভিত্তিতে শরণার্থী শিবিরগুলোর আশপাশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কিশোর-কিশোরীদের জন্য বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পারিচালনা করে। এই কর্মসূচির আওতায় উচ্চ মাধ্যমিক শেষ না করা তরুণ-তরুণীদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অনেক ধরনের প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। পরে তাদেরকে কক্সবাজারের কোর্টবাজারে স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগও করে দেওয়া হয়।

২০২০

অনেক রোহিঙ্গা শরণার্থী বাস করত পাতলা বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি করা ছাউনির ভেতরে , যেখানে তাদের প্রতিটা দিন কাটত বিপদের আশংকায়। সেখানে সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও ছিল অনেক বেশি। কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বজুড়ে লোকজন পরিবারগুলোকে নিরাপদ রাখতে অনেক পূর্ব সতর্কতা মেনে চলা শুরু করে, যার মধ্যে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার বিষয়ও ছিল। কিন্তু কক্সবাজারের জনাকীর্ণ শরণার্থী শিবিরগুলোতে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার কথা বলাটা যত সহজ ছিল, বাস্তবে করাটা ততটাই কঠিন  ছিল।

কোভিড-১৯ শুরু হওয়ার আগে থেকেই ইউনিসেফ তার পার্টনারদের  সঙ্গে মিলে শিবিরগুলোতে, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে চলার বন্দোবস্ত করতে কাজ করে আসছে। মহামারি শুরু হওয়ার পরে এসব কর্মকাণ্ড আরও জোরদার করা হয়। ইউনিসেফের পার্টনাররা দুই লাখ ৪০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য নিরাপদ পানি ও সাবানের ব্যবস্থা করে। এজন্য রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে চার হাজার হাত ধোয়ার জায়গা তৈরি করা হয়। আর শিবিরের বাইরের জনগোষ্ঠীর জন্য তৈরি করা হয় ১৬০টি জায়গা। 

কক্সবাজারের কুতুপালং ক্যাম্পে ইউনিসেফ-সমর্থিত একটি  শিক্ষাকেন্দ্রে শিশুরা সাবান দিয়ে হাত ধুচ্ছে।
UNICEF/UNI315490/Himu

এ বিষয়ে কক্সবাজারে ইউনিসেফ শিশুদের জন্য একটি উদ্ভাবনী কর্মসূচি চালু করে। এতে মজার সঙ্গে হাত ধোয়াটা অভ্যস্ততার মধ্যে (মেক ওয়াশ ফান) এনে  শিশুদেরকে কোভিড-১৯ মোকাবিলা কার্যক্রমের কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়।

পরিবার, বন্ধু ও কমিউনিটির সদস্যদের হাত ধোয়া ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে চলার বিষয়ে সচেতন করার জন্য ১,৬০০ শিশুকে (চাইল্ড লিডার) প্রস্তুত করে ইউনিসেফের পার্টনাররা । তাদের একজন মোহাম্মদ জিয়ান। প্রতিটি চাইল্ড লিডারকে উৎসাহিত করা হয়  অন্তত ১০ জন মানুষের সঙ্গে হাত ধোয়া বিষয়ক জরুরি বার্তাগুলো শেয়ার করার জন্য। এর লক্ষ ছিল শরণার্থী শিবিরগুলোর বাসিন্দাদের মাধ্যমে সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক সচেতনতা ও এর চর্চা বাড়ানো।  

মোহাম্মদের গল্প পড়ুন

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী মোহাম্মদ জিয়ান (১২)। বাংলাদেশ
UNICEF Bangladesh/2020/Reidy কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে হাত ধোয়া নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ‘লার্নিং থ্রু লাফটার’-এর একটি সেশনে মোহাম্মদ জিয়ান (১২)।

এই প্রচেষ্টায় ধর্মীয় ও কমিউনিটির নেতাদের সম্পৃক্ত করাও ছিল জরুরি। কক্সবাজার জেলাজুড়ে এক হাজার ১০০টিরও বেশি ইসলামিক কেন্দ্রের মাধ্যমে কোভিড-১৯ বিষয়ক সচেতনতার বার্তা প্রচারের  জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাথে পার্টনারশীপ গড়ে তুলে ইউনিসেফ। শিশু ও তাদের পরিবারগুলো যাতে আস্থাভাজন লোকের কাছ থেকে সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পায় সেজন্য একটি বড় সংখ্যক ধর্মীয় নেতার সঙ্গে কাজ করে ইউনিসেফ।

মহামারির সময় শিশু ও তাদের পরিবারগুলোকে সুস্থ রাখাটা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি কমাতে মার্চের মাঝামাঝিতে দেশজুড়ে স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শরণার্থী শিবিরের শিক্ষা কেন্দ্রগুলোও বন্ধ করতে হয়েছিল। এর প্রভাব পড়ে সোয়া তিন লাখের মতো রোহিঙ্গা শিশুর ওপর।

শিশুদের শিক্ষা চালিয়ে নেওয়ার জন্য ইউনিসেফ দ্রুতই বিকল্প খুঁজতে শুরু করে। কিন্তু শিবিরগুলোতে প্রযুক্তির ঘাটতি এত বেশি ছিল যে, বাবা-মা কিংবা যত্নকারীদের  মাধ্যমে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া ছিল খুবই চ্যালেঞ্জিং। 

A Rohingya child learns at Learning Centre. Bangladesh
UNICEF/UNI340770/.... রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে শিক্ষাকেন্দ্র বন্ধ থাকায়, শিশুটি বাড়িতেই পড়াশোনা করছে।

ইউনিসেফ তৎক্ষণাৎ  রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ শুরু করে দেয় যাতে শিশুদের লেখাপড়া চলমান থাকে। এর অংশ হিসেবে, স্বেচ্ছাসেবী, শিক্ষক ও শিশুর বাবা-মা অথবা যত্নকারীদেরসন্তানের লেখাপড়া চালিয়ে নিতে নির্দেশিকা দেওয়া হয়। পাশাপাশি শিশুদেরকে ছবি সম্বলিত  বই, অডিও বার্তা ও ওয়ার্কবুক দেওয়া হয়।

Rohingya camp in Bangladesh
UNICEF/UNI360599/Lateef ইউনিসেফের ইমারজেন্সী নিউট্রিশন অফিসার পুষ্টি কর্মপরিকল্পনা সপ্তাহ উপলক্ষে স্বেচ্ছাসেবকের ক্যাম্পের বাড়ি পরিদর্শনের অগ্রগতি পরীক্ষা করছেন।

শিবিরগুলোতে শুধু শিক্ষার ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট  ছিল না, এখনও অনেক সেবারই ঘাটতি সেখানে ছিল; তা। স্বাভাবিক সময়ে সেখানে ইউনিসেফের সহায়তায় বছরে দুবার ‘পুষ্টি কর্মপরিকল্পনা  সপ্তাহ’ (নিউট্রিশন অ্যাকশন উইক) পালন করা হয় সে সময় শিশুদের ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্ট দেওয়ার পাশাপাশি তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের বাছাই করা হয়।

অবশ্য বড় জমায়েত হওয়ার ঝুঁকির কারণে ২০২০ সালের ক্যাম্পেইন এর সময়  রোহিঙ্গা কমিউনিটির স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে করে বাড়ি বাড়ি যাওয়া হয়। জুলাইয়ে চার সপ্তাহের ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইনের মধ্য দিয়ে ৬  মাস থেকে ৫ বছর বয়সী দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা  বাড়ে। এছাড়াও স্বেচ্ছাসেবকেরা ঘরে ঘরে যাওয়ায়, কোভিড-১৯ এর সময় নবজাতক ও ছোট শিশুদের যত্ন নেওয়ার বিষয়েও বার্তা দিতে পারে।

২০২১

আগে থেকেই বিভিন্ন সমস্যাকবলিত  রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে কোভিড-১৯। মিয়ানমারে থাকার সময় অনেক রোহিঙ্গা শিশু স্কুলে যেতে পারত না। সে কারণে আগে থেকেই  এই শিশুদের শিক্ষার অবস্থা ছিল বেশ শোচনীয়  । দেশজুড়ে কোভিড-১৯ সংক্রমণ বাড়তে থাকায় রোহিঙ্গা শিবিরের শিক্ষা কেন্দ্রগুলো তখনও বন্ধ, সে সময় ইউনিসেফ ঘরেই শিশুদের শিক্ষা চালিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করে। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ইউনিসেফ বাংলাদেশ চার লাখ ৩৫ হাজার ওয়ার্কবুক ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করে। তাতে রোহিঙ্গা শিবিরের এক লাখ ৯০ হাজারের বেশি শিশু উপকৃত হয়। অন্যদিকে, বাবা-মা ও শিশুদের যত্নকারীদের তেমন শিক্ষা না থাকায়, বার্মিজ ভাষা প্রশিক্ষকদের রোহিঙ্গা ঘরগুলো পরিদর্শন করে কোভিড-১৯ প্রতিরোধের বার্তা দেবার প্রচেষ্টাও খানিকটা জটিল হয়ে পড়ে।  

কোভিড-১৯ প্রতিরোধে দেওয়া লকডাউনের কারণে শিশুরা নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়। তাদের শিক্ষা ব্যাহত হওয়ার কারণে হাজার হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুতির মধ্যে আরেক বাস্তুচ্যুতির বাস্তবতা অনুভব করে।

২২ মার্চ; চারটি শিবিরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। তাতে ৫০ হাজারেরও বেশি শরণার্থী গৃহহীন হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে অর্ধেকই  ছিল শিশু। এসব শিশু ও তাদের পরিবারগুলোকে জরুরি সহায়তা দিতে দ্রুত ঘটনাস্থলে যায় ইউনিসেফ ও এর পার্টনারেরা। ঘর থেকে শরণার্থীদের বের করতে কাজ করে ইউনিসেফের স্বেচ্ছাসেবকেরা। তাছাড়া আহত ও দগ্ধদের প্রাথমিক সহায়তা দেওয়ার জন্য হেলথ টিম নিয়ে আসে ইউনিসেফ।

On March 22, a fire tore across four camps, causing enormous damage and displacing around 50,000 refugees, half of them children.

UNICEF/UN0431895/Mohsin

But as firefighters extinguished the last embers of the blaze, the scale of the damage was already becoming clear…

হাজার হাজার ঘর পুড়ে গেছে, অন্তত ১৪০টি শিক্ষা কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেছে এবং শিবিরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে । 

এই পরিস্থিতি নিয়ে ১২ বছরের জুনাইদ বলে, ‘আমি শিক্ষা কেন্দ্রে আসতে খুব পছন্দ করতাম। এখানে আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে খেলতাম। কিন্তু সব কিছু হারিয়ে গেছে।’

কোভিড-১৯ এর কারণে বন্ধ হওয়ার ১৮ মাস পর সেপ্টেম্বরে শিক্ষা কেন্দ্রগুলো আবার চালুর অনুমতি পাওয়া যায়। কিন্তু দীর্ঘ দিনের এই বন্ধের কারণে শিবিরগুলোতে শিক্ষার ওপর অনেক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে গেছে। অনেক শিশু শিক্ষায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে এবং উপার্জন হয় এমন কাজে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

A learning Centre for Rohingya children. Bangladesh
UNICEF/UN0551996/Spiridonova রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে একটি মেয়ে তার চেয়ে ছোট বাচ্চাদের গণিত শেখাচ্ছে।

কন্যাশিশুদের জন্য শিক্ষা কেন্দ্রে ফেরার  বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক বাধা কাজ করেছে।

শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পরের সময়টা রোহিঙ্গা শিশুদের জীবনে  আরেক পরিবর্তন নিয়ে আসে। তাদের আর এখন স্বাধীনভাবে ঘরের বাইরে বের হতে দেওয়া হয় না এবং বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত ঘরের ভেতরে থাকার নির্দেশনা জারি করা হয়। এ ধরনের রীতি রোহিঙ্গাদের মধ্যে নতুন নয়। কিন্তু অন্যান্য স্থানে বাড়ির ভেতর কন্যাশিশুরা কিছুটা জায়গা পেয়ে থাকে, যেটা কক্সবাজারের জনাকীর্ণ শরণার্থী শিবিরে পাওয়া সম্ভব নয়। সেখানে বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছাতেই কন্যাশিশুদের ছোট্ট, দম বন্ধ হওয়ার মতো রুমে আটকে রাখা হয়। সেখানে রান্না ও ঘর পরিষ্কারে ব্যস্ত থাকা ছাড়া তাদের আর কিছু করার থাকে না।

শিক্ষা কেন্দ্রগুলো আবার চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউনিসেফ কয়েক শ স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করে, যারা রোহিঙ্গাদের সামাজিক রীতি-নীতি ও আচরণগত পরিবর্তনে কাজ করেন। তারা আবার কন্যাশিশুদের শিক্ষা কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে কাজ করেন। এক্ষেত্রে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় নেতাদেরও কাজে লাগানো হয়। ফলশ্রুতিতে অনেক বাবা-মা তাদের মেয়েদের শুধু কন্যাশিশুদের জন্য আয়োজিত শ্রেণিকক্ষে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে রাজি হন। শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে কন্যাশিশুদের সঙ্গে করে আনা-নেওয়ার জন্য বয়স্ক নারীদের সংগঠিত করতেও রোহিঙ্গ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করে ইউনিসেফ।

২০২২

এ বছর মে মাসে রোহিঙ্গাদের স্বদেশ মিয়ানমারের জাতীয় পাঠ্যক্রমে লেখাপড়ার জন্য ১০ হাজার তম শিশু নাম লেখায়। এর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি দেখা যায় যা তাদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করে। ।

ইউনিসেফ ও এর অংশীদারেরা ২০২১ সালের শেষ দিকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমে লেখাপড়া চালু করে। এটা ছিল রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের শিক্ষার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনের জন্য তাদের প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। মিয়ানমারের জাতীয় পাঠ্যক্রমের আলোকে তৈরি এই পাঠ্যক্রম এর মাধ্যমে  রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুরা   একটি সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পায়।

A learning centre for Rohingya children.
UNICEF/UN0688030/Spiridonova রোহিঙ্গা শিশুরা ইউনিসেফের একটি শিক্ষা কেন্দ্রে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমে অধ্যয়ন করছে।

এর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রে ঘাটতি পূরণেরও একটি প্রচেষ্টা শুরু হয়। এখানে একটু বড়  শিশুদেরও লেখাপড়ার সুযোগ তৈরি হয়, যাদের শিক্ষা লাভের আগে  কোনো সুযোগ ছিল না।

A learning centre for Rohingya children. Bangladesh
UNICEF/UN0633790/Sujan সোহিল, বামে, একজন বার্মিজ ভাষা প্রশিক্ষক, ইউনিসেফ-সমর্থিত একটি শিক্ষা কেন্দ্রে পড়াচ্ছেন৷

“এসব শিশুদের মধ্যে আশার সঞ্চার, তাদের শিক্ষা প্রদান, মিয়ানমারে তাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে যা যা করা লাগে তার সব কিছু আমরা করব।” 

–শেলডন ইয়েট, ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি।

সংকটকালীন সময়ে  প্রতিবন্ধী  শিশুদের চ্যালেঞ্জগুলো আরও বেড়ে যায়। প্রতিবন্ধী শিশুরা প্রায়ই নিপীড়ন বা সহিংসতার শিকার হয়। সমবয়সী অন্য সব শিশুদের তুলনায় তাদের অনেকেই মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। তাদেরকে বিশুদ্ধ পানি এবং পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা পেতে প্রায়ই অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি প্রতিবন্ধী কন্যাশিশুদের ঋতুকালীন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উপকরণ পেতেও এসব বাধার মুখে পড়তে হয়। সহায়ক ডিভাইস, পরিবহন ও প্রতিবন্ধীবান্ধব স্থাপনার ঘাটতির কারণে জরুরি সামাজিক সেবাগুলো তাদের হাতের নাগালের বাইরে থেকে যায়।

কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলো যেসব পাহাড়ি ঢালে গড়ে উঠেছে, সেগুলো পাড়ি দেওয়া  সবল-সক্ষম লোকদের জন্যও খুব একটা সহজ নয়। বিশেষ করে বর্ষা মওসুমে তা আরও বেশি কষ্টসাধ্য  হয়ে ওঠে। এ সময় ভূমিধ্বস ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিটা দিন কাটাতে হয়। ইউনিসেফ ও এর পার্টনারেরা  শরণার্থী শিবিরগুলোতে বসবাসকারী প্রতিবন্ধী  ব্যক্তিদের প্রয়োজন মেটাতে কাজ করে। তারা যাতে সহজে শিশু সুরক্ষা ও শিক্ষা কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হতে পারে, তা নিশ্চিত করতে কাজ করে। সেজন্য প্রতিবন্ধীবান্ধব শৌচাগার নির্মাণসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। জুন মাস নাগাদ এ ধরনের এক হাজার শৌচাগার নির্মাণ করা হয়। প্রতিবন্ধী  শিশুদের শনাক্ত করে সহায়তার জন্য যথাযথ জায়গায় পাঠানোর বিষয়ে কমিউনিটির সদস্য ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সব শিশুর জন্য সমান সুযোগ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিতে এটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ।

“আমি একজন শিক্ষক হতে চাই। কারণ শিক্ষকদের সবাই সম্মান করে। শিক্ষক হয়ে আমি আমার মতো অন্য শিশুদের সহযোগিতা করতে পারব।”

ইরফান, ৯।
A Rohingya children, Bangladesh
UNICEF/UN0749984/Lateef

২০২৩

রোহিঙ্গা সংকট নতুন বছরে পদার্পণ করার সাথে সাথে, শরণার্থী শিশুরা চেনা-আচেনা বিভিন্ন  চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে থাকে ।

মার্চে আগুন লেগে হাজার হাজার শরণার্থী গৃহহীন হয়ে পড়ে। দেশ থেকে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয়া প্রায় ১২ হাজার শরণার্থীরা আবারও  গৃহহীন হয়ে পড়ে।

মে মাসে বয়ে যায় ঘূর্ণিঝড় মোখা। এই ঝড় এবং ২০১৯ সালে হওয়া ঘূর্ণিঝড় ফনী ছিল এ যাবৎ কালে উত্তর ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড় মোখা  বাংলাদেশের অংশবিশেষ ও মিয়ানমারের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। ঝড়টির কেন্দ্র কক্সবাজার উপকূলে আঘাত হানে। তাতে রোহিঙ্গা শিবির ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ সময় ঝড়ো বাতাস ও ভারী বৃষ্টিতে রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি করা অনেক অস্থায়ী আবাস, স্থাপনা ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

Cox’s Bazar was spared the eye of the storm, thousands of people in the camps and host community were affected.
UNICEF/UN0842864/Himu ঘূর্ণিঝড় মোখায় বাংলাদেশের টেকনাফের শরণার্থী শিবিরেঢ় একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্রর কাছে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে।

রোহিঙ্গা  সংকটের ছয় বছর হতে চলেছে; এমন  সময়ে রোহিঙ্গাদের একটি ভালো ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদী হওয়ার কিছু পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে । দেশান্তর হওয়া, , অনেক শিক্ষা কেন্দ্র আগুনে পুড়ে যাওয়া এবং ঘূর্ণিঝড় মোখার আঘাত সত্ত্বেও, জুলাইয়ে নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে রোহিঙ্গা শিবিরের শ্রেণিকক্ষগুলো শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে ভরে উঠে। স্কুলের প্রথম দিন উপলক্ষে তাদের মধ্যে  বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়।

কিশোর-কিশোরীদের জন্যও শিক্ষার সুযোগ এবং কন্যাশিশুদের জন্য আলাদা শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা করায়, শিক্ষায় রোহিঙ্গা শিশুদের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি দেখা যায়। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের জন্য রেকর্ড সংখ্যক, তিন লাখ, শিশু নাম লিখিয়েছে। নতুন এই শিক্ষাবর্ষে প্রথমবারের মতো সব বয়সী রোহিঙ্গা শিশুদের মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমে লেখাপড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ বছর শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে কিশোরীদের এই রেকর্ড সংখ্যক উপস্থিতি বজায় রাখার জন্য আরও  জোরদার প্রচেষ্টা প্রয়োজন।   

Rohingya refugee children want to learn, and having access to education gives them the best chance of one day turning their hopes for a better future into reality.
UNICEF/UNI411470/Lateef শরণার্থী শিবিরের একটি শিক্ষাকেন্দ্রের বাইরে মেয়েরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ শরণার্থী শিবিরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজন  বিপুল কর্মযজ্ঞ। তবে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুরা শিখতে চায়। শিক্ষার সুযোগ দেওয়া গেলে তাদের একটি উন্নত ভবিষ্যতের আশা, এক দিন বাস্তবে রূপ নেওয়ার সুযোগ পাবে।