প্রতিকূলতার মধ্যেও রোহিঙ্গা শরণার্থীরা সৃজনশীল হয়ে ওঠে

রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীদের বানানো স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রগুলোর মাধ্যমে শরণার্থী শিবিরে বেড়ে ওঠা তরুণদের চ্যালেঞ্জ ও স্বপ্নগুলো তুলে ধরা হয়।

ইউনিসেফ
A Rohingya girl in Cox's Bazar camp in Bangladesh
UNICEF/UNI406809/Mawa
21 আগস্ট 2023

একটি মেয়ে একটি স্কুল ব্যাগ তুলে নিয়ে একটি ছোট ঘরের চারপাশে ঘুরতে শুরু করে। সে দেয়ালে অন্য শিশুদের আঁকা কিছু ছবির দিকে তাকায়। ঘরের কোণের ঘড়িটির টিক টিক শব্দের সাথে সাথে যেন তার উদ্বিগ্নতা ও হতাশাও ক্রমশ বাড়ছে । কিন্তু সে এই ঘরের বাইরে যেতে পারবে না। এমন সময় একজন বর্ণনাকারীর কণ্ঠে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে ওঠে - সোফা একজন মেয়ে, তাই তার বাবা-মা তাকে সারাদিন তাদের আশ্রয়কেন্দ্রের ভেতরেই থাকতে বাধ্য করে।

দৃশ্যটি ১৩ বছর বয়সী সোফার নির্মিত একটি স্বল্প দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রের অংশ; সোফা বাংলাদেশের কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে আরও লাখ লাখ রোহিঙ্গা শিশুর সঙ্গে বসবাস করে।

"আমরা এমন একটি গল্পের দেখাতে চেয়েছিলাম যা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ," সোফা ব্যাখ্যা করে। “এটা সেসব অভিভাবকদের সম্পর্কে যারা তাদের সন্তানদের স্কুলে যেতে দেয় না। আমাদের সংগ্রামের বিষয়গুলো অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ"- বলে সে।

১ থেকে ১৩ বছর বয়সী যে ১৫ জন রোহিঙ্গা শিশু সম্প্রতি চলচ্চিত্র নির্মাণ বিষয়ক পাঁচ দিনব্যাপী কর্মশালায় অংশ নিয়েছিল, সোফা তাদেরই একজন। কর্মশালাটির আয়োজন করে ইউনিসেফ এবং এতে সহযোগিতা দেয় 'দ্য ওয়ান মিনিটস জুনিয়র' নামক একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ, যার লক্ষ্য শিল্পের মাধ্যমে তরুণদের ক্ষমতায়ন করা।
 
“ক্যামেরা চালাতে এবং নিজের সিনেমায় অভিনয় করতে আমার দারুণ লেগেছে,” বলে ১৩ বছর বয়সী আরেক অংশগ্রহণকারী রিফাত। "এই কর্মশালার আগে আমি কখনও ভাবিনি যে আমি একটি সিনেমা বানাবো"- সে জানায়।

সারা বিশ্বের তরুণ শিল্পীরা শিশুদের জন্য আয়োজিত এই কর্মশালায় সহযোগিতা করেছে। এই কর্মশালার মাধ্যমে শিশুরা গল্পের চিত্রনাট্য লেখা, ক্যামেরা পরিচালনা ও ভিডিও ফুটেজ সম্পাদনাসহ চলচ্চিত্র নির্মাণের মূল বিষয়গুলো শিখেছে। কর্মশালার শেষে, প্রতিটি অংশগ্রহণকারী তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় বেছে নিয়ে তার ওপর একটি করে স্বল্প দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র বানিয়েছে।

কর্মশালার প্রশিক্ষকদের একজন মিশা ডি রিড্ডার বলেন, "ক্যাম্পে কাজ করা একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা ছিল। আমরা প্রকৃতির জন্য আকুতি, একদিন ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা এবং শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে গল্প পেয়েছি। আশা করি, আমরা তাদের অনুপ্রাণিত করতে এবং ভবিষ্যতের জন্য তাদের মধ্যে আশার আলো জ্বালাতে পেরেছি, যাতে তারা বুঝতে পারে যে তাদের কল্পনা শক্তিকে কেউ আটকে রাখতে পারবে না।"

A Rohingya girl in Cox's Bazar, Bangladesh.
UNICEF/UNI406806/Mawa

“আমি অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে এবং একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে আমাদের গল্পগুলো বলতে চাই।”

মিনারা, ১২

এক মিনিটের এই চলচ্চিত্রগুলোতে ছয় বছর ধরে শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গা শিশুরা প্রতিনিয়ত যেসব কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয় তা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি, এই শিশুরা কীভাবে শরণার্থী শিবিরের বাইরের জীবনের স্বপ্ন দেখা অব্যাহত রেখেছে সেটাও ফুটে উঠেছে।

১২ বছর বয়সী মিনারা নারী ও মেয়েদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু চ্যালেঞ্জ চিত্রায়িত করতে চেয়েছিল। তার গল্পটি শৈশবে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সময় অল্পবয়সী মেয়েরা যে বোঝার মুখোমুখি হয় তার একটি শক্তিশালী ও সৃজনশীল চিত্রায়ন। "আমি আমার গল্পের অনুপ্রেরণা পেয়েছি আমার কাছাকাছি থাকা একটি মেয়ের কাছ থেকে" বলে মিনারা। "আমি দেখাতে চেয়েছিলাম যে ১৮ বছর বয়সের আগে বিয়ে হলে একটি মেয়ের জীবনে কী ঘটতে পারে।" সে আরও বলে, "আমি ভবিষ্যতে আরও সিনেমা বানাতে চাই, বিশেষ করে মেয়েদের জীবন নিয়ে।"

“আমার বন্ধু ও পরিবারের সদস্যরা সিনেমাটি দেখে আমাকে নিয়ে সত্যিই গর্বিত হয়েছে।” - উম্মে, ১২

অন্যান্য শিশুরা তাদের কমিউনিটির কিছু ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তুলে ধরেছে তাদের চলচ্চিত্রের মাধ্যমে।

১২ বছর বয়সী উম্মের চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু ছিল রোহিঙ্গা মেয়ে ও নারীরা চন্দনকাঠ ব্যবহার করে কীভাবে রূপসজ্জা করে। উম্মে বলে, "এটি আমাদের সুন্দর দেখানোর একটি বিশেষ উপায়।" “আমি সবাইকে আমাদের ঐতিহ্যবাহী জিনিসগুলো দেখাতে চেয়েছিলাম কারণ এটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এটি আমাদের পরিচয়ের অংশ-" বলে উম্মে।

“ক্যামেরা চালাতে সত্যিই খুব ভালো লাগে, কিন্তু আমার আগ্রহ অভিনয়ে। একজন অ্যাকশন হিরো হওয়া আমার স্বপ্ন,” বলে ১২ বছর বয়সী মো. রহমতুল্লাহ।

“আমি এই গল্প নিয়ে এসেছি কারণ, মিয়ানমারে ফেলে আসাআমাদের বাড়ির কথা আমার খুব মনে পড়ে।” - নুর, ১১

শিশুরা শরণার্থী শিবিরে তাদের জীবন নিয়েও গল্প বলেছে – তারা কী পছন্দ করে এবং বাড়ির যে বিষয়গুলো তাদের বেশী মনে পড়ে। ১২ বছর বয়সী রহমতুল্লাহ তার শিক্ষাকেন্দ্র ও তার শিক্ষককে নিয়ে একটি গীতিনাট্য তৈরি করেছে । আর ১১ বছর বয়সী নুর, মিয়ানমারে তার বাড়ির কথা কতটা মনে করে তা নিয়ে বানিয়েছে তার চলচ্চিত্রটি।

“আমি দেখাতে চেয়েছি কীভাবে আমরা একে অপরকে সাহায্য করি।” - রিফাত, ১৩

“আমি একটি ড্রেনের পাশে ফুটবল খেলতাম যা মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়।” - জামিল, ১৩

এই শিশুরা যেসব সৃজনশীল উপায়ে তাদের শরণার্থী জীবনের বাস্তবতা তুলে ধরেছে তা সত্যিই অভাবনীয় । স্বপ্নের পর্যায়ক্রমিক কৌশল ব্যবহার করে ১৩ বছর বয়সী জামিল কল্পনা করে যে, শিবিরের নোংরা পরিবেশ একটি সুন্দর জায়গায় রূপান্তরিত হয়েছে যেখানে সে ও তার বন্ধুরা কোনো রকমের দুর্ভাবনা ছাড়াই খেলতে পারছে । "আমি সবুজ পরিবেশ এবং ফুটবল খেলার জন্য পর্যাপ্ত জায়গাসহ একটি শিবিরের কল্পনা করেছি," বলে জামিল।

১৩ বছর বয়সী রেফাত তার গল্পে দেখিয়েছে চিকিৎসা সেবাসহ শিবিরে বিভিন্ন সেবা প্রাপ্তির সুযোগের যে অভাব এবং এই দুর্গম এলাকায় অসুস্থদের বহন করার জন্য শরণার্থীদের নিজেদেরই কীভাবে অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে কাজ পালন করতে হয়। "আমি আমার গল্প নিয়ে এসেছি কারণ শিবিরে কোনো সমতল ভূমি ও অ্যাম্বুলেন্স নেই। সুতরাং, আমি দেখাতে চেয়েছিলাম কীভাবে আমরা একে অপরকে সাহায্য করি-" সে যোগ করে," বলে রেফাত।

কর্মশালার অংশগ্রহণকারীরা তাদের প্রায় অর্ধেক জীবন কাটিয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরে, যেখানে প্রায় দশ লাখ শরণার্থীর বাস, যারা শুধুমাত্র মৌলিক কিছু সেবা পায় এবং সহিংসতা, অগ্নিকাণ্ড ও ভূমি ধ্বসের মত উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে। এমনকি স্বাস্থ্যসেবা, পর্যাপ্ত পুষ্টি, শিক্ষা ও সুরক্ষার মতো মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করাও যেখানে প্রতিনিয়ত একটি চ্যালেঞ্জ, সেখানে শিল্প ও খেলার মাধ্যমে সৃজনশীলতা প্রকাশ করার মতো সুযোগগুলো আরও সীমিত।

ইউনিসেফ এই সংকটের শুরু থেকেই মা রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের অধিকারের জন্য সরাসরি কাজ করে আসছে । বর্তমানে মেয়েরা যাতে শিক্ষা থেকে ঝরে না যায় এবং রোহিঙ্গা শিশুরা যাতে তাদের নিজস্ব ভাষায় শিখতে পারে তা নিশ্চিত করতে ক্যাম্পগুলোতে একটি বড় মাপের শিক্ষা কার্যক্রম চলছে।

সংকটটি সপ্তম বছরে পদার্পণ করছে; কিন্তু মিয়ানমারে অবিলম্বে ও নিরাপদে ফিরে যাবার কোনো আশা বা সম্ভাবনাএখন পর্যন্ত নেই।

কক্সবাজারে ইউনিসেফের ফিল্ড অফিসের প্রধান এজাতুল্লাহ মজিদ বলেন, “এই শিশুদের নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো তাদের সৃজনশীলতার দারুণ উদাহরণ। কিন্তু তারা এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিশুরা সেই সম্ভাবনাকে লালন করার এবং প্রতিটি শিশুরই প্রাপ্য– এমন একটি শৈশব উপভোগ করার সুযোগ ছাড়াই বেড়ে উঠছে। এই শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আমাদের আরও কাজ চালিয়ে যেতে হবে, যাতে তারা শিখতে পারে, বেড়ে উঠতে পারে এবং বড় স্বপ্ন দেখার সাহস করতে পারে।"


শিক্ষার জন্য ৪ কোটি মার্কিন ডলারের আবেদন জানানো হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৭০ শতাংশ তহবিলের যোগান হয়েছে। কক্সবাজারের প্রতিটি শরণার্থী শিশু যাতে শিখতে পারে সেজন্য প্রচেষ্টা আরও ত্বরান্বিত করতে ইউনিসেফকে সক্ষম করার জন্য জরুরি সহায়তা প্রয়োজন।