জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে মানানসই নিরাপদ খাবার পানির উৎস
ইউনিসেফ নির্মিত জলবায়ু সহনশীল একটি নতুন পানিশোধনাগার কক্সবাজারে বিশুদ্ধ খাবার পানির সুযোগসহ নানান সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে।
- বাংলা
- English
কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত উপকূলীয় দ্বীপ কুতুবদিয়া উপজেলায় ছিলো রুমাদের বাড়ি। প্রায় তেত্রিশ বছর আগে, এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে রুমার পরিবার তাদের বাড়িঘর ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হয়; তারা কক্সবাজারে নতুন করে জীবন শুরু করে।
কিন্তু তাদের এই নতুন কমিউনিটিতে ছিলো নতুন চ্যালেঞ্জ - বিশুদ্ধ খাবার পানি, গোসলের পানি, রান্নার পানি এবং অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহারযোগ্য পানি খুঁজে পাওয়ার চ্যালেঞ্জ।এর ফলে রুমার পরিবারকে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিতে পড়তে হয়েছিলো।
রুমা বলেন, “লবণাক্ত ও দূষিত পানির কারণে চর্মরোগসহ আমার বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিয়েছিলো।” তিনি আরও জানান, “বোতলজাত পানি কেনা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় ছিলো না। এটি বেশ ব্যয়বহুল। কিন্তু এটিই ছিলো আমাদের একমাত্র নিরাপদ বিকল্প।”
কয়েক দশক ধরে, কক্সবাজারের পরিবারগুলো মারাত্মক পানি সংকটে ভুগছে। স্থানীয় পানির উৎসগুলোতে উচ্চমাত্রার লবণ এবং আয়রন রয়েছে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়া, টয়লেটের পিট থেকে মল-মুত্র পানিতে মিশে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্রমবর্ধমান খরা ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে পরিস্থিতি দিনে দিনে আরও খারাপ হচ্ছে। এর ফলে, পরিবারগুলোকে হয় অনিরাপদ বা দূষিত পানির উপর অথবা ব্যয়বহুল বিকল্পের উপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।
টেকসই পানির নতুন উৎস
এই সমস্যার সমাধানে সরকার, স্থানীয় এনজিও এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ইউনিসেফ কক্সবাজারে জলবায়ু সহনশীল লবণাক্ত পানি শোধনাগার নির্মাণ করেছে। এই পানি শোধনাগারটি প্রতিদিন ৬–৮ ঘণ্টা চালু থাকে এবং প্রতি ঘণ্টায় ৪,০০০ লিটার বিশুদ্ধ পানীয় জলের যোগান দেয়।এতে স্থানীয়দের চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা এখন মাত্র কুড়ি পয়সা (০.২০ টাকা) ব্যয় করে এক লিটার নিরাপদ পানি সংগ্রহ করতে পারছেন। এতে করে সংসারের ব্যয় যেমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে, ঠিক তেমনভাবে কলেরা ও ডায়রিয়ার মতো পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও হ্রাস পাচ্ছে।
এই সেবাকেন্দ্রে ১২টি সৌরশক্তিচালিত পানির (ভেন্ডিং)মেশিন রয়েছে। এগুলো শোধনাগারের সাথে সরাসরি সংযুক্ত এবং কমিউনিটির বিভিন্ন স্থানে এগুলো স্থাপন করা হয়েছে। প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করে পরিবারগুলো এখন তাদের নিকটবর্তী এটিএম থেকে সহজে পানি সংগ্রহ করতে পারে। এখন ৩,১০০টির বেশি পরিবারের প্রায় ১৬,০০০ মানুষ নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মুল্যে পানির জন্য এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে।
রুমা বলেন, “এই শোধনাগারের আগে অগভীর নলকূপের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হতো। কিন্তু এগুলো নিরাপদ ছিল না। অন্যদিকে, অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে বোতলজাত পানি ক্রয় করা বেশ ব্যয়বহুল ছিল।” তিনি আরও জানান, “এখন পানির এটিএম মেশিনগুলো বেশ নিকটেই রয়েছে। এ কারনে নিরাপদ পানি সংগ্রহ করা এখন বেশ সহজ, নিরাপদ এবং সাশ্রয়ীও বটে।”
নারীরাই এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন
রুমা এখন শুধু পানিশোধনাগারের একজন উপকারভোগী নন, বরং এর সফলতার পেছনে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তার জমির উপর ইউনিসেফ এই পানি শোধনাগার নির্মান করেছে আর বিনিময়ে তিনি এই শোধনাগার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন। প্রতিদিন সকালবেলা রুমা মেশিন চালু করেন, পানির মান পরীক্ষা করেন, এটিএমগুলোতে (ভেন্ডিং মেশিনগুলোতে) পানি সরবরাহ নিশ্চিত করেন, এবং কার্ড রিচার্জ করতে মানুষকে সাহায্য করেন।প্রতিটি নতুন কার্ড বিক্রি থেকে রুমা কমিশন পান। আর এই কমিশননের টাকা তিনি নিজের পরিবারের খরচ চালাতে ব্যবহার করেন।
রুমা বলেন, “এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ আমার মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।” রুমা আরও জানান, “আমার কমিউনিটিকে সেবা দিতে পেরে আমি গর্ব বোধ করি। এখন আমার নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় আছে এবং প্রতিনিয়ত বেশি বেশি মানুষ যুক্ত হবার (সাইন আপ করার) কারণে সেই আয় বাড়ছে।”
সমগ্র কমিউনিটিতে পরিবর্তনের হাওয়া
নিরাপদ খাবার পানির সুবিধা পাবার পাশাপাশি এই শোধনাগারটি এই এলাকার বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। এর আগে পরিবারগুলোকে—বিশেষ করে নারী ও শিশুদেরকে—দূরদূরান্ত থেকে পানি আনতে হতো। এখন সহজে পানি পাওয়া যাচ্ছে। ফলে নারী ও শিশুরা—যেমন ১০ বছর বয়সী জান্নাতুল—এখন পড়াশোনার জন্য বেশি সময় পাচ্ছে; আর সহজ হয়েছে রান্না-বান্না ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ প্রতিদিনের ঘরের কাজ।
জান্নাতুল বলেন, “আগে পানি আনার জন্য আমাকে অনেক দূরে যেতে হতো।কিন্তু এটিএম এখন আমার বাসার কাছে। এ কারণে আমাকে আর এখন তাড়াহুড়ো করে স্কুলে যেতে হয় না।”
নিরাপদ পানির সুবিধা কমিউনিটির জন্য বড় ধরনের স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক সুফল বয়ে এনেছে। এক সময় হুমকি হিসেবে বিবেচিত পানিবাহিত রোগের সংক্রমণ এখন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ৭০০টিরও বেশি স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এই সেবার গ্রাহক হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে এবং নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মূল্যের পানির জন্য এখন তারা এটিএম ব্যবহার করছে।
কমিউনিটির লড়াই করে টিকে থাকার (রেজিলিয়েন্সের) সুন্দর এক মডেল
জলবায়ু সহনশীল এই পানিশোধনাগারটি শুধু তাৎক্ষণিক পানিসঙ্কটেরই সমাধান করছে না, বরং ভবিষ্যতের জলবায়ুজনিত চ্যালেঞ্জ যেমন লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে টিকে থাকতেও কমিউনিটিকে সহায়তা করছে।
রুমা জানায়, “এই পানিশোধনাগারটি আমাদের শুধু পানি দেয়নি—এটি আমাদের নিরাপত্তা ও আশা এনে দিয়েছে। আমরা এখন আর আগাম বন্যা বা খরার চিন্তায় ভয় পাই না। কারণ আমাদের এখন বিশুদ্ধ পানির একটি নির্ভরযোগ্য উৎস আছে।”
এই প্রকল্পের জন্য কমিউনিটির সদস্য হিসাবে আমরা সবাই গর্ববোধ করি। এই পানিশোধনাগারটি যেন দক্ষতার সাথে পরিচালিত হয় সে কারণে স্থানীয় একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইউনিসেফ ও তার অংশীজনেরা এই প্রকল্পটি চালু রাখার ক্ষেত্রে কমিউনিটির বাসিন্দাদের সক্রিয়ভাবে এর সাথে যুক্তকরার মাধ্যমে ভবিষ্যতে এর দায়িত্বভার গ্রহণের জন্য তাদেরকে উৎসাহিত করেছে, প্রস্তুত করেছে, আত্মবিশ্বাসী করেছে । এই সাফল্য তো কেবল এক সুচনা, রুমা মনে করেন।
“সঙ্কটের সময় সবাই যেন নিরাপদ পানির সুবিধা পায় সে বিষয়টি আমি নিশ্চিত করতে চাই,” রুমা জোর দিয়ে বলেন। “আরও এটিএম স্থাপন করলে, আমরা আরও বেশি মানুষকে নিরাপদ রাখতে পারব,” তিনি আরও বলেন।
রুমা যেহেতু নিজেই এই পানিশোধনাগারটি পরিচালনা করছে এবং একজন উদ্যোক্তা হিসেবে তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, সে কারণে তিনি বিশ্বাস করেন যে তার কমিউনিটির ভবিষ্যৎ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও উজ্জ্বল ও আশাবাদী। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পানির পাবার সুযোগ তাদের জীবনকে বদলে দিয়েছে, তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি করেছে এবং রুমার মতো অনেককেই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজ হাতে গড়ে তুলে ক্ষ্মতায়িত করেছে।

