শিশুদের বিকাশ গোটা সমাজের হাতে: রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে বদলাচ্ছে শিশু লালন-পালন ধারা
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে মা-বাবা ও কমিউনিটির নেতারা ভালোবাসা, যত্ন ও মর্যাদার সাথে সন্তান লালন-পালন করতে শিখছেন
- বাংলা
- English
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে জীবন অত্যন্ত কঠিন। সেখানে শিশুরা ও পরিবারগুলো ঘিঞ্জি পরিবেশে গাদাগাদি করে বসবাস করে। খাদ্য, সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পানি, পয়ঃনিষ্কাসন ও আশ্রয়ের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু মানবিক তহবিলে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় এসব সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
এইসব প্রতিকূলতার মাঝেও সন্তানকে লালন-পালনের ক্ষেত্রে যেন কোন ঘাটতি না থাকে সেই নিয়ে বেশ সচেতন ৩৮ বছর বয়সী হাবি মোহাম্মদ। চার সন্তানের জনক হাবির মতন অনেক বাবারাই এখন শিখছেন কিভাবে সন্তান-সন্ততি ভালোবাসা, যত্ন ও সম্মানের সঙ্গে লালন-পালন করতে হয়।
“প্রতিদিনের সংগ্রামের ফলে বাবা-মায়েরা সন্তানদের আবেগ অনুভূতির দিকে ঠিক মতন মনোযোগ দেওয়ার সময় বা শক্তি পান না,” হাবি বলেন। “আবার অনেক সময় অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজেদের মানসিক চাপ আমরা আমাদের সন্তানদের ওপর চাপিয়ে দেই, এব্যাপারে সতর্ক থাকা খুব জরুরী।”
গত বছর (২০২৫) একজন সমাজকর্মী বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিদর্শনের সময় হাবির আশ্রয়কেন্দ্রে যান। তখনই তিনি প্রথম বাবাদের জন্য আয়োজিত পজিটিভ প্যারেন্টিং ( নিবিড় ও যত্নশীল সম্পর্কের ভিত্তিতে সন্তানকে লালন-পালন করা)সেশনের কথা জানতে পারেন এবং সাথে সাথেই তিনি অংশগ্রহণে সম্মতি দেন।
আজ পর্যন্ত হাবি প্রতি মাসে দুটি করে মোট ২০টি সেশনে অংশ নিয়েছেন। “এ পর্যন্ত আমি একটা সেশনও বাদ দেই নাই। এসব সেশন তাকে সন্তান পালনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে এবং সন্তানদেরকে উৎসাহ, সহানুভূতি ও সময় দিয়ে গড়ে তুলতে শিখিয়েছে।
একদিন হাবি লক্ষ্য করলেন, তাঁর ১২ বছর বয়সী বড় ছেলে ইউসুফ, যে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, পড়াশোনায় মনোযোগ দিচ্ছে না। তিনি স্বীকার করেন যে এমন ঘটনা আগে ঘটলেতিনি ইউসুফকে বকতেন এমনকি কখনও মারতেন; তিনি ভাবতেন যে ভয় দেখালে সে আরও মনোযোগী হবে।
কিন্তু এবার তিনি পরিস্থিতি ভিন্নভাবে সামাল দিলেন; পজিটিভ প্যারেন্টিং সেশনগুলো থেকে তিনি শিখেছেন ধৈর্যে নিয়ে শিশুদের সাথে কথা বলতে হয় যেন তারাও মন খুলে বাবা-মার সাথে সব শেয়ার করতে পারে; শিশুদের সাথে রাগ না করে বোঝাতে হয়, উৎসাহ ও প্রেরনা দিতে হয়। তাই চিৎকার করার বদলে হাবি ছেলের পাশে বসে জিজ্ঞেস করলেন তার কী হয়েছে। ইউসুফ তাকে বলল, তার সব বন্ধুদের খেলার জন্য একটি করে ফুটবল আছে, কিন্তু তার নেই। সেও একটি ফুটবল চায়।
হাবি ধৈর্য ধরে শুনেন এবং ছেলেকে কথা দেন – ইউসুফ যদি পরবর্তী পরীক্ষায় প্রথম থেকে পঞ্চম অবস্থানে থাকতে পারে, তবে তিনি তাকে একটি ফুটবল কিনে দেবেন। সেই দিন থেকে ইউসুফ নতুন উদ্যমে পড়াশোনা শুরু করে। হাবি দেখেন, সে বই নিয়ে আরও বেশি সময় বসছে, লিখছে এবং পড়াগুলো বারবার চর্চা করছে।
“আমি ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করিনি,” হেসে বলেন হাবি। “পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই ফুটবল কিনে দিলাম, কারণ ও যে কতটা পরিশ্রম করছিল, তার মূল্যায়ন করতে চেয়েছিলাম।”
হাবির শৈশব তাকে ভালো বাবা হবার ব্যাপারে প্রভাবিত করেছিল। প্রতিবন্ধকতা ও আর্থিক কষ্টের মধ্যে বেড়ে ওঠায় বাবার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল টানাপোড়েনের। আজ তিনি সন্তানদের সঙ্গে বিশ্বাস, উৎসাহ এবং খোলামেলা ও নিবিড় বোঝাপড়া গড়ে তুলে সেই শৃংখল ভাঙতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
“প্রথমবারবাবা হওয়ার পর আমার মনে হয়েছিল যেন আমি চাঁদে পৌঁছে গেছি,” হাবি বলেন। “সেই দিন থেকে আমি নিজেকে কথা দিয়েছি যে আমার সন্তানদের খুশি রাখতে আমি আমার সাধ্যমত সবকিছু করব।”
এই ইতিবাচক পরিবর্তন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনানয়।
হাবির মতোই, ডিসেম্বর ২০২৫ নাগাদ কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীথেকে (হোস্ট কমিউনিটি) প্রায় ২৮,০০০ অভিভাবক, সেবাদানকারী এবং সামাজিক ও ধর্মীয় নেতা পজিটিভ প্যারেন্টিং এর বাস্তবিক ব্যবহার শিখছেন। এর মধ্যে রয়েছেন ১৩,০০০-এর বেশি মা ও নারী সেবাদানকারী, ১৩,০০০-এর বেশি বাবা ও পুরুষসেবাদানকারী এবং প্রায় ১,৮০০ জন সামাজিক ও ধর্মীয় নেতা। জার্মানির BMZ/KfW-এর সহায়তায় ইউনিসেফ ও অংশীজনেরা, শরনার্থী শিবিরগুলোতে পজিটিভ প্যারেন্টিং কে মূলধারায় আনতে একসঙ্গে কাজ করছে।
এই সুসজ্জিত প্যারেন্টিং সেশনগুলো, ইউনিসেফের তৈরি একটি সমন্বিত পজিটিভ প্যারেন্টিং বিষয়ক ইন্টারভেনশন প্যাকেজের অংশ, যেখানে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্ট (IED)। এ পর্যন্ত ১৪৪ জন প্রকল্পকর্মী এবং ৪৪১ জন কমিউনিটি আউটরিচকর্মী প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, যাতে তারা বাবা-মা ও যত্নদাতাদের শিশুদের সুস্থ বিকাশ, অহিংস লালন-পালন, ইতিবাচক বাবা-মা–সন্তান সম্পর্ক এবং মানসিক ও ইমোশোনাল সুস্থতা বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে পারেন।
যেসব বাবা-মা ও সেবাদানকারীরা এই সেশনগুলোতে অংশ নিয়েছেন, তারা শিশুদের দৈনন্দিন জীবনে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন, বিশেষকরে স্থানীয় ভাবে উৎপাদিত খাবার সামগ্রী দিয়ে আরও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা, স্কুলে উপস্থিতি বৃদ্ধি, এবং শিশুবিবাহ, শোষণ ও নির্যাতন থেকে আরও শক্তিশালী সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে।শিশুরা এখন আরও নিরাপদ, আত্মবিশ্বাসী; এবং তারা এমন পরিবারে বেড়ে উঠছে যেখানে তারা মনের কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারে এবং তারা জানে তাদের পাশে তাদের পরিবার রয়েছে।
এই সেশনগুলো অনেক বাবাদের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস বদলে দিচ্ছে।
“বাবারা শিখছেন যে সন্তান পালনশুধু মায়েদের দায়িত্ব নয়,” বলেন মুস্তাফা, একজনকমিউনিটি আউটরিচ কর্মী যিনি এই সেশনগুলিপরিচালনায় সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। “তাদেরও (বাবাদের) উপস্থিত থাকা প্রয়োজন, শুধুভরণপোষণের জন্য নয়, বরংসন্তানদের গড়ে তোলার অংশহতে।”
বাবাদের আলোচনায় ৩৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ আমিন জানান, তিনি শিখেছেন শিশুর জীবনের প্রথম ১,০০০ দিনের সোনালী সময় ও শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানোর গুরুত্ব। তাঁর পরিবারে শিশুদের এক মাস বয়সেই ভাত দেওয়া হতো। এখন তিনি জানেন, সুস্থ মস্তিষ্কের বিকাশ ও শারীরিক বৃদ্ধির জন্য ছয় মাস বয়সের আগে শক্ত খাবার দেওয়া উচিত নয়।
শিবিড়গুলোতে মায়েরা শিখছেন এবং নিজেদের জীবনে পরিবর্তন আনছেন।
মায়েদের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি অধিবেশনে নূরবাহার গর্বের সাথে শিশুদের সবনিয়মিত টিকার নামগুলো বলে গেল।উনি দ্রুত নামগুলো বললেন যে তা প্রায় আবৃত্তির মতো শোনাচ্ছিল।আরেকজন মা, শাওকত, শিক্ষাকেন গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে মেয়েদের জন্য, সে বিষয়ে নিজের ভাবনা তুলে ধরেন।
“শিক্ষা মেয়েদের আত্মনির্ভরশীল হতে এবং নিজেদের অধিকারের জন্য লড়তে সক্ষম করে,” বলেন শাওকত।
শেখার বিষয়টি শুধু বাবা-মায়েরমধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
পজিটিভ প্যারেন্টিং এর সেশনগুলোতে কমিউনিটির নেতা ও ধর্মীয় নেতাদেরও সম্পৃক্ত করা হয়, কারণ তাদের কথা পরিবারগুলোর যেভাবে মন দিয়ে শুনবে, নিছক কর্মসূচির মাধ্যমে তা সম্ভব নয়।
৬০ বছর বয়সী ধর্মীয় নেতা নূর হোসেন বলেন, এই সেশন গুলো তাকে অভিভাবকদের সাথে মেয়েদের স্কুলে পাঠানো, শিশুবিবাহের কুফল এবং সন্তান প্রসবের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্র বেছে নেওয়ার গুরুত্ব, যাতে নবজাতকরা সঠিক যত্ন ও জন্ম নিবন্ধন পায়, এসব বিষয়ে আরও খোলামেলাভাবে কথা বলতে উৎসাহিত করেছে।
“আঠারোবছরের কম বয়সী মেয়েরাসন্তান জন্ম দেওয়ার জন্যশারীরিক বা মানসিকভাবে প্রস্তুতথাকে না,” বলেন হোসেন। “তাইআমি অভিভাবকদের বলি যে শিশুবিবাহক্ষতিকর।”
যেখানেই সুযোগ পান – মসজিদ, শ্রেণিকক্ষ, চায়ের দোকান এবং সামাজিক সভা – হোসেন এই বার্তাগুলো পৌঁছেদেন।
হোসেন আরো বলেন, “কিন্তু প্রত্যেকের কাছে এই বার্তাগুলো পৌঁছানো বেশ কঠিন, কারণ শরনার্থী শিবিরগুলোতে সবার কাছে পৌঁছানো কঠিন, তার উপর আমাদের জনসংখ্যাও অনেক। একারণেই ধারাবাহিক অধিবেশনগুলো খুব গুরুত্বপূর্ন।”
কিশোর-কিশোরী, মা-বাবা, সামাজিকও ধর্মীয় নেতাদের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি এই সেশনগুলো (অধিবেশনগুলো) ক্ষতিকর প্রথাগুলোকে মোকাবিলা করার পাশাপাশি রোহিঙ্গাজনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকেও তুলে ধরে।ধীরে ধীরে পরিবারগুলো বুঝতেপারছে যে, ইতিবাচক পরিবর্তনকেবল একজন মা কিংবাএকজন বাবার কাছ থেকে আসেনা। এইপরিবর্তন গড়ে ওঠে বাড়িতে, শ্রেণিকক্ষে এবং চায়ের দোকানেদৈনন্দিন কথোপকথনের মাধ্যমে; বাবা-মা ওপরিবারের একসঙ্গে শেখার মধ্য দিয়ে, নেতাদেরসোচ্চার হওয়ার মাধ্যমে এবং এমন কমিউনিটিরমাধ্যমে যারা সবার উপরেতাদের সদস্যদের যত্ন ও সুরক্ষাকেপ্রাধান্য দেয়।
কারণ একটি শিশুকে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বড়করতে পুরো পুরো গ্রামেরসবার খাটতে হয়।






