‘পুষ্টি আপা’: মা ও শিশুদের এক বিশ্বস্ত বন্ধু
বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরে পুষ্টি পরামর্শক সাদিয়া মায়েদের ভয় ও ভুল তথ্য কাটিয়ে উঠতে এবং শিশুদের অপুষ্টি থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করছেন।
- বাংলা
- English
“যখনই রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের সারি সারি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের পাশ দিয়ে হাঁটি, আর কেউ আমাকে ‘পুষ্টিআপা’ বলে ডাকে, তখন আমার দিনটা সার্থক মনে হয়,” বলেন সাদিয়া আরেফিন।
সাদিয়ার কাছে ‘পুষ্টি আপা’ ডাকটি শুধু একটি পেশাগত পরিচয় নয়। এর অর্থতাঁর কাছে আরও অনেক বেশি।
সাদিয়া বাচ্চা ও ছোট শিশুর পুষ্টি (আইওয়াইসিএফ) পরামর্শক। গত দুই বছর ধরে তিনি কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে কাজ করছেন। তিনি পুষ্টিবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন।তিনি মনে করেন, মায়েদের সন্তানদের জীবনের শুরুটা স্বাস্থ্যকর করতে সহায়তা করার চেয়ে নিজের জ্ঞান কাজে লাগানোর আর ভালো উপায় নেই।
শরণার্থী শিবিরগুলোতে অতিরিক্ত ভিড়, দারিদ্র্য ও বাস্তুচ্যুতির কারণে শিশুরা তীব্র অপুষ্টির (এসএএম) ঝুঁকিতে থাকে। এসব শিশুর সহায়তায় সাদিয়ার কাজ অনেক সময় চিকিৎসা দিয়ে নয়, একটি কথোপকথন দিয়ে শুরু হয়।
তিনি মায়েদের কথা শোনেন এবং তাঁদের উদ্বেগ বোঝার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি বাচ্চা ও ছোট শিশুদের সঠিকভাবে খাওয়ানোর বিষয়ে মায়েদের পরামর্শ দেন। এভাবে যেসব শিশুর সময়মতো পুষ্টিসেবা প্রয়োজন, তাদের শনাক্ত করতেও তিনি সহায়তা করেন।
“আমার কাজ হলো সব মায়ের সঙ্গে দেখা করা এবং তাঁদের জানানো, ঘরে থাকা সামর্থ্যও উপকরণ দিয়েই কীভাবে তাঁরা শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টির উন্নতি করতে পারেন,” একটি পুষ্টিকেন্দ্রে একটু বিরতির সময় বলেন সাদিয়া।
তিনি বলেন, “আমি যেসব মায়েরসঙ্গে দেখা করি, তাঁদের বেশির ভাগই বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে কখনো ব্যবহারিক কোনো পরামর্শ পাননি।”
কয়েকসপ্তাহ আগে বিশের কোঠায়বয়স এমন এক তরুণীমা এই কেন্দ্রে আসেন।তাঁর শিশু বুকের দুধ খেতে পারছিল না। ঠিকমতো স্তনেও মুখ লাগাতে পারছিল না। শিশুকে ভুলভাবে ধরার কারণে মায়ের স্তনে দুধ জমে তীব্রব্যথা হচ্ছিল। সন্তান জন্মের পর প্রথম দুইসপ্তাহে এ ধরনের সমস্যাদেখা দিতে পারে।
সাদিয়া ধৈর্য ধরে ওই মায়ের পাশে বসেন। শিশুকে কীভাবে ঠিকভাবে স্তনে মুখ লাগাতে হবে, তা দেখিয়ে দেন। বুকের দুধ খাওয়ানোর সঠিক পদ্ধতিও বোঝান।চিকিৎসার জন্য ওই মাকে কাছের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
দুইসপ্তাহ পর ওই মা আবার কেন্দ্রে আসেন। এবার তাঁর মুখেহাসি। ব্যথাও নেই। তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিলেন। মাতৃত্বের শুরুর দিকের কঠিন একটি সময়ে পাশে থাকার জন্য সাদিয়াকে ধন্যবাদ জানাতেই তাঁর ফিরে আসা।
তবে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সমস্যা মিটে গেলেই মায়েদের সহায়তা করার কাজ শেষ হয় না বলে মনে করেন সাদিয়া। সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মায়েদের সামনে নতুন নতুন প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ আসে।
ছয় মাস শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর পর শিশুকে বাড়তি খাবারে অভ্যস্ত করানো মায়েদের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ।
“অনেক মা আমার কাছে এসে বলেন, তাঁদের শিশুরা খেতে চায় না।হতাশ হয়ে তাঁরা জোর করে শিশুকে খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। এতে প্রতিবার খাওয়ানোর সময়ই এক ধরনের লড়াই শুরু হয়,” বলেন সাদিয়া।
সাদিয়া মায়েদের ধৈর্য ধরতে বলেন। তাঁর পরামর্শ, শিশুকে নিজের মতো করে খাবার চিনতে ও খেতে শেখার সুযোগ দিতে হবে। ভাত ও ডালের মতো নিয়মিত খাবারের পাশাপাশি ডিম, খাদ্যশস্য ও ফলের মতো নরম ও পুষ্টিকর বিভিন্ন খাবার দিতে পারেন অভিভাবকেরা। এতে খাবারের প্রতি শিশুর আগ্রহ বাড়তে পারে এবং সে ধীরে ধীরে নিজে খেতে ও শিখতে পারে।
সাদিয়া জানেন, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী অল্পসংখ্যক পরিবারের কাছেই তাঁর কাজের সুফল পৌঁছাচ্ছে। অর্থায়ন কমছে। অন্যদিকে প্রয়োজন বাড়ছে। সীমিত সম্পদের মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে।
তবু সাদিয়া মনে করেন, ছোট একটি উদ্যোগও একটি শিশুর ভবিষ্যৎবদলে দিতে পারে।
১২ মাস বয়সী মোহাম্মদ ইউসুফের কথা এখনো মনে আছে তাঁর। গত মার্চে তীব্র অপুষ্টি নিয়ে সে এই কেন্দ্রে এসেছিল। শিশুটি ছিল দুর্বল ওকম ওজনের। খুব অল্প খাবার খেত সে। সাধারণভাবে একবছর বয়সী একটি শিশুর প্রতিদিন তিন বাটি খাবার ও দুই বাটি নাস্তা খাওয়া প্রয়োজন। এর পাশাপাশি বুকের দুধ খাওয়ানোও চালিয়ে যেতে হয়। কিন্তু ইউসুফের মা জানতেন না, তাঁর বয়সী একটি শিশুকে কতটা এবং কতবার খাবার দিতে হয়। পরিবারের অন্যরা যা খেত, সেখান থেকেই অল্প অল্প করে শিশুকে খাওয়াতেন তিনি।
ইউসুফকে বহির্বিভাগভিত্তিক থেরাপিউটিক কর্মসূচিতে (ওটিপি) ভর্তি করা হয়। তবে শুধু চিকিৎসা যথেষ্ট ছিল না।
তিনদফা সাক্ষাতে কয়েক ঘণ্টা ধরে সাদিয়া ইউসুফের মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। ধীরে ধীরে শিশুটির খাবারের তালিকায় পরিবর্তন আনেন তিনি। বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কুমড়া, মিষ্টি আলু, ডিম, ডাল ও সবজি দিয়ে তৈরি খিচুড়ি খাওয়ানোর পরামর্শ দেন।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইউসুফের অবস্থার উন্নতি হয়। তীব্র অপুষ্টি থেকে সে মাঝারি মাত্রার অপুষ্টির পর্যায়ে আসে। সুস্থ হয়ে ওঠার পথে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
সাদিয়া বলেন, “তীব্র অপুষ্টিতে ভুগতে থাকা কোনো শিশুকে আবার আগ্রহ নিয়ে খেতে এবং ওজন বাড়াতে দেখলে যে আনন্দ পাই, তার সঙ্গে আর কোনো কিছুর তুলনা হয় না। তখন মনে হয়, কেন এই কাজ করছি, তার উত্তর পেয়ে যাই।”
সাদিয়াছোট ছোট অগ্রগতিকে সাফল্য হিসেবে দেখেন। কোনো শিশুর ওজন বাড়ছে, কোনো মা ব্যথাছাড়াই সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারছেন, কোনো পরিবার স্বস্তি নিয়ে কেন্দ্র থেকে ফিরছে—এসবই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
তবেকাউন্সেলিং শেষ হওয়ার পরকিছু ঘটনা তাঁকে সবচেয়ে বেশি গর্বিত করে।
কাজের অংশ হিসেবে সাদিয়া নিয়মিত মায়েদের একত্র করেন। সেখানে বুকের দুধ খাওয়ানো, বাড়তি খাবার ও শিশুর পুষ্টি নিয়ে আলোচনা হয়। এখন তিনি দেখছেন, যেসব মা আগে চুপ করে থাকতেন, তাঁরাই অন্য মায়েদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন।
সাদিয়া গর্বের সাথে বলেন, “আমার বক্তব্য ওনারাই শেষ করে দেন।আমরা যা আলোচনা করি, মায়েরা তা মনে রাখেন এবং অন্যদেরও জানান।”
রোহিঙ্গাশরণার্থী শিবিরগুলোতে সুযোগ-সুবিধা সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে জ্ঞানই হয়ে উঠতে পারে সহায়তার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। বাংলাদেশ হিউম্যানিটারিয়ান ফান্ডের সহায়তায় জীবন রক্ষাকারী তথ্য এক মা থেকে আরেক মা এবং এক পরিবার থেকে আরেক পরিবারে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এসব তথ্য শিশুদের বেঁচে থাকতে, অপুষ্টি কাটিয়ে উঠতে এবং সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করছে।
সাদিয়া জানেন, কুতুপালংয়ের প্রতিটি পরিবারের কাছে তাঁর পক্ষে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবে একজন মা যখন আরেকজন মাকে সাদিয়ার কাছে আসতে বলেন, কোনো মা স্বস্তি নিয়ে কেন্দ্র থেকে ফেরেন, কোনো ক্ষতিকর অভ্যাসের বদলে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে ওঠে কিংবা কোনো শিশু সুস্থ হওয়ার পথে এগিয়ে যায়—তখন আশার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়।
যেসব পরিবার ‘পুষ্টি আপা’র খোঁজে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসে, তাদের জন্য সাদিয়া প্রস্তুত থাকেন। ব্যবহারিক পরামর্শ, আশ্বাস ও সহমর্মিতা নিয়েতিনি পাশে দাঁড়ান। এভাবেই একেকটি শিশুকে ঘিরে তাঁর কাজ এগিয়ে চলে।