ছোট হাত, বড় পরিবর্তন
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের হাত ধরে বদলাচ্ছে স্বাস্থ্য পরিস্থিতি
- বাংলা
- English
আরাফাত মাত্র ১১ বছর বয়সেই স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা প্রচার করে চলেছে। সে যখন কথা বলে তার বন্ধুরা সব মনোযোগ দিয়ে তার কথা শোনে, আর কেবল শোনেই না তারা নিজেদের জীবনে তা মেনেও চলে।
যে কমিউনিটির অর্ধেকেরও বেশি মানুষের বয়স ১৮ বছরের কম, সেখানে নেতৃত্বে ছোটদেরই এগিয়ে আসতে হয়। ধুলোমাখা পায়ে, ছোট্ট হাতের ফাঁকে এক টুকরো সাবান আর মুখে অফুরন্ত হাসি নিয়ে তারা খুব আনন্দের সাথে এ দায়িত্ব পালন করে চলেছে।
“আমরা হয়তো ছোট, কিন্তু আমরা অনেক কিছু জানি,” বলে আরাফাত। “নিরাপদ খাবার পানি আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার উপকারিতা ও উপায় সম্পর্কে জানতে পেরে আমাদের অনেক উপকার হয়েছে। আমরা এই উপায়গুলো কিন্তু আবার সবার সাথে আলোচনা করি যাতে এর উপকারিতা সবাই পায়।”
শিবিরে টিকে থাকা
কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরের সরু গলিগুলো থাকে সদা ব্যস্ত; এখানে অবিরাম চলে বেচে থাকার লড়াই। বিশ্বের বৃহত্তম এই জনসংকীর্ণ শিবিরের অলিতে গলিতে লুকিয়ে থাকে নানা পদের বিপদ আর ঝুঁকি; নোংরা পানিভর্তি ডোবা, বদ্ধ নর্দমা কিংবা অপরিষ্কার হাত, যেকোন কিছু থেকেই ঘটে যেতে পারে বড় কোন বিপদ, গোটা শিবিরে ছড়িয়ে পড়তে পারে মারাত্মক কোন রোগ।
তাই বেঁচে থাকার লড়াইকেই যেন এক উৎসবের রূপ দিয়েছে এখানকার শিশুরা—হাততালি, হাসি, এবং হাত ধোয়া নিয়ে শিশুরা গান গেয়ে নিজেদের ও কমিউনিটির মধ্যে সচেতনতা বাড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত।
শিবিরের পরিবেশ যেহেতু বেশ ঘিঞ্জি আর পরিবারগুলো একই পানির কল ও শৌচাগার (পায়খানা) ব্যবহার করে, তাই রোগ ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা অপরিহার্য। এক টুকরো সাবান বা একটি পরিষ্কার ও ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়াসহ যেকোন সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে পারে।
“এখানে শত শত শিশু আছে,” বলে আরাফাত। “আমরা ধুলোয় খেলা করি এবং মাঝে মাঝে হাত ধুতে ভুলে যাই। একজন অসুস্থ হলে, আস্তে আস্তে আমাদের বাকিরাও অসুস্থ হয়ে পড়ে।”
তাহলে শিশুরা কীভাবে নিরাপদ থাকবে? আরাফাত ও তার বন্ধুদের কাছে কিন্তু এর একটি দারুণ সমাধান আছে।
শিশুদের মাঝে 'ওয়াশ' চ্যাম্পিয়ন
আরাফাত ও তার বন্ধুরা " শিশু নেতৃত্ব দল"(চাইল্ড লিডার'স গ্রুপ) এর সদস্য, যেখানে ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা তাদের সমবয়সীদের গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি শিখতে সাহায্য করে।
ইউনিসেফের অংশীজনদের সহযোগিতায়, তারা জীবাণু নামক অদৃশ্য শক্তিশালী দৈত্য ও তার সাথে লড়াই করে জেতার উপায় সম্পর্কে শিখেছে। ভারী বই কিংবা শিক্ষকের গুরুগম্ভীর বক্তৃতা নয় বরং হাসি ও খেলার ছলে তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নানান নিয়ম-কানুন ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে শেখে - কখনও স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার বিভিন্ন উপায় সম্বলিত লুডুর বোর্ড কিংবা মজার কোন ছড়া গান – এভাবেই হাত ধোয়া ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে চলার বিভিন্ন অভ্যাস রপ্ত করে ফেলে তারা।
নিয়ম-কানুন শিখেই কেবল তারা ক্ষান্ত হয় না; বরং তারা নিজেরা তা পালন করে এবং প্রতি মাসে একবার সবাই একসাথে দেখা করে আলোচনা করে শিবিরের আশেপাশের অলিগলিতেও (ব্লকে) কীভাবে তারা সবাইকে এবিষয়ে উদবুদ্ধ করতে পারে।
আরাফাত বলে, “আমরা লুডু খেলার মাধ্যমে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার নিয়ম ও সময়, নিজের, পরিবারের ও কমিনিটিকে পরিষ্কার রাখার উপায় সম্পর্কে শিখেছি। এখন আমরা এই শিক্ষা আমাদের ভাইবোন, বন্ধু এবং প্রতিবেশীদের কাছে পৌঁছে দিই।”
হঠাৎ কোন কল ভেঙে গেলে শিশু নেতৃত্ব দল সাথে সাথে কমিউনিটিকে অবগত করে এবং তা সময়মত ঠিক করা হলো কিনা সেবিষয়য়ে খবর রাখে।
ইউরোপীয়ান সিভিল প্রোটেকশন অ্যান্ড হিউম্যানিটেরিয়ান এইড অপারেশনস (ECHO)-এর ধারাবাহিক সহায়তায়, ইউনিসেফ তাদের অংশীজনদের সাথে মিলে শিবিরগুলোতে ৩২০টিরও বেশি শিশু নেতৃত্ব দল প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে ১,৪৪০ জনেরও বেশি কন্যাশিশু সহ প্রায় ৩,২০০ রোহিঙ্গা শিশু ও কিশোর-কিশোরী সম্পৃক্ত রয়েছে।
বন্ধুত্বের শক্তি
এগারো বছর বয়সী রুকানা, শিশু নেতৃত্ব দলের আরেকজন সক্রিয় সদস্য। রুকানা হাত ধোয়ার পদ্ধতি নিজে ভালোভাবে শিখেছে আর এখন তার বন্ধুদেরও শেখাচ্ছে।
“যখন আমাদের শিক্ষক বা বড়রা আমাদের কিছু করতে বলেন, আমরা তা কখনো সম্মান তো কখনো ভয়ের খাতিরে শুনি। কিন্তু যখন আরাফাত আমাদের কিছু শেখায় বা করতে বলে, আমরা সে কাজটা খুব মন দিয়ে করি কারণ সেতো আমাদের বন্ধু আর বন্ধুদের সাথে মিলে কোন কাজ করাটা বেশ মজার”, রুকানা বলে।
ছোট শিশুরা সাধারণত তাদের বন্ধুদের সাথেই থাকতে পছন্দ করে, ফলে শিশুরা এমন অনেক কিছু লক্ষ্য করে যা বড়দের নজর প্রায়ই এড়িয়ে যায়: যেমন কোন বন্ধু ফুটবল খেলার পর হাত ধোয় নাই কিংবা ইফতারের পর খাবের উচ্ছিটাংশ বাইরেই ফেলে দিলো। কমিউনিটির চোখ ও কান হিসেবে তারা অন্যদের মনে করিয়ে দেয় যে পরিচ্ছন্নতা একটি দৈনন্দিন অভ্যাস।
বিশাল চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা: বাস্তব পরিস্থিতি
পাঁচ লক্ষাধিক শিশুকে আশ্রয় দেওয়া শিবিরগুলোতে সবচেয়ে বড় হুমকিগুলো আদৌতে খালি চোখে দেখা যায় না। তাই ক্যাম্পে নিয়মিত হাত ধোয়া নিছক স্বাস্থ্যবিধির অংশ নয়, বরং এটি সুরক্ষা, মর্যাদা এবং সংকট থেকে রক্ষাকবচ।
তাই এই শিশু দলের সদস্যরা তাদের সমবয়সীরা স্বাস্থ্যবিধি পালন করছে কিনা তা নিয়মমাফিক পর্যবেক্ষণ করে, ভাঙা কল বা বদ্ধ নর্দমার খবর দেয় এবং বিশ্ব শৌচাগার দিবস, বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের মতো কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেয়; শিশু নেতৃত্ব দলের কিন্তু অনেক দায়িত্ব।
““মাঝে মাঝে আমরা দেখি, আমাদের মতন বাচ্চারা পানির কল বিক্রি করে মিষ্টি কিনে খায়,” বলে আরাফাত। “আমরা তাদের মনে করিয়ে দিই যে পানি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমাদের কলগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সবার পানির জোগান বন্ধ হয়ে যাবে।”
শিশুর কোন নতুন অভ্যাস কখনও কখনও তার বাবা-মা, ভাইবোন এবং প্রতিবেশীদের মধ্যেও আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এভাবে একটি শিশু সচেতন করতে পারে ডজন খানিক পরিবারকে। আর শিশুদের মধ্যে সঞ্চার হয় নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধের।
তবে পুরোনো অভ্যাস পরিবর্তন করাটা খানিকটা চ্যালেঞ্জিং বটে। ছোট শিশুদের মুখে নতুন ধারার কথা শুনে কেউ হয় সন্দিহান, কেউ হয় বিরক্ত। কিন্তু বেশ ধৈর্য ও আন্তরিকতার সাথে এই শিশুরা মানুষের মন জয় করে সচেতনামূলক এই কাজ করে চলেছে।
“মাঝে মাঝে বড়রা মনে করে যে এই অভ্যাসগুলো শেখানোর জন্য আমরা খুব ছোট,” আরাফাত জানায়। “কিন্তু আমরা হাল ছাড়ি না। এটাই আমাদের শক্তি।”
সাবান ও পানি কিন্তু তুচ্ছ কিছু নয়
শিশু নেতৃত্ব দল কেবল স্বাস্থ্যবিধি শেখায় না, এর নেপথ্যে রয়েছে সম্মান ও মর্যাদা শিক্ষা ও চর্চা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে আরাফাত ও তার বন্ধুদের মতো শিশুরা তাদের সুপ্ত সম্ভাবনার বিকাশ ঘটাতে পারে। তারা শেখে যে নেতৃত্ব দেবার গুণাবলী বয়সের ওপর নির্ভর করে না, বরং কাজের ওপর নির্ভর করে।
যখন আরাফাত বা রুকানা ব্যাখ্যা করে কেন আর কীভাবে পরিষ্কার হাত রোগ প্রতিরোধ করে, তখন তারা স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের পাশাপাশি তৈরি করে আত্মবিশ্বাস, গড়ে তোলে আস্থা।
পরিষ্কার হাতে গড়া এক ভবিষ্যৎ
এই শিশুরা শুধু স্বেচ্ছাসেবকই নয়—তারা পরিবর্তনের আত্মবিশ্বাসী বাহক, যারা শেখায় যে স্বাস্থ্যবিধি মানেই সাম্য ও মর্যাদা।
রোহিঙ্গা শিবিরে পরিবর্তন বড় বড় ঘোষণার মাধ্যমে শুরু হয় না, বরং শিশুদের ছোট ছোট দল একসাথে শেখার মাধ্যমে তার গতি ত্বরান্বিত করে। প্রতিবেশীদের একত্রিত করা হোক বা বন্ধুদের খোঁজখবর নেওয়া হোক, এই ক্ষুদে নেতারা দেখিয়ে দেয় যে দক্ষতা আর সামান্য আনন্দের ছোঁয়ায় তারা এক নিরাপদ ভবিষ্যত তৈরির ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। এক এক জোড়া পরিচ্ছন্ন হাতের ছোঁয়ায় একটি স্বাস্থ্যকর কমিউনিটি গড়ে ওঠে। তাদের হাতে শরনার্থী শিবিরের ভবিষ্যৎ শুধু পরিষ্কার পরিচ্ছন্নই নয়, বরং বেশ উজ্জ্বলও ।


