শরণার্থী আমিন এখন শিশুদের ভরসা

১৩ বছর বয়সে বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন মোহাম্মদ আমিন। আজ জীবনরক্ষাকারী পুষ্টিসেবা দিয়ে নিজের কমিউনিটির শিশুদের সুরক্ষায় কাজ করছেন তিনি।

আকরাম হোসেন
Mohammad Amin (22), stands outside the Integrated Nutrition Facility in the Rohingya refugee camp
UNICEF Bangladesh/2026/Saikat
10 সেপ্টেম্বর 2026

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা শুরু হলে মোহাম্মদ আমিনের বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। পরিবারের সঙ্গে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় সে। পেছনে ফেলে আসে নিজের বাড়ি, স্কুল আর একরাশ স্বপ্ন।

এখন ২২ বছর বয়সী আমিন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে পুষ্টিবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে শিশুদের জীবন বাঁচাতে সহায়তা করছেন। এই কাজের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের কমিউনিটির মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁর জীবনে ফিরে এসেছে আত্মসম্মান, মর্যাদা  ও আশার নতুন অনুভূতি।

“আমি শিখেছি কীভাবে জীবন বাঁচাতে হয়। পুষ্টি সম্পর্কে জেনেছি এবং কীভাবে আমার কমিউনিটির শিশুদের সুরক্ষা দিতে হয়, তা শিখেছি,” বলেন তিনি।

A morning briefing with nutrition volunteers takes place before they begin their daily household visits.
UNICEF Bangladesh/2026/Saikat বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রতিদিনের কার্যক্রম শুরুর আগে সকালের ব্রিফিংয়ে অংশ নেন পুষ্টিবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবকেরা।

আমিন ও অন্য পুষ্টিবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবকদের সকাল শুরু হয় পুষ্টি কেন্দ্রের প্রাঙ্গণে সংক্ষিপ্ত বৈঠকের মধ্য দিয়ে। বৈঠকে তাঁরা জুটি বেঁধে কাজ করার পরিকল্পনা পর্যালোচনা করেন। কোন কোন ব্লকে যাবেন এবং কোন শিশু ও পরিবারের খোঁজখবর নিতে হবে, তা-ও ঠিক করে নেন।

স্বেচ্ছাসেবকেরা দলে দলে বাড়ি বাড়ি যান। প্রতিটি দলে থাকেন একজন পুরুষ ও একজন নারী স্বেচ্ছাসেবক। দলে নারী ও পুরুষ উভয়েই থাকায় পরিবারগুলো স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসংক্রান্ত সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারেন। আমিনের সঙ্গে এই দলে কাজ করেন তোফুরা বেগম। বাংলাদেশের এই স্বেচ্ছাসেবক দলেরা রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন।

Amin and Tofura visit a household in their assigned block to conduct a routine nutrition screening and follow-up for children.
UNICEF Bangladesh/2026/Saikat নির্ধারিত ব্লকের একটি বাড়িতে শিশুদের নিয়মিত পুষ্টি পরীক্ষা ও ফলোআপ করতে যান আমিন ও তোফুরা।

কেন্দ্রে বৈঠক শেষে আমিন ও তোফুরা প্রতিদিন শিবিরের ৫০ থেকে ৬০টি পরিবার পরিদর্শনে বেরিয়ে পড়েন। আজ তাঁরা পাহাড়ি পথ বেয়ে একটি অস্থায়ী বাড়িতে যান। সেখানে এক তরুণী মা তাঁর ৩১ মাস বয়সী ছেলে শাহেদকে নিয়ে থাকেন।

তোফুরা সতর্কতার সঙ্গে শাহেদের বাহুর মধ্য-উপরের অংশের পরিধি (মিড-আপার আর্ম সার্কাম্ফিয়ারেন্স/এমইউএসি তথা মুয়াক নামে বেশই পরিচিত) মাপেন এবং শরীরে শোথ আছে কি না, তা পরীক্ষা করেন। আমিন পরীক্ষার ফলাফল নথিভুক্ত করেন। এই সাধারণ অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মাধ্যমে শিশু অপুষ্টির ঝুঁকিতে আছে কি না এবং তার জরুরি সহায়তা প্রয়োজন কি না, তা শনাক্ত করা যায়।

শাহেদের বাহুর পরিধি পাওয়া যায় ১৪ সেন্টিমিটার, যা নির্দেশ করে যে তার পুষ্টির অবস্থা এখন স্বাভাবিক।

শাহেদের এই ফলাফল আমিনকে স্বস্তি দেয়। নয় মাস আগের কথা মনে পড়ে তাঁর। সেদিনই প্রথম শাহেদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমিনের। তখন শাহেদের ওজন ছিল কম। সমবয়সী অন্য শিশুদের তুলনায় সে ছিল দুর্বল এবং তার শরীরে অসুস্থতার স্পষ্ট লক্ষণ ছিল।

শাহেদের অবস্থা বুঝতে পেরে আমিন তাকে দ্রুত সমন্বিত পুষ্টি কেন্দ্রে (আইএনএফ) পাঠান। সেখানে শাহেদ পুষ্টিসেবা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ (ফলোআপ) ও পুষ্টিপূরক পেতে শুরু করে। পাশাপাশি, তার মা পরিপূরক খাবার খাওয়ানোর বিষয়ে পরামর্শ, ব্যবহারিক নির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পান।

এরপর থেকে শাহেদ ও তার মা ওই কেন্দ্র থেকে পুষ্টিসেবা পেয়ে আসছেন। কেন্দ্রের সেবার পাশাপাশি আমিন ও তোফুরা নিয়মিত তাঁদের বাড়িতে যান। তাঁরা শাহেদের শারীরিক অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেন, তার মাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন এবং শাহেদের বেড়ে ওঠার তথ্য নথিভুক্ত করেন।

আজ শাহেদের এমইউএসি পরিমাপ স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটি মাসের পর মাস ধরে চলা ধারাবাহিক পরিচর্যা, সময়মতো চিকিৎসা এবং আমিন ও তোফুরার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।

Tofura measures the Mid-Upper Arm Circumference (MUAC) of 31-month-old Shahed while Amin documents the measurements during a routine nutrition screening.
UNICEF Bangladesh/2026/Saikat Tনিয়মিত পুষ্টি পরীক্ষার সময় ৩১ মাস বয়সী শাহেদের বাহুর মধ্য-উপরের অংশের পরিধি (এমইউএসি) মাপছেন তোফুরা। আমিন সেই পরিমাপ নথিভুক্ত করছেন।

এই কাজ শুধু শিশুদের বাহুর পরিধি মাপা বা শোথ পরীক্ষা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমিনের মতো পুষ্টিবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবকেরা পরিবারগুলোর সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তাঁদের আশ্বস্ত করেন, এই যাত্রায় তাঁরা একা নন। স্বেচ্ছাসেবকেরা ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের চিহ্নিত করেন, সম্ভাব্য স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসমস্যা শনাক্ত করেন এবং নিয়মিত বাড়ি পরিদর্শনের মাধ্যমে পরিবারগুলোকে তাদের প্রয়োজনীয় সেবার সঙ্গে যুক্ত করেন।

কমিউনিটির সদস্য হওয়ায় স্বেচ্ছাসেবকেরা পরিবারগুলোর আস্থা অর্জন করেছেন। কমিউনিটি যেকোন প্রয়োজনে তাঁরাই সবার প্রথমে এগিয়ে আসেন। মায়েরা তাঁদের কাছে সন্তানদের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারেন। এর ফলে স্বেচ্ছাসেবকেরা সময়মতো পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে এবং উপযুক্ত সেবাকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারেন।

জনাকীর্ণ ক্যাম্পটির দিকে তাকালে আমিন তার পরিদর্শন করা অনেক শিশুর মধ্যে নিজের শৈশবের প্রতিচ্ছবি দেখতে পান। প্রতিটি বাড়ি পরিদর্শন, সেবাকেন্দ্রে পাঠানো ও পরামর্শ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি নিশ্চিত করতে চান, কোনো শিশুই যেন সুস্থ ও সবলভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়।

“বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হওয়ায় আমরা অনেক সুযোগ হারিয়েছি,” বলেন আমিন। “আমি চাই, এখানে বেড়ে ওঠা শিশুরা যেন আরও ভালো ভবিষ্যৎ পায়।”

Amin and Tofura walk through the Rohingya refugee camp during their routine household visits.
UNICEF Bangladesh/2026/Saikat বাড়ি পরিদর্শনের জন্য রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন আমিন ও তোফুরা; এভাবেই নিয়মিত বাড়ি-বাড়ি গিয়ে খবর রাখেন তারা।

বাংলাদেশ হিউম্যানিটারিয়ান ফান্ড ও ইউএস ফরেন এসিস্ট্যান্স এর সহায়তায় প্রতিটি স্বেচ্ছাসেবক জুটি প্রতি মাসে প্রায় ৫০০টি পরিবারের কাছে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা পৌঁছে দেন।

প্রতি মাসে ৭৬০ জনের বেশি পুষ্টিবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবক ৫৯ মাস বয়স পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার রোহিঙ্গা শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং জীবনরক্ষাকারী স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করেন।

নিজের কমিউনিটির সেবা করার এই সুযোগ স্বেচ্ছাসেবকদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। একই সঙ্গে শিশুদের অপুষ্টি থেকে রক্ষা করা এবং কমিউনিটির সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার প্রেরণা জোগায়।