বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ ২০২৬-এ মাতৃদুগ্ধ পানকে সুরক্ষা, উৎসাহ দেওয়া ও সহায়তা প্রদানে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে ইউনিসেফ ও ডব্লিউএইচও

বাংলাদেশে ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি জিলিয়ান মেলসপ এবং বাংলাদেশে ডব্লিউএইচওর প্রতিনিধি ডা. জামশেদ মোহাম্মদের যৌথ বিবৃতি

11 আগস্ট 2026

ঢাকা, আগস্ট ১১, ২০২৬ —মায়ের দুধ পান প্রতিটি শিশুর জীবনের সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ শুরু নিশ্চিত করে। জন্মের পর প্রথম ছয় মাসে শিশুর প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি মায়ের দুধ থেকেই পাওয়া যায়। এটি শিশুকে বিভিন্ন সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং তার শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করে। একই সঙ্গে মায়েদের স্তন ও ডিম্বাশয় ক্যানসার এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি কমায় । ফলে শিশুর মায়ের দুধ পান স্বাস্থ্যকর পরিবার, আরও শক্তিশালী কমিউনিটি এবং টেকসই সমাজ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে।

বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ এমন এক সময়ে পালিত হচ্ছে, যখন বাংলাদেশে এ বিষয়ে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫- এর নতুন তথ্য বলছে, মায়ের দুধ পান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জনের গতি কমে গেছে। ২০১৯ সালে ছয় মাসের কম বয়সী যেসব শিশু শুধু মায়ের দুধ পেত, তাদের হার ছিল ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে সেই হার কমে ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো শুরু করার হারও ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রতিটি শিশু যেন জীবনে সম্ভাব্য সবচেয়ে ভালো সূচনা পায় , তা নিশ্চিত করার জন্য এসব তথ্য মায়েদের আরও বেশি সহায়তা দেওয়ার জরুরি প্রয়োজনকে তুলে ধরছে।

শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও এটি সব সময় সহজ নয়। অনেক মা এখনো গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মের সময় এবং সন্তান জন্মের পরে প্রয়োজনীয় পরামর্শ, উৎসাহ ও সহায়তা পান না। অনেককেই পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন সুবিধা বা সন্তানকে স্তন্যদানের উপযোগী কর্মপরিবেশ ছাড়াই কাজে ফিরতে হয়। আবার পরিবারগুলোর সামনে এখনো মায়ের দুধের বিকল্প শিশুখাদ্যের প্রচার-প্রচারণা চলছে। জরুরি ও মানবিক সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে এসব বাধা আরও বড় হয়ে দেখা দেয়।

এই কারণে এ বছরের বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের প্রতিপাদ্য- ‘জীবনের সূচনায় মাতৃদুগ্ধ পান: টেকসই উদ্যোগ করি বেগবান’ বিশেষভাবে সময়োপযোগী। কী করতে হবে, তা আমরা সবাই জানি। শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী, কার্যকর পারিবারিক ও সামাজিক সহায়তা, শিশু-বান্ধব হাসপাতাল কর্মসূচী, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, স্তন্যদানের  উপযোগী কর্মপরিবেশ এবং মাতৃদুগ্ধের বিকল্প, শিশুখাদ্য বিপণন নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে আইন  পুরোপুরি বাস্তবায়ন- এসব উদ্যোগ মায়ের দুধ পানের হার বাড়াতে  কার্যকর বলে প্রমাণিত । মায়ের দুধ পান  সহায়ক কার্যক্রমে প্রতি ১ মার্কিন ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে প্রায় ৫৯ মার্কিন ডলার অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যায়। এই সুফল আসে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় কমা, শিশুদের মেধার বিকাশ, শিক্ষায় ভালো ফল এবং ভবিষ্যতে বেশি আয় করার সক্ষমতা তৈরির মধ্য দিয়ে।

তাই নতুন সমাধান বের করা নয়, বরং যেসব কার্যকর উদ্যোগ ইতিমধ্যে আছে সেগুলো আরও বিস্তৃত করা এবং টেকসইভাবে চালিয়ে যাওয়া, যাতে প্রতিটি মা প্রয়োজনীয় সহায়তা পান এবং প্রতিটি শিশু মায়ের দুধ পানের পূর্ণ উপকার পেতে পারে।

এ লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ ২০২৬-এ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফ সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সব অংশীজনের প্রতি শিশুর মায়ের দুধ পান নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগগুলো আরও জোরদার করার আহ্বান জানাচ্ছে। প্রত্যেক স্বাস্থ্যকর্মীর মাতৃদুগ্ধ পানকে সুরক্ষা, উৎসাহিত করা এবং এ বিষয়ে সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা থাকা উচিত। সব সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে শিশু-বান্ধব হাসপাতাল কার্যক্রম  আরও বিস্তৃত করতে হবে এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য জবাবদিহিতা ও কমিউনিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কর্মজীবী মায়েদের জন্য বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি, মায়ের দুধ পান করানোর জন্যে বিরতি এবং মায়ের দুধ পানের উপযোগী কর্মপরিবেশসহ মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মাতৃদুগ্ধের বিকল্প, শিশুখাদ্য বিপণন নিয়ন্ত্রণ আইন- ২০১৩ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এর মধ্যে ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব পণ্যের অনুপযুক্ত প্রচার ঠেকানোর ব্যবস্থাও থাকতে হবে। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোর সঙ্গে মায়ের দুধ পান সংক্রান্ত সহায়তা যুক্ত করতে হবে, যাতে প্রত্যেক মা বিশেষ করে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মায়েরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পান। অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং তথ্য-প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আরও শক্তিশালী উপাত্ত, মনিটরিং ও গবেষণাও প্রয়োজন।

বাংলাদেশ শিশুদের জন্য যেসব খাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর বিনিয়োগ করতে পারে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে মাতৃদুগ্ধ পানকে সুরক্ষা ও উৎসাহিত করা এবং এ বিষয়ে মায়েদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা। এটি শিশুর জীবন বাঁচায়, তার স্বাস্থ্য ও পুষ্টির উন্নতি করে, শেখার সক্ষমতা শক্তিশালী করে, মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে এবং টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখে। জীবনের শুরুটা যেন সবচেয়ে ভালো হয়, সেই অধিকার প্রতিটি শিশুর রয়েছে। তেমনি প্রতিটি মা সফলভাবে তার সন্তানকে দুধ পান করানোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার অধিকার রাখেন।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার ও অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে ইউনিসেফ ও ডব্লিউএইচও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ । আমরা স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, পরিবারগুলোকে আরও সক্ষম করে তোলা এবং সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলতে একসঙ্গে কাজ করব, যেখানে প্রত্যেক মা সফলভাবে সন্তানকে মায়ের দুধ পান করাতে পারবেন। যাতে করেপ্রতিটি শিশু বেঁচে থাকবে, সুস্থভাবে বেড়ে উঠবে এবং তার পূর্ণ বিকাশের সুযোগ পাবে।

###

গণমাধ্যম বিষয়ক যোগাযোগ

মিগেল মাতেওস মুনোজ
ইউনিসেফ বাংলাদেশ
টেলিফোন: +8801713043478
ই-মেইল: [email protected]
সালমা সুলতানা
ডব্লিউএইচও বাংলাদেশ
টেলিফোন: +8801817534341
ই-মেইল: [email protected]

ইউনিসেফ সম্পর্কে

বিশ্বের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কাছে পৌঁছাতে বিশ্বের কঠিনতম কিছু স্থানে কাজ করে ইউনিসেফ। ১৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলে সর্বত্র সব শিশুর জন্য আরও ভালো একটি পৃথিবী গড়ে তুলতে আমরা কাজ করি।

ইউনিসেফ এবং শিশুদের জন্য এর কাজ সম্পর্কিত আরও তথ্যের জন্য ভিজিট করুন: www.unicef.org/bangladesh/

ইউনিসেফকে অনুসরণ করুন Twitter, Facebook, Instagram এবং YouTube-এ।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্পর্কে

সব মানুষের কল্যাণের জন্য নিবেদিত ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে পরিচালিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সর্বত্র সবাইকে একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর জীবনের সমান সুযোগ দেওয়ার জন্য বিশ্বব্যাপী প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দেয়। কোভিড-১৯ ও জিকার মতো মহামারি এবং এইচআইভি, ম্যালেরিয়া, ইবোলা, মারবার্গ ও যক্ষ্মার মতো সংক্রামক রোগের পাশাপাশি ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও ক্যান্সারের মতো দীর্ঘস্থায়ী অসুখ- সব কিছু মোকাবিলায় আমরা ১৯০টি দেশকে একত্রিক করে কাজ করছি। বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি স্থানে সরাসরি মাঠপর্যায়ে কাজ করে আমরা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করছি, যাতে বিশ্ববাসীর সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করা যায়। আমাদের লক্ষ্য হলো, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাকে এগিয়ে নেওয়া ও সহায়তা দেওয়া, বিশ্বকে নিরাপদ রাখা এবং অসহায় ব্যক্তিদের সেবা করা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও তার কাজ সম্পর্কে জানতে ভিজিট করুন: www.who.int  

ডব্লিউএইচওকে অনুসরণ করুন : TwitterFacebookInstagramLinkedInTikTokPinterestYouTubeTwitch