‘শিশুর সুস্থ্য শৈশব নিশ্চিতে পুষ্টিশক্তির ছোট্ট একটি প্যাকেট’
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে জীবনরক্ষাকারী পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ পুষ্টিশক্তির একটি প্যাকেট (স্যাচেট), খাদ্য ঘাটতি ও দুর্যোগকালীন সময়ে মায়েদেরকে তাদের সন্তানদের পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়তা করছে।
- বাংলা
- English
নোয়াখালী বাংলাদেশ- বিছানার এক পাশে বসে রোকেয়া বেগম তার ছোট্ট মেয়ে আরোহীর সাথে খেলা করছেন, তাকে কিছু একটা ভোলানোর চেষ্টা করছেন। খাবারের প্রতি বাচ্চা মেয়েটির বেশ অনীহা, খাবার দেখেই বারবার মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে আরোহী। আরোহীর বয়স এখন এক বছর। এই বয়স থেকে শিশুদের মায়ের বুকের দুধের পাশাপাশি ঘরের তৈরি বাড়তি খাবার নিয়ম করে খাওয়াতে হয়। কিন্তু রোকেয়া বেগম যেটাই খাওয়ানোর চেষ্টা করেন না কেন আরোহী খেতে নারাজ। নরম ভাত, একটু ডাল বা মিষ্টি কলার কয়েক টুকরো - কিন্তু আরোহী বুকের দুধ ছাড়া কিছুই খেতে চায় না, আর এটাই রোকেয়ার দুশ্চিন্তা বড় কারন কেননা তার বুকের দুধ দিন দিন কমে আসছে।
“বন্যার পর থেকে আমাদের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। আমি নিজে খুব একটা পুষ্টিকর খাবার খেতে পারছি না, তাই আমার বুকের দুধও কমে গেছে। মাঝে মাঝে মেয়েটি দুধ পাওয়ার জন্য জোরে কামড় দেয়, কিন্তু পর্যাপ্ত দুধ পায় না,” শান্তভাবে বলেন রোকেয়া। তিনি আরও বলেন, “আমি তাকে ভাত, ডালের মতো ঘরের খাবার খাওয়াতে চাই, কিন্তু সে সেগুলো খেতে চায় না।”
প্রায় ছয় মাস আগে যখন ভয়াবহ বন্যায় তার গ্রাম ভেসে যায়, সে সময় রোকেয়াকে তার তিন সন্তান নিয়ে সবকিছু একা সামাল দিতে হয়েছে। তার প্রবাসী শ্রমিক স্বামী থাকেন কয়েক হাজার মাইল দূরে। এর মাঝে বাড়ির মাটির চুলাটাও বন্যায় ভেসে যায়, ওদিকে এলাকার দোকানগুলোতে মুদি সদাই প্রায় ফুরিয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে রোকেয়া প্রায় এক মাস তেমন কোন পুষ্টিকর খাবার রান্না করতে পারেননি; ফলে তার পর্যাপ্ত দুধও তৈরী হয় নি।
“আমার খুব কষ্ট হয় যখন লোকজন বলে যে, আমার বাচ্চাকে দেখতে আমার মতো স্বাস্থ্যবান দেখায় না,” বলেন রোকেয়া। তিনি আরও জানান, “অল্প কয়েক দিন আগেই আরোহীর ডায়রিয়া হয়েছিল।”
রোকেয়া অন্য সব শিশুর মতোই আরোহীকে স্বাস্থ্যবান ভাবতেন। তার ধারণা বদলায় যখন ইউনিসেফের সহায়তাপুষ্ট কমিউনিটি নিউট্রিশন ভলান্টিয়ার শাহীন আক্তার সম্প্রতি তার বাড়ি পরিদর্শন করেন। শাহীন আক্তার ওই বাড়িতে গিয়ে একটি বিশেষ টেপ দিয়ে আরোহীর বাহুর পরিধি পরিমাপ করেন, বাহুর পরিধির মাপ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কম হওয়ায় রোকেয়া জানতে পারেন তার মেয়ে ইতিমধ্যে অপুষ্টিতে ভুগছে।
অন্য একটি গ্রাম, একটি সাধারণ ছোট প্যাকেট
নোয়াখালীতে রোকেয়ার বাড়ি থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে, সাবিনা ইয়াসমিন একটি ছোট প্যাকেট (স্যাচেট) খোলেন। তার ১০ মাস বয়সী মেয়ে আকশা চোখ বড় বড় করে খুব কাছ থেকে সেটা দেখতে থাকে। সেটা তার প্রিয় কোনো খাবার হতে পারে ভেবে সে তার ছোট ছোট আঙুলগুলো দিয়ে প্যাকেটটি ধরতে চায়। পিনাট বাটারের (বাদাম দিয়ে তৈরী মাখন) মতো পেস্ট, যা বাদাম, তেল, দুধ, চিনি, ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান দিয়ে তৈরি পুষ্টিশক্তির এই প্যাকেট (স্যাচেট) শিশুদের নিত্যদিনের খাবারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
রোকেয়ার মতো সাবিনার পরবিারও বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তার স্বামীও বিদেশে থাকেন এবং তিনিও একাই দুটি সন্তান বড় করছেন। রোকেয়ার মতো তারও পুষ্টিকর খাবারের ঘাটতি দেখা দেয়। দুর্যোগের পর এক মাসের মতো সময় সাবিনা ও তার মেয়েরা আত্মীয়-স্বজনদের কাছে থেকেছেন। তখন যে অল্প পরিমাণে খাবারের জোগান সম্ভব হত, মূলত ভাত ও আলু, সেটাই সবাই ভাগাভাগি করে খেতেন।
“বাজারেও খাদ্যপণ্যের অভাব দেখা দিয়েছিল এবং দাম বেড়ে গিয়েছিল। সবাই ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল,” ওই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন সাবিনা। তিনি আরও বলেন, “আমার ঠিকমতো খাওয়া
হচ্ছিল না। সে কারণে সন্তান পর্যাপ্ত বুকের দুধও পাচ্ছিলো না। এটা নিয়ে আমি খুব অসুবিধায় ছিলাম। যেভাবে খাওয়াতে চাই সেভাবে বাচ্চাকে খাওয়াতে পারছি না, এটা আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছিল।”
তবে একটি জিনিস ছিল ভিন্ন।
ইউনিসেফ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কমিউনিটি নিউট্রিশন ভলান্টিয়ার জান্নাতুল ফেরদৌস, যিনি সাবিনার প্রতিবেশীও, তিনি সময়মতো তাদের কাছে গেলেন। জান্নাতুল ছিলেন প্রায় ৮০ জন স্বেচ্ছাসেবকের একজন যারা মাঠ পর্যায়ে সরাসরি কাজ করছে এবং যাদেরকে ইউনিসেফ সমর্থিত অপুষ্টি মোকাবিলার জন্য একটি পাইলট প্রকল্পে ফেনী ও নোয়াখালী জেলার ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী প্রায় ১০ হাজার শিশুর জন্য নিয়োজিত করা হয়েছিল।
“প্রতিবেশী হিসেবে প্রায় ২২ বছর ধরে আমি এই মাকে চিনতাম,” বলেন জান্নাতুল। তিনি আরও বলেন, “যখন আমি পৌঁছালাম সে সময় তাদের বাড়ি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। সবকিছু গোলমেলে অবস্থায় ছিল। পরিবারটির অবস্থা আসলে খুব খারাপ ছিল।” সাবিনার কষ্টের কথা শুনতে শুনতে জান্নাতুল আকশার বাম হাতের উপরের বাহুর মধ্যভাগের পরিমাপ নিলেন। দেখা গেল যে, শিশুটি তখনো অপুষ্টিতে আক্রান্ত না হলেও পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সে অপুষ্টির শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। জান্নাতুল তাকে একটি সাধারণ কিন্তু কার্যকরী সমাধান দিলেন। ইউনিসেফের কল্যাণে বিনামূল্যে পুষ্টিশক্তি (ইংরেজিতে স্মল কোয়ান্টিটি লিপিড বেসড নিউট্রিয়েন্ট সাপ্লিমেন্ট -এসকিউ-এলএনএস/SQ-LNS) নামে পরিচিত সম্পূরক পুষ্টিকর খাবারের প্যাকেট দিলেন যা সরাসরিও খাওয়া যায়।
এই সম্পূরক পুষ্টিকর খাবারের পেস্ট পুষ্টির ঘাটতি পূরণের মাধ্যমে খাদ্যের ঘাটতি ও দুর্যোগকালীন সময়ে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের অপুষ্টিতে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। শিশুকে মায়ের দুধ পান করানো ও ঘরে তৈরি বৈচিত্র্যপূর্ণ বাড়তি খাবার খাওয়ানোর পাশাপাশি এই সম্পূরক খাবারটি দিতে হয়।
“জান্নাতুল আমাকে বললেন, পুষ্টিশক্তির একটি প্যাকেট, ভাত ও মাছের মতো খাবারের সঙ্গে মেশালে সেটাই আমার বাচ্চাকে প্রতিদিন তার যেসকল পুষ্টি উপাদানের প্রয়োজন সেটার একট বড় অংশের যোগান দিতে পারে,” সাবিনা জানান।
প্রথমবারের মতো ‘পুষ্টিশক্তি’ বিতরণ
গত ডিসেম্বর থেকে সাবিনা প্রতি মাসে আকশাকে তাদের বাড়ির কাছাকাছি ইউনিসেফের সহায়তাপুষ্ট স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে নিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে শিশুটির শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় এবং তার পুষ্টি নিশ্চিত করার জন্য মা সাবিনাকে শিশুপুষ্টি বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়। ওই সেশন চলাকালে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (কমিউনিটি স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী) পান্না আকতার শিশুটির ওজন ও উচ্চতার মাপ নেন ও রেকর্ড রাখেন এবং তাকে পুষ্টিশক্তির (SQ-LNS) প্যাকেট দেন।
আর ঠিক চার মাসের মধ্যেই ছোট শিশুটির ওজন দেড় কেজি বেড়ে যায়।
“সে আরও প্রানবন্ত, সতেজ ও হাসিখুশি হয়ে ওঠে। সে এটার স্বাদও পছন্দ করে,” হাসিমুখে বলেন সাবিনা। “এটার ব্যবস্থা করার জন্য আমি ইউনিসেফকে ধন্যবাদ জানাই। কারণ এই প্যাকেট আমার মেয়েকে অর্ধেক বাটি খিচুরির সমান পুষ্টি যোগায়,১” এই মা আরও বলেন।
আকশা একা নয়। এলাকার অন্য শিশুরাও এই পুষ্টিশক্তির প্যাকেট থেকে উপকার পাচ্ছে।
“এই সম্পূরক খাবারের ফলাফল খুবই সন্তোষজনক,” বলেন পান্না। তিনি আরও বলেন, “বাবা-মায়েরা নিয়মিত আসছেন। এমনকি যেসব পরিবার আগে নিবন্ধন করেনি এখন তারাও পুষ্টিশক্তির স্যাচেট নেওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করছেন।”
সাবিনাদের মতো বহু পরিবারে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো চালু করা ‘পুষ্টিশক্তির’ এই কর্মসূচি ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসছে। এই পরিবর্তন ঘটছে অপুষ্টির শিকার হতে চলা একটি শিশুর স্বাস্থ্যবান শিশু হিসেবে বেড়ে ওঠার যাত্রা শুরুর মধ্য দিয়ে; বিকাশ বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা শিশুর স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন ও তার সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশের পথ খুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে।
দিনে মাত্র ১২ টাকা
ঘরে ফিরে রোকেয়া মেয়ে আরোহীকে ঘুমাতে দেখেন। আশা করেন, সামনের দিনগুলোতে তার মেয়ের ক্ষুধা ও খাওয়ার প্রতি আগ্রহ বাড়বে। আকশার মতো শিশুদের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে সহায়তা করা এই পুষ্টিশক্তি সম্পর্কে কেন আগে জানতে পারলেন না, সেটা নিয়ে আফসোস করেন তিনি।
জলবায়ুর অভিঘাত ও দুর্যোগপ্রবণ একটি দেশে শিশুর পুষ্টির জন্য বিনিয়োগ করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে আরও সুস্থ ও শক্তিশালী করে তোলা সম্ভব। অতি ক্ষুদ্র বিনিয়োগ- দিনে মাত্র ১২ টাকা (ইউএসডি ১০ সেন্ট)- দিয়েই একটি শিশুর হাতে SQ-LNS সাপ্লিমেন্ট পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এটা স্বল্প ব্যয়ের দীর্ঘমেয়াদী এক সমাধান, যার সুফল সারা জীবন পাওয়া যাবে। আর এই সুফল শুধু কেবল শিশুদের শৈশবকে সুন্দর করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এর বিস্তর ভূমিকা থাকবে।
আরোহীর বেলায় কিছুটা দেরি হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু অন্য হাজারো শিশুর ক্ষেত্রে তা হবে না। এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার সময়- দেরি হওয়ার আগে প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছাতে হবে, যেমনটি আমরা আকশার কাছে পৌঁছেছি।
__________________________
১ বাংলাদেশের একটি সাধারণ ভাত এবং ডালের খাবার
বাংলাদেশে মা ও শিশুদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও কল্যাণের জন্য অব্যাহত সহায়তা প্রদান এবং অপরিসীম অবদান রাখায় ইকোর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে ইউনিসেফ।



