“যখন আমার বুকের মধ্যে বাচ্চা নিরাপদ থাকে, আমি শান্তি পাই”
কমিউনিটি ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ারের (ক্যাঙ্গারু মাতৃ সেবা) মাধ্যমে কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীরা যেভাবে কম ওজনের শিশুদের সেবা-যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে মায়েদের সহায়তা করছেন।
- বাংলা
- English
ভোলা, বাংলাদেশ- “যখন আমার বুকে আমার বাচ্চা নিরাপদ থাকে, আমার খুব শান্তি লাগে,” বলছিলেন শিউলি আক্তার। নবজাতক কন্যা রূপা তার মায়ের বুকে হালকা বেগুনি রংয়ের একটা বন্ধনীর (বাইন্ডার) সাহায্যে বাধা রয়েছে; বন্ধনীটা আস্তে আস্তে ঠিক করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন তিনি।
মাত্র দুই সপ্তাহ আগে জন্ম নেওয়া রূপার ওজন ছিল মাত্র ২,০০০ গ্রাম। কম ওজনের শিশু হিসেবে চিহ্নিত রূপা সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে; অপুষ্টি ও বিলমম্বিত বিকাশের ঝুঁকিও রয়েছে, তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো জন্মের প্রথম ২৮ দিনের মধ্যেই মৃত্যুর শঙ্কা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
রূপার ছোট্ট আকৃতি দেখে প্রথমে শিউলি ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু এখন নিজের এই সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি প্রশান্তি, আত্মবিশ্বাস ও মমতার বন্ধন অনুভব করেন।
তিনি জানেন, রূপা এখন ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে।
ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার: স্বল্প খরচে জীবনরক্ষাকারী পদ্ধতি
তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন নাজমা আক্তার-একজন কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মী, যিনি ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার (কেএমসি) নামে পরিচিত পরিচর্যা পদ্ধতি বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, যে পদ্ধতিতে স্থিতিশীল কম ওজনের নবজাতকদের১ চিহ্নিত করা এবং বাড়িতে তাদের পরিচর্যায় সহায়তা দেওয়া হয়। এটি একটি সহজ ও স্বল্প খরচের পদ্ধতি, যাতে প্রতিদিন অন্তত টানা আট ঘণ্টা শিশুকে ত্বকের স্পর্শে রাখা (স্কিন-টু-স্কিন কনট্যাক্ট), শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো এবং নিয়মিত ফলো-আপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নাজমা হাসি মুখে শিউলিকে ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার কীভাবে চালিয়ে যেতে হয় এবং এই সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিটি ঘণ্টা কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝিয়ে বলেন; তার হাসি ও আত্মবিশ্বাস দেখে শিউলি ভইরসা পেলেন। একইসঙ্গে তিনি রূপার ওজন একটি মা ও শিশু পুষ্টি কার্ডে লিপিবদ্ধ করেন, এখন আর আগের সব কাগজ নিয়ে যাওয়া লাগবে না। এই একটি কার্ড সেবাদান প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও কার্যকর করে তুলেছে।
“আমি এই এলাকায় প্রতি মাসে দুই থেকে তিনটি কম ওজনের নবজাতকের ব্যবস্থাপনা করি,” বলেন নাজমা। তিনি বলেন, “আমি এই এলাকারই মানুষ, তাই সবাই আমাকে আপন করে নেয়, ঘরে ডাকে। তারা আমার ওপর ভরসা করে।”
নিষ্ঠার সঙ্গে ঘরে ঘরে গিয়ে সেবা
নাজমা কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে হাঁটা দেন পরবর্তী গন্তব্যের দিকে: একই গ্রামের আরেক পাশে, পাঁচ মিনিটের দূরত্বে, ১৮ বছর বয়সী মারিয়া আক্তারের বাড়ি।
রোদ চড়ছে মাথার ওপরে, কিন্তু নাজমা এগিয়ে চলেন। প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে তিনি মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন-শিশুটি সুস্থভাবে জন্মেছে কি না, প্রত্যেক মা সঠিক খাবার খাওয়ানোর নিয়ম জানেন কি না- এ সব কিছু তিনি মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করেন। যদি কোনো নবজাতক কম ওজনের হয় তাহলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার (কেএমসি) পদ্ধতি শিখিয়ে দেন।
গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত ভোলা বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্গম ও প্রত্যন্ত জেলাগুলোর একটি। এখানে হাসপাতাল বা বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবার সুযোগ সীমিত হওয়ায় কম ওজনের অনেক নবজাতক সময়মতো চিহ্নিত বা সঠিকভাবে পরিচর্যা পায় না।
সে কারণে নাজমার এই দরজায় দরজায় গিয়ে সেবা প্রদান শিশুর জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে যেন এক আশার আলো। তাই কাজের চাপ যতই হোক না কেন তিনি জানেন, তাঁকে অবশ্যই কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
মোটের ওপর তিনি নিজের কঠোর পরিশ্রমের ফল দেখতে পেয়েছেন: মাঝে মাঝে কমিউনিটির সংশয় ও সন্দেহের মুখোমুখি হয়েও বিগত ১৮ মাসে ধৈর্য ধরে ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার শেখানোর মাধ্যমে তিনি রূপার মতো ৩০টির বেশি কম ওজনের নবজাতককে বাঁচাতে এবং বেড়ে উঠতে সাহায্য করেছেন।
মারিয়ার পুত্রসন্তান সাফওয়ান তাদেরই একজন।
এক তরুণ মায়ের দুশ্চিন্তা
মারিয়ার ঘরটি সাধারণ, ইটের দেয়ালজুড়ে টাঙানো রয়েছে সাদামাটা সাজসজ্জা ও দুটি কাগজের ক্যালেন্ডার। ঘরের ভেতরে দুটি ফ্যান ঘুরছে, সেগুলো চালিয়ে গরমের অস্বস্তি কিছুটা কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
৪৫ দিন আগে নাজমা এই বাড়িতে ছুটে এসেছিলেন মারিয়ার সন্তানের জন্ম হওয়ার ঠিক পরের সকালেই। তিনি একটি ওজন মাপার যন্ত্র সঙ্গে করে এনেছিলেন। ইউনিসেফের সহায়তায় তিনি এটা পেয়েছিলেন। তার আগে এই যন্ত্র নাজমার ছিল না। তিনি শিশুটির ওজন মাপলেন, আবারও মাপলেন, মাত্র ২,০০০ গ্রাম। তিনি বুঝতে পারলেন, এটি আরেকটি কম ওজনের নবজাতক জন্ম হওয়ার ঘটনা।
“আমার সন্তানকে এত ছোট দেখে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। সে ঠিকমতো কান্নাও করছিল না। আমরা ভেবেছিলাম, চিকিৎসার জন্য তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে,” ওই সময়ের ঘটনা স্মরণ করে বলেন মারিয়া। তিনি আরও বলেন, “কিন্তু নাজমা আমাকে দুশ্চিন্তা না করতে বললেন।তিনি বললেন, আমরা বাড়িতেই বাচ্চার যত্ন নিতে পারব। তিনি আমাকে ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন এবং কীভাবে এটা করতে হবে, তা শিখিয়ে দিলেন।”
প্রথমে এই কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে মারিয়ার মধ্যে অনিশ্চয়তা কাজ করছিল। একনাগাড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শিশুকে বুকে জড়িয়ে রাখা ছিল বেশ অস্বস্তিকর এবং বন্ধনী ব্যবহার করতেও তাঁর লজ্জা লাগত। যখন তার কিছুটা বিশ্রামের প্রয়োজন হতো, তখন শ্বশুর-শাশুড়ি এগিয়ে এসে সাফওয়ানের জন্য ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ারের দায়িত্ব নিতেন।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর এই অভ্যাস রপ্ত হয়ে যায়।
“আমার এটা ভালো লাগতে শুরু করল। কারণ আমার ছেলে সব সময় আমার বুকের কাছেই থাকত,” এক চিলতে হাসি মুখে বলেন মারিয়া।
নাজুক অবস্থা থেকে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠা
ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার এবং নাজমার নিয়মিত ফলো-আপের ফলে এক মাসের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে সাফওয়ানের ওজন বেড়ে ৩,৬০০ গ্রাম হয়েছে। সে এখন ভালোভাবে বুকের দুধ খাচ্ছে, সক্রিয় রয়েছে এবং আর ঝুঁকির মধ্যে নেই।
“এখন ওকে দুধ খাওয়ানোর সময় আমি টের পাই যে ওর ওজন আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে,” গর্বের সঙ্গে বলেন মারিয়া। এই মা আরও বলেন, “সে এখন আমার ডাকে সাড়া দেয়, পরিবারের সবার ডাকে সাড়া দেয়। সে পুরোপুরি প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেছে।”
নাজমার পরামর্শ অনুযায়ী, মারিয়া সাফওয়ানকে টিকা দেওয়াও শুরু করেছেন।
“আমি চাই, আমার ছেলে সুস্থ থাকুক, লেখাপড়া শিখুক। আমি তাকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই,” বলেন মারিয়া।
এক নীরব সংকট
বাংলাদেশে প্রতি বছর সাফওয়ান ও রূপার মতো প্রায় ৭ লাখ২ শিশুর জন্ম হয় কম ওজন নিয়ে। এটা হয়ে থাকে কম বয়সে গর্ভধারণ ও মায়ের অপুষ্টির কারণে। কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের এই সংখ্যা প্রতি চারটি নবজাতকের মধ্যে প্রায় একটি, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
এই সংকট মোকাবিলায় ইউনিসেফ এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কমিউনিটি পর্যায়ে ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার (কেএমসি) চালু করেছে। স্বল্প খরচের এই সহজ টেকনিক প্রতিটি পরিবারের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে নাজমার মতো স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
মাত্র ১৮ ডলার ব্যয় করে একজন কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং তাকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়া যায়, যাতে তিনি নবজাতকের জীবন রক্ষা করতে পারেন, বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে পারেন এবং শিশুর জন্মের প্রথম ঘণ্টাগুলো থেকেই মায়ের কোলে তার সুস্থ মস্তিষ্কের বিকাশকে উৎসাহিত করতে পারেন।
“ইউনিসেফের সহায়তা পাওয়ার আগে আমার কাছে কোনো ওজন মাপার যন্ত্র বা কম ওজনের শিশুকে সামলানোর প্রশিক্ষণ ছিল না,” জোর দিয়ে বলেন নাজমা। তিনি বলেন, “এখন আমার কাছে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জ্ঞান রয়েছে, যা দিয়ে আমি সঙ্গে সঙ্গে মায়েদের সাহায্য করতে পারি।”
এখনো কাজের চাপ অনেক বেশি। নাজমা প্রতি মাসে ৬৫০টির মতো বাড়িতে যান এবং যতদিন যাচ্ছে এই সেবার চাহিদা ততই বাড়ছে। সহায়তার প্রয়োজন এমন প্রতিটি মা ও শিশুর যথাযথ সেবা নিশ্চিতের জন্য কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে ইউনিসেফ।
“যদি সরকার, এনজিও ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় আরও ভালো হয়, যদি আমরা আরও বেশি সহায়তা পেতাম তাহলে আমরা আরও বেশি কাজ করতে পারতাম এবং প্রতিটি মা ও শিশুর সেবার মান উন্নত করতে পারতাম,” যোগ করেন নাজমা।
এক মায়ের কাছ থেকে আরেক মায়ের কাছে
গ্রামে ফিরে এসে দেখা যায়, নাজমার প্রচেষ্টা সফল হয়েছে। এক সময় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও ভয়ে থাকা মারিয়া এখন নিজেই অন্যদের পরামর্শ দেওয়ার জন্য আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন।
“যদি কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া কোনো শিশুর মায়ের সঙ্গে আমার দেখা হয় তাহলে নাজমা আমাকে যা শিখিয়েছেন, সেটাই আমি তাকে বলব,” বলেন তিনি।
যেমন এক সময় মারিয়া নাজমার কথা শুনেছিলেন, ঠিক তেমনি শিউলিও মারিয়ার গল্প থেকে উৎসাহ পেয়েছেন।
“এটাই আমাকে ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ারে ভরসা রাখতে সাহায্য করেছে,” আরও একবার বন্ধনীটা ঠিক করতে করতে বলেন শিউলি। তার সন্তান শান্তি করে তার বুকে ঘুমিয়ে আছে- নিরাপদে, উষ্ণতায় এবং প্রতিদিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
______________________________
১ স্থিতিশীল কম ওজনের শিশু বলতে বোঝায়, ওই সব শিশুদের বিপদের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না এবং শ্বাসকষ্টও হয় না। কেবল স্থিতিশীল এলবিডব্লিউ নবজাতকদেরই বাসায়/বাড়িতে রেখে সেবা-যত্ন করা যায়। স্থিতিশীল নয় এমন এলবিডব্লিউদের হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।
২ ইউনিসেফ ও ডব্লিউএইচও ২০২৩, https://data.unicef.org/topic/nutrition/low-birthweight/
বাংলাদেশে মা ও শিশুদের পুষ্টি ও সুস্থতার জন্য অব্যাহত সহায়তা এবং অসামান্য অবদানের জন্য গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা, দ্য পাওয়ার অফ নিউট্রিশন এবং তাদের সহ-বিনিয়োগকারীদের প্রতি ইউনিসেফ আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে।