অপুষ্টি আর উপেক্ষা: রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট পা দিলো অষ্টম বছরে
ভালো পুষ্টির অভাবের কারণে সোফিবা মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছিল। তাকে সুস্থ করে তুলতে ইউনিসেফ সাহায্য করছে। কিন্তু বাংলাদেশে অপুষ্টির শিকার অন্য যে সব রোহিঙ্গা শিশু রয়েছে তাদের সহায়তার জন্য আরও অনেক কিছু করা প্রয়োজন।
- বাংলা
- English
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে রুবেদা যখন তার চতুর্থ সন্তান সোফিবাকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন, তখন তিনি তার নিজের এবং তার অনাগত সন্তানের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন; কিন্তু তার মেয়ে সুস্থ এবং সুন্দরভাবে জন্মগ্রহণ করেছিলো।
তবে কয়েকদিন পরে সোফিবা জ্বর এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং দ্রুত তার ওজন কমতে থাকে । সোফিবা অসুস্থ হয়ে পড়লে তার মা রুবেদা প্রায়ই তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতেন। রুবেদা তার সন্তানের স্বাস্থ্য নিয়ে সব সময়ই উদ্বিগ্ন থাকতেন। রুবেদা যে শরণার্থী শিবিরে থাকতেন সেখানে একদিন কমিউনিটির পুষ্টি স্বেচ্ছাসেবক তাদের সাথে দেখা করতে আসেন। এই পুষ্টিসেবকই প্রথম চিহ্নিত করেন যে, সোফিবা অপুষ্টির সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ – ওয়েস্টিং (উচ্চতার তুলনায় কম ওজন)এর শিকার। মারাত্মক অপুস্টিতে ভোগা এই শিশুদের ক্ষেত্রে যেকোন রোগে সহজেই আক্রান্ত হবার এমনকি মৃত্যুরও ঝুঁকি অনেক বেশি।
রুবেদা বলেন, “আমার খুব ভয় ও অসহায় লাগছিলো। আবার বাচ্চাটা তেমন একটা খেলাধুলা করত না। ও খুব দুর্বল ছিল, আর হাঁটতেও পারতো না।”
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের কক্সবাজারে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরে সাত বছর ধরে প্রায় এক মিলিয়ন (১০ লক্ষ) রোহিঙ্গা নির্বাসনে রয়েছে। এদের মধ্যে অর্ধেকই আবার শিশু। এ সব শিশুদের মধ্যে অনেকের জন্ম হয়েছে এই আশ্রয়কেন্দ্রে। এ সব শরণার্থী শিবিরে প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার শিশু জন্মগ্রহণ করে। অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এ সব শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড, বন্যা এবং ভূমিধবসের মতো আবহাওয়া-সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরনের বিপদের সম্মুখীন হয়। এ ছাড়াও বর্ষা মৌসুমে ডায়রিয়া, ডেঙ্গু এবং ম্যালেরিয়ার মতো রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে পুষ্টির অবস্থার অবনতি হয়েছে। শরণার্থীদের জীবিকা নির্বাহের জন্য শুধুমাত্র মানবিক সহায়তার উপর নির্ভর করতে হয়। কারণ, তাদের জীবিকা নির্বাহের তেমন কোনো উৎস নেই বললেই চলে। সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুসারে, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের মধ্যে ১৫.১শতাংশ শিশু খবা©কৃতির হয় (ওয়েস্টিং)। এর অর্থ হলো উচ্চতা অনুযায়ী তারা বেশ পাতলা হয় যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-ইউনিসেফের জরুরি অবস্থার জন্য বরাদ্দ সীমার চেয়ে বেশি । শিবিরে এমন অনেক শিশু রয়েছে যারা দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টিতে ভূগছে। গত দুই বছরে এবিষয়ে তেমন কোন পরিবর্তন দেখা যায় নি। হিসেব অনুযায়ী প্রতি ১০ জনের মধ্যে চারজন শিশু দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টিতে ভূগছে।
রুবেদা বলেন, অন্যান্য রোহিঙ্গা শরণার্থীর মতো আমি আমার পরিবারের জন্য মাসিক যে রেশন পাই, তা পুরো পরিবারের জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ তাদের রেশন আগের তুলনায় পরিমাণে কমে গিয়েছে। নিজের পরিবারের অবস্থা বর্ননা করে রুবেদা আরও বলেন, “আমার স্বামী কোনো কাজ করতে পারে না। তিনি ভীষণ দুর্বল। যতক্ষণ পারি আমরা খাবার মজুদ করে রাখি। আমরা তেমন স্বচ্ছল নয়।”
ধীরে ধীরে অবস্থার ক্রমাগত উন্নতি হচ্ছে
কোনো এক সকালে, একটি সমন্বিত পুষ্টি কেন্দ্রে নিয়মিত পরীক্ষা করার জন্য সোফিবাকে কোলে নিয়ে অপেক্ষা করছে রুবেদা।সোফিবা মায়ের বুকে ঢলে আছে আর রুবেদা মেয়ে শক্ত করে আকড়ে আছে। কেন্দ্রটি শিশুদের কান্না আর চিৎকারে বেশ সরগম; পুষ্টি স্বেচ্ছাসেবকেরা আগত শিশুদের নিয়ে ব্যস্ত, আর মায়েরা ব্যস্ত শিদের কান্না থামাতে।
শরণার্থী শিবিরের ইউনিসেফের সহযোগিতায় পরিচালিত এমন মোট ৩৪ টি সমন্বিত পুষ্টি কেন্দ্রেরয়েছে। এখানে শিশু, পরিচর্যাকারী এবং গর্ভবতী ওস্তন্যদানকারী মায়েরা জীবন রক্ষাকারী প্রতিরোধমূলক এবং নিরাময়মূলক বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি সেবা পান। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, অপুষ্টির বিষয়টি প্রাথমিকভাবে সনাক্তকরণের জন্য অনূর্ধ্ব-৫ শিশুদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, গুরুতর খর্বাকৃতি শিশুদের চিকিৎসার জন্য জরুরি পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ, পুষ্টি বিষয়ক পরামর্শ, শিশুদের শারীরিক বিকাশ পর্যবেক্ষণ এবং শিশু ও বাচ্চাদের জন্য পুষ্টিকর খাবার রান্নার প্রদর্শনী।
রুবেদা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলো, এমন সময় তার ডাক পড়ল। রুবেদার সন্তান সোফিবার পুষ্টির অবস্থা মূল্যায়ন করার জন্য স্বেচ্ছাসেবকেরা সোফিবার উচ্চতা, ওজন এবং কনুইয়ের উপরের বাহুর পরিধি পরিমাপ করলেন। তারপরে, পুষ্টি স্বেচ্ছাসেবকদের কাছ থেকে রুবেদা বিভিন্ন খাদ্যাভ্যাস এবং কীভাবে নিজের ও তার সন্তানের জন্য পুষ্টিকর খাবার তৈরি করবেন সে বিষয়ে পরামর্শ পেয়েছিলেন।
সাথে রেডি-টু-ইউজ থেরাপিউটিক ফুড (আরইউটিএফ) এর প্যাকেটও দেয়া হয় রুবেদাকে এসময় সোফিবার ক্ষুধা পরীক্ষা করা হয়েছিলো। রেডি-টু-ইউজ থেরাপিউটিক ফুড (আরইউটিএফ) হলো একটি শক্তিতে ও অনুপুষ্টিতে ভরপুর একপ্রকার ঘন প্রক্রিয়াজাত খাবার যা মারাত্মক খবাকৃতিতে ভুগছে এমন শিশুদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়।
সেবাকেন্দ্রে আসার পর থেকে সোফিবার শরীরের ধীরে ধীরে কিন্তু ক্রমাগত উন্নতি দেখা দিচ্ছে। তার মধ্য বাহুর উপরের অংশ এখনও ক্ষীণকায়। কিন্তু চিকিৎসার জন্য প্রথম ভর্তি হওয়ার পর থেকে তার ওজন ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সে ধীরে ধীরে লম্বা হচ্ছে।
যদিও রুবেদার জন্য এটি একটি অগ্নিপরীক্ষার মতো। কারণ রুবেদা তিন মাসের গর্ভবতী; এই পুষ্টিসেবা নিতে বারবার আসা-যাওয়া করতে করতে তিনি বেশ ক্লান্ত। তবুও রুবেদা তার মেয়ের স্বাস্থ্যের উন্নতি দেখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং আশাবাদী।
রুবেদা বলেন, “মেয়ের স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য তার ওজন এখনও [আরো] বাড়াতে হবে। “আমি চাইআমার বাচ্চা যেন দ্রুত হাঁটতে পারে।”