পানির কলকল ধ্বনি আশা জাগায়
নিরাপদ পানি, পয়ঃনিষ্কাষণ এবং স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) সহায়তার মাধ্যমে সংকটের মাঝেও রোহিঙ্গা শিশুরা স্বাভাবিক জীবনযাপনের আশা খুঁজে পাচ্ছে।
- বাংলা
- English
কুতুপালং শরণার্থী আশ্রয়কেন্দ্র, বাংলাদেশ - নূর আয়েশা তার বাড়ির দরজার কাছে বসে অবিরাম বৃষ্টি পড়ার শব্দ উপভোগ করছে আর খাতায় একটা ফুলের ছবি আঁকছে। পাশেই তার বোন নূর হাসিনা স্থির হয়ে শুয়ে আছে; নীরবে সে বোনের আঁকা ফুলের ছবি দেখছে।
প্রত্যেক বছর এমন বৃষ্টি দেখে অভ্যস্ত পরিবারটি; তবে এই প্রথম বার বৃষ্টি তাদের মনে কোন আতঙ্ক সৃষ্টি করেনি, বরং বৃষ্টি দেখে তারা আনন্দিত। কারন এবার আর বৃষ্টির মধ্যে পানি আর কাদা মাড়িয়ে তাদের টয়লেট (শৌচাগার) খুঁজে বের করতে হবে না, ৩০০ ফুট দূরে খাবারের পানির খোঁজে যেতে হবে না, আর না হিমশিম খেতে হবে মাসিকের সময় পরিষ্কার কাপড় যোগাড় করতে গিয়ে।
এবারের বৃষ্টিটা আসলেই ভিন্ন- নির্মল, স্নিগ্ধ ও স্বস্তির।
তাদের গল্পটা কিছুটা এরকমঃ
“সে যদি আমাকে তার কষ্টের কথা বলতে পারতো,
তাহলে আমি একটু নিশ্চিন্ত থাকতাম।”
নূর হাসিনার চোখের ভাষা কেবল তার মা শাহজান বেগমই বুঝতে পারেন।
২১ বছর বয়সী নূর হাসিনা প্রায় দুই দশক ধরে কথা বলতে বা নড়াচড়া করতে পারেনা। গুরুতর শারীরিক সমস্যার ফলে সে তার কথা বলার ও নড়াচড়া ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।
হাসিনার বয়স যখন তিন বছর, তখন সে প্রাণশক্তিতে ভরপুর ছিলো, বিভিন্ন খাবার নিয়ে সব সময় গল্প করতো। সে আম খেতে ভালোবাসতো। বিষণ্ণতার সাথে শাহজান বেগম এসব দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন।
শাহজান বেগম এখন বেশ সতর্কতার সাথে হাসিনার রুটিন মেনে চলেন; নির্দিষ্ট সময়ে হাসিনাকে সবসময় খাবার দিতে চেষ্টা করেণ তিনি। এছাড়াও যখনই হাসিনা প্লেটের দিকে তাকিয়ে থাকে অথবা প্লেট দেখলে তার চোখের চাহনি উজ্জ্বল হয়ে উঠে তখনি দ্রুত খাবার সামনে হাজির করেন শাহজান বেগম।
শাহাজান বেগম বলেন, “সে কখন ক্ষুধার্ত বা তৃষ্ণার্ত হয় সেটা আমি সবসময় জানি। কারণ আমি তার মা।”
হাসিনার পর্যাপ্ত যত্ন নিশ্চিত করা সবসময় সহজ নয়, বিশেষ করে মাসিকের (ঋতুস্রাবের) সময়। মাসিকের দিনগুলোতে সারাদিনে যেমন অনেক বেশি পরিমাণে কাপড় ধূতে হয় শাহাজানকে, তেমনি হাসিনার শরীর ও মেজাজ থাকে কিছুটা খিটখিটে। শাজাহান জানান, “আমাকে বারবার তার কাপড় ধুতে হয়। আর ওকে বাইরে টয়লেট ব্যবহার করতে নিয়ে যাওয়াটাও আমাদের দুজনের জন্যই কষ্টকড়।”
হাসিনা যেহেতু তার নিজের ক্ষুধা, তৃষ্ণা, অথবা মাসিকের কষ্টের কথা প্রকাশ করতে পারে না, সে কারণে হাসিনার আরও বেশি যত্ন নিতে হয়। শাহজান বেগমের ইচ্ছে হয়, হাসিনার কষ্ট যদি তিনি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারতেন।“হাসিনা যদি তার কষ্টের কথা বলতে পারতো, তাহলে আমি অনেক বেশি শান্তি পেতাম”, তিনি বলেন।
পানীয় জল আনতে যখন অনেক দূরে যেতে হতো
১৭ বছর বয়সী নূর আয়েশার পৃথিবী ছোট ও সহজ হলেও এটি এখন বেশ সমৃদ্ধ।
বড় হয়ে নূর আয়েশা একজন শিক্ষিকা হতে চায়। তার নিজের আশ্রয়কেন্দ্রের (ক্যাম্পের) ছোট শিশুদের পড়ানো, নিজের চেনা সবচেয়ে ভালো ফুলের ছবি আঁকা এবং নিজের বড় বোন নূর হাসিনার সেবা করা তার সবচেয়ে বেশি পছন্দের।
পাঁচ বছর বয়স থেকেই হাসিনার পিঠ বাঁকা ছিল। তখন থেকেই শরীরে একটি ছোট পিণ্ড দেখা দেয় এবং ধীরে ধীরে তার মেরুদণ্ডের আকৃতি পরিবর্তন হতে থাকে। সময়ের সাথে সাথে, তার জন্য ঘুমানো, জিনিসপত্র ওপরে উঠানো, এমনকি পানির মতো অতি সাধারণ জিনিস পান করাও কষ্টসাধ্য হয়ে উঠে।
পরিষ্কার পানীয় জলের পথটি ৩০০ ফুটেরও বেশি লম্বা। রাস্তাটিও বেশ উঁচু-নিচু। এ কারণে, বেশিরভাগ দিনই পানি আনতে যাবার জন্য তাকে অন্য কারো উপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু নূর আয়েশা থেমে যাবার পাত্রী নন। তার চারপাশের পৃথিবী এভাবে সঙ্কুচিত হোক – এটি সে কখনও চায়নি।
আর তারপর, কিছু একটা বদলে গেলো।
আত্মমর্যাদা ও আশায় ভরপুর পৃথিবী
ইউনিসেফ এবং তার অংশীজনদের সহায়তায় একটি ছোট্ট কিন্তু কার্যকরী পরিবর্তন দেখা গেলো।
আশ্রয়কেন্দ্রের ভেতরেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য উপযুক্ত একটি ল্যাট্রিন স্থাপন করা হলো। এতে করে পিচ্ছিল পথ দিয়ে হাসিনাকে আর হাঁটতে কিংবা দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে হয় না। তাদের বাস্তবতা ও প্রয়জনীয়তার কথা মাথায় রেখেই মসৃণ ও ছোট সিঁড়ি, নিরাপদ হাতল ও গোপনীয়তা রক্ষার মতো সুযোগ-সুবিধাসহ নানান ব্যবস্থা চালু করা হলো।
তারপর এলো পানীয় জল
তাদের বাড়ি থেকে মাত্র কয়েক ধাপ দূরে একটি ট্যাপ স্ট্যান্ড স্থাপন করা হয়েছে। ৩০০ ফুট হেঁটে যাওয়ার পরিবর্তে, এখন পানীয় জল আনতে তাদের কেবল একটি হাতল ঘুরাতে হয়। নিরাপদ ঢাকনা সহ তারা দুটি জেরি ক্যানও পেয়েছে। এর ফলে ভালো পানীয় জল ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে তারা। এছাড়াও, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত উপকরণও (হাইজিন কিট) পেয়েছে তারা।
শাহজান বেগমের জন্য এই কিটে কিছু মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনার (ম্যান্সট্রুয়াল হাইজিন ম্যানেজমেন্ট-এমএইচএম কিট) উপকরণ ছিলো। এর মধ্যে পুনঃব্যবহারযোগ্য প্যাড, অন্তর্বাস এবং কাপড় ধোয়ার সাবান ছিলো। মাসিকের সময় হাসিনার সেবার ধরণ বদলে দিয়েছিলো এই উপকরণ। আয়েশাকেও এখন আর কাপড় ধোয়ার কাজ করতে হয় না। পাশাপাশি, তাদের চাহিদা বুঝে স্বাস্থ্যবিধি স্বেচ্ছাসেবক সাজেদা আলম এসব বিষয়ে তাদের বিভিন্ন নির্দেশনা প্রদান করেন। সাজেদা নিয়মিত শাহজান বেগম এবং তার মেয়েদের সাথে দেখা করেন এবং পরিবারটির জন্য অত্যাবশ্যকীয় এসব সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করে চলেছেন তিনি।
দিন দিন - প্রতিদিন
আগে, পরিবারটিকে বেশির ভাগ সময়ই মৌলিক বিষয়গুলি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সাথে লড়াই করতে হত। কিন্তু আজ, ছোট ছোট পছন্দগুলো বেছে নিতে পারে তারা, এ যেন এক নতুন স্বাধীনতা।
কোথাও পড়ে যাওয়ার ভয় ছাড়াই আয়েশা এখন পানি আনতে পারে। বেশ ভালোভাবে ও স্বস্তিতে হাসিনা এখন ঘুমাতে পারে। অনেক বছর পরে প্রথমবারের মতো শাহজান বেগম এখন কাজের ফাঁকে একটু জিরোতে পারে।
পানীয় জল এখন হাতের নাগালে; পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে চলাও এখন সম্ভব। এটি শুধু বিশেষ কোন দিনে নয়, বরং প্রতিদিনই নিশ্চিত করা সম্ভব। আর সেবাযত্নের ভার, যা একসময় নিরবে নিজ কাঁধে বহন করতে হতো কেবল শাহজানকে, এখন তার ভার অনেকটাই কমেছে।
বাংলাদেশে শরণার্থী শিশু ও তাদের পরিবারের কল্যাণে অব্যাহত সহায়তা এবং মূল্যবান অবদানের জন্য জার্মান ফেডারেল পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতি ইউনিসেফ আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে।

