বিশ্ব শিশু দিবস: জলবায়ু সংকট নিয়ে কাজ করতে তরুণ শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণা
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে চারু ও কারুকলা বিষয়ক কর্মশালায় অনুপ্রাণিত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুরা
- বাংলা
- English
বিশ্বজুড়ে যখন বিশ্ব শিশু দিবস উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে, সেসময় ইউনিসেফ তার অংশীজনদের নিয়ে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের শিশুদের জন্য দুই দিনব্যাপী চারু ও কারুকলা বিষয়ক একটি কর্মশালার আয়োজন করে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা তৈরি ও তাদের ক্ষমতায়নের পথে এগিয়ে নিতে এ আয়োজন করা হয়।
কর্মশালাটি পরিচালিত হয় ৯ থেকে ১৫ বছরের শিশুদের জন্য। এর লক্ষ্য ছিল চিত্রকর্মের মাধ্যমে তারা যেন জলবায়ু সংকট নিয়ে নিজেদের ভাবনা, ভীতি ও আশাবাদের জায়গাগুলো তুলে ধরার একটি সুযোগ পায়।
ইউনিসেফের কনসালট্যান্ট ও কর্মশালার প্রশিক্ষক সুহানা বলেন, “আমরা জলবায়ু সংকট নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই শিশুদের ক্ষমতায়নের পথে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। সেজন্য এই সংকট কীভাবে তাদের মতো করে সারা বিশ্বের শিশুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, সে বিষয়ে তাদের নিজেদের উদ্বেগ ও ভাবনা তুলে ধরতে উৎসাহিত করেছি।”
ক্যানভাসে উদ্বেগের প্রকাশ
কর্মশালার প্রথম দিনে জলবায়ু সংকটের নানা দিক সৃজনশীলতার সঙ্গে তুলে আনার বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয়। এই সেশনে অংশগ্রহণকারী শিশুদেরকে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে শিশু হিসেবে তাদের অধিকারগুলো কীভাবে সম্পৃক্ত সে বিষয়ে আলোচনা করা হয়। এক্ষেত্রে অংশগ্রহণমূলক আলোচনা ও অনুশীলন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এর ফলে জটিল বিষয়টি শিশুদের বোধগম্য হয়ে ওঠে এবং তারা নিজেদের উদ্বেগগুলো তুলে ধরতে শুরু করে।
UNICEF Bangladesh/2023/Sujan
আরও অক্সিজেন পাওয়ার জন্য বেশি বেশি গাছ লাগানোর বিষয়ে আমরা কথা বলি। আমরা যদি নদীতে পলিথিন ফেলি তাহলে মাছ অসুস্থ হবে বা মারা যাবে। সে কারণে আমি ব্যবহার কমানো, পুনঃব্যবহার ও পুনঃপ্রক্রিয়া নিয়ে এঁকেছি, যেখানে লোকজন ময়লা-আবর্জনা ফেলতে আবর্জনার পাত্র ব্যবহার করছে এবং গাছ লাগানো হচ্ছে।” –১৩ বছর বয়সী আসোফা
এ বিষয়ে ১৩ বছর বয়সী আসোফা বলে, “কর্মশালার শুরুর আগে, আমরা কিছু অনুশীলন এবং যার যা ইচ্ছা তা আঁকি। আরও অক্সিজেন পাওয়ার জন্য বেশি বেশি গাছ লাগানোর বিষয়ে আমরা কথা বলি। অক্সিজেনের সঙ্গে খাবারও পাওয়ার জন্য আমাদের সবজি, ফলের গাছ লাগানো দরকার। কী খাচ্ছি তা নিয়েও আমাদের চিন্তা করার দরকার আছে। আমরা যদি নদীতে পলিথিন ফেলি তাহলে মাছ অসুস্থ হবে বা মারা যাবে। আমাদের কম কম পলিথিন ব্যবহার করা দরকার। আমাদের যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা উচিত নয়। সে কারণে আমি ব্যবহার কমানো, পুনঃব্যবহার ও পুনঃপ্রক্রিয়া নিয়ে এঁকেছি, যেখানে লোকজন ময়লা-আবর্জনা ফেলতে আবর্জনার পাত্র ব্যবহার করছে এবং গাছ লাগানো হচ্ছে।”
তাদের লোকালয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাব থেকে শুরু করে একটি টেকসই, পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যতের কাল্পনিক চিত্র তুলে ধরে তারা। এখানে পেনসিলের প্রতিটি আঁচড়ে রয়েছে শক্তিশালী সব বক্তব্য।
UNICEF Bangladesh/2023/Sujan
“আমি একটি নিরাপদ গ্রহ এঁকেছি, যেখানে পর্যাপ্ত অক্সিজেন দেওয়ার জন্য প্রচুর গাছপালা রয়েছে। আমার ছবিতে আঁকা দুই হাত থেকে বোঝা যায় যে, এই গ্রহ নিরাপদ।” –১১ বয়সী ইসমা
১১ বছর বয়সী ইসমা বলে, “আমি একটি নিরাপদ গ্রহ এঁকেছি, যেখানে পর্যাপ্ত অক্সিজেন দেওয়ার জন্য প্রচুর গাছপালা রয়েছে। অনেক গাছ থাকায় এই গ্রহ সবুজ। আমার ছবিতে আঁকা দুই হাত থেকে বোঝা যায় যে, এই গ্রহ নিরাপদ। এটার যত্ন নেওয়া আমাদের দায়িত্ব।”
পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে নিজস্ব কাজকর্মে একটি পরিবর্তন আনার অভিন্ন অঙ্গীকার থেকে শিশুরা তাদের শৈল্পিক প্রচেষ্টার প্রতিফলন ঘটানোয় কর্মশালাটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
চিত্র থেকে সমাধান
দ্বিতীয় দিনে শিশুরা তাদের চিত্রকর্মে রঙ দিয়ে সেগুলোকে জীবন্ত করে তোলে। দরদ দিয়ে রঙ করা শিশু শিল্পীদের স্কেচগুলো কর্মশালাটিকে রঙিন এক প্রদর্শনীস্থলে রূপান্তরিত করে। তাদের প্রতিটি রঙের প্রলেপে পরিবেশ রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান ফুটে ওঠে।
UNICEF Bangladesh/2023/Sujan
“আমি দু’টি পৃথিবী এঁকেছি। একটিতে তুলে ধরা হয়েছে, আমরা গাছ কাটছি এবং সেখানে কোন অক্সিজেন নেই। অপর দিকে আমরা যদি গাছ লাগাই এবং আমাদের পরিবেশ সুবজ রাখি তাহলে আমরা বেঁচে থাকতে পারব।” –১৫ বছর বয়সী তৌহিদ
নিজের চিত্রকর্ম নিয়ে ১৫ বছর বয়সী তৌহিদ বলে, “আমি দুটি পৃথিবী এঁকেছি। একটিতে তুলে ধরা হয়েছে, আমরা গাছ কাটছি এবং সেখানে কোনো অক্সিজেন নেই। কোনো গাছ না থাকলে সেখানে তীব্র গরম হবে এবং অক্সিজেন না থাকলে মানুষও বাঁচতে পারবে না। অপর দিকে আমরা যদি গাছ লাগাই এবং আমাদের পরিবেশ সবুজ রাখি তাহলে আমরা বেঁচে থাকতে পারব। পৃথিবীর এক পাশ সবুজ ও ঠাণ্ডা এবং অপর পাশ শুষ্ক ও গরম।”
UNICEF Bangladesh/2023/Sujan
“আমরা যখন পানিতে পলিথিন ও অন্যান্য ময়লা-আবর্জনা ফেলি তখন আমরা সেই পানি দূষিত করি। পানি দূষণে মাছ মারা যেতে পারে। কখনো কখনো মাছ রোগাক্রান্ত হতে পারে এবং আমরা সেই মাছ খায় তাহলে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়বো।” –১১ বছর বয়সী রুম।
১১ বছর বয়সী রুমা বলে, “যখন আমরা পানিতে পলিথিন ও অন্যান্য ময়লা-আবর্জনা ফেলি তখন আমরা সেই পানি দূষিত করি। পানি দূষণে মাছ মারা যেতে পারে। কখনো কখনো মাছ রোগাক্রান্ত হবে এবং আমরা যদি সেই সব মাছ খাই তাহলে আমরাও অসুস্থ হয়ে পড়ব। এখন আমাদের খাওয়ার জন্য কম মাছ আছে। এভাবে জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের ওপর প্রভাব ফেলছে।”
পরিবর্তনের বীজ বপণ
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী শিশুরা তাদের শৈল্পিক দক্ষতার প্রকাশ ঘটানোর উপায় সম্পর্কেই শুধু জেনেছে তা নয়; বরং তারা সম্মিলিতভাবে আমাদের এই ধরণী সুরক্ষায় কার কী করণীয় সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পেয়েছে।
পরিবেশের জন্য কাজ করার মানসিকতা তৈরির মাধ্যমে এই কর্মশালায় একটি প্রজন্মের প্রতিনিধিদের মধ্যে এ বিষয়ক বীজ বপণ করা হল। এর ফলে তারা বুঝতে শিখবে যে, জলবায়ু সংকট শুধু আমাদের ভবিষ্যতের জন্য হুমকি নয়, একটি বাধাও, যেটাকে সবার একসঙ্গে অতিক্রম করতে হবে। চিত্রকর্ম ও শিক্ষার মাধ্যমে এই শিশুরা আমাদের ধরণী ও এর সব মানুষের জন্য একটি টেকসই ভবিষ্যৎ ও সবার জন্য সমান এক পৃথিবী প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় এক ধাপ এগোল।