বাংলাদেশে হাম নিয়ে প্রায়ই যেসব বিষয় জানতে চাওয়া হয়/ বাংলাদেশে হাম নিয়ে প্রায়ই যেসব প্রশ্ন করা হয়

হাম, হামের প্রাদুর্ভাব এবং শিশুদের ওপর এর প্রভাব নিয়ে আপনার জিজ্ঞাসার জবাব দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা

ইউনিসেফ
A child receives measles-rubella vaccine at a vaccination centre in Cox’s Bazar on 5 April 2026. © UNICEF Bangladesh/2026
UNICEF Bangladesh/2026
07 এপ্রিল 2026

বাংলাদেশ হাম একটি পরিচিত রোগ; এটি ভাইরাস সংক্রমণের মাধ্যমে হয়ে থাকে এবং খুব ছোঁয়াচে। হামে আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস কিংবা তারা হাঁচি ও কাশি দিলে বাতাসের মাধ্যমে এটা সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। তবে শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়া থেকে সুরক্ষিত করা এবং এটা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করার কিছু উপায় রয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৬সালের মার্চ পর্যন্ত ৬৭৬ জনের হাম সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং এই রোগে ৩৮টির বেশি শিশু মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য পরস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।

প্রিয় অভিভাবকবৃন্দ, হাম সম্পর্কে আপনারা প্রায়ই যেসব বিষয় জানতে চান তেমন কিছু প্রশ্নের উত্তর আমাদের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আমরা আশা করি, এতে আপনাদের সুবিধা হবে।

“হাম কী?”

হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি।

এটি একটি ভাইরাস জনিত রোগ, যা নাক, গলা ও ফুসফুস (শ্বাসতন্ত্র) সংক্রমিত করে এবং পরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এর উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং সারা শরীরে দাগ যুক্ত ফুসকুড়ি।

হাম শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল করে দেয়, ফলে অন্যান্য রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এটি নিউমোনিয়া, শ্বাসপ্রশ্বাসজনিতও স্নায়ুবিক জটিলতা, ডায়রিয়া, বধিরতা, অন্ধত্ব এবং মস্তিষ্কে ফোলা (এনসেফালাইটিস)-এর মতো গুরুতর অসুস্থতার কারণ হতে পারে, যা প্রাণঘাতীও হতে পারে।

হামযেকোনো বয়সের মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে। তবেএটি পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

“হাম কীভাবে ছড়ায়?”

হাম খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে যখন আক্রান্ত ব্যক্তি শ্বাস নেয়, কাশি দেয় বা হাঁচি দেয়। আক্রান্ত ব্যক্তির শ্লেষ্মা বা লালা কিংবা কফের মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়াতে পারে এবং এটি বাতাসে ও বিভিন্ন পৃষ্ঠে প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। অন্য কেউ যদি এই দূষিত বাতাস শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করে বা দূষিত কিছু স্পর্শ করে পরে চোখ, নাক বা মুখে হাত দেয়, তাহলে সে সংক্রমিত হতে পারে।

হাম অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায়- এটি কোভিড-১৯ ও জলবসন্তের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দ্রুত হারে সংক্রমিত হয়।ভাইরাসটি এতটাই ছোঁয়াচে যে, যদি হাম আক্রান্ত কোনো শিশু একটি শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে, তাহলে সেখানেথাকা টিকা না নেওয়া প্রায় সব শিশুই সংক্রমিত হতে পারে।

হামের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার আগেই একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্যদের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়াতে পারে। এ কারণেই শিশুদেরমধ্যে এটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে- অভিভাবকরা বুঝে ওঠার আগেই তাদের শিশুর কাছ থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে।

 

Symptoms of measles
2026/UNICEF

“শিশুদের মধ্যে হাম রোগের উপসর্গগুলো কী কী? হাম হলে ত্বক কেমন দেখায়?”

সাধারণত ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার ১০ থেকে ১৪দিন পর উপসর্গগুলো দেখা দেয়। হামের সবচেয়ে দৃশ্যমান উপসর্গ হলো ত্বকে ফুসকুড়ি।

হামের প্রাথমিক উপসর্গগুলো অস্পষ্ট হতে পারে এবং সহজেই তা অন্য রোগ বলে ভুল হতে পারে।এই প্রাথমিক লক্ষণগুলো সাধারণত ৪-৭ দিনস্থায়ী হয়। এগুলো হলো:

•             উচ্চ জ্বর

•             কাশি

•             নাক দিয়ে পানিপড়া

•             চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং চোখে ভেজাভাব কিংবা চোখ দিয়ে পানিপড়া

•             গালের ভেতরে ছোট ছোট সাদাদাগ (কপলিক স্পট)

হামের ফুসকুড়ি সাধারণত সংক্রমণের ৭-১৮ দিনের মধ্যে দেখা যায়। এটি লাল রঙের দানাদার ফুসকুড়ি, যা সাধারণত মুখ ও গলা থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এটি প্রায় ৩ দিনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণত ৫-৬ দিন পর মিলিয়ে যায়।

এই ফুসকুড়ি ছোট লাল হালকা দানাদার দাগ হিসেবে শুরু হয়ে বড় বড় ছোপের আকার নিতে পারে। সাধারণত এগুলো চুলকায় না। ফর্সা ত্বকে ফুসকুড়ি গুলো লাল বা বাদামি দেখায়, আর গাঢ় বা শ্যামবর্ন ত্বকে এটি তুলনামূলকভাবে কম স্পষ্ট হতে পারে।

ঢাকার একটি হাসপাতালে হাম আক্রান্ত একটি শিশুর চিকিৎসা চলছে।
UNICEF/UNI971283/Goni ঢাকার একটি হাসপাতালে হাম আক্রান্ত একটি শিশুর চিকিৎসা চলছে।

“শিশুদের জন্য হাম কতটা বিপজ্জনক?”

আপনার শিশুর হাম হলে সে গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। হাম অনেকের ধারণার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। হামে মৃত্যুর বেশিরভাগ ঘটনাই এই রোগ থেকে সৃষ্ট জটিলতার কারণে হয়ে থাকে।

যেসব জটিলতা দেখা দিতে পারে:

  • দৃষ্টিহীনতা
  • এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কে সংক্রমণ, যা ফোলা ও মস্তিষ্কের ক্ষতি ঘটাতে পারে)
  • তীব্র ডায়রিয়া ও এর ফলে পানিশূন্যতা
  • কানের সংক্রমণ বা বধিরতা
  • নিউমোনিয়াসহ গুরুতর শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা

এই ভাইরাস শরীরে আক্রমণ করে এবং প্রাণঘাতী জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং ৩০ বছরের বেশি বয়সী টিকা না নেওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটতে পারে।

যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে- বিশেষ করে যাদের শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন এ নেই বা যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এইচআইভি বা অন্যান্য রোগের কারণে দুর্বল-তাদের এসব জটিলতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

হাম একটি শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল করে দিতে পারে এবং শরীরকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে যখন শরীর নিজেকে সংক্রমণ থেকে কীভাবে রক্ষা করতে হয় সেটাই “ভুলে যায়”, ফলে শিশুর শরীর অন্যান্য সংক্রমণ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে অত্যন্ত অসহায় হয়ে পড়ে।

হাম এবং এর ফলে শিশুদের মধ্যে যে জটিলতাগুলো দেখা দিতে পারে, তা সত্যিই ভীতিকর। তবে এটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। শিশুদের সুরক্ষার সর্বোত্তম উপায় হলো তাদের হামের টিকা দেওয়া।  

ময়মনসিংহে শিশুকে হাম-রুবেলার (এমআরভি) টিকা দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন একজন মা।
UNICEF/UN0468134/Maw ময়মনসিংহে শিশুকে হাম-রুবেলার (এমআরভি) টিকা দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন একজন মা।

“আমার শিশুকে হাম থেকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখব?"

আপনার শিশুকে হাম প্রতিরোধে টিকা দেওয়াই তাকে সংক্রমিত হওয়া এবং অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়ানো থেকে সুরক্ষিত রাখার সর্বোত্তম উপায়।

হামের টিকা খুবই নিরাপদ ও কার্যকর এবং বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদানের অংশ হিসেবে এটা দেওয়া হয়

শিশুকে শুধু হামের টিকা দেওয়া যেতে পারে অথবা মাম্পস ও রুবেলা টিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া যেতে পারে, যা হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা নামে পরিচিত। সম্পূর্ণ সুরক্ষার জন্য শিশুদের এই টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়। অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা সারাজীবনের জন্য হয়ে থাকে।

শিশুর হামের টিকা নেওয়ার সঠিক বয়স দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে।

প্রথম ডোজ:

  • যেসব দেশে হাম বেশি হয়ে থাকে, সেখানে সাধারণত শিশুদের ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। কারণ তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
  • যেসব দেশে হাম তেমন দেখা যায় না, সে সব দেশে শিশুদের সাধারণত ১২ থেকে ১৫ মাস বয়সের মধ্যে প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় ডোজ: 

  • আপনার শিশুকে পরবর্তী সময়ে, সাধারণত ১৫- ২৪ মাস বয়সে টিকার দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে। 

কখন শিশুকে টিকা দেওয়া উচতি, তা বুঝতে আপনি চিকিৎসকের কাছে জাতীয় টিকাদান সূচি সম্পর্কে জানতে পারেন অথবা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্য দেখে নিতে পারেন।

“আমার শিশুর মধ্যে হামের লক্ষণ দেখলে কী করব?” “কোন ওষুধ দিতে হবে?”

হাম সাধারণত জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হওয়ার মাধ্যমে শুরু হয়, যা পরে ফুসকুড়িতে রূপ নেয়। আপনার শিশুর মধ্যে এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান।

এই রোগের চিকিৎসা এবং জটিলতা এড়ানোর জন্য দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এতে সংক্রমণ অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া রোধ করতেও সহায়ক হবে।

চিকিৎসককে দেখানোর আগ পর্যন্ত আপনার শিশুকে বাড়িতে অসুস্থ নয় এমন সদস্যদের থেকে দূরে রাখুন। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যত্ন নিন এবং চিকিৎসা চালিয়ে যান।

হাম নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ দিয়ে নিরাময় করা যায় না। যেসব উপসর্গ দেখা দেবে, সেগুলো উপশমে চিকিৎসা দেওয়া হবে। আর শিশুর শরীর নিজেই সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। 

“হাম আক্রান্ত শিশুর যত্ন কীভাবে নেব?”

আপনার শিশুর যদি হাম হয় এবং চিকিৎসক তাকে বাড়িতে রেখে সুস্থ করার পরামর্শ দেন, তাহলে আপনি নিম্নলিখিতভাবে তার যত্ন নিতে পারেন:

  • পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে সহায়তা করুন: আপনার শিশুকে বেশি করে ঘুমাতে দিন এবং বিশ্রামে রাখুন।
  • শরীর হাইড্রেটেড রাখা (পানিশুন্যতা রোধ করা): শিশুকে পর্যাপ্ত পানি বা তরল পান করতে উৎসাহিত করুন, যাতে পানিশূন্যতা দেখা না দেয়। ডায়রিয়া বা বমির কারণে শরীর থেকে যে তরল কমে যায়, তা পূরণ করতে খাবার স্যালাইন (ওরাল রিহাইড্রেশন সল্ট-ওআরএস) ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা: যদি নিউমোনিয়া বা চোখের সংক্রমণের জন্য ওষুধ দেওয়া হয়, তবে সেগুলো ঠিকভাবে ব্যবহার করুন।
  • বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যাওয়া: যদি আপনি শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান, তা অব্যাহত রাখুন।
  • সুস্থ ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া: পুষ্টিকর খাবার শরীরকে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে।

যদি আপনার শিশু অপুষ্টিতে ভোগে তাহলে তাকে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে চিকিৎসা দিতে হবে। শিশুর উপসর্গ যদি খারাপের দিকে যেতে থাকে, তাহলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ করে যে, হাম আক্রান্ত সকল শিশুকে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ভিটামিন এ-এর দুটি ডোজ দেওয়া উচিত। চিকিৎসক এটা দেবেন। ভিটামিন এ চোখের ক্ষতি, দৃষ্টিহীনতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে এবং শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। বিশেষ করে ২ বছরের কম বয়সী শিশু এবং যেসব এলাকায় অপুষ্টি বেশি, সেখানে ভিটামিন এ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।