“যখন সুযোগ ছিল তখন আমার সন্তানকে টিকা না দেওয়ায় নিজেকে অনেক অপরাধী লাগছে”

ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে অভিভাবকেরা তাদের ভয়, অপরাধ বোধ এবং সন্তানকে টিকা দেওয়ার গুরুত্ব নিয়ে বললেন।

স্তুতি শর্মা
9-month-old Jaifa with her parents Omar Farook and Yasmin at the Infectious Disease Hospital
UNICEF/UNI987715/Mukut
06 মে 2026

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সারাদেশে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে এবং এটা খুবই উদ্বেগজনক। হাজার হাজার শিশু গুরুতর ঝুঁকিতে পড়েছে, বিশেষ করে ছোট ও সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় থাকা শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। হাম সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি একটি কঠিন বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে- এখনও

অনেক শিশু জীবনরক্ষাকারী টিকা পায়নি, ফলে তারা প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

হাসপাতালগুলোর চাপ বেড়েছে বহুগুণ। হাম ওয়ার্ডগুলোর ধারণক্ষমতার চেয়ে রোগীর সংখ্যা বেশি। সন্তানকে ভর্তি করানোর আশায় অভিভাবকেরা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে বেড়াচ্ছেন। এদিকে চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতালের কর্মীরা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন পরিস্থিতি সামাল দিতে।

এই মাসে আমরা ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হাম আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের কথায় ফুটে উঠেছে ভয় ও আশার অদ্ভূদ এক মিশ্রণ।

1-year-old Anaiza was admitted to DNCC Hospital
UNICEF/UNI974935/Mukut শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়ার পর এক বছর বয়সী আনাইজাকে ডিএনসিসি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সে গত বছর তার হাম-রুবেলা টিকা পায়নি।

“সময়মতো সন্তানকে টিকা না দিয়ে আমরা ভুল করেছি, আর এখন বাচ্চাটা আমার কত কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দয়া করে আপনারা এমন ভুল করবেন না। আপনার সন্তানকে এখনই হামের টিকা দিন,” বলেন আনাইজার মা সুমা।

আনাইজার বয়স মাত্র এক বছর। আনাইজার একসাথে অনেক জ্বর, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে, তার বাবা-মা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসে। তাকে চার দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। এই দম্পতির নয় বছরের একটি ছেলেও আছে তবে তার হাম হয়নি; তাকে ছোটবেলাতেই হামের টিকা দেওয়া হয়েছিলো।

আইসিইউ থেকে বের করে আনাইজাকে সাধারণ হাম ওয়ার্ডে রাখা হয়। তার সামনের বেডের শিশুটি মারা গেছে। খবরটা শুনে মায়ের মন ঘাবড়ে উঠে।

আমরা যেদিন পরিবারটির সঙ্গে দেখা করলাম, সে সময় আনাইজা সুস্থ হয়ে উঠছিল। এই প্রথম সুমা ও তার স্বামী আলামিন কিছুটা আশা ফিরে পেল।

সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় ২০২৫ সালে পরিচালিত হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির বিষয়ে এই বাবা-মা জানতেন কিন্তু আনাইজা অসুস্থ থাকায় সে সময় তাকে এই টিকা দেওয়া হয়নি। সেই সিদ্ধান্তের জন্য এখন তারা বেশ অনুতাপ করছেন।

জাতীয়ভাবে পরিচালিত ইপিআই-এর আওতায় এই প্রাণঘাতী রোগ থেকে সুরক্ষিত করার জন্য শিশুদের নয় মাস ও ১৫ মাস বয়সে এক ডোজ করে মোট দুই ডোজ হাম-রুবেলার (এমআর) টিকা দেওয়া হয়। ইপিআই-এর এসব টিকা কেনায় সহায়তা করে ইউনিসেফ এবং এই টিকা বিনামূল্যে শিশুদের দেওয়া হয়।

7-month-old Raizan’s mother coaxes him in the measles ward at DNCC Hospital
UNICEF/UNI974934/Mukut ডিএনসিসি হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে ৭ মাস বয়সী রাইজানকে কোলে নিয়ে আছেন তার মা। এই হাসপাতালে হাম সংক্রমণ থেকে দেখা দেওয়া জটিলতার চিকিৎসা নিচ্ছে শিশুটি।

“আমি সব মাকে বলতে চাই, সময়মতো সন্তানকে টিকা দিন। এতদিন পর আজকে আমার হালকা লাগছে, কারণ আজ আমার সন্তান হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরছে,” বলেন রাইজানের মা রাজিয়া।

পাঁচ দিন আগে ১০৫ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে সাত মাস বয়সী রাইজানকে ডিএনসিসি’র কোভিড-১৯ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠে এবং আমাদের যেদিন দেখা হয় সেদিন রাইজানকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। রাইজানের টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন রাজিয়া।

20-month-old Abdur was admitted to the DNCC Hospital in Dhaka
UNICEF/UNI974940/Mukut পরীক্ষায় হাম ধরা পড়ার পর ডিএনসিসি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ২০ মাস বয়সী আব্দুরকে। কয়েকদিন ধরে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন এই শিশুকে নিয়ে তার মা উদ্বিগ্ন।

“সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সন্তানকে টিকা না দেওয়ার জন্য আমি ভীষণ অপরাধবোধে ভুগছি। আমি চাই না কোনো মা-বাবাকে কখনও এই অনুভূতি বয়ে বেড়াতে হোক,” বলেন আব্দুরের মা আয়েশা। তিনি আরও বলেন, “আমি শুধু অপেক্ষা করছি, সে যেন একবার চোখ খুলে আমার দিকে তাকায়। এতেই আমি স্বস্তি পাব।”

আয়েশা কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসেছেন। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরে অবশেষে ডিএনসিসি হাসপাতালে ছেলেকে ভর্তি করিয়েছেন। ২০ মাস বয়সী

আব্দুর রহমানের তিন দিন ধরে ডায়রিয়া, কাশি, ভীষণ জ্বর, শরীরে ফুসকুড়ি এবং চোখে তীব্র ফোলাভাব রয়েছে। হামের সঙ্গে তার নিউমোনিয়াও ধরা পড়েছে।

বিদেশে কর্মরত তার বাবা বারবার ফোন করছেন। কথা বলতে গেলেই, কান্নায় তার গ্লা ভারি হিওয়ে উঠছে। ছেলেকে নিয়ে কোনো ভালো খবরের অপেক্ষায় আছেন তিনি। সম্প্রতি তিনি টেলিভিশনে জরুরি হাম টিকাদান কার্যক্রমের খবর দেখেছেন। কর্যক্রম শুরু হলেই আব্দুরকে টিকা দেয়া হবে বলে জানান তারা।

9-month-old Siam from Mirpur was diagnosed with pneumonia
UNICEF/UNI974933/Mukut রাজধানীর মিরপুরের ৯ মাস বয়সী সিয়ামের নিউমোনিয়া ধরা পড়েছে। গায়ে দেখা দিয়েছে ফুসকুড়ি। চিকিৎসা করানোর জন্য মা তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন।

“এই মুহূর্তে আমার কেমন লাগছে, তা কেবল একজন মা-ই বুঝতে পারবেন। আমি শুধু চাই, আমার সন্তান সুস্থ হয়ে উঠুক। প্রয়োজন হলে আমি তাকে আরও ১০টি হাসপাতালে নিয়ে যাব। তার জন্য আমি সব কিছু করতে পারি,” বলেন সিয়ামের মা জান্নাত।

যখন ৯ মাস বয়সী সিয়ামের শরীরে প্রথমে ফুসকুড়ি দেখা দেয়, তখন তার পরিবার ভেবেছিল এটি অ্যালার্জি। কিন্তু ধীরে ধীরে তার অবস্থার অবনতি হতে থাকে। বেশ কয়েকটি হাসপাতালে ঘোরার পর তার মা জান্নাত অবশেষে ডিএনসিসি হাসপাতালে তার জন্য একটি শয্যার ব্যবস্থা করতে পারেন। সেখানে পরীক্ষায় তার হাম ও নিউমোনিয়া ধরা পড়ে।

জান্নাত এখন ছেলের সুস্থ হয়ে ওঠার দিন গুনছেন। তিনি জানান, এখন তার ছেলের টিকা নেওয়ার জন্য উপযুক্ত বয়স হয়েছে। দ্রুতই তিনি তাকে টিকা দিতে যাবেন।

9-month-old Abdur was admitted to the measles ward at DNCC Hospital
UNICEF/UNI974932/Mukut ৯ মাস বয়সী আব্দুর জ্বর, মুখে ফুসকুড়ি ও কাশি নিয়ে এপ্রিলে ডিএনসিসি হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে। তার হাম ও নিউমোনিয়া ধরা পড়েছে।

“আপনি যদি ছেলের শরীরে কোনো ফুসকুড়ি দেখেন তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন। দ্বিতীয়বার ভাববেন না। হাসপাতালে নিয়ে যাবেন,” বলেন আব্দুরের মা শারমিন।

৯ মাস বয়সী আব্দুর জ্বর, মুখে ফুসকুড়ি ও টানা কাশি নিয়ে ছয় দিন আগে হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে। তার পরিবার শুরুতে যেটাকে অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া বলে মনে করেছিল, সেটিই আসলে হামের ফুসকুড়ি ছিল। শারমিনের বোন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, তিনি দ্রুত ছেলের চিকিৎসা করানোর জন্য

শারমিনকে পরামর্শ দেন। সেই পরামর্শই আব্দুরের জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তারও হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া শনাক্ত হয়েছে।

9-month-old Jaifa with her father Omar Farook
UNICEF/UNI982018/Mukut সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বাবা ওমর ফারুকের কোলে ৯ মাস বয়সী জাইফা।

“দয়া করে আপনার সন্তানকে টিকা দিন। কখন হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি চলে, সেটা না জানলে অন্যদের জিজ্ঞেস করুন, খবর দেখুন, খুঁজে বের করুন,” বলেন জাইফার বাবা ওমর ফারুক। আর জাইফার মা ইয়াসমিন বলেন, “যে শিশুরা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না, তাদের নিয়ে আমার খুব চিন্তা হচ্ছে।”

ওমর ও ইয়াসমিন দম্পতির বাসা কেরানীগঞ্জে। ছেলেকে নিয়ে বেশ কয়েকটি হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি করাতে না পেরে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আসেন তারা। এখানকার হাম ওয়ার্ডে রোগীর সংখ্যা ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি। তাই প্রচণ্ড গরমের

মধ্যে কোনো ফ্যান ছাড়াই হাসপাতালের বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে সেখানে ৯ মাস বয়সী জাইফাকে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

জাইফার বাবা-মা টিকা দিতে চায়নি এমন নয়। কখন টিকা দেওয়া হয়, সেটা তারা জানতেন না।

ওমর ফারুক বলেন, “ঢাকায় অনেক তথ্য আপনার কাছে চলে আসে। কিন্তু গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে বসবাসরত বাবা-মায়েরা জানবেন কীভাবে? তাদেরও জানা দরকার। দেশজুড়ে চলমান হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির প্রচারে আরও কিছু করা দরকার।”

আমরা যখন ওমরের পাশে বসেছিলাম তখন তিনি প্রথমেই পরবর্তী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির তারিখ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। যখন তিনি জানতে পারেন এটি ২০ এপ্রিল ২০২৬ থেকে শুরু হয়েছে, তখন তিনি তা মনে রাখার জন্য নোট করে রাখেন। ওমর ও ইয়াসমিন জাইফাকে টিকা দেবেন বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

সেদিন তাদের জন্য কিছুটা ভালো খবর ছিল। জাইফাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছিল। ভয় নিয়ে ও বিপর্যস্ত হয়ে যে পরিবার হাসপাতালে এসেছিল, তারাই হাসিমুখে আমাদের বিদায় জানালো।

টিকা কাজ করে। টিকা প্রাণঘাতী কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য রোগ ও এর জটিলতা থেকে শিশুদের সুরক্ষা দেয়। সময়মতো টিকা দেওয়া হলে তা জীবন রক্ষা করে।

হাম অত্যন্ত সংক্রামক এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যেসব শিশু টিকা পায়নি এবং যেসব শিশুর এখনও টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

এমন একটি প্রাদুর্ভাবের পরিস্থিতিতে সময়মতো না নেওয়া যে কোনো টিকার একটি ডোজই বড় দুর্ঘটনার কারন হতে পারে।

টিকা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে অবশ্যই একজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন এবং শুধু নির্ভরযোগ্য উৎসের তথ্যের ওপর ভরসা করুন। গুজব বা ভুল তথ্য যেন আপনার সন্তানের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে না ফেলে।

২০২৬ সালের ৫ এপ্রিল ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় প্রাথমিক জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চলে। এরপর বাংলাদেশ সরকার ২০ এপ্রিল থেকে এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। এই কর্মসূচি উপজেলা ও পৌর পর্যায়ে ১০ মে পর্যন্ত চলবে এবং বাকি আটটি সিটি কর্পোরেশনে এটি ২০ মে পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

প্রতিটি শিশু, বিশেষ করে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা যাতে টিকা পায়, সেজন্য বাংলাদেশ সরকার, গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য অংশীজনদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছে ইউনিসেফ।

হামে যারা প্রিয় সন্তানকে হারিয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে ইউনিসেফ।