তুই আমার প্রাণের বন্ধু

আজ জানবো দুই বন্ধুর গল্প; আইনের সাথে সংঘাতে জড়িত দুই শিশুর অম্লান এক বন্ধুত্ব

স্তুতি শর্মা
12-year-old Abrar strikes the Superman pose.
UNICEF/UNI912636/Rasnat
07 জুন 2026

"ছুটাছুটি করে হাঁপিয়ে গেছিস? সুপারম্যান তো কখনো ক্লান্ত হয় না!" পাশ থেকে একজন হেসে রসিকতা করল।

"সুপারম্যান ক্লান্ত হবে কেন? ও তো উড়তে পারে!" চটপট উত্তর দিল আবরার।

Abrar* and Riyad* are 12.

Tওরা দুজন দুজনার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। একজন আরেকজনকে ছাড়া যেন কিছুই বোঝে না। সব কাজ ওরা একসাথেই করে।

স্কুলে যাওয়ার সময় হলে রিয়াদ নিজে গিয়ে আবরারকে বাসা থেকে ডেকে নেয়, তারপর দুজনে একসাথে রওনা দেয়।আবরার যখন তার প্রিয় কবিতা 'আমার পণ' আবৃত্তি করে, রিয়াদ পাশে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে শোনে।

রিয়াদের যখন পাঞ্জা লড়ার শখ হয়, আবরার সাথে সাথে এক হাত পেছনে দিয়ে আরেক হাত সামনে এগিয়ে দেয়।

আর আবরার যখন সুপারম্যানের মতো পোজ দেয়, তখন রিয়াদ পরম যত্নে তার গলার পেছনে গামছাটা খুব ভালোভাবে বেঁধে দেয়। 

12-year-old Riyad helps Abrar tie a cape around his neck to complete his “Superman pose”.
UNICEF/UNI908534/Rasnat আর আবরার যখন সুপারম্যানের মতো পোজ দেয়, তখন রিয়াদ পরম যত্নে তার গলার পেছনে গামছাটা খুব ভালোভাবে বেঁধে দেয়।

'আমার পণ' কবিতাটি বাংলাদেশের তৃতীয় শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ের অংশ। আবরার পড়ে তৃতীয় শ্রেণীতে, আর রিয়াদ পড়ে প্রথম শ্রেণীতে। আবরারের মুখে শুনতে শুনতে রিয়াদেরও এখন কবিতার বেশ কিছু অংশ মুখস্থ হয়ে গেছে।

12-year-old Abrar reading his favourite poem Amar Pon from his textbook
UNICEF/UNI908510/Rasnat ১২ বছরের আবরার তার পাঠ্যবই থেকে প্রিয় কবিতা 'আমার পণ' পড়ছে।

কবিতাটি হলো একটি শিশুর ভালো, সৎ, নিয়মানুবর্তী এবং শ্রদ্ধাশীল হওয়ার প্রতিজ্ঞার গল্প। যেখানে বড়দের কথা মেনে চলা, পারস্পরিক সম্পর্ককে ভালোবাসায় আগলে রাখা, মন দিয়ে পড়াশোনা করা এবং সবার সাথে মিলেমিশে থাকার কথা বলা হয়েছে।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে আবরার আর রিয়াদের জীবনটা হুট করেই ওলটপালট হয়ে যায়।

স্থানীয় থানা থেকে প্রবেশন অফিসারকে জানানো হয় যে, ছোটখাটো চুরির অপরাধে দুটি শিশুকে আটকে রাখা হয়েছে। খবর পেয়ে শিশু সুরক্ষা কর্মীরা দেরি না করে ছুটে যান থানায়।

“আমরা যখন থানায় পৌঁছালাম, বাচ্চা দুটো খুব ভয়ে ছিল," বলছিলেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের সমাজকর্মী আবদুল হাসনাত। "আমি প্রথমেই ওদের আশ্বস্ত করলাম যে ওরা এখানে নিরাপদ। ওদের বোঝালাম যে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।”

Iবাংলাদেশে অপরাধের জন্য আইনি দায়বদ্ধতার সর্বনিম্ন বয়স হলো ৯ বছর। এর মানে হলো, ৯ বছরের কম বয়সী শিশুদের দ্বারা সংঘটিত যেকোনো কাজ সম্পূর্ণভাবে অপরাধমুক্ত; আর ৯ বছর বয়সী কোনো শিশু যদি অপরাধ করে, তাকে দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার মুখোমুখি করা সম্ভব। আবরার ও রিয়াদ, দুজনেরই বয়স ১২ বছর। তবে, জাতিসংঘ শিশু অধিকার কমিটির আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এই বয়সটি হওয়া উচিত অন্তত ১৪ বছর। কারণ এত কম বয়সে শিশুদের অপরাধী হিসেবে গণ্য না করে, তাদের সংশোধনের জন্য বিকল্প ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া জরুরি। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী প্রাথমিক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ  রয়েছে।

"আমরা অভিভাবকদেরও সাহস দিচ্ছিলাম," হাসনাত বলেন। "আমরা চাচ্ছিলাম ওনারা যেন বোঝেন যে, এই পরিস্থিতি ভয় বা উৎকণ্ঠা দিয়ে নয়, বরং ঠান্ডা মাথায় আদর, ভালোবাসা ও ধৈর্য দিয়ে সামলানো সম্ভব।

থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং শিশু বিষয়ক পুলিশ অফিসারের সাথে আলোচনার পর সবাই একমত হন যে, এই শিশুদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আইনি ব্যবস্থা নিলে তাদের কোনো লাভ হবে না। শিশু আইন ২০১৩-এর ৪৭ ধারা অনুযায়ী, আবরার ও রিয়াদকে সতর্ক করে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।আইন মোতাবেক এটাই ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত।

Social worker Abdul Hasanat is talking to Abrar. With time, he has been able to build trust with the children and meets their family regularly for counselling.
UNICEF/UNI908529/Rasnat সমাজকর্মী আবদুল হাসনাত আবরারের সাথে কথা বলছেন। সময়ের সাথে সাথে তিনি এই শিশুদের বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছেন এবং নিয়মিত তাদের পরিবারকে পরামর্শ ও মানসিক সমর্থন দিতে তাদের বাড়ি যান।

Bকিন্তু বাড়ি ফেরার পর আবরার আর রিয়াদের জীবনটা অত সহজ ছিল না। চারপাশের মানুষের কানাঘুষা আর ফিসফিসানি ওদের তাড়া করে বেড়াত। অন্য বন্ধুদের বলে দেওয়া হয়েছিল ওদের থেকে দূরে থাকতে।

সমাজের এই 'কলঙ্ক' বা অপবাদ ঘুচানো একটা বাচ্চার জন্য মূল ঘটনার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে দাঁড়ায়।

"একটা শিশু নিজে থেকে বদলাতে চাইলেও, চারপাশের পরিবেশ হয়তো তাকে সেই সুযোগ দিতে চায় না। কিন্তু আমরা সমাজকে বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, যেন সবাই ওদের আর দশটা শিশুর মতনই দেখে," বলেন হাসনাত।

এখানে মনে রাখা দরকার, থানায় আটকে পড়া সব শিশুর পাশে দাঁড়ানোর জন্য কিন্তু এমন সমাজকর্মী থাকে না। আবরার আর রিয়াদের ভাগ্য তাদের সহায় ছিল তখন, জীবনে তারা দ্বিতীয় সুযোগ পেয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং ইউনিসেফের সহায়তায় তাদের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়। হাসনাত নিয়মিত ওদের সাথে দেখা করে  সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলিং ও পরিবারের সাথে দূরত্ব কমাতে কাজ করতে থাকেন। পাশাপাশি কিছু আর্থিক সহায়তা পাওয়ায় পরিবার দুটির ওপর থেকেও চাপ কিছুটা কমে।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৪০,০০০ শিশুর মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে, যার বেশির ভাগই খুব ছোটখাটো অপরাধ। অথচ পুরো দেশে প্রবেশন অফিসার আছেন মাত্র ৭০ জন! প্রশিক্ষিত সমাজকর্মীর এই তীব্র সংকটের কারণে, থানায় বিপদে পড়া অধিকাংশ শিশুই তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো মানুষ পায় না।

A paper plane made by Riyad.
UNICEF/UNI908507/Rasnat রিয়াদের বানানো একটি কাগজের প্লেন।

তবে আবরার আর রিয়াদের বন্ধুত্ব দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। এখন তারা নিয়মিত স্কুলে যায়, মন ভরে খেলে, প্রাণ খুলে হাসে। কোনো কোনো দিন দুজনে একসাথে বসে কাগজের প্লেন বানায়। একজনের প্লেন অন্যজনের চেয়ে দূরে গেলে কে জিতল তা নিয়ে আবার ছোটখাটো ঝগড়া হয়ে যায়। আবার কোনো কোনো দিন ওদের খেলার ছলে পাড়ার চেনা রাস্তাগুলোই হয়ে ওঠে এক কাল্পনিক শহর, যাকে শত্রুদের হাত থেকে বাঁচাতে এই দুই বন্ধু নির্ভীক 'সুপারহিরো' সেজে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

হাসনাত এখনো নিয়মিত ওদের বাড়ি যান। যখনই প্রয়োজন হয়, ওদের সঠিক পথ দেখান আর সাহস যোগান।

আপাতত, এই বয়সে ওদের যা করার কথা, ওরা ঠিক সেটাই করছে—খেলাধুলা, কল্পনা, পড়াশোনা আর মনের আনন্দে স্রেফ শিশু হয়ে বেঁচে থাকা।

(গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে শিশুদের আসল নাম পরিবর্তন করা হয়েছে)

Embedded video follows
UNICEF