নতুন সূচনায় সাহস সঞ্চার

গাজীপুরের গার্মেন্টস (পোশাক কারখানা) এলাকায় দীর্ঘ কর্মঘণ্টা আর মানুষের কড়া সমালোচনার মাঝে ‘একা’ মায়েদের (সিঙ্গেল মাদার) সংগ্রামটা বেশ চ্যালেঞ্জিং। সেখানে 'জিনা ট্রিকো' (Gina Tricot)-এর সহায়তায় ইউনিসেফ পিঙ্কির মতো মায়েদের পাশে দাঁড়িয়েছে

আকিব সাফওয়ান জাসের
Pinky Akhter embraced her son five-year-old son Muhammad
UNICEF/Bangladesh/2026/Rasnat
01 মার্চ 2026

গাজীপুর, বাংলাদেশ – পিঙ্কির প্রতিটা সকাল যেন শুরু হয় একরাশ চাপ আর তাড়াহুড়ো নিয়ে।রাস্তায় হকারদের হাঁকডাক, দোকানের শাটার খোলার ঘড়ঘড় শব্দ, পিচঢালা রাস্তায় মানুষের দ্রুত পায়ের আওয়াজ- চারপাশের এই হট্টগোলের শব্দেই তার ঘুম ভাঙে প্রতিদিন। চারপাশটা তখনও পুরোপুরি ফর্সা হয়নি; আকাশটাও কেমন যেন ফ্যাকাসে। বাতাসে হালকা ধুলো উড়ছে, ভেসে বেড়াচ্ছে কিছু একটার আবছা গন্ধ - গাড়ির ধোঁয়ার গন্ধ, আর পাশের ঘরে নিশ্চই চুলোয় ভাত চড়ানো হয়ে গেছে।

মাত্র ষোলো বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল পিঙ্কির। বিয়ের পর স্বামীর সাথে তিনিও একটি পোশাক কারখানায় যোগ দেন। কারখানায় চারপাশে কেবল কাপড়, সুতো আর মেশিনের শব্দে ভরা গরম বাতাস; সঙ্গে প্রোডাকশনের টার্গেট পূরণের চিন্তায় দ্রুত হাত চালানোর একটানা ব্যস্ততা। এভাবেই চলছে দিনগুলো। প্রতি মাসে নিজের বেতন থেকে অল্প অল্প করে টাকা জমানো শুরু করল পিঙ্কি। যত্নে ভাঁজ করে রাখা সেই ছোট ছোট নোটগুলো জমানোর পেছনে তার কেবল একটাই উদ্দেশ্য —তার পরিবারের ভবিষ্যৎ, পরিবারের খুশি।

কিন্তু সব পরিকল্পনা সবসময় সফল হয়না।

তার স্বামীর চাকরিটা নিয়মিত ছিল না, মাঝেমধ্যেই তিনি বেকার হয়ে পড়তেন। ফলে সংসারে ধীরে ধীরে আর্থিক টানাপোড়েন বাড়তে থাকে। অল্প অল্প করে সংসারের পুরো দায়-দায়িত্ব পিঙ্কির কাঁধে এসে পড়ে। যে দায়িত্বের বোঝাটা একসময় দুজনের ভাগ করে নেওয়ার কথা ছিল, তা এখন শুধুই পিঙ্কির একার।

 

একমাত্র সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে মায়ের লড়াই

Five-year-old Muhammad during playtime at the UNICEF-supported Surabari Day-care Center
UNICEF/Bangladesh/2026/Rasnat ইউনিসেফ-সমর্থিত সুরাবাড়ি দিবাযত্ন কেন্দ্রে খেলার ছলে অক্ষর শিখছে পাঁচ বছরের মুহাম্মদ।

বিয়ের সাড়ে চার বছর পর পিঙ্কি সন্তানের কথা ভাবতে শুরু করেন। তিনি আশা করেছিলেন, বাবা হওয়ার দায়িত্ব হয়তো পরিস্থিতিকে কিছুটা বদলে দেবে।

এরপর তার ছেলের জন্ম হয়।

পিঙ্কি ছেলের নাম রাখলেন মুহাম্মদ।

মুহাম্মদের ছোট্ট ছোট্ট নিঃশ্বাস, আধো আধো বুলি, হাসির খিল খিল শব্দ, মুহুর্তেই পিঙ্কির সব ক্লান্তি, গ্লানি, কষ্ট দূর করে দিতো। কিন্তু সামনে যে কঠিন দীর্ঘ পথ।

মুহাম্মদের বয়স যখন তিন বছর, পিঙ্কি সিদ্ধান্ত নিলেন বিচ্ছেদের। সিদ্ধান্তটি কঠিন হলেও পিঙ্কি ও তার ছেলের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য ছিলো উপযুক্ত।

মানুষের কড়া সমালোচনার মাঝেও এগিয়ে চলা

Pinky Akhter and her son Muhammad at the UNICEF-supported Surabari Day-care Center.
UNICEF/Bangladesh/2026/Rasnat ইউনিসেফ-সমর্থিত সুরাবাড়ি দিবাযত্ন কেন্দ্রে পিঙ্কি আক্তার ও তাঁর ছেলে মুহাম্মদ।

ছেলে মুহাম্মদকে নিয়ে পিঙ্কির এখন ছোট্ট সংসার। পিঙ্কির বেঁচে থাকার সংগ্রাম এখনও চলমান।প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করেন তিনি। দিনের বেলা মুহাম্মদের নানি ওকে দেখাশোনা করেন। পিঙ্কির মায়ের কোমরে সমস্যা-হাঁটাচলা করতে তার বেশ অসুবিধে হয়। তা সত্ত্বেও তিনি মুহাম্মদের যথাসম্ভব যত্ন নেবার চেষ্টা করেন, খাইয়ে দেন, গোসল করিয়ে দেন এবং যাতে মায়ের জন্য মন খারাপ না করে সেজন্য নানানভাবে নাতিকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করেন।

কিন্তু মুহাম্মদকে নিয়ে পিঙ্কির দুশ্চিন্তা সবসময় লেগেই থাকতো যা তার কাজেও মাঝে মধ্যে ব্যাঘাত ঘটাতো। আশেপাশের মানুষজনও তার দিকে কেমন এক কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকাত। পিঙ্কি তাদের সাথে কখনো কোন তর্কে জড়াতো না, না কখনও কোনো সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করতো।

মাস গেলেই ঘরের ভাড়া দেওয়া, সন্তানের জন্য খাবারের জোগাড় করার চিন্তা পিঙ্কির মাথায় ঘুরপাক খায় সবসময়; আর অন্যদিকে এসবের জোগান দিতে গিয়ে তিনি যখন সারাদিন কাজে বাইরে, তখন আদৌ তার মুহাম্মদ ঠিকমতন খাচ্ছে কিনা, খেলতে গিয়ে পড়ে গেলো কিনা, বয়স্ক নানীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বাড়ির বাইরে একা চলে গেলো কিনা আর তার আসুস্থ মা’ই বা ঠিকমতন মুহাম্মদের আর নিজের খেয়াল রাখতে পারছেন কিনা তা নিয়ে সবসময় উদ্বিগ্ন থাকতেন পিঙ্কি।

সুরাবাড়ি: যেখানে শৈশব নিরাপদ

ঠিক তখনই তিনি ইউনিসেফ-সমর্থিত 'সুরাবাড়ি দিবাযত্ন কেন্দ্র’-এর খোঁজ পান।

শুরুতে তিনি খুব বেশি আশাবাদী ছিলেন না। তার শুধু এমন একটা জায়গা দরকার ছিল যেখানে মুহাম্মদকে অন্তত কেউ দেখে রাখবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি সম্পূর্ণ অন্য এক পরিবেশ দেখতে পেলেন। শিশুদের কলকাকলিতে ভরা একটা ঘর, সুশৃঙ্খল নিয়মকানুন, মজার সব কর্মকাণ্ড চলছে সেখানে আর শিক্ষিকারা অত্যন্ত ধৈর্য ও ভালোবাসার সাথে শিশুদের সাথে কথা বলছেন!

এই যত্ন আর মনোযোগ দেখেই পিঙ্কি এতদিন পর প্রথমবারের মতো অনুভব করলেন যে, মা হিসেবে এই লড়াইয়ে তিনি একা নন।

মুহাম্মদ সেখানে নতুন সব জিনিস শিখতে শুরু করল, এগুলো যে এত সহজ ও সুন্দর উপায়েও শেখানো সম্ভব তা পিঙ্কি ভাবতেও পারেননি। সে নিজের নাম, ঠিকানা এবং বাবা-মায়ের নাম বলতে শিখল। মানুষের সাথে সালাম বা শুভেচ্ছা বিনিময় করা এবং পেনসিল ধরাও শিখে গেলো।

এমনকি আগে খাওয়া-দাওয়া নিয়ে ছেলে তার যেসব বাহানা করত, এখন তাও অনেকটা কমে গেছে। ওর মেজাজ আগের মতন আর খিটখিটে থাকে না এখন; মনে হয় যেন নিয়মিত যত্ন ও ভালোবাসা ওর ভেতরের সব ক্লান্তি ও জেদ দূর করে দিয়েছে। আগে ও পড়তে বসতে চাইত না, আর এখন সকালে সুরাবাড়িতে যাওয়ার জন্য ছটফট করে।

কিছুদিন আগে একবার মুহাম্মদ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, তখন সুরাবাড়ির আপারাই ওর সব দেখভাল করেছিলেন। এই দিবাযত্ন কেন্দ্রে এসে ও এমন এক নিরাপত্তার ছোঁয়া পেয়েছে, যা ওর ছোট্ট মনকে শান্ত করে দিয়েছে, ভরসা দিয়েছে। ছেলেটা বেশ যত্ন ও আদরে বড় হচ্ছে; আর এই সুন্দর পরিবেশের কারণে ও এখন চারপাশের  মানুষ, এমনকি নিজের ওপরও বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।

পিঙ্কির জন্য এই সবকিছুর মানে হলো, নিজের সন্তান ভালো হাতে আছে জেনে এখন তিনি নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারেন।

অনেকদিন পর পিঙ্কি মানসিক শান্তি ফিরে পেয়েছে, খুঁজে পেয়েছে স্বস্তি।

মায়ের নীরব প্রার্থনা

"আমার এতটুকুই চাওয়া- ও বড় হয়ে যেন আমাকে কখনও ভুল না বুঝে।"

In their home, Pinky Akhter sits beside Muhammad as he goes through his lessons, trying to keep his education on track despite uncertainty.
UNICEF/Bangladesh/2026/Rasnat নিজের ঘরে পিঙ্কি আক্তার ছেলের পাশে বসে আছেন, আর মুহাম্মদ পড়াশোনা করছে। অনিশ্চয়তার মাঝেও ছেলের পড়াশোনা সচল রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

নিজের ঘরে পিঙ্কি আক্তার ছেলের পাশে বসে আছেন, আর মুহাম্মদ পড়াশোনা করছে। অনিশ্চয়তার মাঝেও ছেলের পড়াশোনা সচল রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। © ইউনিসেফ/বাংলাদেশ/২০২৬/রাসনাত

বর্তমানে পিঙ্কি গাজীপুরের একটি নামকরা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির প্রোডাকশন ইউনিটে কাজ করেন। সাধারণত সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত তার কাজ থাকে। পিঙ্কি কাজে খুবই মনোযোগী। তার কাজ নিয়ে তার সুপারভাইজারও বেশ খুশি।

তার বাসা এবং দিবাযত্ন কেন্দ্রটি কাছাকাছি হওয়ায় পিঙ্কির দুশ্চিন্তা আরও অনেক কমে গেছে। এখন তিনি কারখানায় পুরো মন দিয়ে কাজ করতে পারেন।

মুহাম্মদের ভবিষ্যতের কথা জিজ্ঞেস করা হলে, পিঙ্কি কখনই বড় কোনো স্বপ্নের কথা বলেন না। বরং তিনি চান তার ছেলে যেন "একজন ভালো মানুষ" হয়ে বড় হয়। "আমার এতটুকুই চাওয়া- ও বড় হয়ে যেন আমাকে কখনও ভুল না বুঝে; আমি যা কিছু করেছি, শুধু ওর জন্যই করেছি," আস্তে করে বলে পিঙ্কি।

সংগ্রামী মায়েদের পাশে,

যেন শিশুরা সুন্দর পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে

At the UNICEF-supported Surabari Day Care Center, learning begins with small moments, names, colours, and confidence.
UNICEF/Bangladesh/2026/Rasnat ইউনিসেফ-সমর্থিত সুরাবাড়ি দিবাযত্ন কেন্দ্রে শিশুরা রঙ চিনছে, ফুল-ফলের নাম শিখছে, গুনতে শিখছে; আর এভাবেই খেলার ছলে শেখার মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।

'জিনা ট্রিকো'-এর মতো অংশীজনদের সহযোগিতায় ইউনিসেফ দেশে শিশু সুরক্ষা এবং শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ (আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট বা ইসিডি) কার্যক্রম জোরদার করে চলেছে। এর উদ্দেশ্য হলো মুহাম্মদের মতো শিশুরা যেন শেখার জন্য সুন্দর ও যত্নে ভরা পরিবেশ পায়, একটি নিরাপদ শৈশব পায়।

ইউনিসেফ-সমর্থিত এসব দিবাযত্ন কেন্দ্রগুলোর কল্যাণে কর্মজীবী মায়েরা, বিশেষ করে যারা কঠিন পরিস্থিতির শিকার, নিশ্চিন্তে তাদের কাজে যেতে পারছেন,  তাদের আয় ও জীবিকা অর্জনের পথ সচল রাখতে পারছেন। সন্তানের নিরাপত্তা নাকি রুটি-রুজি—এই দুটির মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার কঠিন পরীক্ষা তাদের আর দিতে হচ্ছে না।


***

বাংলাদেশের শিশু ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য এবং শিশুদের নিরাপদ যত্ন, প্রারম্ভিক শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মজীবী মায়েদের নিশ্চিন্তে জীবিকা নির্বাহে সাহায্য করার এই উদ্যোগে অবদান রাখায় ইউনিসেফ আন্তরিকভাবে ‘'জিনা ট্রিকো’' (Gina Tricot)-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে।