সম্ভাবনাময় ২০২৬ সালঃ চলুন কিছুটা আশাবাদী হই!
২০২৬ সালে আশাবাদী হবার মতন কী কী ঘটেছে ২০২৫ সালে – চলুন জেনে নিই।
- বাংলা
- English
২০২৫সাল - মানবিক সহায়তা ও উন্নয়ন খাতেরজন্য বৈশ্বিক অস্থিরতার এক বছর। শিশুরা নানান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় এই বছর - নৃশংস সংঘাত, ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা, বহুপাক্ষিকতার প্রতি বিশ্বের মৌলিক অঙ্গীকারের চ্যালেঞ্জ এবং অপরিকল্পনীয় তহবিল বা বাজেট কাট। তবে এই সবকিছুর মধ্যেও আমরা আমাদের মূলনীতিতে থেকেছি অটল; কাজ করে চলেছি প্রতিটি শিশুর জন্য একটি সম্মানজনক জীবনের সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। এই চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের খানিকটা ভাবিয়েছিলো বটে; তবে থামাতে পারেনি। প্রত্যেকেই আমরা অদম্য সাহস, প্রগাড় সহমর্মিতা ও আরও নিদারুন অভিঘাত সহনশীলতা নিয়ে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছি ।
বাংলাদেশএসব বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের বাইরে ছিল না। তবেকঠিন সময়ের মধ্যেও দেশের শিশু ও তাদেরপরিবারগুলোর অগ্রগতি ও ইতিবাচক কিছুপরিবর্তনের মুখ দেখেছে। আর আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, রাতের ওপারে সবসময় রয়েছে এক উদীয়মান সূর্য।
আগামী বছর ঘিরে আমরা কেন আশাবাদী-তার আটটি কারণ এখানে তুলে ধরা হলো।
শিশু অধিকার সনদে ১২ টি রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষর
বিশ্বব্যাপী শিশু অধিকার যখন কেবল বক্তৃতার বিষয়, ইউনিসেফ তখন শিশু অধিকারকে নিয়ে নতুন আঙ্গিকে চিন্তা করেছে। গত ডিসেম্বর মাসে ইউনিসেফ সফলভাবে ১২টি রাজনৈতিক দলকে একত্রিত করে একটি ‘শিশু অধিকার ইশতেহার’-এ তাদের প্রতিশ্রুতি আদায়ে সক্ষম হয়। এই ইশতেহার বাংলাদেশের শিশু ও তরুণদের প্রাণবন্ত উপস্থিতির মাধ্যমে প্রণীত সুস্পষ্ট অঙ্গীকার সম্বলিত একটি দলিল, যা তাদের অধিকারকে সম্মান ও সুরক্ষিত করে এমন একটি ভবিষ্যতের পক্ষে কথা বলে।
শিশুরা দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৮ শতাংশেরও বেশির প্রতিনিধিত্ব করে- তারপরেও জাতীয় নীতির আলোচনায় তাদের অধিকারসমূহ ও বক্তব্য প্রায়ই তেমন গুরুত্ব পায় না। এই বৈষম্য কমিয়ে আনতে ইউনিসেফ, শিশু অধিকারকে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারগুলোতে গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত করতে সফল হয়েছে।
এই উদ্যোগের ফলেই ‘শিশু অধিকার ইশতেহার’ (চাইল্ড রাইটস ম্যানিফেস্টো) প্রণীত হয়। এই ইশতেহার মূলত শিশু ও তরুণদের সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে নির্ধারিত ১০টি অঙ্গীকারের একটি তালিকা। এটা করার লক্ষ্য ছিল, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের কাছ থেকে শিশুদের অগ্রাধিকার দিয়ে বিনিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি আদায় করা। এটা তরুণদের প্রকৃত ও তাৎপর্যপূর্ণ অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তৈরি রাজনৈতিক অ্যাডভোকেসির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
“আমরা আশাবাদী যে, আজকে যে অঙ্গীকারগুলো করা হয়েছে সেগুলো ভবিষ্যতের নীতি, বাজেট ও কর্মপরিকল্পনায় প্রতিফলিত হবে। আমরা আরও শক্তিশালী শিশু-বান্ধব বাজেট, উন্নত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, শিশুদের অগ্রাধিকার দিয়ে জলবায়ু অভিযোজনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সবার জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সমতা নিশ্চিত হওয়ার প্রত্যাশা করি,” বলেছে ১৫ বছর বয়সী শিশু সাংবাদিক ইফতেশাম।"
জাতীয় নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সরকারকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আজ যখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, তখন শিশুদের অধিকার ও কল্যাণের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটি জাতীয় উন্নয়নের অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে শিশু ও তরুণদের স্থান দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান ঘাটতিগুলো দূর করা এবং অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার এক তাৎপর্যপূর্ণ সময়। এই নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্ব আরও জোরদার করতে প্রস্তুত রয়েছে ইউনিসেফ।
বাংলাদেশের তৃতীয় ‘জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান’ (ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন- এনডিসি ৩.০)- এর কেন্দ্রে শিশু ও তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে শিশুরা চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু ঝুঁকির ধ্বংসাত্মক প্রভাবের শিকার হয়েছে।
তাদের স্থান হয়েছে আশ্রয় কেন্দ্রে। অনিরাপদ পানি পান করেছে। তারা তাদের বাবা-মায়েদেরকে বারবার ধ্বসে হওয়া ঘর ও জীবিকা পুনর্নির্মাণের জন্য সংগ্রাম করতে দেখেছে। তারা শুধু কয়েক দিন নয়, সপ্তাহের পর সপ্তাহ স্কুল থেকে দূরে থেকেছে।
গত বছর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার একটি শক্তিশালী শিশু ও তরুণবান্ধব এনডিসি ৩.০ গ্রহণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী একটি নজির স্থাপন করেছে। এনডিসি ৩.০-এ তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্ত করা এবং এর কেন্দ্রে শিশু ও তরুণদের রাখার লক্ষ্যে ইউনিসেফ দেশের বিভিন্ন জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সাত দফায় তরুণদের সঙ্গে পরামর্শ সভা আয়োজনে সরকারকে সহযোগিতা করে। এর মধ্য দিয়ে কৌশলগতভাবে শিশু ও তরুণ, নারী এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী জলবায়ু পদক্ষেপের কেন্দ্রে স্থান পায়। এটাকে শিশু অধিকারের জন্য একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখা হয়।
এনডিসি ৩.০ –এ জলবায়ু পরিবর্তনের মাত্রাতিরিক্তি ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব এবং এর কারণে শিশু ও তরুণেরা যেসব মৌলিক সেবার ওপর নির্ভর করে সেগুলো বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। এখানে স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি, পানি ও স্যানিটেশন, শিক্ষা, শিশু সুরক্ষা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার মতো প্রধান প্রধান বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে এনডিসি ৩.০ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং এর উচ্চাভিলাষী ২০৩৫ লক্ষ্যসমূহ অর্জন করতে বাংলাদেশের শক্তিশালী জাতীয় নেতৃত্ব এবং স্থায়ী আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ইউনিসেফ সরকার; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় (এমওইএফসিসি) ও অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে প্রস্তুত, যাতে জলবায়ু অর্থায়ন উৎসাহিত করা যায়, শিশু-বান্ধব এবং অভিঘাত সহনশীলতা তৈরি করে এমন সমাধানগুলো বাড়ানো যায় এবং এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়ন ও মনিটরিংয়ে শিশু ও তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়।
এনডিসি ৩.০ একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে: এটি আজ শিশু ও তরুণদের সুরক্ষিত করার জন্য পরিবর্তনের একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনা, যা সবার জন্য আরও নিরাপদ ও অভিঘাত সহনশীল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে।
টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি) ক্যাম্পেইনে ৯৭ শতাংশের বেশি লক্ষ্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ
প্রতিরোধযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে এখনো প্রতি বছর টাইফয়েড জ্বরে প্রায় ৬,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়। এই রোগটি দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশেষভাবে শিশুদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
এটা মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ সরকার গত অক্টোবরে দেশজুড়ে মাসব্যাপী টাইফয়ে কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি) ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে। এই ক্যাম্পেইনে ৫ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
দেশের প্রতিটি প্রান্তের শিশুদের কাছে যাতে জীবনরক্ষাকারী টাইফয়েডের টিকা পৌঁছানো যায় সেজন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা নদী পার হয়ে এবং পাহাড়ে চড়ে দূর-দূরান্তের পথে ছুটে যান। কাদামাটির এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চল এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিশু, প্রতিবন্ধী শিশু, সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশু; যাযাবর, জাতিগত ও চা-বাগান কমিউনিটির শিশু; কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এবং যৌনকর্মীদের শিশু - সবাইকে এই টিকা দেওয়া হয়। রোহিঙ্গা শিবিরেও ৪ লাখ ২৪,০০০-এরও বেশি শিশু এই টিকা পেয়েছে।
বাংলাদেশ শিশুদের টিকা প্রদানের এই ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রার ৯৭ শতাংশের বেশি সাফল্য অর্জন করেছে। এর মধ্য দিয়ে চার কোটি ২৫ লাখেরও বেশি শিশু সুরক্ষিত হয়েছে।টিকা প্রদানের এই কর্মসূচিতে ৫ কোটি ৪০ লাখ টিসিভি ডোজ সরবরাহ করে এবং পরিকল্পনা থেকে শুরু করে যোগাযোগ পর্যন্ত বিতরণের প্রতিটি ধাপকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তা করেছে ইউনিসেফ। এই অসাধারণ সাফল্য সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন, যা গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও অন্যান্য অংশীজনদের সহায়তায় সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ এখন টাইফয়েড প্রতিরোধে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিশ্বে অষ্টম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দেশজুড়ে জীবনরক্ষাকারী এই টিকা প্রদান ক্যাম্পেইন করেছে।
কন্যাশিশুদের জন্য এইচপিভি টিকাকে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে
জরায়ুমুখ ক্যানসার একটি সাধারণ হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের (এইচপিভি) কারণে হয়ে থাকে। বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশেও এটা নারীদের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর একটি। দেশে প্রতি বছর ৫ হাজারের বেশি নারী জরায়ুমুখ ক্যানসারে প্রাণ হারান।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এই প্রজন্মের কন্যাশিশুদের জরায়ুমুখ ক্যানসার থেকে সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করে। সারা দেশে এইচপিভি টিকা প্রদান ক্যাম্পেইনের আওতায় ৫৬ লাখ কিশোরীকে (১০-১৪ বছর বয়সী কন্যাশিশুদের ৯৩ শতাংশ) টিকা দেওয়া হয়েছে। টিকাপ্রাপ্তদের মধ্যে সবচেয়ে সুবিধা-বঞ্চিত কমিউনিটির কন্যাশিশু ও কিশোরীরাও রয়েছে।
ইউনিসেফ এই সব টিকা সরবরাহ করেছে এবং সারা দেশে বিস্তৃত পরিসরে টিকা প্রদান নিশ্চিত করার জন্য গ্যাভি, দ্যা ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ও অংশীজনদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে কাজ করেছে, যাতে টিকা প্রদানের সার্বিক পরিকল্পনা, তদারকি ও কার্যক্রম পরিচালনা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়।
এই টিকা প্রদানের সাফল্যের ভিত্তিতে এইচপিভি টিকাকে ২০২৫ সাল থেকে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি প্রতিরোধযোগ্য জরায়ুমুখ ক্যানসার নির্মূলের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হয়, এবং ২০২৬ ও তার পরের বছরগুলোতে আরও বেশি কন্যাশিশুকে টিকা দেওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে এখন ৭৩ শতাংশষ মানুষ মৌলিক স্যানিটেশন সেবা ব্যবহার করছেন
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫ (এমআইসিএস ২০২৫)-এর প্রাথমিক ফলাফলে দেশে শিশু ও তাদের পরিবারের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক অগ্রগতির চিত্র উঠে এসেছে।
বর্তমানে দেশের ৭৩ শতাংশ মানুষ মৌলিক স্যানিটেশন সেবা ব্যবহার করছেন, যার মধ্যে উন্নত শৌচাগার, সেপটিক ট্যাংক ও ল্যাট্রিন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০১৯ সালে মৌলিক স্যানিটেশন ব্যবহার করতেন ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ। এই অগ্রগতির অর্থ হলো, আগের তুলনায় কম সংখ্যক শিশু অসুস্থ হচ্ছে, কম সংখ্যক শিশু স্কুলে অনুপস্থিত থাকছে এবং শিশুদের জন্য আরও স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হচ্ছে।
তবে এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে। ফলাফলে এটাও দেখা গেছে যে, মাত্র ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষের নিরাপদ ব্যবস্থাপনার আওতায় পানীয় জল পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, যে পানি ই. কোলাইমুক্ত এবং যাতে আর্সেনিকের মাত্রা কম। এটি দেখায় যে, পানির গুণগত মান এখনো একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে শিশুদের স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক কল্যাণের ওপর।
সার্ভের এই ফলাফলকে গুরুত্ব দিয়ে ইউনিসেফ সরকারের সঙ্গে কাজ করে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক এই পরিস্থিতির উত্তরণে এমন নীতি প্রণয়নে সহায়তা করতে চায়, যেখানে প্রতিটি শিশুর বেঁচে থাকা ও তার বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সাফ অনূর্ধ্ব-২০ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ জয় করেছে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২০ নারী ফুটবল দল ২০২৫ সালে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ষষ্ঠ আসরে শিরোপা জয় করেছে। এমন একটি দেশে যেখানে ফুটবলের মতো খেলাধুলায় এখনো অনেকাংশে পুরুষের প্রাধান্য রয়েছে, সেখানে এটি একটি বড় অর্জন।
এ ধরনের জয় শ্যামলী ও রানির মতো কন্যাশিশুদের জন্য বিশেষভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক। কারণ এটি তাদের খেলাধুলায় অংশ নিতে, বড় স্বপ্ন দেখতে এবং নিজেদের সামর্থ্যে বিশ্বাস করতে উৎসাহিত করে। তারা বেড়ে ওঠার সময় আরও বেশি সংখ্যক নারীকে আদর্শ হিসেবে দেখতে পায়, যাদের দিকে তাকিয়ে অনুপ্রাণিত হতে পারে। বাংলাদেশে ‘স্পোর্টস ফর ডেভেলপমেন্ট’ (এসফোরডি)কর্মসূচি তাদের মতো কন্যাশিশুদের আত্মবিশ্বাস অর্জন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেতে সহায়তা করছে, যাতে তারা বাধা ভেঙে এগিয়ে যেতে পারে এবং তাদের চলার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী ক্ষতিকর সামাজিক প্রথাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
২০২২ সালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এই কর্মসূচি চালু করে ইউনিসেফ। এর আওতায় কন্যাশিশুরা ফুটবল, ভলিবল, কাবাডি, সুইমসেফ, ব্যাডমিন্টন, আত্মরক্ষা, ক্রিকেট, স্কেটবোর্ডিং, সার্ফিং এবং বিভিন্ন স্থানীয় খেলায় প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পায়। পাশাপাশি তারা বিভিন্ন আলোচনামূলক সেশনে অংশ নিয়ে বাল্যবিবাহ ও নপিীড়ন-নির্যাতনের ক্ষতির দিক, শিক্ষার গুরুত্ব, ইতিবাচক অভিভাবকত্বসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে জানতে পারে।
শিশু ও নারীদের সুরক্ষায় দুটি যুগান্তকারী আইন অনুমোদন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার
গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিতে একটি দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দুটি যুগান্তকারী অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে—যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৬ প্রণয়ন এবং পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশ- ২০২৬ সংশোধন।
যৌন হয়রানি প্রতিরোধ বিষয়ক অধ্যাদেশটি কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে যৌন হয়রানির সংজ্ঞা সম্প্রসারিত করে শারীরিক, মৌখিক, অ-মৌখিক, অনলাইন নির্যাতন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি (আইসিসি) গঠনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তা, পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং ও আইনি সহায়তা প্রদানের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হবে বলেও আশা করা হচ্ছে।
সংশোধিত পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ২০২৬-এ পারিবারিক সহিংসতার সংজ্ঞা বিস্তৃত করে শারীরিক, মানসিক, যৌন, আর্থিক ও ডিজিটাল সহিংসতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই আইনে ভুক্তভোগীদের দ্রুত সুরক্ষা, আশ্রয়, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কারাদণ্ড বা জরিমানার বিধান রয়েছে এবং দায়িত্বে অবহেলার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এই অধ্যাদেশগুলো ঘর, শিক্ষা প্রতষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ইউনিসেফ এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপকে স্বাগত জানায় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বের প্রশংসা করে। পাশাপাশি জাতিসংঘের সংস্থাসমূহ, অন্যান্য অংশীজন, সুশীল সমাজ এবং নারী অধিকার নেটওয়ার্কগুলোর নিরলস অ্যাডভোকেসি, যা এই অর্জনকে সম্ভব করেছে, সেগুলোকেও স্মরণ করছে ইউনিসেফ।
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত নতুন সরকারের অধীনে বাংলাদেশ যখন নতুন অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এই আইনি অঙ্গীকারগুলোকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপান্তর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে, যাতে নারী ও শিশুরা ভয় বা সামাজিক কলঙ্ক ছাড়াই তাদের সুরক্ষামূলক সেবাগুলো নিরাপদে গ্রহণ করতে পারে।
দেশের শিশু ও পরিবারগুলোর অভিঘাত সহনশীলতা
সবশেষে বাংলাদেশে যেসব শিশু ও পরিবারের জন্য আমরা কাজ করি, তারাই আমাদের অপরিসীম আশা জোগায়।
২০২৫ সাল ছিল দুর্যোগ ও অস্থিরতার একটি বছর। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভয়ঙ্কর বন্যা, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির, কড়াইল বস্তি ও কারখানায় আগুন। সেই সঙ্গে ছিল নাগরিক অস্থিরতা।
এই সব কিছুর মধ্যেও শিশু ও পরিবারগুলোর ধাক্কা সামলে নেওয়ার সক্ষমতা ও দৃঢ়সংকল্প আমাদের এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে। একটি ভালো আগামীর জন্য তাদের আশা ও স্বপ্ন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমাদের কখনোই থেমে গেলে চলবে না।
জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং একটি উন্নত ভবিষ্যতের দাবিতে সাহসী ও সংকল্পবদ্ধ তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের জনগণ সফলভাবে জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। দেশ এখন আশা, পরিবর্তন ও রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আগামী প্রজন্মের জন্য আরও নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তোলার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
২০২৬ সালে যা-ই হোক না কেন, আমরা প্রতিটি শিশুর জন্য আরও উজ্জ্বল ও আশাব্যঞ্জক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে প্রতিদিন নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়ার অঙ্গীকারে অবিচল থাকব।