বাংলাদেশে শিশুদের ওপর সীসা দূষণের প্রভাব

সীসামুক্ত বাংলাদেশ অর্জনের ক্ষেত্রে জাতীয় প্রচেষ্টা : ইউনিসেফ বিশেষজ্ঞের সাথে বিস্তারিত আলোচনা

ইউনিসেফ
Picture a child doing what children usually do
UNICEF/UNI538615/Mukut
14 জুন 2026

মনে করুন, আপনার আদরের সোনামণির মেঝেতে হামাগুড়ি দিচ্ছে , মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, তার প্রিয় খেলনাগুলি নিয়ে খেলছে; আবার যখন একটু বড় হলো, তখন পাড়ার গলিতে বন্ধুদের পেছনে ছুটছে। এবার যদি বলি, এই ছোট্ট সাধারণ মুহূর্তগুলোর প্রতিটিতেই, তাদের শরীরে অদৃশ্য এমন কিছু প্রবেশ করছে যা তাদের স্বাস্থ্যের ওপর চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

সীসা দূষণ একটি  নীরব হুমকি যা ধীরে ধীরে বাংলাদেশে শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করছে। তারা যে বাতাসে শ্বাস নেয়, যে খাবার খায়, এমনকি যে খেলনা হাতে নিয়ে খেলে তার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে সীসা। শিশুদের ক্ষেত্রে এই সীসার সামান্যতম পরিমাণও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বাংলাদেশের শিশুরা সীসা দূষণের বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে।  দেশে জনসংখ্যার চাপ, দ্রুত ও অপরিকল্পিত শহরায়ন ও শিল্পায়ন এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার ও বর্জ্য নিষ্কাশন সম্পর্কিত দুর্বল আইন এর অন্যতম কারন।   

এই প্রবন্ধে আমরা বাংলাদেশে ইউনিসেফ-এর স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. প্রিসিলা ওবিলের সাথে সীসা বিষক্রিয়ার ঝুঁকি, প্রভাব এবং তা থেকে শিশু ও পরিবারকে রক্ষা করার জন্য দেশে বিদ্যমান আইনগত ব্যবস্থা ও নীতিমালা আরও জোরদার করার গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেছি।

চলুন আগে প্রাথমিক বিষয়গুলো জেনে নেই ;  সীসা দূষণ বা সীসা বিষক্রিয়া আসলে কী এবং এটি বিশেষকরে শিশুদের জন্য বিপজ্জনক কেন? এটি কি প্রতিরোধযোগ্য?

সীসা একটি অত্যন্ত বিষাক্ত ধাতু। এর কোনো স্বাদ বা গন্ধ নেই। এটি খালি চোখে দেখা যায় না। যখন শরীরে সীসা জমতে থাকে, তখন তাকে সীসা বিষক্রিয়া বলা হয়। এর প্রভাবে হৃৎপিণ্ড, কিডনি এবং মস্তিষ্কসহ শরীরের একাধিক অঙ্গের ক্ষতি হয়ে থাকে । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)  রক্তে সীসার পরিমাণ প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়ার সুপারিশ করেছে। তবে তারা একই সাথে এটিও জোর দিয়ে বলেছে যে, রক্তে সীসার কোনো মাত্রাই আসলে নিরাপদ নয়।

শিশুদের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি বিপজ্জনক। তাদের মস্তিষ্কসহ শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো সময়ের সাথে সাথে বিকশিত হয়, তাই দীর্ঘ সময় ধরে অল্প অল্প করে  সীসার সংস্পর্শে এলেও তা তাদের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে; হতে পারে অপরিবর্তনীয় ক্ষতির কারণ। এর ফলে নতুন কিছু শেখার ক্ষেত্রে অসুবিধা, নিউরোডেভেলপমেন্টাল ও বুদ্ধিমত্তার বিকাশজনিত সমস্যা, এমনকি আচরণে অস্থিরতা ও উগ্রতার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। গর্ভবতী নারী ও তার গর্ভের শিশুর ক্ষেত্রেও সীসা দূষণের প্রভাব মারাত্মক। কারণ সীসা  গর্ভফুল (প্লাসেন্টা) ভেদ করে শিশুর শরীরে প্রবেশ করতে পারে, যা গর্ভপাত, মৃত শিশু জন্ম দেওয়া বা সময়ের আগেই অপরিণত শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার কারণ হতে পারে।

সীসা দূষণ প্রতিরোধযোগ্য, এবং সেই কারণেই এর সম্ভাব্য উৎসগুলো সম্পর্কে জানা এবং সেগুলো এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের ক্ষেত্রে সীসা দূষণের ঝুঁকি কেন বেশি?

প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুরা চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি সীসা শোষণ করে থাকে। ছোট শিশুরা স্বভাবতই কৌতূহলী হয় আর তারা প্রায়ই হাতের কাছে যা পায় তা আগে মুখে দেয়, মাটিতে গড়াগড়ি তাদের প্রিয় এক খেলা। সীসাযুক্ত বিপজ্জনক জিনিস চিনে এড়িয়ে চলতে তারা পারেনা। যেমনঃ সীসাযুক্ত অনেক রঙের ডিব্বার গায়ে সতর্কীকরণ লেবেল লাগানো থাকে, ছোট্ট শিশুরা তা পড়তে পারে না। এর ফলে দূষিত ধুলো, মাটি, রং এবং সীসার অন্যান্য উৎসের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

এছাড়াও, ছোট শিশুদের মস্তিষ্ক ও গর্ভে শিশুদের বিকাশ খুব দ্রুত ঘটতে  থাকে। এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে সীসার মতো বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসা শিশুদের শেখা, আচরণ, বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে যার রেশ অনেকক্ষেত্রে আজীবন রয়ে যায়। 

A boy
UNICEF/UN0743558/Mukut

সীসা দূষণের অন্যতম কেন্দ্রস্থল হিসেবে বাংলাদেশকে বিবেচনা করা হয়। এখানকার শিশুদের জন্য পরিস্থিতি কতটা গুরুতর?

সীসা দূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এখানে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ (২১ মিলিয়ন) শিশুর রক্তে উচ্চমাত্রায় সীসার উপস্থিতি রয়েছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত মাত্রা (প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম) এর চেয়ে বেশি। এটা চিন্তার বিষয়।

গত বছর, মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভেতে (এমআইসিএস ২০২৫) ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১১,০০০-এর বেশি শিশু এবং ২,০০০-এর বেশি গর্ভবতী মহিলার ওপর করা পরীক্ষার ফলাফল উঠে আসে। এই প্রথমবার কোন সার্ভেতে সীসা এবং ভারী ধাতুর উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। প্রাপ্ত ফলাফলগুলো ছিল বেশ উদ্বেগজনক।

পরীক্ষায় ৩৮.৩% শিশু এবং ৭.৫% গর্ভবতী মহিলার রক্তে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি সীসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে । অন্যদিকে ঢাকার শিশুদের অধিকাংশরেই  (৬৫%) রক্তে এই নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি সীসা পাওয়া গেছে। এসব শিশুরা তাদের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে ; যখন তাদের কথা বলা শেখার সময়, প্রাণ খুলে খেলার সময় এবং তাদের চারপাশের জগতের সাথে পরিচিত হয়ে উঠার সময় তখন তারা সীসার মতন ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শে আসছে প্রতিনিয়ত। ফলে ব্যাহত হচ্ছে তাদের শেখার ক্ষমতা, তাদের আচরণ ও তাদের পূর্ন সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ।   

শিশুদের জন্য সীসা (lead) দূষণের প্রধান উৎসগুলো কী কী? এমন কোনো নির্দিষ্ট পরিবেশ আছে কি যেখানে তাদের ঝুঁকি বেশি থাকে?

শিশুরা ঠিক কোথায় সীসার সংস্পর্শে আসছে তা বোঝার জন্য, আপনাকে সেই জায়গাগুলোর কথা ভাবতে হবে যেখানে তারা তাদের বেশিরভাগ সময় কাটায়, যেমন বাড়ি, স্কুল বা খোলা জায়গা।

সীসার সংস্পর্শে আসার কিছু সাধারণ উৎসের মধ্যে রয়েছেঃ

•  পুরানো লিড-অ্যাসিড (সীসা-এসিড) ব্যাটারি এবং ইলেকট্রনিক বর্জ্য (ই-বর্জ্য) নিয়মকানুন না মেনে যেখানে-সেখানে রিসাইকেল বা পুনরুৎপাদন বা পুনঃব্যভার করার কারণে সীসা আশেপাশের ধূলিকণা ও মাটির সাথে মিশে যায়

•             দেয়াল থেক খসে পড়ছে এমন সীসাযুক্ত রং

•             দূষিত খেলনা

•             ধাতুর স্ক্র্যাপ বা ফেলে দেওয়া ধাতব টুকরো থেকে তৈরি অ্যালুমিনিয়াম বা সিরামিকের রান্নার বাসনপত্র

•             ভেজাল হলুদ ও অন্যান্য গুড়া মশলা,

•             অনুমোদন ব্যতীত তৈরি কবিরাজি বা ভেষজ ওষুধ

•             সীসাযুক্ত গহনা, তাবিজ এবং সুরমা বা কাজলের মতো প্রসাধনী

অভিভাবকদের কি কোনো বিশেষ লক্ষণের দিকে নজর রাখা উচিত?

উদ্বেগের বিষয় হলো এটা চট করে চোখে পড়ে না; সীসা বিষক্রিয়ার প্রভাব চোখে পড়তে বা বুঝতে বেশ কিছুদিন সময় লাগে।

সীসার সংস্পর্শে এলে শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে, রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এটি বুদ্ধিমত্তা (আই কিউ) কমিয়ে দেয়। এটি মনোযোগের পরিধি ও ব্যাপ্তি এবং স্মৃতিশক্তি হ্রাস করে। এটি নতুন কিছু শেখার ক্ষেত্রে  অসুবিধা এবং আচরণগত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। এর ফলে পেটে ব্যথা এবং খিঁচুনি হতে পারে।

এই প্রভাবগুলো সময়ের সাথে সাথে কমে না বরং বাড়তে পারে। যেসব শিশু ঘন ঘন সীসার সংস্পর্শে আসে, তারা প্রায়ই পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকে, তাদের মেধার পুর্ন বিকাশের ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে তাদেরকে অনেক বেশি কষ্ট করতে হয়। তাদের আসুস্থ হবার প্রবণতা থাকে বেশি ফলে ভবিষ্যতে চিকিৎসা খরচ ও ভোগান্তিও তাদের বেশি পোহাতে হয়।

তবে, এই লক্ষণগুলো শিশুদের অন্যান্য সাধারণ অসুস্থতার মতোই মনে হতে পারে। একারণেই সীসার উপস্থিতি ও সংস্পর্শ নিশ্চিত করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হলো রক্ত পরীক্ষা। যদি কোনো অভিভাবক বা যত্নকারী সীসা বিষক্রিয়ার সন্দেহ করেন, তবে তাদের অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত এবং চিকিৎসার জন্য প্রস্তাবিত নির্দেশনা সতর্কতার সাথে অনুসরণ করা উচিত। 

Child is paying
UNICEF/UNI789730/Mukut

সন্তানদের সুরক্ষার জন্য বাবা-মা এবং পরিবার কী কী পদক্ষেপ নিতে পারে?

সীসার উৎসগুলো সম্পর্কে জেনে এবং সেগুলো এড়িয়ে চলার মাধ্যমে পরিবারগুলো সীসার সংস্পর্শ কমাতে পারে।

• নিয়ম না মেনে ব্যাটারী ভাঙা বা পুনর্ব্যবহার এবং ইলেকট্রনিক বর্জ্যের স্তূপ থেকে শিশুদের দূরে রাখুন। যে প্রাপ্তবয়স্করা এধরনের শিল্পকারখানায় কাজ করেন তাদের কাজের পোশাক বাড়িতে আনা উচিত নয় এবং শিশুদের সংস্পর্শে আসার আগেই তা যেন ভালোভাবে ধোয়া হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।

•             স্থানীয়পর্যায়ে তৈরি সীসাযুক্ত খেলনা, বিশেষ করে সীসাযুক্ত রঙের প্রলেপ দেওয়া খেলনা এড়িয়ে চলুন।

•             আপনার বাড়িতে ব্যবহৃত রং সীসামুক্ত কিনা এবং তা উঠে যাচ্ছে কিনা তা পরীক্ষা করুন।

•             সীসাযুক্ত সুরমা, প্রসাধনী, গহনা এবং তাবিজের পরিবর্তে  সীসামুক্ত বিকল্প ব্যবহার করুন।

•             সম্ভব হলে, ধাতব টুকরো দিয়ে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্রের পরিবর্তে স্টেইনলেস স্টিলের রান্নার পাত্র বেছে নিন।

•             শিশুদের খেলার পরে ও খাওয়ার আগে কলের ছেড়ে সাবান দিয়ে ঘন ঘন হাত ধোবার অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য উৎসাহিত করুন।

•             আপনার সন্তানদের পুষ্টিকর, আয়রন ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার দিন।

•             শুধু শুকনো ঝাড়ু দিয়ে নয়, আপনার বাড়ির মেঝে ভিজা কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করুন।

আপনার শিশু অসুস্থ হলে বা সীসার সংস্পর্শে এসে থাকতে পারে বলে মনে হলে, অনুগ্রহ করে তাকে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান, যেখানে স্বাস্থ্যকর্মী তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানবেন এবং ঝুঁকির কারণগুলো পরীক্ষা করবেন। যদি কোনো ঝুঁকির কারণ চিহ্নিত হয়, তবে সংস্পর্শের বিষয়টি নিশ্চিত করতে রক্ত পরীক্ষা করান এবং জাতীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করুন।

শিশুদের সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকার কী পদক্ষেপ নিতে পারে?

বাবা-মা কিংবা অভিভাবকের একার পক্ষে শিশুদের সীসা বিষক্রিয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।  বাংলাদেশকে সীসামুক্ত করে তোলার জন্য বিভিন্ন খাতের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নীতিমালা, প্রবিধানসমূহের সঠিক বাস্তবায়ন, নজরদারি শক্তিশালীকরণ এবং স্বাস্থ্য ও বেসরকারি উভয় খাতের সাথে সহযোগিতার মাধ্যমে সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

নীতিগত পর্যায়ে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে একটি জাতীয় কৌশলের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যার আওতায় বহু-খাতভিত্তিক ও আন্তঃমন্ত্রণালয় স্টিয়ারিং কমিটি গঠিত হবে; ফলে প্রমাণ-ভিত্তিক নীতিমালা ও প্রবিধান প্রণয়নে দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে। এটি একটি দারুণ সূচনা। কারণ সীসা  বিষক্রিয়া স্বাস্থ্য, শিল্প, পরিবেশ এবং ভোক্তা সুরক্ষাকে প্রভাবিত করে। রক্তে সীসার মাত্রা পরীক্ষা সকলের জন্য, বিশেষ করে শিশুদের জন্য সহজলভ্য হওয়া উচিত।

কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে রক্তে সীসার মাত্রা পরীক্ষা করার মতো সুসজ্জিত কোনো নির্দিষ্ট ল্যাবরেটরি বয়া পরীক্ষাগার নেই, যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।  মানুষের রক্ত এবং পরিবেশগত নমুনা উভয়ই পরীক্ষা করার সরঞ্জামসহ একটি ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হলে, তা সীসা দূষণ শনাক্তকরণ, পর্যবেক্ষণ এবং মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা জোরদার করার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে। ফলে নিয়মিত পরীক্ষা, অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং শিশুদের সীসা দূষণ থেকে রক্ষা করার জন্য সঠিক প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেঅনুয়ায়ী পদক্ষেপ গ্রহণে  নির্দেশনার জন্য একটি নিয়মিত নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতেও সহায়ক হবে।

পাশাপাশি, বেসরকারি খাতের সাথে যৌথভাবে কাজ করে সরকার একদিকে যেমন ব্যবসায়ীদের নিরাপদ ও দায়িত্বশীল হতে উৎসাহিত করতে পারে, অন্যদিকে তাদের জবাবদিহিতার আওতায়ও আনতে পারে।

পরিশেষে, সীসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের সক্ষমতা তৈরি ও বাড়ানো জরুরি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে এই ক্ষেত্রে নির্দেশিকা ও প্রশিক্ষণ উপকরণ তৈরি করেছে যা নতুন তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে হালনাগাদ করা হবে। অন্যদিকে চিকিৎসা শিক্ষা অধিদপ্তর শিশুদের পরিবেশগত স্বাস্থ্য বিষয়ে একটি হ্যান্ডবুক তৈরি করেছে—যেখানে সীসা বিষক্রিয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—এবং এটিকে চিকিৎসা শিক্ষা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ অপরিহার্য। 
 

বাংলাদেশে সীসা দূষণ মোকাবিলায় ইউনিসেফ কীভাবে অবদান রাখছে?

সরকারের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইউনিসেফ বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে কাজ করছে। আমরা তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করছি, নীতিমালায় বদল আনার চেষ্টা করছি, নিয়মকানুন বা আইনের সংস্কারের জন্য কথা বলছি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছি, সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করছি, আর সেই সাথে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী, দাতা সংস্থা ও বেসরকারি খাতের সাথে অংশীদারিত্ব জোরদার করছি।

এমআইসিএস ২০২৫-এর প্রাথমিক ফলাফল থেকে আমরা জানতে পেরেছি কোন এলাকার শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে। এখন আমাদের পরের কাজ হলো এই সীসা দূষণের মূল উৎসগুলো খুঁজে বের করা। ইউনিসেফ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে মিলে খাবার জিনিস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরীক্ষার মাধ্যমে একটি জরিপ করছে । এর পাশাপাশি দেশজুড়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে একটি পারিবারিক জরিপ করার পরিকল্পনাও চলছে।

এই সব সম্মিলিত প্রচেষ্টাগুলোর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারব শিশুরা ঠিক কীভাবে সীসার সংস্পর্শে আসছে। আর এর ওপর ভিত্তি করেই সরকার, বেসরকারি খাত এবং সুশীল সমাজের কাছ থেকে কী ধরনের জরুরি পদক্ষেপ দরকার—সেটা ঠিক করা যাবে। সীসা দূষণ পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব, আর এই বিশ্বাসটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।