কক্সবাজারে জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীল শিক্ষাকেন্দ্র নির্মাণ
এক বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের পর দুর্যোগ ও চরম আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতির মধ্যেও শিশুদের নিরাপদ পড়াশোনায় সহায়তা করতে ইউনিসেফ রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে প্রথম অগ্নিরোধী ও জলবায়ু-সহনশীল স্কুল নির্মাণ করেছে
- বাংলা
- English
১৩ বছর বয়সী রফিক দুর্যোগের সঙ্গে অপরিচিত নয়। সাত বছরেরও বেশি আগে মিয়ানমারে ব্যাপক সহিংস হামলার সময় তার গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়, যা তাকে এবং তার পরিবারকে নিরাপত্তার সন্ধানে বাড়ি থেকে পালাতে বাধ্য করে।
তারা প্রতিবেশী বাংলাদেশের সীমান্ত পেরিয়ে কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরে আরও ৭ লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে বাঁশ দিয়ে তৈরি জনাকীর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়। এরপর রফিক দ্রুতই তার আশ্রয়কেন্দ্রে ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত একটি শিক্ষা কেন্দ্রে ক্লাস শুরু করে। সেখানে গিয়ে বার্মিজ পড়তে তার খুব ভালো লাগে।
"যখন আমি বার্মিজ পড়ি, তখন এটি আমাকে আমার মাতৃভূমির কথা মনে করিয়ে দেয়," বলে রফিক।
কিন্তু রফিকের জীবন আবারও ওলটপালট হয়ে যায়, এবার ভয়াবহ এক অগ্নিকাণ্ডে। গত বছরের ৭ জানুয়ারির প্রথম প্রহরে তার আশ্রয়কেন্দ্রে লাগা আগুন কয়েক মিনিটের মধ্যে ৫ হাজারে বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে, যাদের মধ্যে সাড়ে ৩ হাজার শিশুও ছিল, আবারও বাস্তুচ্যুত করে। তাদের সবার আশ্রয়কেন্দ্র পুড়ে যায়। আগুনে ইউনিসেফের ১৪টি শিক্ষা কেন্দ্র ধ্বংস হয়, যার ফলে দেড় হাজার শিশু তাদের পড়াশোনার জায়গা হারায়।
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুরা বছরের পর বছর মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য সংগ্রাম করে আসছে। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের শুরুতে তাৎক্ষণিক ও অস্থায়ী সমাধান হিসেবে ক্যাম্পের বেশিরভাগ শিক্ষা কেন্দ্র বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়। কিন্তু দুর্বল নির্মাণ কাঠামো প্রায়শই আগুন, বন্যা, ভূমিধস ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অন্যান্য দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে যায়। আর বাংলাদেশে এ ধরনের দুর্যোগ এখন ঘন ঘনই হচ্ছে এবং এসব দুর্যোগের মাত্রা ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে।
২০২৪ সালে ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত মোট ৪৩৪টি শিক্ষা কেন্দ্র আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে, যা ৩০ হাজারের বেশি শিশুর অথবা ইউনিসেফের শিক্ষা কর্মসূচির আওতায় থাকা প্রতি ৮ জন শিশুর মধ্যে এক জনেরও বেশি শিশুর পড়াশোনা ব্যাহত করে। এই কেন্দ্রগুলো ঘন ঘন মেরামতের খরচ অনেক বেশি। তাছাড়া, অন্যান্য শিক্ষা কার্যক্রম ও মানবিক পরিষেবার জন্য মেরামত খাতের সীমিত যে বাজেট তা সরিয়ে নেওয়া হয়।
রফিকের মতো শিশুদের জন্য শ্রেণিকক্ষ হারানোর অর্থ কেবল পাঠ হারানো নয়, তাদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের আশাও হারানো। অগ্নিকাণ্ডের পরের দিন সকালে সে এবং তার সহপাঠীরা তাদের শিক্ষা কেন্দ্র যেখানে ছিল সেখানে ছুটে যায়, কিন্তু সেখানে তারা শুধু ধ্বংসস্তূপই দেখতে পায়।
"বার্মিজ বইয়ে আমার দেশের ছবি ও গল্প ছিল," রফিক স্মরণ করে। এরপর বলে, "বইয়ের মাত্র একটি পৃষ্ঠাই আমার পড়া বাকি ছিল।"
শিক্ষা কেন্দ্রটি পুনর্নির্মাণ হওয়ার আগে, রফিক ও তার সহপাঠীরা জরুরি ভিত্তিতে শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ইউনিসেফ স্থাপিত একটি ত্রিপলের তাবু ব্যবহার করে। সেখানে তারা সাত মাস ক্লাস করে। এই পরিবেশে পড়াশোনা করা তাদের জন্য কঠিন ছিল, বিশেষ করে চরম বৈরী আবহাওয়ার সময়।
রাফিক বলে, "বৃষ্টি হলে আমাদের পড়ার জায়গাটি অন্ধকারাচ্ছন্ন ও পানিতে তলিয়ে যেত। এটা পড়াশোনার জন্য মোটেও ভালো জায়গা ছিল না।"
আরও ভালোভাবে পুনর্নির্মাণ করা
যেহেতু কক্সবাজারে অগ্নিকাণ্ড ও জলবায়ুজনিত অভিঘাত ঘন ঘনই ঘটছে। সে কারণে ইউনিসেফ শিশু ও তাদের পরিবার যাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা পায়, সেজন্য আশ্রয়কেন্দ্রগুলো অগ্নিরোধী ও জলবায়ু-সহনশীল কাঠামো দিয়ে নির্মাণের আহ্বান জানিয়েছে। আগের দুর্যোগগুলো শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, নিরাপদ পানি, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদানের কাজে ব্যবহৃত ইউনিসেফের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোও ধ্বংস করে।
২০২৪ সালে ইউনিসেফ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নতুন, টেকসই ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতে সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন পায়। এর মধ্যে রয়েছে, গত বছর চালু করা প্রথম জলবায়ু-সহনশীল সমন্বিত পুষ্টি কেন্দ্র ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং প্রথম অগ্নিরোধী ও জলবায়ু-সহনশীল স্কুল।
নিজের ছাই থেকে পুনর্জন্ম হওয়া পৌরাণিক ফিনিক্স পাখির নামানুসারে "ফিনিক্স লার্নিং সেন্টার" নামে পরিচিত একটি স্কুলের নির্মাণ কাজ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সম্পন্ন হয়। এর পরপরই সেখানে ক্লাস শুরু হয়েছে। প্রচণ্ড গরম, প্রবল বাতাস ও বন্যার ক্ষতি সহ্য করতে সক্ষম স্টিলের ফ্রেম ও ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড বোর্ড দিয়ে এটি নির্মিত। স্কুলে বিদ্যুতের পূর্ণ যোগান আসে ছাদে বসানো সোলার প্যানেল থেকে এবং দুই দিন কেন্দ্রটি চালানোর জন্য বিদ্যুতের পর্যাপ্ত ব্যাকআপ থাকে। ১০টি শ্রেণিকক্ষসহ এটি প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ৭০০ জনেরও বেশি শিশুর নিরাপদ ও সুরক্ষিত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করছে।
স্কুলটি উদ্বোধনকালে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, "এটি এখন একটি চমৎকার শিক্ষা কেন্দ্র। এটি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল এবং এটি ক্যাম্প এলাকার অন্যতম সেরা লার্নিং সেন্টার হিসেবে পুনর্নির্মিত হয়েছে।"
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী রফিক কয়েক সপ্তাহ ধরে নতুন এই স্কুলে পড়াশোনা করছে। সে বলে, এই স্কুলটি তার আগের শিক্ষা কেন্দ্রের চেয়ে অনেক ভালো।
রফিক বলে, "আমার হোয়াইটবোর্ড, লাইট ও ফ্যান ভালো লাগে। আমি আমার বই পড়তে পারি এবং আমাদের শিক্ষক বোর্ডে কী লিখছেন তা আগের চেয়ে ভালো দেখতে পারি। এখানে পড়াশোনা করতে ভালো লাগছে।"
আশ্রয়শিবিরের অন্যান্য শিক্ষা কেন্দ্রে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা মোটেও ভালো নয়। আর ‘ফিনিক্স লার্নিং সেন্টার’-এর প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে কয়েকটি করে সিলিং ফ্যান রয়েছে, যা প্রচণ্ড গরমের সময় শিশুদের স্বস্তি দেয়। ২০২৪ সালে একটি তাপপ্রবাহের সময় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ছাড়িয়ে যায় এবং যার ফলে তখন সারাদেশের সব স্কুল বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের সব শিক্ষা কেন্দ্রও তখন কয়েক দিনের জন্য বন্ধ করে দিতে হয়।
রফিকের পড়াশোনা অবশেষে সঠিক পথে ফিরে আসায় সে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও আশাবাদী হয়ে উঠতে শুরু করেছে।
শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নের কথা জানিয়ে সে বলে, "আমি অন্যান্য শিশুদের পড়াশোনায় সাহায্য করতে চাই। আর চাই, আমার ভাই ও বোনেরা আমার মতোই বার্মিজ, ইংরেজি ও অন্যান্য বিষয় শিখুক।"
স্কুলটির সপ্তম শ্রেণির রোহিঙ্গা শিক্ষক লতিফ লক্ষ্য করেছেন, তার ক্লাসে উপস্থিতির হার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক প্রথা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা কিশোরীরা এই স্কুলের প্রতি উৎসাহী হয়ে উঠেছে। কারণ এই স্কুলে মেয়েদের জন্য আলাদা শ্রেণিকক্ষ ও শৌচাগার রয়েছে।
শিক্ষক লতিফ বলেন, "আরও অনেক মেয়ে এখানে পড়াশোনা করতে আগ্রহী হচ্ছে। তারা শ্রেণিকক্ষ, বেড়া ও ভেতরের ল্যাট্রিন দেখে নিরাপদ বোধ করে।"
ক্রমবর্ধমান দুর্যোগ, পরিবেশের অবনতি ও জলবায়ু সংকটের মুখেও রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে প্রতিটি শিশুকে পড়াশোনার সুযোগ প্রদানে ইউনিসেফ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই প্রচেষ্টায় সমর্থন দিতে ইউনিসেফ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, সুরক্ষা এবং পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি পরিষেবা যাতে শিশু ও তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছানো যায় সে জন্য আরও টেকসই, অগ্নিরোধী ও জলবায়ু-সহনশীল সুযোগ-সুবিধার নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছে। জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোতে ১ ডলার বিনিয়োগ করা হলে তা জরুরিভিত্তিতে দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠনে খরচ আনুমানিক ৪ ডলার কমায়।
#