বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে নতুন দিকনির্দেশনা দিল ইউনিসেফের গবেষণা
- বাংলা
- English
ঢাকা, ৭ মে, বাংলাদেশ- ইউনিসেফ বাংলাদেশ ও ইউনিসেফ অফিস অব স্ট্রাটেজি এন্ড এভিডেন্স, ইনোচেন্টি-এর নতুন গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে শিক্ষার মানোন্নয়ন শুধু শক্তিশালী নীতির ওপর নির্ভর করে না, বরং তা শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সেটার ওপর নির্ভর করে।
আজ বৃহস্পতিবার (৭ মে) এক অনুষ্ঠানে এই গবষেণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন (শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়), বাংলাদেশে ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিএসএইচই) মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল।
ইউনিসেফ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে তিন বছর ধরে এই গবেষণা পরিচালনা করেছে। শিক্ষার সংস্কার বাস্তবে কীভাবে কাজ করছে, তা এখানে খতিয়ে দেখা হয়েছে। সংস্কারের কোন কোন বিষয় কাজ করছে, কী কী বিষয় এতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে এবং নীতি পরিকল্পনার (পলিসি ডিজাইন) সঙ্গে প্রতিদিনের শিক্ষাদানের মধ্যে ব্যবধান কেন থাকছে- সেগুলো খুঁজে বের করা হয়েছে।
জাতীয় অগ্রাধিকার ও বিদ্যমান ব্যবস্থাসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোসহ শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট প্রধান প্রধান জাতীয় প্রতিষ্ঠান-সংস্থার সঙ্গে সম্মিলিতভাবে এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে।
গবেষণার প্রধান বার্তাসমূহ:
লার্নিং এনহ্যান্সমেন্ট স্ট্র্যাটেজি (এলইএস- শেখার প্রক্রিয়াকে সহজ ও কার্যকর করার কৌশল): শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষা দিন
- অনেক শিক্ষার্থী মৌলিক সাক্ষরতা ও গণনাদক্ষতা অর্জন ছাড়াই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে।
- কোন শ্রেণিতে পড়ে তার ভিত্তিতে শিক্ষার্থী কতটা জানে, সে বিষয়ে অনুমান না করে তার প্রকৃত শেখার স্তরের ভিত্তিতে পাঠদান করলে শিক্ষাদানের মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়।
- শিক্ষার্থীদের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন শেখানোর পদ্ধতি পাঠ্যক্রম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও বিদ্যালয় ব্যবস্থার অংশ করতে হবেএটাকে ঐচ্ছিক হিসেবে দেখা যাবে না।
পাঠ্যক্রম সংস্কার বাস্তবায়ন: সুদৃঢ় লক্ষ্য, কিন্তু প্রস্তুতির ঘাটতি
- শিক্ষকরা ২০২২ সালের পাঠ্যক্রম সংস্কার অনুযায়ী শেখানোর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।
- প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রশিক্ষণ প্রদানে বিলম্ব, সীমিত শিক্ষাসামগ্রী এবং মূল্যায়নব্যবস্থার দুর্বলতা।
- পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের জন্য আরও ভালো প্রস্তুতি, আরও টেকসই পদ্ধতি এবং শ্রেণিকক্ষ-উপযোগী উপকরণ ও কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ছোট ছোট দক্ষতার উন্নয়ন: গুরুত্ব অনেক, কিন্তু লাভবান সীমিত সংখ্যক
- শিক্ষার্থীরা ছোট ছোট দক্ষতা থেকে উপকৃত হয়, কিন্তু এসব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ এখনও সীমিত এবং সবার জন্য সমান নয়।
- ছোট ছোট দক্ষতাকে পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সমন্বিত না করে সহশিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করলে শিক্ষকরা তা বাস্তবায়নে সমস্যার সম্মুখীন হন।
- পাঠ্যক্রম, সময়সূচি ও মূল্যায়নব্যবস্থার সঙ্গে ছোট ছোট দক্ষতা তৈরির কার্যক্রমের আরও জোরালো সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
খেলাভিত্তিক শিক্ষা (গ্যামিফাইড লার্নিং): স্বল্পপ্রযুক্তির উপকরণেও উজ্জ্বল সম্ভাবনা
- কমিকভিত্তিক শিক্ষাসামগ্রী জ্ঞান অর্জনে ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে, বিশেষ করে যখন ঘরে ব্যবহার করা হয়েছে।
- ডিজিটাল উপকরণ কার্যকর, কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা (ডিভাইস ও বিদ্যুৎ সুবিধা) এর ব্যবহারকে বাধাগ্রস্ত করে।
- পরিবার ও সহপাঠীদের সম্পৃক্ততা শিক্ষার মানোন্নয়ন করে।
জেন্ডার-রেসপন্সিভ শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষকদের দৃষ্টিভঙ্গি
- শিক্ষকরা শিক্ষায় জেন্ডার সমতাকে জোরালোভাবে সমর্থন করেন, কিন্তু এর বাস্তব প্রয়োগে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে।
- বিদ্যালয়ের পরিবেশ, সামাজিক রীতিনীতি এবং নারী শিক্ষকের সীমিত প্রতিনিধিত্ব এ বিষয়ে অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।
- বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ, বাস্তবিক প্রয়োগ ও উদাহরণ এবং কমিউনিটির অধিক সম্পৃক্ততা অগ্রগতি অর্জনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষাদান (ইএমডিসি): ঘাটতি পূরণ সম্ভব
- শিক্ষার বাইরে থাকা শিশুদের তাদের প্রয়োজন ও শেখার স্বক্ষমতানুযায়ী শিক্ষাদান করলে দ্রুত শেখার ঘাটতি পূরণ করতে পারে।
- ৮০ শতাংশেরও বেশি শিক্ষার্থী সফলভাবে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরে এসেছে।
- ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় ফেরাটা টেকসই করার জন্য শিক্ষকদের জোরালো সহায়তা এবং সুপরিকল্পিত উপায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্কিলফো: সেই সব দক্ষতা, যেগুলো ভবিষ্যৎ পুনর্নির্মাণ করে
- মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে কারিগরি দক্ষতার সমন্বয় কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ও আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলে।
- স্নাতক শেষ করা অনেক শিক্ষার্থী, বিশেষ করে মেয়েরা শিক্ষানবিশ হিসেবে বা অন্যান্যভাবে কর্মজীবনে প্রবেশ করছে।
- শ্রমবাজারের সঙ্গে আরও জোরালো সংযোগ এবং দক্ষতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাল্যবিবাহ নিরসনের লক্ষ্যে বৈশ্বিক কর্মসূচি (জিপিইসিএম)
- বাল্যবিবাহের শিকার কন্যাশিশুদের মধ্যে শিক্ষানবিশ কার্যক্রম (অ্যাপ্রেন্টিসশিপ) দক্ষতা তৈরি ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে।
- সামাজিক রীতি-নীতি, চলাচলে সীমাবদ্ধতা এবং আর্থিক সেবায় অংশগ্রহণের সুযোগের ঘাটতি অগ্রগতিকে সীমিত করে।
- দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিশ্চিত করতে শ্রমবাজারের সঙ্গে আরও জোরালো সংযোগ, অর্থনৈতিক সহায়তা এবং টেকসই জীবিকার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
সামনে এগোনোর পথ
এই গবেষণার ফলাফল একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়: শিক্ষা সংস্কার তখনই সফল হয় যখন পুরো ব্যবস্থা তা বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত থাকে।
এর অর্থ হলো- শিক্ষকরা যেন পর্যাপ্ত সময় দিতে পারে তার পাশাপাশি তাদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ নিশ্চিত করা; বিদ্যালয়ভিত্তিক নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করা; অভিভাবক ও কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করা এবং সংস্কার কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের শিক্ষা সংক্রান্ত আকাঙ্ক্ষা বা লক্ষ্য নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন নেই; বরং সংস্কারগুলোকে আরও বাস্তবসম্মত ও টেকসইভাবে বাস্তবায়ন করা দরকার, যা সকল পর্যায়ের শ্রেণিকক্ষের জন্য বাস্তবসম্মত হবে; সাথে গোটা ব্যবস্থা তার সহায়ক হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- তথ্য-প্রমাণে দেখা গেছে যে, সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া শিশু ও কিশোর-কিশোরীরাও আবার শিক্ষা ব্যবস্থায় ফিরে আসতে পারে ও সফল হতে পারে, যদি শিক্ষা ব্যবস্থায় তাদের প্রয়োজন ও শেখার স্বক্ষমতাকে প্রাধান্য দেয়া হয়; অর্থাৎ শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায় যেখানে সবার জন্য থাকবে সমান শিক্ষার সুযোগ।
#####
সম্পাদকের জন্য নোট
ছবি ডাউনলোড করতে, এখানে ক্লিক করুন
পুরো রিপোর্ট ডাউনলোড করতে, এখানে ক্লিক করুন
গণমাধ্যম বিষয়ক যোগাযোগ
ইউনিসেফ সম্পর্কে
বিশ্বের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কাছে পৌঁছাতে বিশ্বের কঠিনতম কিছু স্থানে কাজ করে ইউনিসেফ। ১৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলে সর্বত্র সব শিশুর জন্য আরও ভালো একটি পৃথিবী গড়ে তুলতে আমরা কাজ করি।
ইউনিসেফ এবং শিশুদের জন্য এর কাজ সম্পর্কিত আরও তথ্যের জন্য ভিজিট করুন: www.unicef.org/bangladesh/
ইউনিসেফকে অনুসরণ করুন Twitter, Facebook, Instagram এবং YouTube-এ।