ভোলায় উজ্জ্বল ভবিষ্যত গড়ার ভিত্তি বিনির্মাণ
জীবন শুরুর প্রথম কয়েকটি বছরে ভালোবাসা, খেলাধুলা এবং পারস্পারিক বোঝাপড়া শিশুর ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে। ভোলায় একজন মা এ-বিষয়টিই শিখছেন।
- বাংলা
- English
ভোলা, বাংলাদেশ – পরিবারগুলো তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য এখন কমিউনিটি ক্লিনিকে আসে। এই ক্লিনিকে চলে ছন্দবদ্ধ গানের গুনগুন শব্দ, গল্পগুজব আর মাঝে মাঝে শিশুদের কান্নার শব্দ। সকাল গড়িয়ে গেছে। আর তখনই শুরু হলো তিন বছরের নিচের বয়সের শিশু ও তাদের অভিভাবকদের জন্য খেলার মাধ্যমে পরিচালিত শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ (আর্লি চাইল্ডহুড বিকাশ -ইসিডি) এর অধিবেশন।
মেঝেতে বিছানো লাল ফুলের নকশা করা একটি চাদরের উপর প্রায় ছয় থেকে আটজন মা তাদের সন্তানদের সাথে নিয়ে গোল হয়ে বসে আছেন। তারা অধিবেশন পরিচালনাকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী প্রদীপের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। তাদের সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে রঙিন সব ছবির বই এবং ধাঁধার বেশ কিছু কার্ড।
আঠারো মাস বয়সী মেয়ে রোজার পাশে বসে ফাহিমা বেগম ধাঁধা কার্ডের একটি ফুলের দিকে ইশারা করছেন।
তিনি জিজ্ঞাসা করছেন, “এটা কী?”
মায়ের প্রশ্ন শুনে রোজা মনোযোগ দিয়ে বইটির দিকে তাকায়। কয়েকজন বাচ্চা গরমে অস্থির হয়ে পড়েছে আবার কেউ কেউ কান্না শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু রোজার দৃষ্টি সেই ফুলটির দিকে স্থির হয়ে আছে। মাঝে মাঝে, সে তার সহপাঠীদের দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন সে ঠিকমতো কাজটি করছে কিনা তা মিলিয়ে দেখছে।
প্রথম ১০০০ দিন: যে জানালা আর খুলবে না
নিজের সন্তানকে নিয়ে এমনভাবে বসে থাকবেন দুই বছর আগেও ফাহিমা এমনটি কল্পনা করতে পারেননি। তিন সন্তানের মা ফাহিমা; তার প্রথম দুই সন্তানকে লালন পালনের ক্ষেত্রে কোন সঠিক নির্দেশনা (প্যারেন্টিং গাইডলাইন)ছিলো না তার কাছে। কেবল নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়টি জানা ছিলো তার। একটি শিশুর জীবনের প্রথম ১,০০০ দিনই তার মস্তিষ্ক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এছাড়াও এই সময়ে শিশুর সঙ্গে কথা বলা, যোগাযোগ করা ও খেলাধুলা করা—এই সাধারণ কাজগুলোই সন্তানের ভবিষ্যৎ গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। এ কথাগুলো তাকে আগে কখনও কেউ বলেনি।
“নিজের বাচ্চাদের সাথে আমি কীভাবে খেলব, সে বিষয়ে আগে আমার কোনও ধারণা ছিল না”, তিনি বলেন। “আমি না বুঝে, না জেনে ওদের খুব বকাবকি করতাম। কারণ, আমি জানতাম না যে, এটি তাদের মস্তিষ্কের বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে”, তিনি আরও বলেন। তাই প্রদীপ যখন ফাহিমার দরজায় কড়া নাড়েন, তখন পরিস্থিতি বদলে যায়। প্রদীপ পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফাহিমার পরিবারকে চেনেন। প্রদীপ গ্রামের একজন পরিচিত ও বিশ্বস্ত মুখ; তিনি আগে থেকেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান এবং মাতৃ, শিশু স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ (ইসিডি) বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খেলার উপকরণ১ পাওয়ার পর, প্রদীপ, ফাহিমার পরিবারের মতো তিন বছরের কম বয়সী শিশুদের পরিবারগুলোকে, তার দ্বারা পরিচালিত অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানাতে শুরু করেন।
প্রদীপ জানান, “আমি অনেক কিছু শিখেছি। ইসিডি এর প্রশিক্ষণ আমাকে শুধু একজন ভালো স্বাস্থ্যকর্মী হতেই সাহায্য করেনি, বরং একজন ভালো বাবা হিসেবেও গড়ে তুলেছে।”
ভিন্নভাবে সন্তানদের লালন-পালন করা
রোজা ভাইবোনদের মধ্যে তৃতীয়। কিন্তু সেই প্রথম জীবনের শুরু থেকে সঠিক খাওয়া-দাওয়া ও যথাযথ পরিচর্যা পেয়েছে; পাশাপাশি তাকেই কেবল শিশুদের বিকাশে সহায়ক ও প্রাথমিক উদ্দীপনাসমৃদ্ধকরণ বিভিন্ন কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এই সময়টা শিশুদের বিকাশের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ। এ সময় প্রতি সেকেন্ডে একটি শিশুর দশ লক্ষেরও বেশি নতুন স্নায়ু সংযোগ (নিউরাল) তৈরি হয়। এছাড়াও সঠিক পুষ্টি ও যথাযথ পরিচর্যা আজীবনের জন্য শিশুর স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সৃজননশীলতার ভিত্তি প্রস্তুত করে।তার
বড় ভাইবোনদের তুলনায় রোজার বিকাশ বেশ দ্রুত হয়েছে।
ফাহিমা বলেন, “আমার বড় মেয়ে মাহা তিন বছর বয়সে কথা বলতে শুরু করেছে। অন্যদিকে, ১৮ মাস বয়সেই রোজা অর্থপূর্ণ বাক্য তৈরি করতে শুরু করে। সে আরও বেশি সক্রিয় এবং সবকিছুতে আগ্রহী ও প্রাণবন্ত।”
ফাহিমা এবং রোজা এখন প্রতি দুই সপ্তাহে একবার করে ক্লিনিকে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশের (ইসিডি) মজার অধিবেশনে যোগ দেয়। শিশুর বিকাশগত বিলম্বের প্রাথমিক লক্ষণ সনাক্ত করার জন্য প্রতি ছয় মাস অন্তর রোজার বিকাশ সংক্রান্ত মাইলফলকগুলো পরীক্ষা করা হয়। খাওয়ানোর সময় রোজার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করতে হবে, বাড়িতে তৈরি খেলনা ব্যবহার করে তার সঙ্গে কীভাবে খেলতে হয় এবং মেয়েটিকে বাইরে নিয়ে গিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে কীভাবে পরিচিত করাতে হবে – সে বিষয়গুলো এখন ফাহিমা শিখেছেন। ফাহিমার স্বামী মহিউদ্দিন তালুকদারও এতে অংশ নেন।
মহিউদ্দিন জানান, “আমি সত্যিই আমার সন্তানদের সঙ্গে খেলতে খুব পছন্দ করি। নতুন কিছু শেখানো আর তাদেরকে শিখতে সহায়তা করতে আমার খুব ভালো লাগে।”
ফাহিমা ও মহিউদ্দিন সবসময়ই তাদের সন্তানদের ভালোবাসেন। তবে এখন তারা শিখছেন কীভাবে এমনভাবে সন্তানদের বড় করে তুলতে হয় যাতে তারা অনুভব করতে পারে যে তারাও কারও পৃথিবী – এমন অনুভূতি আসলে প্রত্যেকটি শিশুরই প্রাপ্য।
সন্তানদের মনোযোগ সহকারেখাওয়ানো থেকে শুরু করে তাদেরকে গল্প বলা, তাদের সাথে গল্প করা, তাদের সাথেনিয়মিত খেলা, এমন সব সব ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে পরিবারটি মাহা ও রোজাকে এখন আগের চেয়ে ভিন্নভাবে বড় করছেন; এতে রোজার ভিত এমন শক্তভাবে প্রস্তুত হচ্ছে যা তার বড় ভাইবোনেরা কখনও পায়নি।
দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন
গ্রামে পরিবর্তনের চিত্র সহজে চোখে পড়ে। পরিবারগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে করতে প্রদীপ ও কমিউনিটির অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীগণ দৃষ্টিভঙ্গির এই পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন। যেমন, একসময় যেখানে মায়েরা শিশুদের মাটিতে বসিয়ে রেখে অন্য কাজে চলে যেতেন, এখন তারা শিশুদের পাশে বসেন, কথা বলেন, খেলেন এবং সক্রিয়ভাবে তাদের সাথে মিথস্ক্রিয়া করেন। এখন আরও বেশি পরিবার এগিয়ে আসছে। কীভাবে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ (ইসিডি) কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারে- সে বিষয়ে তারা এখন জানতে চাচ্ছে।
তবে, এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। জায়গার স্বল্পতা, উপকরণ এবং প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে সব শিশুকে এই কার্যক্রমের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। প্রদীপ জানান, “কখনও কখনও শিশুরা কান্না করে। আবার কখনও কখনও তারা খেলার বই ছিঁড়ে ফেলে। অনেক সময় বিদ্যুৎ থাকে না। কিছু পরিবার অনেক দূরে থাকার কারণে যাতায়াতের খরচ বহন করতে পারে না।”
স্মার্ট বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মাণ
বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন এবং দৈনন্দিন স্বাস্থ্যসেবার সাথে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ (ইসিডি) পরিষেবাগুলোকে একীভূত করলে যে অসাধারণ কিছু করা সম্ভব, সে বিষয়টি দেখিয়ে দিয়েছে ভোলার মতো প্রত্যন্ত দ্বীপে ইউনিসেফের সহায়তায় বাংলাদেশ সরকার দ্বারা পরিচালিত এই পাইলট কার্যক্রমটি। দেশের কমিউনিটি ক্লিনিকের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এবং প্রদীপের মতো কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এই কার্যক্রমটি সহজেই পিছিয়ে পড়া শিশুদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এই কার্যক্রম শিশুদের কাছে তাদের পূর্ণ সম্ভাবনায় বিকশিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্দীপনা, মনোযোগ এবং ভালোবাসা প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরেছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশকে (ইসিডি) একীভূত করার ফলে খেলাধুলার আরও সুযোগ তৈরি হচ্ছে। শিশুরা নতুন কিছু শেখা এবং তাদের পুর্ণ বিকশের ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য অংশ হলো খেলাধুলা।
“ইসিডি সংক্রান্ত সেবা সারা দেশে সম্প্রসারিত করা উচিত”, নিজের চোখে নিজ কমিউনিটিতে ফলাফল দেখে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আনিসুর রহমান এই মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশের জন্য একটি শক্তিশালী নীতি-কাঠামো রয়েছে। এখন প্রয়োজন হলো, এই নীতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া এবং এমন সেবাকে দেশের প্রতিটি প্রান্তে প্রতিটি পরিবারের প্রাত্যহিক অনুশীলনের অংশ করে তোলা । এর অর্জন সুস্পষ্ট। শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ কর্মসূচিতে ব্যয় করা প্রতিটি ডলারের জন্য, বিনিয়োগের উপর ১৩ ডলার পর্যন্ত রিটার্ন পাওয়া যায়। তবে সংখ্যার বাইরেও প্রকৃত বিনিয়োগ ফেরতের মানে হলো, সুস্থ-সবল শিশুদের মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য একটি স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
একটি ভবিষ্যতের পুনর্নির্ধারণ
বাড়িতে রোজা ও মাহা একসাথে ছবির বই উল্টে-পাল্টে দেখছে। আর তাদের পাশে ফাহিমা বসে রয়েছেন।
ফাহিমা জানান, “ইসিডি নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।” তিনি আরও বলেন, “এটি আমার সন্তানদের লালন-পালনের পদ্ধতিই বদলে দিয়েছে। আমি চাই তারা পড়ালেখা শেষ করুক, শিক্ষিত হোক, আর একটা চাকরি করুক।”
কারণ, ভালোবাসা, স্নেহময় পরিচর্যা, সঠিকভাবে খাওয়ানো ও প্রারম্ভিক উদ্দীপনার মাধ্যমে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ শুরু হয়।
মোদ্দা কথা হলো, শুরু থেকেই প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ, অত্যন্ত গুরত্বপুর্ণ!
____________________________
১ এই উপকরণগুলোর মধ্যে রয়েছে, বয়সভিত্তিক এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খেলনা, ছবির বই ও ধাঁধা।
“ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য শিশুর উন্নত মস্তিষ্ক গঠনে প্রাথমিক বয়স থেকেই সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা” উদ্যোগে অব্যাহত সমর্থন এবং অসামান্য অবদানের জন্য ইউনিসেফ এলডিএস, জিনা ট্রিকট এবং গাভি-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে।

