রোহিঙ্গা শিবিরে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে স্বেচ্ছাসেবকদের অবদান

কিশোরীদের পড়াশোনা থেকে দূরে রাখার ক্ষেত্রে বাধা অপসারণে সাহায্য করছেন নারী রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকেরা

তাসনীম কিবরিয়া
Rahima, 20, a female Rohingya volunteer, sits with students during a class
UNICEF Bangladesh/2023/Sujan  
30 সেপ্টেম্বর 2024

বাংলাদেশের কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে ইউনিসেফের সহায়তাপুষ্ট একটি শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসে আছেন ২০ বছর বয়সী নারী রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক রহিমা।

“মিয়ানমারে আমি তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। আমি সেখানে স্কুলে যাওয়া পছন্দ করতাম, আমার অনেক বন্ধুও ছিল”- শিক্ষার্থী হিসেবে নিজের শৈশবের কথা স্মরণ করে বলেন ২০ বছর বয়সী রহিমা।

২০১৭ সালে হঠাৎ তার শিক্ষাজীবনের অবসান ঘটে। ওই সময় তিনি পরিবারের সাথে বাড়ি থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে এসে আশ্রয় নেন। বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছুলে তার একা ঘরের বাইরে যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এরপর দ্রুতই তার বাবা-মা তাকে বিয়ে দিয়ে দেন।

“ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার পর আমি আর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাইনি। আমার স্বামীকেও বলতে পারিনি যে, আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই”- ব্যাখ্যা করে বলেন রহিমা।

১৮ বছর বয়সেই বিয়ে হয়ে যায় রহিমার; তৈরি হয় বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ। বিয়ের এক বছরের মধ্যে তার স্বামী আরেকজনকে বিয়ে করেন যা রহিমাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়।

রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে কিশোরীরা পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নানান বাধার সম্মুখীন হয়; তার মধ্যে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর পর কিশোরী মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে বাবা-মায়েদের অনিচ্ছা, রাস্তায় হয়রানি এবং বাড়ি ও শিক্ষাকেন্দ্রের মধ্যে দূরত্ব ও নিরাপত্তাহীনতা মেয়েদের স্কুলে যেতে না দেয়ার পেছনের কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম।

নতুন লক্ষ্য

রহিমা যখন মায়ের সঙ্গে থাকতেন, তখন তার বেশিরভাগ সময় কাটত বাড়িতে, এটা বেশ অস্বস্তিকর। তবে একদিন রহিমা নিকটবর্তী একটি শিক্ষাকেন্দ্রে মেয়েদের সহায়তা করার জন্য একজন স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের বিষয়ে জানতে পারেন। বদলে যায় রহিমার জীবন।

রোহিঙ্গা শিবিরে মেয়েদের শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কমিউনিটির সদস্য ও মেয়েদের অনুরোধে, ইউনিসেফ এবং এর অংশীজনেরা ২০২২ সালে কেবল কিশোরীদের জন্য আলাদা পাঠদান শুরু করে। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইউনিসেফ মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার সময় সঙ্গে থাকার জন্য নারী রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করে। এই স্বেচ্ছাসেবকেরা শ্রেণিকক্ষে মেয়েদের সঙ্গে থাকেন এবং কোনো শিক্ষার্থী শিক্ষাকেন্দ্রে না এলে তার খোঁজখবর নেন। পাশাপাশি যেসব পরিবার তাদের মেয়েদের স্কুল পাঠাচ্ছে না তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেন।

পদটির জন্য আবেদন করার পর অল্প সময়ের মধ্যেই রহিমা শিক্ষাকেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিয়োগ পান, যা তার জীবনে একটি নতুন লক্ষ্য এনে দেয়। রহিমা স্বীকার করেন, প্রথম দিকে নতুন এই দায়িত্বের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তার কিছুটা সময় লাগে।

Rahima and Roksana (right),12, greet Kohinoor, 12, as they walk to the learning centre.
UNICEF Bangladesh/2023/Sujan   শিক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার পথে, রহিমা ও ১২ বছর বয়সী রোকসানার (ডানে) সাথে ১২ বছর বয়সী কোহিনূরের কুশলাদি বিনিময়।

রহিমা বলেন, “স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে আমি যখন কাজ শুরু করি, তখন প্রায়ই পথ হারিয়ে ফেলতাম। এতো বড় ক্যাম্পটি (শরণার্থী শিবির) বেশ বিভ্রান্তিকর মনে হতো। তবে সহায়তাকর্মী ও শিক্ষকেরা আমাকে মেয়েদের বাড়ি চিনতে সাহায্য করেন। এখন পথগুলো আমার মুখস্ত হয়ে গেছে।”

“আমাকে অল্পবয়সী মেয়েদের সঙ্গে শিক্ষাকেন্দ্রে যেতে হয়। কারণ কিছু পুরুষ পথে তাদের বিরক্ত বা উত্ত্যক্ত করতে পারে”- শরণার্থী শিবিরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে আলোকপাত করে বলেন রহিমা। তার উপস্থিতি, একটি চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে হয়রানির বিরুদ্ধে সুরক্ষামূলক ঢাল হিসেবে কাজ করে, যার কারণে মেয়েরা ও তাদের বাবা-মায়েরা নিরাপদ বোধ করেন।

রহিমার ভূমিকা কেবল মেয়েদের শিক্ষাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শরণার্থী শিবিরে মেয়েদের পড়াশোনার পক্ষে রোহিঙ্গা কমিউনিটিকে উদবুদ্ধ করতেও তিনি কাজ করে চলেছেন। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি রোল মডেল হিসেবে কাজ করেন তিনি। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা, রহিমাকে এই কাজটি নিষ্ঠার সাথে চালিয়ে যেতে বিশেষ অনুপ্রেরনা দেয়। 

Rahima accompanies Roksana and Kohinoor through the camp to the learning centre.
UNICEF Bangladesh/2023/Sujan   শরণার্থী শিবিরের ভেতর দিয়ে শিক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার পথে রোকসানা ও কোহিনূরকে সঙ্গ দেয় রহিমা।

রহিমা বলেন, “আমি বাবা-মায়েদের বলি তাদের মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে। শিক্ষা কীভাবে মেয়েদের দৈনন্দিন জীবনে সাহায্য করতে পারে সেটি তাদেরকে বোঝাই।”

শ্রেণিকক্ষে মেয়েদের সঙ্গে বসে, রহিমা তার পড়াশোনা চালিয়ে যাবার সুপ্ত বাসনাকে কাজে লাগায়। মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে বার্মিজ ও অন্যান্য যে বিষয়গুলো পড়ানো হয়, সেগুলো তিনিও পড়েন।

Rahima sits with students during a Burmese language lesson.
UNICEF Bangladesh/2023/Sujan   বার্মিজ ভাষা শিক্ষা ক্লাসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসে আছেন রহিমা।

রহিমার মতো নারী রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় ও শুধু মেয়েদের জন্য শিক্ষাকেন্দ্র চালু হওয়ায়, বাবা-মায়েরা তাদের মেয়েদের সেখানে পাঠাতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যায়ের ক্লাসে অংশগ্রহণকারী মেয়েদের সংখ্যা সাত শতাংশ বেড়ে ১৭ শতাংশ থেকে ২৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। রোহিঙ্গা কমিউনিটির বাবা-মায়েরা তাদের কিশোরী মেয়েদের শিক্ষাকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হওয়ায়, নারী রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকদের সংখ্যা ৭১ থেকে বাড়িয়ে ৩০৫ জন করা হয়েছে।

রহিমা তার নিজের এবং যেসব কিশোরীকে সঙ্গ দেন তাদের জন্য একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন। স্কুল ছাড়তে বাধ্য হওয়া এক তরুণীর পরবর্তীতে নিজ কনিউনিটিতে মেয়েদের শিক্ষা নিশ্চিতে এমন প্রচেষ্টা ও সাফল্য সত্যিই প্রশংসনীয় ও গর্বের।

“এই মেয়েরা আমার ছোট বোনের মতো। সময়ের সাথে সাথে আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। তারা আমার সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করে। আমি চাই, তারা এমন শিক্ষা লাভ করুক যাতে বড় হয়ে দায়িত্বশীল মানুষ হতে পারে এবং নিজেদের জন্য কিছু করতে পারে,” বলেন রহিমা।

 

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে মেয়েদের শিক্ষায় অবদান ও অব্যাহত সহায়তা প্রদানের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায় ইউনিসেফ।