কোভিড-১৯ মহামারীতে চাপের মুখে পড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও সেবা বিঘ্নিত হওয়ার কারনে হুমকিতে অন্তঃসত্ত্বা মা ও নবজাতক শিশুরা

কোভিড-১৯ মহামারী দেখা দেওয়ার আনুমানিক নয় মাসের মধ্যে ১১ কোটি ৬০ লাখ শিশুর জন্ম হবে বলে আশা করা হচ্ছে, ইউনিসেফ বিভিন্ন দেশের সরকার ও দাতাদের প্রতি অন্তঃসত্ত্বা নারী ও নবজাতকদের জীবনরক্ষাকারী সেবাসমূহ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানাচ্ছে

07 মে 2020
মা ও নবজাতক
UNICEF/UNI239084/Mawa

নিউইয়র্ক, ৭ মে ২০২০ - বাংলাদেশে কোভিড মহামারীকালীন সময়ের মধ্যে আনুমানিক ২৪ লাখ শিশুর জন্ম হবে এবং বৈশ্বিকভাবে ও এর প্রভাবের মধ্যে আনুমানিক ১১ কোটি ৬০ লাখ শিশুর জন্ম হবে। গত ১১ মার্চ কোভিড-১৯ মহামারী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ৪০ সপ্তাহের মধ্যে এই সব শিশুর জন্ম হওয়ার কথা রয়েছে। এই মহামারীর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য সেবা চাপের মুখে এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ প্রবাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে।

ইউনিসেফ বলছে, প্রসূতি মা ও নবজাতকদের রূঢ় বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হবে। বিশ্বজুড়ে লকডাউন ও কারফিউয়ের মতো নিয়ন্ত্রণমূলক নানা পদক্ষেপ; মহামারী সামলাতে স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রগুলোর হিমশিম অবস্থা ও সরঞ্জামের ঘাটতি; এবং ধাত্রীসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা কোভিড-১৯ রোগীদের সেবাদানে নিয়োজিত হওয়ায় শিশুর জন্মের সময় দক্ষ লোকবলের ঘাটতি থাকবে।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেন, “বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মা মাতৃত্বের স্বাদ নেওয়ার স্বপ্ন বুনছেন। তাদের এখন এমন একটি বিশ্ব বাস্তবতায় একটি নতুন জীবন আনার জন্য প্রস্তুত হতে হবে যেখানে সংক্রমিত হওয়ার ভয়ে অন্তঃসত্ত্বা মায়েরা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যেতে ভয় পাচ্ছেন, বা লকডাউন ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চাপের মুখে থাকায় তারা জরুরি সেবা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। “করোনাভাইরাস মহামারী মাতৃত্বের ওপর কতটা প্রভাব ফেলছে তা এখন কল্পনা করাও কঠিন।”

আগামী ১০ই মে মা দিবসের প্রাক্কালে  ইউনিসেফ সতর্ক করছে যে, কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপসমূহ শিশুর জন্মকালীন সেবার মতো জীবনরক্ষাকারী স্বাস্থ্য সেবা বিঘ্নিত করতে পারে, যা লাখ লাখ অন্তঃসত্ত্বা মা ও তাদের সন্তানদের বিরাট ঝুঁকিতে ফেলবে। বিশ্বের ১২৮টিরও বেশি দেশে এই দিবসটি স্বীকৃত।   

মহামারী ঘোষণার পর নয় মাসে যেসব দেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শিশুর জন্মের আশা করা হচ্ছে সেগুলো হল: ভারত (দুই কোটি এক লাখ), চীন (এক কোটি ৩৫ লাখ), নাইজেরিয়া (৬৪ লাখ), পাকিস্তান (৫০ লাখ) ও ইন্দোনেশিয়া (৪০ লাখ)। এগুলোর অধিকাংশ দেশে মহামারীর আগে থেকেই নবজাতকের উচ্চ মৃত্যু হার ছিল এবং কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে এই হার আরও বাড়তে পারে।

এমনকি ধনী দেশগুলোতেও এই সংকটের প্রভাব পড়বে। প্রত্যাশিত শিশুর জন্মের দিক দিয়ে ষষ্ঠ অবস্থানে থাকবে যুক্তরাষ্ট্রে। ।

২৪ লাখ শিশুর প্রত্যাশিত জন্ম নিয়ে গত ১১ মার্চ মহামারী ঘোষণার পর থেকে পরবর্তী নয় মাসে সর্বাধিক শিশুর জন্মের দিক দিয়ে বিশ্বে নবম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

প্রাতিষ্ঠানিক মাতৃ মৃত্যু হার ও নবজাতকের মৃত্যু হারে তেমন কোনো পরিবর্তন না হলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, কোভিড-১৯ সংকট শুরুর পর থেকে স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রগুলোতে মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ উল্লেখযোগভাবে কমে গেছে। উল্লেখ্য, ৬৩টি জেলা হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ৩৩টিতে এখন সব ধরনের জরুরি গর্ভকালীন ও প্রসূতি সেবা দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি তোমো হোযুমি বলেন, “কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা/ হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ সত্ত্বেও অন্তঃসত্ত্বা মা ও নবজাতকের জীবনরক্ষাকারী রুটিন সেবাসমূহ যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা মেনে অব্যাহত রাখা দরকার। অনাগত মাসগুলোতে অন্তঃসত্ত্বা মা ও অসুস্থ নবজাতকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রাপ্তি নিশ্চিত  করার মাধ্যমে জীবন রক্ষায় সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করছে ইউনিসেফ।”

ইউনিসেফ সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে চিকিৎসক, নার্স এবং ধাত্রীদের জন্য নির্দেশিকা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মহামারী চলাকালীন সময়ে মাতৃ, নবজাতক ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখতে সরকারকে সর্বাত্মক সহায়তা দিচ্ছে। এটি ভাইরাসের বিস্তার রোধ করতে সহায়তা করবে এবং স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগীদের সুরক্ষা দেবে। এসবের মধ্যে রয়েছে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের থেকে কোভিড-১৯ আক্রান্ত নন এমন রোগীদের থেকে পৃথক করা, হাত ধোয়া ও অন্যান্য হাইজিন বিষয়গুলি মেনে চলা এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামগুলির যৌক্তিক ব্যবহার করা।

ইউনিসেফ সতর্ক করেছে যে, বৈশ্বিকভাবে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের অন্যদের চেয়ে কোভিড-১৯ এ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রমাণ না দিলেও বিভিন্ন দেশে তাদের গর্ভকালীন, সন্তান জন্মকালীন ও সন্তান জন্মের পরের সেবা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অসুস্থ নবজাতকের জরুরি সেবা লাগবে যেহেতু তাদের মৃত্যু ঝুঁকি বেশি থাকে। এছাড়া শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করার জন্য সহায়তা, এবং শিশুকে সুস্থ রাখতে ওষুধ, টিকা ও পুষ্টি প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বজুড়ে মায়েদের পক্ষে ইউনিসেফ অনাগত মাসগুলোতে জীবন রক্ষায় বিভিন্ন দেশের সরকার ও স্বাস্থ্য সেবাদাতাদের প্রতি নিম্নোক্ত জরুরি আহ্বান জানাচ্ছে:

  • অন্তঃসত্ত্বা নারীদের গর্ভকালীন চেকআপ, সন্তান জন্মের সময় ও জন্মের পরের সেবা এবং প্রয়োজন মতো কোভিড-১৯ সংক্রান্ত সেবা পেতে সহায়তা প্রদান।
  • স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরীক্ষা করানো নিশ্চিত করতে হবে এবং কোভিড-১৯ এর টিকা বের হলে তাদের দিতে হবে যাতে মহামারীর সময়ে তারা সব অন্তঃসত্ত্বা নারী ও নবজাতককে মানসম্পন্ন সেবা প্রদান করতে পারেন।
  • শিশুর জন্মের সময় ও তৎপরবর্তী সময়ের জন্য স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধের সব ধরনের পদক্ষেপের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।  
  • অন্তঃসত্ত্বা নারী ও প্রসূতি মায়েদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতের জন্য স্বাস্থ্য কর্মীদের হোম ভিজিটের সুযোগ দিতে হবে। আর প্রত্যন্ত এলাকার নারীদের গর্ভকালীন ও প্রসূতি সেবার জন্য তৈরি করা বাড়িতে (ম্যাটারনাল ওয়েটিং হোম) থাকা এবং টেলিফোনে পরামর্শ গ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে।
  • যেসব জায়গায় স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে সেখানে বাড়িতে গিয়ে সন্তান জন্মকালীন সেবা প্রদানে স্বাস্থ্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং জীবাণুমুক্ত বার্থ কিটসহ সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে।
  • জীবনরক্ষাকারী সেবাসমূহ নির্বিঘ্ন রাখতে প্রায়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামের সঙ্গে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক উপকরণ বরাদ্দ দিতে হবে।

গর্ভকালে বা সন্তান জন্মের সময় মা থেকে সন্তানে ভাইরাস সংক্রমিত হয় কি না তা এখনও জানা না যাওয়ায় ইউনিসেফ সব মায়েদের জন্য নিম্নোক্ত সুপারিশ করছে:

  • ভাইরাস সংক্রমণ থেকে সুরক্ষায় সব ধরনের পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অনুসরণ, কোভিড-১৯ এর উপসর্গ দেখা দিয়েছে কি না তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং কারও উপসর্গ দেখা দিলে বা এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লে নিকটস্থ স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রের পরামর্শ নিতে হবে।
  • অন্যদের কোভিড-১৯ সংক্রমণ এড়াতেও একই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিতে হবে; শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, একসঙ্গে হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে এবং অনলাইনে স্বাস্থ্য সেবা পরামর্শ নিতে হবে।
  • আক্রান্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস, কাশি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা সেবা নিতে হবে।
  • মায়ের দুধের নমুনা পরীক্ষায় ভাইরাস পাওয়া না যাওয়ায় মা সংক্রমিত বা সংক্রমণ ঘটেছে বলে সন্দেহ হলেও শিশুকে বুকের দুধ খাইয়ে যেতে হবে। আক্রান্ত মায়েদের শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মুখে মাস্ক পরতে হবে, শিশুকে স্পর্শ করার আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হবে এবং তিনি যেসব জায়গা ও জিনিসপত্র ব্যবহার করবেন সেগুলো নিয়মিত জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।
  • মা নবজাতককে ধরতে পারবেন এবং বুকের মধ্যে নিয়ে রাখতে পারবেন (স্কিন টু স্কিন কেয়ার)।
  • নিরাপদে সন্তান জন্মদান কোথায় হবে সে বিষয়ে ধাত্রী বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং উদ্বেগ কমাতে সন্তান জন্মদান নিয়ে পরিকল্পনা সাজাতে হবে এবং প্রয়োজনের সময় ওই জায়গা যেন পাওয়া যায় তা নিশ্চিত করতে হবে।
  • শিশুর জন্মের পরেও নিয়মিত টিকাদানসহ চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।

কোভিড-১৯ মহামারীর আগেও প্রতি বছর ২৮ লাখ অন্তঃসত্ত্বা নারী ও নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে, অর্থাৎ প্রতি ১১ সেকেন্ডে একজন, প্রতিরোধ করা যায় এমন কারণেই অধিকাংশেরই মৃত্যু হয়।
গর্ভের সময়, সন্তান জন্মদান ও জন্মের পরে জটিলতা প্রতিরোধ ও তার চিকিৎসায় প্রতিটি মা ও নবজাতক যেন নিরাপদ হাতের সেবা পায় সেজন্য স্বাস্থ্য কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়ে প্রস্তুত করতে অবিলম্বে বিনিয়োগ করতে আহ্বান জানাচ্ছে ইউনিসেফ।

গণমাধ্যম বিষয়ক যোগাযোগ

ফারিয়া সেলিম
ইউনিসেফ বাংলাদেশ
টেলিফোন: +8801817586096
ই-মেইল: fselim@unicef.org
সাবরিনা সিধু
ইউনিসেফ দক্ষিণ এশিয়া (নিউ দিল্লি)
টেলিফোন: +91 9384030106
ই-মেইল: ssidhu@unicef.org

ইউনিসেফ সম্পর্কে

প্রতিটি শিশুর অধিকার ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বিশ্বের ১৯০ টি দেশে কাজ করছে ইউনিসেফ। সকল বঞ্চিত শিশুদের পাশে থাকার অঙ্গীকার নিয়ে আমরা কাজ করি বিশ্বের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে।

আমাদের কাজ সম্পর্কে আরো জানতে ভিজিট করুন: www.unicef.org.bd

ইউনিসেফের সাথে থাকুন: ফেসবুক এবং টুইটার