শেরপুর জেলা সদর হাসপাতাল: পর্দার আড়ালে থাকা তিন হিরো’র গল্প

এই হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ডে দায়িত্বশীল ও একনিষ্ঠ এই ত্রিতয় দৃশ্যপটের আড়ালে থেকেই মা ও নবজাতকদের নিরাপদ রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন অক্লান্তভাবে

স্তুতি শর্মা
50-year-old Shahanaz is one of the cleaning staff at Sherpur District Sadar Hospital.
UNICEF/UNI809502/Mukut
08 জুলাই 2025

রাজধানী ঢাকা থেকে ২০০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত শেরপুর জেলা সদর হাসপাতাল। এখন মে মাস, ধান কাটার মৌসুম। তাই প্তহে আপনার চোখে পড়বে নরম রোদে দুলতে থাকা পাকা সোনালী ধান, কৃষকদের ফসল কাটার দৃশ্য আর রাস্তার পাশে কাঁঠাল গাছের ডালে গুচ্ছ গুচ্ছ কাঁঠাল।

খোলা মাঠ পেরিয়ে রাস্তার ধার ঘেঁষে যখন বাজার আর রিকশা স্ট্যান্ড চোখে পড়বে, তখনই বুঝবেন শেরপুর শহর চলে এসেছে। তবে সদর হাসপাতালে পৌঁছুতে আপনাদের স্থানীয়দের সহযোগিতা নিতে হতে পারে; তখন অবশ্য যেকোনো অ্যাপের থেকে অনেক দ্রুত এবং সহজে আপনাকে পথ চিনিয়ে দিবে রাস্তার ধারের ফুচকা বিক্রেতা ‘মামা’।

প্রতিদিন এই হাসপাতালে দুই হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন, যার মধ্যে প্রায় ২০০ জনই শিশু। পুরনো ভবনের চারতলায় অবস্থিত মহিলা ওয়ার্ড; ওয়ার্ডের রোগী ও নারী দর্শনার্থীদের গোপনীয়তা রক্ষা করতে দরজায় পর্দা টানানো আছে।

মহিনা এই ওয়ার্ডকে এককথায় সচল রাখতে যে ‘হিরো’ নীরবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন তার নাম শাহনাজ। 

শাহনাজ: যিনি সংক্রমণ থেকে মা ও নবজাতকদের সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করেন

পঞ্চাশ বছর বয়সী শাহনাজ তার জীবনের প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন এই হাসপাতালে। তার বাড়ি ত্থেকে হাসপাতালে আসতে প্রতিদিন পাঁচ টাকা লাগে- বাংলাদেশের অনেক জেলার মতন শেরপুরেও রিকশা ভাড়া দিয়ে দূরত্ব মাপা হয়, কিলোমিটার বা মাইল হিসেব করে নয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে শাহনাজের প্রতিদিনের দায়িত্বের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ওয়ার্ডের মেঝে পরিষ্কার রাখা, শৌচাগার ব্যবহারযোগ্য রাখা এবং সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা, যা নানা রকমের সংক্রমণের হাত থেকে ওয়ার্ডকে রক্ষা করে থাকে - এভাবেই নিঃশব্দে সংক্রমণের হাত থেকে দিনের পর দিন হাজার হাজার জীবন বাঁচিয়ে চলেছেন শাহনাজ।

“মানুষ টয়লেটে সব ধরনের জিনিসপত্র ফেলে- স্যানিটারি প্যাড, ব্যবহৃত তোয়ালে, এমনকি প্লাস্টিকের বোতলও,” বলেন শাহনাজ। তিনি বলেন, “অনেকেই স্কোয়াটিং পট (প্যান) ব্যবহার করতে অভ্যস্ত, কমোড কীভাবে ব্যবহার করতে হয় জানেন না, সে কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।”

বছরের পর বছর, ভাঙা কল, আটকে পড়া অকেজো টয়লেট, লিক করা বেসিন, বদ্ধ নালা আর পাইপ এবং হাসপাতালের রুমের (কক্ষগুলোর) কাছে বর্জ্যের স্তূপ- এসব হরহামেশাই দেখেছেন তিনি। কিন্তু সম্প্রতি তিনি বড় ধরনের এক পরিবর্তন লক্ষ করেছেন।

“আমি জানি না, এটা কে করেছিল, কিন্তু আমি কিছু পরিবর্তন দেখেছি,” বলেন শাহনাজ। তিনি বলেন, “নতুন টাইলস, মেরামতকৃত টয়লেট ও বেসিন, খাবার পানির আলাদা স্টেশন (জায়গা) এবং একেক ধরনের বর্জ্যের জন্য একেক রঙের নতুন ডাস্টবিন- এগুলোর ফলে খুব উপকার হয়েছে।”

এসব উদ্যোগ ওয়াশ ফিট প্রকল্পের আওতায় নেয়া হয়েছে; রিপাবলিক অব কোরিয়া (কোরিয়া প্রজাতন্ত্র) ও ইউনিসেফের সহায়তায় ওয়াশি ফিট প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে।

“এখন আমাদের কাজ অনেক সহজ হয়ে গেছে,” বলেন শাহনাজ। তিনি আরও বলেন, “মানুষও আগের চেয়ে অনেক সচেতন হয়েছে। টয়লেটগুলো আর দিনের পর দিন অকেজো হয়ে পরে থাকছে না।”

শাহনাজের কাজটি কঠিন তবে তার স্বীকৃতি মেলে খুবই সামান্য। কিন্তু তাকে ছাড়া শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ড যেন অকেজো।

তাহমিনা: পৃথিবীতে নতুন প্রাণ আনতে সহায়তা করেন যিনি

শাহনাজ যখন মহিলা ওয়ার্ডের বারান্দার মেঝে মোছেন, ২৬ বছর বয়সী মিডওয়াইফ তাহমিনা আখতার তখন বেশ সতর্কতার সাথে তার পাশ দিয়ে হেঁটে যান যেন পরিষ্কার মেঝেতে কোনভাবেই তার জুতোর ছাপ না পড়ে।

গত চার বছর ধরে তাহমিনা মায়েদের জীবনের সবচেয়ে আবেগপূর্ণ ও নাজুক মুহূর্তগুলোতে তাদের পাশে থেকেছেন। তিনি সন্তান প্রসবের জন্য মায়েদের প্রস্তুত করেন, সন্তানের প্রথম কান্নার জন্য অধীর অপেক্ষায় থাকা মায়েদের মানসিক সহায়তা দেন, সিজারিয়ান অপারেশনের পর মায়েদের সেরে উঠতে সহায়তা করেন এবং প্রতিটি নবজাতক যেন জন্মের প্রথম কয়েক ঘণ্টায় সর্বোত্তম সেবা পায় সেটা নিশ্চিত করেন।

তাই ওয়াশ ফিট প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার পর থেকে তাহমিনা এবং তার সহকর্মী নার্স ও চিকিৎসকেরা শাহনাজের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করছেন, যাতে মহিলা ওয়ার্ডে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত হয়।

তাহমিনা বলেন, “জন্মের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা মা ও শিশু দুজনেই সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে। তাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটা জীবন রক্ষাকারী একটি উদ্যোগ। সে কারণেই আমরা এটাকে সবার দায়িত্ব হিসেবে দেখি।”

কিন্তু ওয়ার্ডটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা সব সময় সহজ ছিল না।

“ওয়াশ ফিট-এর উদ্যোগগুলোর আগে সাধারন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাটাই বেশ কষ্টসাধ্য ছিলো,” সে সময়ের অবস্থা স্মরণ করে বলেন তাহমিনা। তিনি আরও বলেন, “আমাদের পর্যাপ্ত সংখ্যক ময়লার ঝুড়ি ছিল না। প্রায়ই সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়া মা, তাদের সেবাদান/যত্নকারী ও হাসপাতালের কর্মীদের শুধু হাত ধোয়ার জন্য বা ব্যবহার উপযোগী একটি টয়লেটে যেতে তিন তলা নিচে নামতে হত।”

এখন পরিস্থিতি অনেক ভালো হয়েছে। বর্তমানে প্রতিটি রোগী একটি ব্যক্তিগত ময়লা ফেলার বাক্স পান, ওয়ার্ডের হাত ধোয়ার জায়গাগুলো পুরোপুরি কার্যকর আর রঙভিত্তিক ডাস্টবিনগুলো বর্জ্য সঠিকভাবে আলাদা করতে সহায়তা করছে। তাহমিনা বলেন, এই উদ্যোগগুলো সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে।

“এখন আমাদের আরও ভালো সুযোগ-সুবিধা রয়েছে এবং সেগুলো সঠিকভাবে ব্যবহারের জন্য আমরা প্রশিক্ষণও পেয়েছি,” বলেন তাহমিনা। তিনি বলেন, “এখন আমাদের যা প্রয়োজন তা হলো, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সহায়তা, যাতে এই উন্নতি দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই হয়।”

56-year-old Hasnan is an electrician who has taken up multiple roles at the hospital.
UNICEF/UNI809511/Mukut ৫৬ বছর বয়সী হাসনান একজন ইলেকট্রিশিয়ান, যিনি হাসপাতালে একাধিক ভূমিকা পালন করছেন।

হাসনান: যিনি সব কিছু ঠিক করে দেন

৫৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ আব্দুল হাসনানের কোন ইউনিফর্ম নেই। তাকে ডেলিভারি বেডের পাশে দাঁড়াতে হয় না বা মহিলা ওয়ার্ডে রোগীদের পরামর্শ দিতে হয় না। তারপরেও তাকে ছাড়া শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালের অনেক কিছুই স্থবির হয়ে পড়বে। তিনি আমাদের আজকের তৃতীয় ‘অগোচর নায়ক’।

হাসনানের অফিসিয়াল পদবী ইলেকট্রিশিয়ান হলেও তার দায়িত্ব আরও অনেক বেশি। ভোরে উঠেই পানির পাম্প চালু করা, ত্রুটিপূর্ণ সার্কিট মেরামত করা বা ভাঙা ও নষ্ট কল ঠিক করা- এসব কাজ তিনি রোগী বা ডাক্তার বুঝে উঠার আগেই সেরে ফেলার চেষ্টা করেন যাতে কারও কোন অসুবিধা না হয়।

হাসনান বলেন, “আমি এখানে প্রায় ৩০ বছর ধরে আছি। বিদ্যুতের কাজ, প্লাম্বিং এর কাজ(কল/পানির লাইন ঠিক করা), রক্ষণাবেক্ষণ অথবা যদি কিছু ভাঙে তাহলে সেটা ঠিক করার জন্য তারা আমাকে ডাক দেয়।” মহিলা ওয়ার্ডেও একই ঘটনা। কিছু কাজ না করলে শাহনাজ সব সময় সমাধানের জন্য হাসনানের সঙ্গেই যোগাযোগ করেন।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় হাসনান ইউনিসেফ থেকে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা (ওয়াশ) বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। এই প্রশিক্ষণ তাকে হাসপাতালে পানি সরবরাহ ঠিক রাখা, ট্যাংক পরিষ্কার রাখা এবং আরও কার্যকরভাবে টয়লেট রক্ষণাবেক্ষণে সহায়তা করেছে।

তাই ইউনিসেফ ও তার অংশীজনেরা যখন ওয়াশ ফিট প্রকল্পের আওতায় এই হাসপাতালে মূল্যায়ন কার্যক্রম (এসেসমেন্ট) শুরু করে, তখন হাসনান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি প্রকৌশলীদের সঙ্গে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরে তাদেরকে হাসপাতালের অবকাঠামো বুঝতে সহযোগিতা করেন এবং নার্স ও রক্ষণাবেক্ষণ দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে প্রতিটি বিবরণ নথিভুক্ত ও সমাধান নিশ্চিত করেছেন। উন্নয়ন কাজ চলার সময়ও তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন- নতুন পাইপ বসানো, পয়ঃনিষ্কাশনের লাইন এবং উপরের ট্যাংকগুলো পরিষ্কার করার মতো কাজে নিজ হাতে করেছেন।

এরপরেও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়ে যায়। হাসনান মনে করেন, নতুন হাসপাতাল ভবনেও একই ধরনের উন্নয়ন তথা উদ্যোগের প্রয়োজন। তিনি বলেন, “ইউনিসেফের সহায়তায় পুরনো হাসপাতাল ভবনে বড় পরিবর্তন এসেছে। যদি আমরা নতুন ভবনেও একই মডেল অনুসরণ করে উন্নতি করতে পারি, তাহলে রোগী, দর্শনার্থী, স্টাফ- সবার জন্যই ভালো হবে।”

###

সম্পাদকদের জন্য নোট:

ওয়াশ ফিট প্রকল্প সম্পর্কে

রিপাবলিক অব কোরিয়ার (আরওকে) সহায়তায় পরিচালিত ওয়াশ ফিট প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশজুড়ে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা (ওয়াশ) সেবা জোরদার করা হয়েছে। এতে শিশু ও তাদের পরিবারের স্বাস্থ্য সেবা, নিরাপত্তা ও মর্যাদার উন্নয়ন ঘটছে। ১৬টি স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানে সমন্বিত ওয়াশ মূল্যায়নের পর ইউনিসেফ দুটি জেলা হাসপাতাল এবং পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।

ইউনিসেফ বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নে সহায়তা করেছে, যার মধ্যে রয়েছে পানির ট্যাংক পরিষ্কার ও মেরামত, ক্ষতিগ্রস্ত পাইপ পরিবর্তন, টয়লেট আধুনিকায়ন এবং নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা টয়লেট, নিরাপদ খাবার পানির জন্য ওয়াটার ফিল্টার স্থাপন, মাসিকের সময়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে চলার জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সুবিধা স্থাপন এবং বর্জ্য পৃথকীকরণ ব্যবস্থা চালু করা।

এই প্রকল্প স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ওয়াশ সেবাসমূহ উন্নত করে জনস্বাস্থ্য শক্তিশালী ও উন্নয়ন করার ক্ষেত্রে একটি সম্প্রসারণযোগ্য মডেল সামনে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল এসব উন্নতির বিস্তারে সহায়তা করতে পারে এবং শিশু ও তাদের পরিবারের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য সেবায় এবং সরকার নির্ধারিত মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবার মানদণ্ডের তালিকায় যেন ওয়াশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, সেজন্য ইউনিসেফ সোচ্চার থাকবে।