নতুন মা ও নবজাতকদের আশার আলো
ইউনিসেফের সমর্থনপুষ্ট স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিটে সময় মতো সেবা পেল অপরিণত বয়সে জন্ম নেওয়া সারিদ; এখন সে বেড়ে উঠছে মা-বাবার মমতায়
- বাংলা
- English
নভেম্বরের মাস; কক্সবাজারে হালকা শীত পড়ছে। এমনি এক সকালে হাসপাতালে যাবার পথেই একটি অটোরিকশার ভেতর এক মা জন্ম দিলেন তার ছোট্ট এক শিশুকে।
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের সামনে থামল অটোরিকশাটি। স্বাস্থ্যকর্মীরা দ্রুত এগিয়ে এসে ক্লান্ত মা ও তার নবজাতককে হাসপাতালের ভেতরে নিয়ে যান। স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি দল মাকে লেবার ওয়ার্ডে নিয়ে যান আর আরেকটি দল অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে ছোট্ট শিশুটিকে স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিটে (স্ক্যানু) নিয়ে যান।
এই মার নাম মিসনাহার, বয়স ৩৫ বছর। তার ছেলে সন্তানটি জন্ম নিয়েছিল নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে- ওজন ছিল মাত্র ৯০০ গ্রাম এবং জন্মের পরপরই তার শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।
স্ক্যানুর ভেতরে নার্সরা তাৎক্ষনিক শিশুটিকে অক্সিজেন দিয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। তার ছোট্ট শরীর জুড়ে কেবল নল আর বিভিন্ন ধরনের তার; সার্বক্ষনিক যন্ত্রের সাহায্যে ছোট্ট শিশুটির প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রথম ২৪ ঘণ্টা মিসনাহার তার শিশুকে কোলে নিতে পারেননি।তিনি শুধু বিশেয়ায়িত এই ইউনিটের কাঁচের দেয়ালের ওপার থেকে তাকিয়ে তাকিয়ে ছেলেকে দেখেছেন, চোখ ভরা তারভয়, উৎকণ্ঠা আর অল্প খানিক আশা।
‘আমি কান্না চেপে রাখতে পারছিলাম না। প্রথম ১৫ দিন ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোর কয়েকটি’, বলেন মিস নাহার।
দুই মাস পরে
আজ মিসনাহারের সন্তানের ওজন ১ দশমিক ৫ কিলোগ্রাম। এখনো খুব ছোট হলেও ধীরে ধীরে তার স্বাস্থ্যের উন্নতি হচ্ছে। মিসনাহার তার ছেলের নাম রেখেছেন মীর মোহাম্মদ সারিদ। প্রতিদিনই তিনি শিখছেন কীভাবে সন্তানের যত্ন নিতে হবে।ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার পদ্ধতির মাধ্যমে তাকে উষ্ণ রাখা, শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো, প্রতিবার দুধ খাওয়ানোর পর আলতো করে ঢেঁকুর তোলানো, সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে ঘন ঘন নিজে হাতধোয়া- এসব তিনি মনোযোগ দিয়ে মেনে চলছেন। সারিদের চাহিদাগুলো কীভাবে বুঝতে হবে, তা নার্সরা তাকে দেখিয়ে দিয়েছেন। বাড়ি যাওয়ার পর কোন কোন বিষয়ের দিকে নজর রাখতে হবে, তা চিকিৎসকেরা বুঝিয়ে দিয়েছেন। তিনি প্রতিটি নির্দেশনা যত্ন সহকারে মেনে চলেছেন, আর তাতেই বড় পরিবর্তন এসেছে।
সারিদের এখনও নিয়মিত ফলো-আপের (চিকিৎসক দেখানো) প্রয়োজন রয়েছে। তার পরবর্তী স্ক্রিনিংয়েরেটিনোপ্যাথি আছে কিনা তা পরীক্ষা করা হবে। রেটিনোপ্যাথি হলো চোখের একটি সমস্যা যা অপরিণত বয়সে জন্ম নেয়া শিশুদের মধ্যে সাধারণত দেখা যায়, বিশেষ করে যে সকল শিশুদের জন্মের সাথে-সাথেই অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। মিসনাহার জানেন, সামনের পথটা বেশ কঠিন, আর তা পাড়ি দিতে তার সর্ব প্রথম প্রয়োজন ধৈর্য। ধীরে ধীরে তার ভয় দূর হয়ে আশাবাদ তৈরি হচ্ছে।
“আমি চাই আমার ছেলে বড় হয়ে একজন চিকিৎসক বা নার্স হবে,” বলেন মিসনাহার। তিনি আরও বলেন, “এখানকার লোকজন আমাদের সন্তানের জীবন বাঁচিয়েছে। হয়ত একদিন সে অন্যদের জীবন বাঁচাবে।”
সারিদের জীবন বাঁচাতে দুইটা জিনিস চমৎকার ভূমিকা রেখেছে – ১। মিসনাহার ঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে পেরেছিলেন, আর ২। সঠিক সময়ে সে বিশেষায়িত নবজাতক সেবা পেয়েছিলো।
বাংলাদেশে প্রতি ১,০০০ জীবিত জন্মের মধ্যে ২২টি নবজাতকের মৃত্যু ঘটে। সম্প্রতি প্রকাশিত মাল্টিপল ইনডেক্স ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫–এর প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুদের মোট মৃত্যুর ৬৭শতাংশই নবজাতকদের মৃত্যু। তাই, নবজাতকদের জীবন রক্ষা করতে পারাটাই শিশু স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
ইউনিসেফও এর অংশীজনেরা দেশজুড়ে ৬২টি সরকারি হাসপাতালে স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিট (স্ক্যানু) প্রতিষ্ঠায় সরকারকে সহায়তা করেছে। এই ইউনিট গুলোতে রয়েছে কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশু এবং সারিদের মতো গুরুতর অসুস্থ নবজাতকদের জীবন রক্ষাকারী সেবার ব্যবস্থা যেমনঃ অক্সিজেন সেবা, রেডিয়েন্ট ওয়ার্মার, ফটোথেরাপি, রিসাসিটেটর ও নিরবছিন্ন পর্যবেক্ষণ যন্ত্র ও ব্যবস্থা।
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল, যেটাস্থানীয় কমিউনিটি এবং ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি রেফারেল স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে, সেখানে ৬৫-বিছানার স্ক্যানু জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে এক মাইলফলক।
বিশেষায়িত সেবার এই ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালনকারী মেডিকেল অফিসারদের একজন ডা. ইমতিয়াজ; তিনি বলেন, “এই ইউনিট নবজাতকদের স্বাস্থ্য সেবায় বিরাট পরিবর্তন এনেছে। আমরা শিশুদের শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারছি আর কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে।”
এই ইউনিটে চিকিৎসা সেবার চাহিদাও অনেক বেশি। সবগুলো বিছানা বা সিট ভর্তি থাকে প্রায় সবসময়। চিকিৎসক ও নার্সরা সার্বক্ষনিক এক বিছানা থেকে অন্য বিছানায়, এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে যাচ্ছেন; শিশুদের গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক লক্ষ্মণ বা পরিবর্তনগুলো পরীক্ষা করে দেখছেন, কারও কারও অক্সিজেন লেভেল তার প্রয়োজন অনুযায়ী ঠিক করে দিচ্ছেন; ক্লান্ত, উত্তেজিত ও অসুস্থ শিশুগুলোকে শান্ত করে একটু আরাম দিতে নিরলস চেষ্টা করে চলেছেন তারা।
এদিকে কাঁচের দেয়ালের বাইরে সবসময়ই এক ঝাঁক বাবা-মাকে অপেক্ষা করতে দেখা যায় - কেউ কেউ চুপচাপ প্রার্থনা করছেন, কেউ জানালায় হাত রেখে সন্তানকে এক ঝলক দেখার চেষ্টা করছেন; কেউবা অপলক দৃষ্টিতে অপেক্ষা করছেন, এই বুঝি একজন নার্স এসে বলবেন যে – আপনার শিশুকে আপনি এখনই কোলে নিয়ে জড়িয়ে ধরতে পারবেন। ওদিকে কাঁচের দেয়ালের ভেতরটা বেশ নিঃশব্দ; কেবল মনিটরের বীপ-বীপ শব্দ, মৃদু কান্নার আওয়াজ আর স্বাস্থ্য কর্মীদের পায়ের শান্ত শব্দ।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে জোরদার করা
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ইউনিসেফ স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, তাদের বেতন দিয়েছে, নিশ্চিত করেছে আরও উন্নত সেবা, অবকাঠামোর সংস্কার ও ডেটা সিস্টেমের উন্নয়ন, পাশাপাশি সরবরাহ করেছে পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্র থেকে শুরু করে পরিষ্কার পানীয় জলের ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জামাদি, যা কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ভালো স্বাস্থ্য সেবাও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করেছে।
এসব বিনিয়োগের কারণে হাসপাতালকে ২৪ ঘণ্টাই মা ও নবজাতকের সেবা, টিকা প্রদান, পুষ্টিপরামর্শ এবং স্থানীয় কমিউনিটি ও শরণার্থীদের জরুরি সেবা প্রদানের জন্য প্রস্তুত রাখা সম্ভব হয়েছে।
মিসনাহারের মতন এমন কঠিন মুহূর্তে নবজাতক শিশুদের জীবন বাঁচাতে যে জরুরী ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা প্রয়োজন তার সবগুলোই এক ছাদের নিচে সরবরাহ করা এখন সম্ভব; এভাবেই মিসনাহারের মতন উপকৃত হয়েছে আরও অনেক পরিবার। আর একেকটা শিশু যখন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যায়, তখন তাদের এক প্রকার প্রশান্তি লাগে, মনে হয় তাদের সকল পরিশ্রম স্বার্থক।
“যখন কোন শিশু সেরে ওঠে এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি যায়, আমরা সবাই সেই মুহুর্তটাকে খুব উপভোগ করি, উদযাপন করি,” বলেন ডা. ইমতিয়াজ। তিনি আরও বলেন, “এই মুহূর্তগুলো আমাদেরকে সামনে এগিয়ে যেতে শক্তি যোগায়।”
মিসনাহারের জন্য অবশ্য এর অর্থ খুব সাধারণ-তার ছেলেকে চোখের সামনে বড় হতে দেখা, সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে দেখা, ছেলেকে বুকে জড়িয়ে আদর করা।