সংকটের মধ্যে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে দ্বারে দ্বারে
যে অঞ্চলে এক সময় সুপেয় পানির জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে এবং দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হত, সেই টেকনাফে সৌরশক্তিচালিত সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বাসিন্দাদের নিরাপদ খাবার পানি পাওয়ার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে, আর তা প্রতিটি শিশুর পরিবারে আশার সঞ্চার করছে।
- বাংলা
- English
টেকনাফ, বাংলাদেশ- বাংলাদেশের উপকূলীয় গ্রাম জালিয়াপাড়ায় তাহমিনা আখতার মমতাভরে তার এক বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ হাবিবকে দোল দিচ্ছেন, ঠিক সেই সময় তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয় ২০ লিটার বিশুদ্ধ পানির একটি জার। এটি দেখতে সাধারণ মনে হলেও এটা তাহমিনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। এটি তার জীবনের পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করে।
“এমনও দিন ছিল যখন আমাকে প্রায় এক কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হত এবং মাত্র এক কলসি পানির জন্য তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হত,” সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন তাহমিনা। তিনি আরও বলেন, “আমি আমার ছেলেকে একা রেখে যেতে না পারলে আমাদের পানি না খেয়ে থাকতে হত বা আশপাশে যে পানি পেতাম সেটাই খেতে হত আর ওই পানি খেয়ে আমরা প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তাম।”
বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তের টেকনাফের হাজারো মানুষকে প্রতিদিন যে সংগ্রাম করতে হত, সেটাই তুলে ধরে তাহমিনার এই অভিজ্ঞতা। এমন একটা সময় ছিল যখন পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার কারণে পরিবারগুলো মারাত্মক সংকটে পড়েছিল, বিশেষ করে যখন তারা অগভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীল ছিল। অনেক সময় পানি কিনে খেতে হয়। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, অনেকের পক্ষে পানি কেনার খরচ বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এক মহা সংকট
টেকনাফের পানি সংকট বেশ জটিল। ভূতাত্ত্বিকভাবে এ অঞ্চলে অল্প কিছু বিচ্ছিন্ন মিষ্টি পানির স্তর (অ্যাকুইফার) রয়েছে। এমনকি এখানকার গভীর নলকূপগুলোও ব্যবহারযোগ্য পানি সরবরাহে হিমশিম খাচ্ছে, কারণ প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৩ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত নেমে যাচ্ছে। এক সময় যেখানে ৬০-৭০ ফুট নিচে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া যেত, এখন অনেক ক্ষেত্রে তা পেতে ৫০০ ফুট পর্যন্ত খনন করতে হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে গভীরতর পানির স্তরগুলোতেও লবণাক্ততা প্রবেশ করে এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই পানি সংকটের প্রভাব পড়ছে স্থানীয় অর্থনীতির উপরও। চিংড়ি চাষ, লবণ উৎপাদনসহ স্থানীয় বিভিন্ন কার্যক্রম ভূ-গর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ আরও ত্বরান্বিত করেছে। এর পাশাপাশি অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ের কারণে মিষ্টি (মিঠা) পানির উৎস খুঁজে পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
শিশুদের ওপর এর প্রভাব আরও তীব্র। অনিরাপদ খাবার পানির কারণে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাতে তাদের স্কুলে অনুপস্থিতি বাড়ে এবং শিশুদের পুষ্টিহীনতা দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে তাহমিনার মতো মায়েদের সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে গিয়ে প্রতিদিন অন্তহীন দুশ্চিন্তা, মুল্যবান সময়ের অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় পরিশ্রম করতে হয় যা তাদের প্রতিদিনের টিকে থাকার সংগ্রামকে আর কঠিন করে তোলে। অন্যদিকে আবার লবণাক্ত পানি পান করার ফলে উচ্চ রক্তচাপ ও অন্যান্য হৃদ্রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়, বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের জন্য তা বেশ ক্ষতিকর।
আজিজা ও কুলসুমা: দৃঢ় সংকল্পের দুই নাম
আজিজা আখতার ও উম্মে কুলসুমা দুজনেরই বয়স ১৫ বছর। বিশুদ্ধ পানি আনার জন্য প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় তাদের প্রায় এক কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হত। ওই সময় গ্রামের রাস্তাগুলো নিস্তব্ধ ও অন্ধকার হয়ে যেত, এই পরিস্থিতি তাদের একা চলাফেরার ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ছিলো বেশ বিপজ্জনক।
বর্ষা বা বন্যার মৌসুমে এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যেত। রাস্তাঘাট চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ত এবং দিনের পর দিন নিরাপদ পানি পাওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যেত।
রান্নার পানি না থাকায় তাদের পরিবারগুলোকে প্রায়ই শুকনো মুড়ি খেয়ে দিন কাটাতে হতো। দূর থেকে পানি আনার জন্য দীর্ঘ সময় ব্যয় করার কারণে তারা প্রায়ই পড়াশোনার সময় করে উঠতে পারত না, ফলে স্কুলের পড়ায় পিছিয়ে পড়ত তারা।
“আমরা টেকনাফকে আরও সবুজ করতে চাই এবং সবার জন্য, বিশেষ করে এখানকার পরবর্তী প্রজন্মের শিশুদের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চাই, যাতে আমাদের যেসব প্রতিবন্ধকতা নিয়ে চলতে হয়েছে সেগুলো ছাড়াই তারা বেড়ে উঠতে পারে।”
বাংলাদেশে সন্ধ্যার পর শিশুরা সাধারণত পড়তে বসে। কিন্তু আজিজা ও কুলসুমার ক্ষেত্রে সে সময়টা ছিল বেঁচে থাকার জন্য অত্যাবশ্যকীয় পানির ব্যবস্থা করার মাহেন্দ্রক্ষণ।
“আমাদের লাইন ধরে দাঁড়িয়ে অন্যদের সঙ্গে ঝগড়া করতে হত। সবাই পানির জন্য বেপরোয়া হয়ে উঠত,” বলে কুলসুমা।
এত কিছুর পরেও এই দুই কিশোরী এখন আশাবাদী। শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে আজিজা বলে, “আমরা বড় হয়ে এনজিওকর্মী হতে চাই।” সে আরও বলে, “আমরা টেকনাফকে আরও সবুজ করতে চাই এবং সবার জন্য, বিশেষ করে এখানকার পরবর্তী প্রজন্মের শিশুদের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চাই, যাতে আমাদের যেসব প্রতিবন্ধকতা নিয়ে চলতে হয়েছে সেগুলো ছাড়াই তারা বেড়ে উঠতে পারে।”
জীবন পাল্টে দেওয়া সেই মুহূর্ত: ভূ-উপরিস্থ পানি পরিশোধন কেন্দ্র (সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট)
আশার আলো, মনে হচ্ছে, দেখা যাচ্ছে।
এই ক্রমবর্ধমান পানি সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস-এফসিডিও) সহায়তায় ইউনিসেফ টেকনাফে চারটি ভূ-উপরিস্থ পানি পরিশোধন কেন্দ্র (সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট-এসডব্লিউটিপি) নির্মাণ করেছে। জলবায়ু সহিষ্ণু এসব আধুনিক প্রযুক্তি এখন স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলোর নিরাপদ পানি পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করছে।
প্রতিটি পরিশোধন কেন্দ্র প্রতি ঘণ্টায় প্রায় দুই হাজার লিটার লবণাক্ত ভূ-উপরিস্থ পানি প্রক্রিয়াকরণ করে, যা দূষিত পানিকে কার্যকরভাবে বিশুদ্ধ খাবার পানিতে রূপান্তরিত করে। প্রতিদিন প্রতিটি কেন্দ্র থেকে ১২ হাজার থেকে ১৬ হাজার লিটার পর্যন্ত বিশুদ্ধ পানি উৎপাদন হয়। এই পরিশোধন কেন্দ্রগুলো সৌরশক্তি দ্বারা চালিত হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে সৌরশক্তি ও গ্রিড বিদ্যুতের সমন্বয়ে এ উৎপাদনক্ষমতা দিনে ২৪ হাজার লিটার পর্যন্ত বাড়ানো যায়।
এই ভূ-উপরিস্থ পানি পরিশোধন কেন্দ্রগুলো একটি হাইব্রিড ব্যবস্থা ব্যবহার করে, যেখানে সৌরশক্তির সঙ্গে গ্রিড বিদ্যুতের সমন্বয় রয়েছে। এর ফলে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের সময়েও কেন্দ্রগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।
এই পরিশোধন কেন্দ্রগুলোর জন্য পানির উৎস হলো কাছাকাছি থাকা ভূ-উপরিস্থ জলাশয়, যা অঞ্চলটির দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে এমন ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করছে।
সবার জন্য পানি: প্রতিটি পরিবারের কাছে পৌঁছানোর দুটি পথ
সবার জন্য বিশুদ্ধ পানি পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে এই প্রকল্পে একটি দ্বৈত পানি বিতরণ মডেল অনুসরণ করা হয়, যা বিভিন্ন পরিবারের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে।
একটি পদ্ধতি হলো ওয়াটার এটিএম কার্ড ব্যবহার, যা একটি রিচার্জযোগ্য স্মার্ট কার্ড এবং কাছাকাছি বুথগুলোতে ব্যবহৃত হয়। প্রতিবার কার্ড সোয়াইপে (ব্যবহারে) ৫ লিটার পানি দেওয়া হয় এবং কার্ডের ব্যালান্স থেকে সেই পরিমাণ টাকা কেটে নেওয়া হয়। এই ব্যবস্থা সুবিধাজনক এবং পানির ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করে, পাশাপাশি অপচয়ও কমায়।
পানি বিতরণের দ্বিতীয় পদ্ধতি সেই সব পরিবারের জন্য, যারা এটিএম বুথে যেতে সক্ষম নয়-যেমন ছোট শিশু বা বয়স্ক সদস্য রয়েছে এমন পরিবার। তাহমিনার মতো মায়েদের জন্য, যাদের ঘরে ছোট শিশু রয়েছেন, এমন ঘরে ঘরে পানি সরবরাহ করার ব্যবস্থা এক কথায় অভিনব। পানি উদ্যোক্তারা বিদ্যুৎচালিত ভ্যানে করে ২০ লিটার বিশুদ্ধ পানির জার সরাসরি বাড়ির দরজায় পৌঁছে দেন, যাতে তাহমিনার মতো পরিবারগুলোর সদস্যরা ঘরের বাইরে বের না হয়েই রান্না ও দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য নিরাপদ পানি পান।
স্থানীয় পানি উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়ন
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পানি উদ্যোক্তা কামাল হোসেন তার কমিউনিটিতে (লোকালয়ে) নিরাপদ খাবার পানি সরবরাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
তিনি বৈদ্যুতিক বাহনের মাধ্যমে ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানির জার পৌঁছে দেওয়ার কাজ সমন্বয় করেন। প্রত্যন্ত বা দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোর জন্য এই সেবা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কেউই যেন নিরাপদ পানি পাওয়া থেকে বঞ্চিত না হন, তা এই সেবার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়।
নিজের ভূমিকার গুরুত্ব উপলব্ধি করে কামাল বলেন, “আমি এই কাজটা উপভোগ করি, কারণ আমি আমার নিজের কমিউনিটির মানুষদের কাছে নিরাপদ পানি পৌঁছে দিতে পারি।” সবার নিরাপদ পানি পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তার এই প্রয়াস একটি সামাজিক ব্যবসার মডেল হিসেবে কাজ করছে যার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে; আর এভাবে পুরো ব্যবস্থাটা স্থায়ী ও টেকসই হয়ে উঠছে।
যেখানে পানি আছে, সেখানে আশা আছে
তাহমিনা, আজিজা ও কুলসুমার জীবন বদলে দিয়েছে এই উদ্যোগ।
“এখন আমি পানি নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে পুরো সময়টুকু আমার ছেলের দেখাশোনার কাজে লাগাই,” বলেন তাহমিনা। তিনি আরও বলেন, “আমরা আর অসুস্থ হই না। আমি টাকা সঞ্চয় করছি। এখন আমি স্বপ্ন দেখি।”
আজিজা ও কুলসুমার মতো মেয়েদের জন্য, যারা এক সময় অন্ধকারে খালি কলসি নিয়ে হাঁটত, এখন সেখানে রয়েছে নিরাপদ পানি, শিক্ষার সুযোগ ও অফুরন্ত আশা।
বিশুদ্ধ পানি, নতুন শুরু
প্রতিটি কেন্দ্র থেকে প্রায় ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার মানুষকে নিরাপদ পানি দেওয়া হয়। আর এভাবেই এই ভূ-উপরিস্থ পানি পরিশোধন কেন্দ্রগুলো বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় পানি ও নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলার জন্য একটি আদর্শ মডেল হিসেবে কাজ করছে।
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং নিরাপদ পানি পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করে এই মডেল শুধু স্থানীয়দের টিকে থাকার লড়াইকেই সহজ করে তুলছে না, বরং তাদের মর্যাদাকেও অক্ষুন্ন রাখতে ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশে শিশু ও তাদের পরিবারগুলোর নিরাপদ পানি পাওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে অব্যাহত সহায়তা এবং অসামান্য অবদানের জন্য যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস-এফসিডিও) প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে ইউনিসেফ।









