বাল্যবিবাহ নিরসনে বাংলাদেশকে সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছে ইউএনএফপিএ ও ইউনিসেফ

বাল্যবিবাহ নিরসনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে উভয় সংস্থাই বলেছে, এটি যেন একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা হয় এবং আইনি কাঠামোটি এমনভাবে উন্নত করতে হবে যাতে কিশোরীদের অধিকার সমুন্নত রেখে বিবাহ ও গর্ভধারণ এড়িয়ে চলা সম্ভব হয়।

14 ডিসেম্বর 2024
The GPECM Steering Committee visit to Bangladesh
UNICEF/UNI704215/Mukut

ঢাকা, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪ - কন্যাশিশুদের জীবন রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ইউএনএফপিএ-ইউনিসেফ গ্লোবাল প্রোগ্রাম টু এন্ড চাইল্ড ম্যারিজ (জিপিইসিএম)-এর স্টিয়ারিং কমিটি (পরিচালনা কমিটি) গত ৮ থেকে ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সফর করেছে। এই সফরে তারা বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিরসনে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বাল্যবিবাহ প্রবণ অঞ্চলগুলোর একটি হিসেবে এখনো রয়ে গেছে বাংলাদেশ। বাল্যবিবাহের হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হলেও এখনো ৫১ শতাংশ বাংলাদেশি কন্যাশিশুর বয়স ১৮ বছর হওয়ার আগেই তাদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।

বাল্যবিবাহ কন্যাশিশুদের শৈশব কেড়ে নেয় এবং তাদের উন্নয়নকে হুমকির মুখে ফেলে। যেসব কন্যাশিশুর ১৮ বছর বয়সের আগে বিয়ে হয়, তাদের ঘরে নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং তাদের পড়াশোনাও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। যাদের বিয়ে হয়নি সেই সব কন্যাশিশুর তুলনায় তাদের অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যের অবস্থা খারাপ হয়, যার প্রভাব তাদের সন্তানদের ওপর পড়ে। আর এর ফলে শিশুদের মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে দেশের প্রচেষ্টা ব্যাহত হয়।

জিপিইসিএম স্টিয়ারিং কমিটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সফরে বাল্যবিবাহ নিরসন, কিশোরী কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সুরক্ষা জোরদারকরণের পদ্ধতিগত উপায়সমূহ এবং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাসমূহে সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। তারা বাল্যবিবাহ নিরসনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনার (এনএপিইসিএম) ওপর অগ্রাধিকার দিয়েছে। এই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যেন পর্যাপ্ত তহবিলের যোগান নিশ্চিত করা হয়, শক্তিশালী আইনি কাঠামোর মাধ্যমে একে যেন সংহত করা হয় এবং তাতে যেন পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য জোরালো বার্তা থাকে, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়ছে।

পাঁচ দিনের সফরে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা সরকারি কর্মকর্তা, সুশীল সমাজ সংগঠন, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং উচ্চ হারে বাল্যবিবাহ রয়েছে এমন জেলাসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। তারা এসব সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে বাল্যবিবাহ নিরসনের কার্যক্রমের সফলতা এবং এই সংকট মোকাবিলার চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে বুঝতে চেয়েছেন। মাঠ পর্যায়ে তারা যেসব পরিদর্শন করেছেন, তাতে উদ্ভাবনী কর্মসূচিগুলোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এসব কর্মসূচির মধ্যে শিক্ষা, জীবন দক্ষতা, কর্মসংস্থানের দক্ষতা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে তরুণ মায়েরাসহ কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে চালু করা কর্মসূচিগুলো রয়েছে।

গ্লোবাল প্রোগ্রামের চেয়ার সীমা সেন গুপ্ত বলেন, “গ্লোবাল প্রোগ্রাম স্টিয়ারিং কমিটি বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিরসনের প্রচেষ্টাসমূহ প্রত্যক্ষ করে খুবই আনন্দিত। বাংলাদেশ বাল্যবিবাহ নিরসনের বৈশ্বিক উদ্যোগের সামনের কাতারে রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে জাতিসংঘের সংস্থাসমূহ ও সুশীল সমাজের শক্তিশালী সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ দেখিয়েছে, উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব। বাল্যবিবাহ নিরসনের জন্য প্রয়োজন সমন্বতি উদ্যেোগ এবং এসব প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার করার জন্যই আমরা এখানে এসেছি। এনএপিইসিএম যেন সব প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হয় তা নিশ্চিত করে এবং আইনি কাঠামো উন্নত করে এটা বাস্তবায়ন করা হলে দেশে এই সংকট নিরসনে বহুমাত্রিক প্রভাব তৈরি হবে।”

স্টিয়ারিং কমিটির এই সফর এমন সময়ে হয়েছে যখন দেশে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে ১৬ দিনব্যাপী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এতে বাল্যবিবাহকে শিশুদের ওপর এক ধরনের সহিংসতা ও মানবাধিকার লংঘন হিসেবে বিবেচনার গুরুত্ব সামনে এসেছে। আলোচনায় জেন্ডার-ট্রান্সফরমেটিভ অ্যাপ্রোচ জোরদার, পুরুষ ও ছেলে শিশুদের সহায়ক হিসেবে যুক্ত করা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধকে বৃহত্তর সুরক্ষা ও দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে ইউএনএফপিএ’র প্রতিনিধি মাসাকি ওয়াতাবে বলেন, “বাল্যবিবাহ নিরসন কন্যাশিশুদের জন্য নিরাপদ, ক্ষমতাসম্পন্ন ও স্বাস্থ্যকর জীবনের দিকে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে। ইউএনএফপিএ এক্ষেত্রে একটি সমন্বিত অ্যাপ্রোচে সহায়তা অব্যাহত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যাতে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকারসমূহ, জীবনদক্ষতামূলক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং ক্ষতিকর চর্চাসমূহ থেকে জনগোষ্ঠীকে সরিয়ে আনতে স্থানীয়দের যুক্ত করা হবে। পুরুষ ও ছেলে শিশুদের যুক্ত করাটা জরুরি শুধু এসব সমস্যা মোকাবিলার জন্যই নয়, বরং নারী-পুরুষ উভয়ে মিলে সমস্যার সমাধান ও প্রচেষ্টা গ্রহণের জন্য। একসঙ্গে আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারি যেখানে কন্যাশিশুদের মূল্যায়ন এবং তাদের উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হবে।”

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, “বাল্যবিবাহ শুধু শিশুদের অধিকারের লংঘন নয়, এটা টেকসই উন্নয়নের জন্যও একটি প্রতিবন্ধক। অভিঘাত সামলে নেওয়ার সক্ষমতা সম্পন্ন শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সমাজকর্মীদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ও আমাদের অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে পেরে ইউনিসেফ গর্বিত। যেখানে প্রতিটি শিশুর উন্নতি সাধন হবে এমন একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার কেন্দ্রে অবশ্যই কন্যাশিশুদের বক্তব্য থাকতে হবে।”

ইউএনএফপিএ-ইউনিসেফ গ্লোবাল প্রোগ্রাম টু এন্ড চাইল্ড ম্যারিজ দেশে সরকারের নেতৃত্ব পরিচালিত সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারের প্রচেষ্টায় সহায়তার পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং আনুষ্ঠানিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং ক্ষতিকর জেন্ডারকেন্দ্রিক রীতি-নীতি মোকাবিলায় সহযোগিতা দেয়। এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী কিশোর-কিশোরীদের প্রভাব ও তাদের কর্মপরিধি সম্পর্কে জানাবোঝার জন্য এই তরুণদের সঙ্গে যুক্ত হবে স্টিয়ার কমিটি।

স্টিয়ারিং কমিটির এই সফর সব অংশীদারদের প্রতি বাল্যবিবাহ নিরসনের প্রচেষ্টায় অগ্রগতি ত্বরাণ্বিত করতে অংশীদারত্ব বৃদ্ধির জন্য একটি সমন্বিত ও জরুরি আহ্বান রেখেছে। এই অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে সরকার, সুশীল সমাজ, বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। ধারাবাহিক অগ্রগতি অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ৫.৩: ২০৩০ সাল নাগাদ বাল্যবিবাহ নিরসনেবর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে।

ইউএনএফপিএ ও ইউনিসেফ ২০১৬ সালে গ্লোবাল প্রোগ্রাম টু এন্ড চাইল্ড ম্যারিজ চালু করে। বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা কন্যাশিশু ও ইতিমধ্যে বিবাহ হয়েছে এমন কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়ন করা হয়েছে এই কর্মসূচির মাধ্যমে।এর আওতায় ২০২৩ সাল নাগাদ ২ কোটি ১০ লাখ কিশোরীর জীবনমানের উন্নয়নে ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়েছে। তাদেরকে ২০২৬ সাল থেকে জীবনদক্ষতা ও কর্মসংস্থানের দক্ষতা অর্জনের শিক্ষার সুযোগ, সমন্বিত যৌন শিক্ষা ও স্কুলে যেতে সহায়তাসহ নানাভাবে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এই কর্মসূচির আওতায় কিশোরী কন্যাশিশুদের সহায়তা প্রদান বা বাল্যবিবাহ নিরসনের অন্যান্য প্রচেষ্টায় সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে ৩৫ কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষকে বিভিন্ন সংলাপ ও কমিউনিকেশন ক্যাম্পেইনে যুক্ত করা হয়েছে। এই ব্যক্তিদের মধ্যে  মধ্যে সমাজে প্রভাব রাখতে পারে এমন ব্যক্তি এবং পুরুষ ও ছেলেশিশুরাও রয়েছে।

সম্পাদকদের জন্য

জিপিইসিএম সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন।

এই মিশনের ছবি পেতে এখানে ক্লিক করুন।

গণমাধ্যম বিষয়ক যোগাযোগ

মিগেল মাতেওস মুনোজ
ইউনিসেফ বাংলাদেশ
টেলিফোন: +8801713043478
ই-মেইল: [email protected]
ফারিয়া সেলিম
ইউনিসেফ বাংলাদেশ
টেলিফোন: +8801817586096
ই-মেইল: [email protected]

ইউনিসেফ সম্পর্কে

বিশ্বের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কাছে পৌঁছাতে বিশ্বের কঠিনতম কিছু স্থানে কাজ করে ইউনিসেফ। ১৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলে সর্বত্র সব শিশুর জন্য আরও ভালো একটি পৃথিবী গড়ে তুলতে আমরা কাজ করি।

ইউনিসেফ এবং শিশুদের জন্য এর কাজ সম্পর্কিত আরও তথ্যের জন্য ভিজিট করুন: www.unicef.org/bangladesh/

ইউনিসেফকে অনুসরণ করুন Twitter, Facebook, Instagram এবং YouTube-এ।

ইউএনএফপিএ সম্পর্কে

ইউএনএফপিএ হলো জাতিসংঘের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সংস্থা। আমাদের লক্ষ্য হলো এমন একটি পৃথিবী গড়ে তোলা যেখানে প্রতিটি গর্ভধারণ প্রত্যাশিত, প্রতিটি শিশুর জন্ম হবে নিরাপদ এবং প্রতিটি তরুণের সম্ভাবনার বিকাশ ঘটবে।

ইউএনএফপিএ ও এর কাজ সম্পর্কে আরও তথ্যের জন্য ভিজিট করুন: https://bangladesh.unfpa.org/

Twitter, Facebook, Instagram, YouTube