পুষ্টিসেবা পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের দোরগোড়ায়
জাপান সরকারের সহায়তায় ও ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত পুষ্টিসেবা কার্যক্রম শিশু ও মায়েদের জীবনরক্ষাকারী সেবা দিচ্ছে।
- বাংলা
- English
“সে খায় না, খেলাধুলাও করে না। দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে, আর সারাক্ষণ কাঁদে। আমরা তাকে কোথায় নিয়ে যাব? কীভাবে তাকে সাহায্য করব”—১২ মাস বয়সী আজিজ খানের মা ২২ বছর বয়সী নূর কায়েস এভাবেই নিজের উদ্বেগের কথা জানান।
২০২৪ সালে আজিজ ও তার পরিবার কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে পৌঁছালে তাদের কাছে সবকিছুই ছিল নতুন।
ছোট আশ্রয়কেন্দ্র, সরু অলিগলি আর শিবিরের দৈনন্দিন জীবনের নতুন রুটিন—সবই ছিল তাদের কাছে অপরিচিত। প্রতিদিনই তাদের নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হতো। তবে আস্তে আস্তে তারা শিখে নেন যে কোথায় কী ধরনের সহায়তা পাওয়া যায়। খাদ্যসহায়তা পেলেও বয়সের তুলনায় আজিজের শারীরিক বৃদ্ধি হচ্ছিল না। ২২ বছর বয়সী মা নূর জানতেন না, এ অবস্থায় কোথায় গেলে বা কার কাছে সাহায্য চাইলে ছেলের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া যাবে।
একদিন তাঁদের ছোট্ট অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের দরজায় কড়া নাড়লেন শফিকা ও ওমর নামের দুই কমিউনিটি পুষ্টি স্বেচ্ছাসেবক। তাঁরা জানতে চাইলেন, পরিবারটিতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী কোনো শিশু আছে কি না। নূর আজিজকে তাঁদের সামনে নিয়ে এলেন।
শফিকা সতর্কতার সঙ্গে আজিজের বাহুর মধ্যভাগের পরিধি (এমইউএসি বা মুয়াক নামে বেশি পরিচিত) মাপলেন। পরিমাপে দেখা গেল, তার বাহুর পরিধি ১০ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার, যা তীব্র অপুষ্টির নির্দেশক। দেরি না করে আজিজকে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার জন্য নিকটস্থ সমন্বিত পুষ্টিকেন্দ্রে পাঠানো হলো।
পরদিন ছেলেকে নিয়ে নূর তাঁর শিবিরে ইউনিসেফের সহায়তাপুষ্ট একটি সমন্বিত পুষ্টিকেন্দ্রে (আইএনএফ) গেলেন। তিনি বেশ চিন্তিত ছিলেন, তবে আশা ছাড়েননি। পুষ্টি দলের সদস্যরা আজিজের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ শুরু করলেন। তাঁরা তার উচ্চতা ও ওজন মাপলেন এবং বাহুর মধ্যভাগের পরিধি (এমইউএসি) ও শরীরে শোথ (পানি জমে আছে কিনা) আছে কি না, তা পরীক্ষা করলেন।
কেন্দ্রের অন্য একটি অংশে একজন নার্স আজিজের শারীরিক পরীক্ষা ও ক্ষুধামন্দা ও খাওয়ার রুচির পরীক্ষা করলেন। এ সময় তাকে আগে থেকেই তৈরি করা খাবার, যা রেডি-টু ইউজ থেরাপিউটিক ফুড (আরইউটিএফ) নামে পরিচিত তা, খেতে দেওয়া হল যাতে বোঝা যায়, এই খাবার দিয়ে চিকিৎসায় সে সাড়া দিচ্ছে কি না। নূরের স্বস্তি হলো, আজিজ খাবারটি খেতে শুরু করল এবং আরও খাওয়ার জন্য হাত বাড়াল।
খাওয়ার রুচি পরীক্ষার পর একজন পুষ্টি পরামর্শদাতা নূরের সঙ্গে বসলেন, যাতে আজিজের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়। তিনি জানতে চাইলেন, আজিজকে কীভাবে খাওয়ানো হতো এবং জন্মের পর থেকে সে কী কী খাবার খেয়ে বড় হয়েছে। নূরের কথা শুনে পরামর্শদাতা বুঝতে পারলেন, আজিজের অপুষ্টির পেছনে আসলে কী কারণ ছিল।
আজিজের বয়স যখন পাঁচ মাস, তখন আবার গর্ভবতী হওয়ায় নূর তাকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দেন।
নূর বলেন, “অনেকেই আমাকে বলেছিলেন, বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে গেলে গর্ভের শিশুটি দুর্বল হয়ে জন্মাবে। তাই আমি আজিজকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দিই।”
সেই পরামর্শে বিশ্বাস করে নূর আজিজকে বুকের দুধের পরিবর্তে গুঁড়া দুধ ও ভাত খাওয়াতে শুরু করেন। কয়েক মাস ধরে এগুলোই ছিল শিশুটির পুষ্টির প্রধান উৎস। নূরের কথা শুনে পুষ্টি পরামর্শদাতা বুঝতে পারলেন, কেন আজিজ অপুষ্টির শিকার হয়েছে।
পুষ্টি পরামর্শদাতা নূরকে বুঝিয়ে বললেন, গর্ভাবস্থায় বুকের দুধ খাওয়ানো নিয়ে তাঁকে যে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, তা সঠিক নয়। তিনি বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যাওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং আজিজের বৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্যের জন্য মায়ের দুধের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন।
আজিজের বয়স এখন এক বছর। তাই নূরকে ভাতের পাশাপাশি মিষ্টিকুমড়া, মিষ্টি আলু, ডিম ও শাকসবজির মতো বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
পরামর্শ সেশনের পর নূরকে এক স্যাশেট (ছোট প্যাকেট) আরইউটিএফ দেওয়া হলো। পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এই পেস্ট সহজেই খাওয়ানো যায়। এই পরিমাণ খাবার দিয়ে আজিজকে সাত দিন ধরে দিনে দুবার খাওয়ানো যাবে। আজিজকে পরবর্তী সপ্তাহে আবার সমন্বিত পুষ্টিকেন্দ্রে (আইএনএফ) নিয়ে আসার জন্য তার স্বাস্থ্য কার্ডে ফলোআপের (পুনঃমূল্যায়নের) তারিখও উল্লেখ করে দেওয়া হলো।
আইএনএফে গিয়ে নূরও স্বাস্থ্যসেবা পেলেন।সাত মাসের গর্ভবতী নূরের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন একজন নার্স।তাঁর ওজন মেপে স্বাস্থ্যকার্ডে তা লিখে রাখা হয়। এ ছাড়া, গর্ভাবস্থায় আয়রনের ঘাটতি ও রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধও চিকিৎসার জন্য তাঁকে আয়রনও ফলিক অ্যাসিডের ট্যাবলেট দেওয়া হয়।
নূর বলেন, “আমি এখানে শুধু আমার সন্তানের জন্য সাহায্য চাইতে এসেছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি, আমি নিজেও এবং আমার অনাগত সন্তানও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেয়েছে।”
অপুষ্টিতে ভোগা ছেলেকে নিয়ে, মনে অনেক প্রশ্ন আর উদ্বেগ নিয়ে আইএনএফে এসেছিলেন নূর। তিনি এসেছিলেন ছেলের জন্য সাহায্য চাইতে। কিন্তু ফিরে যাওয়ার সময় ছেলের পাশাপাশি নিজের ও অনাগত সন্তানের জন্যও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলেন। এখন তিনি জানেন, কোথায় গেলে সাহায্য পাওয়া যাবে এবং নিজের ও সন্তানদের জন্য কী ধরনের সেবা রয়েছে।
নতুন পরিবেশে আসা একজন মায়ের জন্য বারইর কাছেই প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে—এ কথা জানা অনেকটাই স্বস্তির। জাপান সরকার ও অন্যান্য অংশীদারের সহায়তায়, ইউনিসেফের সহায়তাপূষ্ট পুষ্টিসেবার মাধ্যমে আজিজের মতো শিশুদের অপুষ্টি শনাক্ত করে তাদের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার আওতায় আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে নূরের মতো মায়েরা পাচ্ছেন মাতৃত্বকালীন সেবা। এসব সেবার সম্মিলিত উদ্যোগ রোহিঙ্গা শিশুদের নতুন প্রজন্মের জন্য জীবনের শুরুটা আরও সুস্থ ও নিরাপদ করতে ভূমিকা রাখছে।

