ভয়ানক আগুনে বিধ্বস্ত কড়াইল বস্তি, হাজারো মানুষ গৃহহীন

আগুনে সর্বহারা পরিবারগুলোকে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করছে ইউনিসেফ

সানজিয়া করিম ফারিয়া
Bangladeshi Girl
UNICEF Bangladesh/2024/Mukut
20 মে 2024

কড়াইল বস্তির সরু গলি ধরে এগিয়ে গেলে এখনো আগুনের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া যাবে; যা মনে করিয়ে দেয় ভয়ানক সেই অগিঙ্কান্ডের ঘটনা যেখানে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল প্রায় তিন হাজার মানুষের বসতি, বিলীন হয়ে গিয়েছিলো তাদের বহু বছর ধরে বোনা স্বপ্ন। দিনটি ছিল ২৪শে মার্চের বিকেল বেলা।

ঢাকার সবচেয়ে বড় বস্তিতে লাগা ভয়ঙ্কর সেই আগুনে ৩৫০টিরও বেশি পরিবার তাদের আশ্রয় হারায়; তাদের মধ্যে ছিলো এক হাজার শিশু। বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে খাবার, নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের সকল ব্যবস্থা। এই মানুষগুলোর বেশির ভাগই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সংঘটিত নানা দুর্যোগের শিকার হয়ে এ শহরে এসেছিল। নানা চ্যালেঞ্জের মাঝে শুরু করেছিলো বেঁচে থাকার নতুন লড়াই। কিন্তু এই লড়াই যেন কেবল দিন দিন কঠিনই হয়ে উঠছে।

সর্বগ্রাসী আগুন

ওই দিনের আগুনের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিন সন্তানের মা সোহেদা বলেন, “যখন আগুন লাগে তখন আমি পরিবারের জন্য রান্না করছিলাম। আমি শুধু একটা আলনা বাঁচাতে পেরেছি । বড় ছেলেকে বলছিলাম বোনদের নিয়ে তাড়াতাড়ি বের হয়ে যেতে। লোকজন ভিড় করার আগে আমরা এখান থেকে বের হতে পেরেছি । গত ১০ বছরে আমরা দুইবার আগুনে সব কিছু হারিয়েছি। আমরা কয়েকবারই আমার বাপের ভিটায় ফিরে যেতে চেয়েছি। কিন্তু এখন আর আমাদের কিছছু নাই। আমার ছোট মেয়ে কানিজ তার ঈদের জামা চাচ্ছে। কিন্তু সবইতো আগুনে পুড়ে শেষ।”

আগুন থেকে বাঁচতে ঘর থেকে বের হবার সময় সঙ্গে করে কী নিয়েছিল, জানতে চাইলে চার বছর বয়সী কানিজ শুধু বলে, “আমার পানির বোতল।”

কড়াইল বস্তিতে ভয়ঙ্কর এই আগুনে ঘর-বাড়ির পাশাপাশি ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত দুটি শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রের (চাইল্ড প্রোটেকশন হাব) একটি পুড়ে ছাই  হয়ে গেছে। বস্তির ভেতর শিশু সুরক্ষা কেন্দ্র শিশুদের জন্য একটা নিরাপদ জায়গা। শিশুদের প্রতি সহিংসতা, বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম প্রতিরোধে মানসিক ও সাইকোসোশ্যাল সহায়তা দেওয়া হয় এখান থেকে। সারা দেশে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় এমন মোট ২ হাজার ১৭০টি শিশু সুরক্ষা কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। এগুলো কমিউনিটি-লেড অ্যাপ্রোচ বা কমিউনিটি দ্বারা পরিচালিত।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুড়ে যাওয়া শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রটি মেরামত করে; ত্রিপল দিয়ে তৈরী এই অস্থায়ী কেন্দ্রটিতে ২৬ শে মার্চ সকাল নাগাদ কার্যক্রম পুরো দমে শুরু হয়।  কিশোর-কিশোরীরাও তৎক্ষণাৎ কেন্দ্রটিতে আয়োজিত আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে শুরু করে। জরুরি পরিস্থিতিতে পরিবারের সঙ্গে থাকা এবং পোড়া জায়গা দিয়ে চলাচল করার সময় সাবধানতা অবলম্বনের গুরুত্ব সম্পর্কে তারা তাদের বুদ্ধিদীপ্ত বক্তব্য তুলে ধরে। চাইল্ড রাইটস (শিশু অধিকার) ও কমিউনিটি ফ্যাসিলিটেটরদের সহায়তায় শিশুরা তাদের জরুরি প্রয়োজন মেটানো এবং সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সেবার জন্য নগদ সহায়তা পায়। এই শিশুদের মধ্যে খাবার সংগ্রহের জন্য ‘ফুড ভাউচার’ এবং খাদ্য বহির্ভূত অন্যান্য জিনিসপত্রও বিতরণ করা হয়। এসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সব শিশু তাৎক্ষণিক ভাবে শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রে পুনরায় যোগ দিতে পারছে না। এমন শিশুর সংখ্যা হবে মাসে গড়ে প্রায় এক হাজার।

পুনরায় স্বপ্ন বুনন

সোহেদা বলেন, “আমার বড় মেয়ে কাশফিয়া গত তিন বছর ধরে কেন্দ্রে যাচ্ছিল। কানিজও মাত্রই তার বোনের সঙ্গে যাওয়া শুরু করেছিল। কিন্তু আগুনের ঘটনার পর তারা যেতে পারেনি। কারণ তারা দুজনই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।” তিনি বলেন, “আমাদের ঘর পুড়ে যাওয়ার পর থেকে আমরা এই তাঁবুতে বসবাস করছি। এখানে দিনের বেলা খুব গরম থাকে এবং রাতে যখন বৃষ্টি হয় তখন আমাদের জেগে থাকতে হয়। ফ্যাসিলিটেটরেরা আমার সন্তানদের জন্য নগদ টাকা দিয়েছেন। আমরা সেই টাকা দিয়ে তাদের জন্য ওষুধ ও খাবার কিনেছি। তারা এখন সুস্থ হয়ে উঠছে।” 

“আগুন লাগার পর থেকেই মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় (এমওডব্লিউসিএ), যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় (এমওওয়াইএস) এবং সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের (এমওএসডব্লিউ) পাশাপাশি ইউনিসেফ মাঠে থেকে দ্রুত সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা অক্লান্ত ভাবে কাজ করে যাচ্ছে,” বলেন বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি শেলডন ইয়েট।

শিশু সুরক্ষা কেন্দ্র থেকে শিশুদের নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া ছাড়াও যারা ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বা আগুনের ঘটনায় আহত হয়েছেন, তাদেরও আর্থিক সহায়তা দিয়েছে ইউনিসেফ। এর পাশাপাশি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার গুলোর মধ্যে ৩৭৫টি ‘ফ্যামিলি কিটস’ বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিটি কিটের মধ্যে ছিলো কম্বল, মশারি, মশা মারার ব্যাটসহ ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার  জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। “ এখন পর্যন্ত ৩০০ শিশু ও কিশোর-কিশোরী এবং তাদের পরিবার, ইউনিসেফ এবং তার সরকারী অংশী জনদের (সরকারী মন্ত্রণালয় ও সংস্থা) কাছ থেকে সহায়তা পেয়েছে। এছাড়াও ২০০ এর বেশি শিশু নগদ অর্থ সহায়তা পেয়েছে,” বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি জানান।   

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ইউনিসেফ শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রে শিশুদের বিনোদনের সরঞ্জামও (কিট) সরবরাহ করেছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কিশোর-কিশোরীদের জন্য আত্মরক্ষার কৌশল শেখার প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছে। সেখানে দুজন কমিউনিটি মোবিলাইজার এবং জেলা স্পোর্টস কর্মকর্তাদের যুক্ত করা হয়েছে। ফলে জরুরি পরিস্থিতিগুলোতে শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা সহিংসতা ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জের সাথে মোকাবিলা করতে শিখছে। সমাজ সেবা কর্মী ও কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তা নিয়ে ইউনিসেফ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মিলে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের নিবন্ধন, তাদেরকে খাবার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী (কিটস) প্রদান এবং প্রাথমিক পর্যায়ের সাইকোসোশ্যাল (মনোসামাজিক) সহায়তা দেওয়ার জন্য কাজ করছে।

আশার কিরণ

বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও কমিউনিটি ফ্যাসিলিটেটরেরা তাদের সর্বাত্মক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ শিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের অনেকের নিজেদেরই ঘর আগুনে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, তারপরও তারা আগুন লাগার পরপরই শিশুদের সহায়তা প্রদানে লেগে পড়েন। 

কড়াইল বস্তিতে আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের আরেকজন তাসলিমা এ ঘটনার পর পাওয়া সহায়তার কথা উল্লেখ করে বলেন, “আমার ঘরের সামনেই আগুন লেগেছিল। আমার মীমের নাক-মুখ দিয়ে অনেক ধোঁয়া ঢুকেছিল। তখন আমাদের তাকে হাসপাতালে নিতে হয়েছিল। আমার মেয়ের বয়স মাত্র ৪ বছর হওয়ায় সে শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রের সাথ যুক্ত ছিলো না। তারপরেও কেন্দ্রের ফ্যাসিলিটেটরদের কাছ থেকে মীমকে হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা অনেক সহযোগিতা পেয়েছিলাম। আমরা নগদ অর্থ সহায়তাও পেয়েছি। সেই টাকা দিয়ে আমরা তার জন্য খাবার, ফলমূল ও ওষুধ কিনেছি।”

ছাই ছাপিয়ে ভবিষ্যৎ

নিজের ঘরের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দাঁড়িয়ে এই অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন সেগুলো উল্লেখ করে তাসলিমা বলেন, “আমাদের এখন শুধু একটা চৌকি ছাড়া আর কিছুই নাই। এমনকি মাথার উপরে ছাদও নাই। এই গরমে সূর্যের তাপে যেন গা পুড়ে যায়। টয়লেটগুলোও পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে মীম ঘুমের মধ্যে 'আগুন - আগুন' বলে চিৎকার করে জেগে উঠে। ফ্যামিলি কিট ও নগদ অর্থ সহায়তা আমাদের খুব উপকারে এসেছে। কিন্তু আমাদের কষ্টের দিনগুলি কবে যে শেষ হবে!”   

অসংখ্য চ্যালেঞ্জের মধ্যে এই কমিউনিটি পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার যে সক্ষমতা দেখিয়েছে, তা দারুণ। তাদেরকে পুনর্বাসনের সহায়তা দেয়া গেলে তারা আবার ঘুরে দাঁড়াবে। কারন তাঁরা সংগ্রামী; তাঁরা লড়তে শিখেছে, হারতে নয়। এই আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত শিশু ও তাদের পরিবারগুলো সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছে। সে কারণে তাদের প্রতি চলমান সহায়তা অব্যাহত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ইউনিসেফ।