কন্যাশিশুদের জন্য সুস্থ্য ভবিষ্যৎ নিশ্চিতকরণ: বেদে সম্প্রদায়ের এইচপিভি টিকা গ্রহনের যাত্রা
ইউনিসেফের সহায়তায় স্বাস্থ্যকর্মীরা টিকা নিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভয় দূর করতে ভূমিকা রাখছেন, মায়েরা নিজ উদ্যোগে তাদের শিশুদের টিকাদানের জন্য নিয়ে আসছেন
- বাংলা
- English
“আমরা যে ছেলে-মেয়ে নিয়ে এই পরিবেশে টিকে আছি এটাই আমাদের জন্য অনেক বড় বিষয়।সেখানে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সেবা পাওয়াটা আমাদের চিন্তারও বাইরে”, কথাগুলো বলছিলেন ঢাকার আফতাবনগরে বসবাসরত বেদে সম্প্রদায়ের সদস্য সাত সন্তানের মা বিবি আমেনা। বাংলাদেশের একটি অতিপরিচিত প্রান্তিক যাযাবর গোষ্ঠী বেদে সম্প্রদায় দারিদ্র্য, উপার্জনের পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব এবং স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য মৌলিক সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে থাকে। নৌকা বা তাঁবু টাঙিয়ে ঘর বানিয়ে বসবাস করা বেদে সম্প্রদায় প্রায়ই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ভ্রাম্যমান। নদীনির্ভর জীবিকা এবং সাপ খেলা দেখানো ও তাবিজ-কবজ বিক্রির ন্যায় নানা কর্মকাণ্ডের ওপর তাদের খাওয়া-পরা নির্ভর করে।
এই সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বাস্থ্য সেবা, বিশেষ করে টিকা পাবার ক্ষেত্রে বরাবরই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। কিন্তু,দেশজুড়ে চলমান হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) টিকাদান কর্মসূচি (ক্যাম্পেইন) ছিল ব্যতিক্রম। ইউনিসেফ, ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স (গ্যাভি) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সহায়তা নিয়ে এই টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ সরকার। ১০ বছর থেকে ১৪ বছর বয়সী কন্যাশিশুদের জন্য এই টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়েছে। উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এলাকাসমূহ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য টিকাদান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই কর্মসূচি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।
স্বাস্থ্যসেবার চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলা
আফতাবনগরে বেদে সম্প্রদায় হচ্ছে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোর একটি। প্রথমে, এই সম্প্রদায়ের শিশুরা সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় ছিল না। গত এক বছর ধরে, ঢাকা উত্তর সিটি ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ইপিআই কর্মসূচির সঙ্গে সম্মিলিতভাবে ইউনিসেফ এই এলাকায় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে আসছে। সেখানে এইচপিভি টিকাদান একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে যুক্ত হয়। নিরলস কিছু স্বাস্থ্যকর্মীদের নেতৃত্বে এই টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আগে যাদের স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার কোন-সুযোগ ছিল না, সেই বেদে সম্প্রদায়ের অনেক শিশু এখন সবার মতন টিকা পাচ্ছে।এই টিকা জরায়ুমুখ ক্যানসারের জন্য দায়ী হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। জরায়ুমুখ ক্যানসারে বাংলাদেশে বছরে কয়েক হাজার নারীর মৃত্যু হয়। এদেশে যত নারীদের ক্যানসার হয় তার মধ্যে দ্বিতীয় সর্বাধিক সংখ্যক ভোগে এই জরায়ুমুখ ক্যানসারে। প্রাপ্ত তথ্য মতে, প্রতি বছর বাংলাদেশে ৮ হাজার ২৬৮ জন নারীর জরায়ুমুখ ক্যানসার ধরা পড়ে এবং এই রোগে ৪ হাজার ৯৭১ জন নারীর মৃত্যু হয়।১
ইউনিসেফ বাংলাদেশের ইমিউনাইজেশন স্পেশালিষ্ট ডা. রিয়াদ মাহমুদ বলেন, “বেদে সম্প্রদায় এবং এদের মতো উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর অসহায় কন্যাশিশুদের খুঁজে বের করার জন্য বিশেষ কৌশল প্রণয়নে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এবং অন্যান্য জেলা প্রশাসনকে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে ইউনিসেফ। শনাক্ত করার পর এই সব কন্যাশিশুকে এইচপিভি টিকা দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে, আমরা আমাদের পূর্বের টিকা না পাওয়া শিশু কিংবা টিকার অসম্পূর্ণ-ডোজ নেয়া শিশুদের খুঁজে বের করে নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছি।” ইউনিসেফের সহায়তায় স্বাস্থ্যকর্মীদের, এইচপিভি ও ইপিআই কর্মসূচির আওতায় সঠিকভাবে টিকা দেওয়ার পদ্ধতি এবং সঠিক যোগাযোগ কৌশল ব্যবহার করে সামাজিক ও আচরণগত পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষন দেয়া হয়েছে।
আফতাবনগরে বসবাসরত বেদে সম্প্রদায়কে এইচপিভি টিকা নিতে আগ্রহী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন স্বাস্থ্যকর্মী কামরুন নাহার। তিনি বলেন, “এইচপিভি ক্যাম্পেইনের জন্য ডিএনসিসি যখন একজন ভ্যাকসিনেটর হিসেবে আমাকে নিয়োগ দিল, তখন আমি আফতাবনগরে বেদে সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য একটি টিকাদান সেশন আয়োজনের কথা ভাবলাম। অবশ্য এই সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জন ততোটা সহজ ছিল না।” কামরুন নাহার এই সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং সম্প্রদায়ের সদস্যদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেন। তবে সম্প্রদায়ের নেতাদের সহযোগিতার পরেও তিনি পুরো জনগোষ্ঠীর সদস্যদের তাদের কন্যাশিশুদের এইচপিভির বিরুদ্ধে সুরক্ষার জন্য টিকা নেওয়ার বিষয়ে রাজি করাতে পারছিলেন না।
প্রাথমিকভাবে বাধার মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজের এই কাজের প্রতি অটল ছিলেন। কামরুন নাহার এই সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটান, ধৈর্যের সঙ্গে তাদের উদ্বেগের কথাগুলো শোনেন এবং টিকাদান নিয়ে তাদের ভয়ের জায়গাগুলো দূর করতে কাজ করেন। এটা ছিল তাদের জন্য একটি নতুন বিষয়। এই কর্মসূচির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন ইউনিসেফের সহায়তা নিয়ে তিনি-লিফলেট ও ব্রশিউর (ছোট বই) বিলি করেন। এক ডোজ এইচপিভি টিকা নিলে জরায়ু ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী রোগসহ ভবিষ্যতে অন্যান্য গুরুতর স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জটিলতা ও মৃত্যু কীভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব, সে সব তথ্য এসব লিফলেট ও ব্রশিউরে তুলে ধরা হয়েছে।সম্প্রদায়ের কেউ যেন বাদ না পড়েন সেজন্য কামরুন নাহার রাতে ওই বস্তিতে যেতেন, যে সময় সবাই তাদের ঘরে থাকতেন।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন
প্রথমদিকে টিকাদানের গুরুত্ব সম্পর্কে না জানার কারণে বেদে সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এইচপিভি টিকার পার্শ্বপতিক্রিয়া ও ঝুঁকি নিয়ে নানা সন্দেহ ও ভয় কাজ করত। সেখানে কামরুন নাহারের মতো স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের কাছে এইচপিভি টিকা নেওয়ার সুবিধাসমূহ তুলে ধরার পাশাপাশি এ বিষয়ে থাকা ভুল ধারণাগুলো দূর করতে কাজ করেন। তাতে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। আরেকটি চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়, আর তা হলো - বেদে সম্প্রদায়ের মানুষের জন্ম সনদ না থাকার কারণে এই জনগোষ্ঠীর কন্যাশিশুদের টিকাদানের জন্য নিবন্ধন সম্পন্ন করা। তখন তাদেরকে শুধু নাম তালিকাভুক্ত করে টিকার জন্য নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হয়।
বেদে সম্প্রদায়ের অনেক মায়ের মতো বিবি আমেনাও তার কন্যাশিশুকে টিকা দেওয়া নিয়ে দ্বিধান্বিত ছিলেন। সেখানে কামরুন নাহারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে তার ধারণা পরিবর্তন হয়। সঠিক তথ্য ও আস্থাহীনতার কারণে তাঁর মধ্যে কতটা সংশয় কাজ করছিল, সেটা স্মরণ করে বিবি আমেনা বলেন, “আমার সম্প্রদায়ের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যানসার হওয়া মহিলাদের আমি চিনি। তাদের কেউ কেউ সুস্থ হয়েছেন। আবার অনেকে মারা গেছেন। আমি জানতাম না যে, এইচপিভি টিকা নিয়ে এই রোগ প্রতিরোধ করা যায়। আমার মেয়েকে এই টিকা দেব, তা কখনো চিন্তাও করি নাই। এখন আমি এই টিকা এবং এর গুরুত্ব সম্পর্কে জানি।”
বিবি আমেনার এই যাত্রার মধ্য দিয়ে বেদে সম্প্রদায়ের অনেকের চিন্তায় পরিবর্তন এসেছে; টিকাদানের গুরুত্ব সম্পর্কে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যে সচেতনতা তৈরি হয়েছে তা-স্বাস্থ্যকর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের-প্রতিফলন। অনিশ্চয়তা ও ভয়কে জয় করে, তারা নিজেদের সন্তানদের সুস্থ্য ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে টিকাদানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঢাল হিসেবে মেনে নিয়েছেন।
অভিজ্ঞতার আলোকে স্বাস্থ্যকর্মী কামরুন নাহার বলেন, “টিকা সম্পর্কে তাদেরকে কাউন্সিল করার পর এই সম্প্রদায়ের মানুষেরা শুধু তাদের পর্যাপ্ত কন্যাশিশুদের এইচপিভি টিকা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, তারা সম্প্রদায়ে নতুন কোনো শিশু জন্ম নিলে নিজ উদ্যোগেই আমাকে তা জানাচ্ছেন। শিশুটির সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় টিকাদান সম্পন্ন করার জন্য আমাকে অনুরোধও করছেন। এটা আমাকে খুবই আনন্দিত করেছে যে, এই সম্প্রদায়ের কন্যাশিশুদের এইচপিভি টিকা পেতে আমি সহায়তা করেছি এবং টিকাদানের গুরুত্ব সম্পর্কে সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হওয়াটা দেখতে পাচ্ছি।”
স্বাস্থ্য সেবায় সম-অধিকার নিশ্চিত করা
সম্প্রদায়ের ২৪টি শিশুর সবাইকে একদিনের সেশনে সফলভাবে এইচপিভি টিকা দেওয়া হয়েছে। টিকা নেওয়ার পর, ১১ বছরের লামিয়া বলে, “আমার মা আমাকে এইচপিভি টিকা দিতে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, এটা আমাকে নানা রোগ থেকে সুরক্ষা দেবে এবং আমার একটি উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে। আমি আমার সম্প্রদায়ের সব বন্ধুকে এইচপিভি টিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করতে চাই, যাতে আমরা সবাই সুস্থ্যভাবে বেড়ে উঠতে পারি।” ২০২৩ সালের অক্টোবরে এইচপিভি টিকা ক্যাম্পেইন চালু হওয়ার পর ঢাকা বিভাগে ১৫ লাখ কন্যাশিশুকে এই টিকা দেওয়া হয়েছে। এই ক্যাম্পেইনের আওতায় জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধের সক্ষমতা তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশজুড়ে লাখ লাখ কন্যাশিশুকে স্বাস্থ্যকর ও উন্নত ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষিত করা হয়েছে।
আফতাবনগরে বেদে সম্প্রদায়ের কন্যাশিশুদের জন্য আয়োজিত টিকাদান কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগটি সফল প্রমাণিত হয়েছে; সকলের মাঝে টিকা পৌঁছে দেবার এই প্রয়াসের মাধ্যমে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবায় বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার ক্ষেত্রে ইউনিসেফ তার সহায়তা চলিয়ে যাবে; এভাবে সকল শিশুর জন্য চিকিৎসা নিশ্চিত করার ইউনিসেফের যে অঙ্গীকার, তা পূরণের লক্ষে আরও এক ধাপ এগুনো গেলো।
_________________________________
১ বাংলাদেশ হিউমান পাপিলোমাভাইরাস এ্যান্ড রিলেটেড ক্যান্সারস্, ফ্যাক্ট শিট ২০২৩

