ক্ষমতায়নের পথে যাত্রা: শিশুদের অধিকার ও কন্যাশিশুদের স্বপ্নের জন্য আমার মিশন
সঠিক উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবর্তন আনা সম্ভব- কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে পরিবর্তন আন্তে প্রয়োজন দৃঢ় সংকল্প ও কমিউনিটির সহায়তা
- বাংলা
- English
আমরা প্রতি বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করি। তারপরেও নারী ও কন্যাশিশুদের ওপর অবিচার চলতে থাকে। সম্প্রতি একটি আদালত পাঁচ বছর বয়সী একটি শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তির জামিন মঞ্জুর করেছে। তার এই ভয়াবহ অপরাধের বিস্তারিত বিবরণ এতটাই বীভৎস ছিল যে, সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেগুলো পড়াটাও কঠিন ছিল।
একজন আইন বিশেষজ্ঞ না হলেও আমি জোরালোভাবে বিশ্বাস করি যে, নিরাপরাধ প্রমাণিত হওয়া ছাড়া ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তিকে জামিন দেওয়া উচিত নয়। এ ধরনের জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য আইনি প্রক্রিয়া অবশ্যই ত্বরাণ্বিত করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, একইসঙ্গে সহিংসতার শিকার ব্যক্তিরা যেন বিশেষ সেবা-যত্ন পায় তা নিশ্চিত করতে হবে, যেহেতু রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ইউনিসেফের একজন ‘ইয়ুথ অ্যাডভোকেট’ এবং নিজে একজন কিশোরী হওয়ার কারণে বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশুরা নিয়মিত যেসব কঠিন আচরণের মুখোমুখি হচ্ছে সেগুলো দেখে আমি গভীরভাবে হতাশা বোধ করি। সে কারণে নারী ও কন্যাশিশুদেরকে তাদের সমাজে কীভাবে দেখা হচ্ছে তাতে পরিবর্তন সাধন এবং তাদের যেন অন্যায্য আচরণ সহ্য করতে না হয় সেজন্য তাদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে আমি অক্লান্তভাবে কাজ করে চলেছি।
লক্ষ্মীপুরের প্রত্যন্ত এক এলাকায় আদিবাসী শিশুদের জন্য আমি একটি অনানুষ্ঠানিক স্কুল পরিচালনা করি; আমার মনে পড়ে সেখানে এক সময় ব্যাপকভাবে শিশুবিবাহ হত। দরিদ্র পরিবারগুলো বিশ্বাস করত যে, তাদের মেয়েদের আগেভাগে বিয়ে দেওয়াই অর্থনৈতিক চাপ কমানো বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার একমাত্র পথ। এই চর্চার বিধ্বংসী প্রভাব আমাকে কার্যকরী কিছু একটা করার জন্য অনুপ্রাণিত করে।
কয়েক বছর আগে অনানুষ্ঠানিক স্কুল পরিচালনার পাশাপাশি আমি লক্ষ্মীপুরে শিশুবিবাহ নিরসনে কাজ শুরু করি। আমি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে বোঝাতাম কেন তাদের কন্যাশিশুদের সফল হওয়ার জন্য শিক্ষা জরুরি। এটা সহজ ছিল না। অনেক বাবা-মাই সত্যিকারে বিশ্বাস করতেন যে, অল্প বয়সে বিয়ে দিলে সেটা তাদের কন্যাদের পৃথিবীর কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া থেকে রক্ষা করবে।
তাদের উদ্বেগের যৌক্তিক কারণ থাকলেও এই মানসিকতা ছিল বিপজ্জনক, বিশেষ করে সেই সব বাবা-মায়েদের জন্য যাদের কন্যাশিশুদের ঘরের বাইরে তেমন কোনো সহায়তা ছিল না। আমি তাদের কাছে শিশুবিবাহের ক্ষতিকর পরিণতি সম্পর্কে তুলে ধরতাম। শিশুবিবাহ কন্যাশিশুদের যে শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকিগুলো তৈরি করে সেগুলোর পাশাপাশি এটা তাদের ভবিষ্যতের জন্য যেসব প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আসে সেগুলো তাদেরকে বুঝিয়ে বলতাম। তাদের সহযোগিতা করতাম যেন তারা তাদের কন্যাশিশুদের জন্য একটি ভালো সমাধান চিন্তা করতে পারেন - তাদের কন্যাশিশুদের স্কুলে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে দেন যেখানে এই শিশুরা আত্মবিশ্বাসী, দৃঢ় এবং স্বাধীন নারী হয়ে গড়ে উঠতে পারবে।
খালি বাড়ি বাড়ি গিয়ে কথা বলা আর বঝানোর মাঝে আমি থেমে থাকিনি। সচেতনতা তৈরির জন্য আমি লক্ষ্মীপুরজুড়ে ছোট ছোট কর্মশালা করতাম যেখানে কমিউনিটির নেতাদের এক জায়গায় নিয়ে আসা হতো। আমার অনানুষ্ঠানিক স্কুলের শিক্ষার্থীদেরকেও শিশুবিবাহের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে শিক্ষা দিতাম।
কমিউনিটিতে এই কাজের সময় আমি আরেকটি উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ অনুধাবন করলাম যে, কিশোরীদের মধ্যে ঋতুস্রাববিষয়ক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। অনেকে ঋতুস্রাবকে লজ্জাজনক ও অশুদ্ধ মনে করত। তাদের এই ধারণার মূলে ছিল দীর্ঘ দিন চলে আসা সাংস্কৃতিক ট্যাবু, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে এসেছে।
আমি নিশ্চিত করতে চাই যে কোনও মেয়েকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হবে না, প্রতিটি মেয়ের শিক্ষার সুযোগ থাকবে এবং মাসিক স্বাস্থ্য আর কোনও নিষিদ্ধ বিষয় নয়।
এই স্টিগমার (প্রচলিত ভুল ধারণা) কারণে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঠিক মতন মেনে চলা হতো না, যেমন অপরিষ্কার কাপড় ব্যবহার করা, ঠিকমতো না ধুয়ে পুনরায় প্যাড ব্যবহার করা বা ঋতুস্রাবের সময় গোসল না করা। এর ফলে অনেক কন্যাশিশু স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগত ও অস্বস্তি বোধ করত। এর জন্য তারা প্রায় স্কুলে অনুপস্থিত থাকত এবং আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিতে ভুগত।
এই সংকট মোকাবিলায় আমি আমার স্কুলে এবং কমিউনিটিতে কন্যাশিশুদের জন্য কর্মশালা আয়োজন করা শুরু করলাম। এর লক্ষ্য ছিল, কন্যাশিশুদেরকে ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্য ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের বলা হল যে, ঋতুস্রাব প্রাকৃতিক এবং এটা জীবনের একটি স্বাস্থ্যকর অংশ। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে যেন ঋতুস্রাবকালীন ব্যবস্থাপনা ব্যাহত না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য যাদের সঙ্গতি নেই তাদের মধ্যে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য স্যানিটারি প্যাডও বিলি করতে থাকলাম।
প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি আমি কন্যাশিশুদের আত্মবিশ্বাসী করতে চেয়েছিলাম। তাদের শরীর লজ্জা পাওয়ার কিছু নয়, বরং তা শক্তিমত্তার প্রতীক সেই ধারণাও আমি তাদের দিতে চেয়েছিলাম। ঋতুস্রাবকালীন কষ্ট জয় করে কন্যাশিশুরা আমার কর্মশালায় এসে হাসছে সেটা দেখে তাদের ক্ষমতায়নের বিষয়টি অনুভূত হয়েছিল। ঋতুস্রাবের সময়ে কী করতে হবে তা জানার ফলে এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম হাতের নাগালে থাকায় তারা আরও নিয়মিতভাবে স্কুলে আসা শুরু করল।
আজকে আমি গর্ব করে বলতে পারি যে, লক্ষ্মীপুরে গত দুই বছরে একটিও শিশুবিবাহের ঘটনা নেই। এই অর্জন শুধু আমার একার জয় নয়, সেই সব কন্যাশিশু ও পরিবারগুলোরও জয় যারা আমার সাথে সাথে বিশ্বাস করেছিল যে একদিন পরিবর্তন আসবেই।
আমার কাজ লক্ষ্মীপুরের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে। ময়মনসিংহের প্রান্তিক বিন জনগোষ্ঠীর জন্যও আমি কাজ করেছি। বিন জনগোষ্ঠী প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছে। সেখানে শিক্ষার সুযোগের ঘাটতির পাশাপাশি নারী ও কন্যাশিশুদের তেমন সুযোগ-সুবিধা ছিল না। আমি পরিবারগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ শুরু করলাম, তাদের কাছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ক্ষমতায়নের গুরুত্ব তুলে ধরতে লাগলাম। আস্তে আস্তে তাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আসল। সেই সব বাবা-মা যারা এক সময় তাদের কন্যাশিশুদের ভবিষ্যৎ দেখতেন শিশুবিবাহ ও সংসারের কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ, এখন তারা কন্যাশিশুদেরকে লেখাপড়া করার জন্য উৎসাহিত করেন।
আমার কাজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একটি দিক যেটা আমাকে প্রশান্তি দেয় তা হলো – যখন আমি দেখি এক সময় সময় সামাজিক আকাঙ্ক্ষার মধ্যে আটকা থাকা মেয়েরা দ্রুত সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। অনেকে এখন নির্ভরশীলতা ও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির চক্র ভেঙে ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণাও পাচ্ছে।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষা। স্কুলে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার কারণে এই কন্যাশিশুরা পরবর্তীতে একটি অর্থবহ পেশাগত জীবন গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। তারা নিজেদের কথাগুলো তুলে ধরতে শিখছে, অচল হয়ে পড়া সামাজিক রীতি-নীতিকে চ্যালেঞ্জ করে সেগুলোর পরিবর্তন করতে শিখছে; পাশাপাশি তারা এমন এক ভবিষ্যৎ এর স্বপ্ন দেখে যেখানে তারা সকলেই নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
আমার এই যাত্রা আমাকে শিখিয়েছে যে, যখন আমরা বিশ্বাস রাখি এবং একসঙ্গে কাজ করি তখন পরিবর্তন সম্ভব। বাবা-মা, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ এবং সেই সব কন্যাশিশু যাদের সঙ্গে আমি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি তারা সবাই সহায়তা না করলে লক্ষ্মীপুর ও ময়মনসিংহে আমার উদ্যোগগুলো সফল হত না।
এটা আমাকে তরুণদের নেতৃত্বে সাধিত পরিবর্তন এর ক্ষমতাও দেখিয়েছে। একজন ১৬ বছরের কিশোরী হিসেবে আমার হয়তো বড় সংগঠন/সংস্থা পরিচালনার অভিজ্ঞতা বা তার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ নেই, কিন্তু আমার প্রচণ্ড ইচ্ছা শক্তি ও সংকল্প আছে, সেই সঙ্গে বাংলাদেশে কন্যাশিশুরা যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় সে বিষয়ে জানাবোঝা আছে।
আমি এটাও শিখেছি যে, পরিবর্তন রাতারাতি আসে না। এর জন্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা সাংস্কৃতিক চর্চাগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস থাকতে হয় এবং ধৈর্য নিয়ে বাস্তবসম্মত পরিবর্তনের জন্য কথা বলে যেতে হয়। কিন্তু এখানেই আমি থামব না। আমি নিশ্চিত করতে চাই যে, কোনো কন্যাশিশুকে আর জোর করে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে না, প্রতিটি কন্যাশিশু লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে এবং ঋতুকালীন স্বাস্থ্য আর ট্যাবুর কোনো বিষয় নয়।
কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়ন এবং তাদের অধিকারগুলোকে সুরক্ষিত করে এমন সব উদ্যোগে সহায়তার জন্য আমি সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। অ্যাডভোকেসি, শিক্ষা বা অর্থনৈতিক সহায়তা যেভাবেই হোক না কেন প্রতিটি ক্ষেত্রে সহযগিতা গুরুত্বপূর্ণ। যখন আমরা কন্যাশিশুদের উন্নয়নে বিনিয়োগ করি, তখন আমরা ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য বিনিয়োগ করি। একসঙ্গে আমরা এমন একটি বিশ্ব গড়ে তুলতে পারি যেখানে প্রতিটি কন্যাশিশুর স্বপ্ন দেখার, অর্জনের ও এগিয়ে চলার স্বাধীনতা থাকবে।