সঙ্কট-কবলিত দেশগুলোতে মায়েদের অপুষ্টি ২৫ শতাংশ বেড়েছে, যা নারী ও নবজাতকদের ঝুঁকিতে ফেলছে – ইউনিসেফ

স্টান্টিংয়ে (খর্বাকৃতি) আক্রান্ত ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের অর্ধেকই গর্ভাবস্থায় অথবা ছয় মাস বয়সের আগেই এই অবস্থার শিকার হচ্ছে; এই প্রেক্ষাপটে কিশোরী ও নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি কর্মসূচিগুলোতে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে এই প্রতিবেদন বিশেষভাবে জোর দিয়েছে

07 মার্চ 2023
A mother and child. Bangladesh
UNICEF Bangladesh/2022/Monir

নিউইয়র্ক, ৭ মার্চ ২০২৩ – আজ ইউনিসেফ প্রকাশিত নতুন এক প্রতিবেদন অনুসারে, বৈশ্বিক খাদ্য ও পুষ্টি সংকটে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ১২টি দেশে ২০২০ সাল থেকে তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা গর্ভবতী  ও মায়ের দুধ পান করানো কিশোরী ও নারীর সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়ে ৫৫ লাখ থেকে ৬৯ লাখে উন্নীত হয়েছে।

এই ১২টি দেশ হচ্ছে আফগানিস্তান, বুরকিনা ফাসো, চাদ, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, মালি, নাইজার, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সুদান ও ইয়েমেন। ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং কিছু দেশে চলমান খরা, সংঘাত ও অস্থিরতা এই পুষ্টি সংকটককে আরও ত্বরাণিত করেছে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের আগে প্রকাশিত 'অপুষ্টিতে আক্রান্ত এবং উপেক্ষিত:  কিশোরী ও নারীদের মধ্যে বৈশ্বিক পুষ্টি সংকট' (Undernourished and Overlooked: A Global Nutrition Crisis in Adolescent Girls and Women) শীর্ষক প্রতিবেদনে  আরও বলা হয়েছে,  প্রচলিত লিঙ্গ বৈষম্যের কারণে চলমান এই সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। ফলে, কিশোরী ও নারীদের মধ্যে পুষ্টির অভাবও আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত দুই দশকে এই পরিস্থিতির সামান্যই উন্নতি হতে দেখা গেছে ।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, “বৈশ্বিক ক্ষুধা সংকট লাখ লাখ মা ও তাদের সন্তানকে ক্ষুধা ও মারাত্মক অপুষ্টির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামী কয়েক প্রজন্মকে এর পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।’’

বিশ্বব্যাপী কিশোরী ও নারীদের পুষ্টির অবস্থা এমন বিস্তারিতভাবে ফুটে উঠেছে এই প্রতিবেদনে যা আগে কখনো হয়নি। প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ১০০ কোটির বেশি কিশোরী ও নারী অপুষ্টি (স্বল্প ওজন ও স্বল্প উচ্চতাসহ), প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি এবং রক্ত স্বল্পতায় ভুগছে। আর এটি তাদের স্বাস্থ্যসহ জীবনের সামগ্রিক ক্ষেত্রে ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনছে।

অপর্যাপ্ত পুষ্টির কারণে কিশোরী  ও নারীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচেছ, পাশাপাশি তাদের মেধার দুর্বল বিকাশ এবং গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন জটিলতাসহ নানান ঝুকির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। এই অপর্যাপ্ত পুষ্টি তাদের শিশুদেরও সুস্থভাবে বেঁচে থাকা, স্বাভাবিক বৃদ্ধি, লেখাপড়া ও ভবিষ্যতে কর্ম ও উপার্জন ক্ষমতার উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে যার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। প্রতিবেদনের একটি নতুন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ২ বছরের কম বয়সী ৫ কোটি ১০ লাখ শিশু স্টান্টিংয়ে ভোগে, যার অর্থ অপুষ্টির কারণে তারা তাদের বয়সের তুলনায় বেশ খাটো। তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই গর্ভাবস্থায় এবং ভূমিষ্ঠ হবার পর প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই স্টান্টিংয়ের শিকার হয়। অর্থাৎ ৫০০ দিনের যে সময়কালে একটি শিশু সম্পূর্ণরূপে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া পুষ্টির ওপর নির্ভরশীল থাকে তখনই এই  স্টান্টিংয়ের ঘটনা ঘটে।

"শিশুদের অপুষ্টি রোধ করার জন্য, আমাদের অবশ্যই কিশোরী ও নারীদের মধ্যে অপুষ্টির সমস্যা সমাধান করতে হবে," ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল যোগ করেন।

দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকা রয়েছে কিশোরী ও নারীদের মাঝে পুষ্টি সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে।  বৈশ্বিকভাবে ওজন স্বল্পতায় ভোগা প্রতি ৩ জন কিশোরী ও নারীর মধ্যে ২ জনের, এবং রক্ত স্বল্পতায় ভোগা প্রতি ৫ জন কিশোরী ও নারীর মধ্যে ৩ জনেরই বসবাস এই দুই অঞ্চলের একটিতে। এদিকে, দরিদ্র পরিবারের কিশোরী ও নারীদের ওজন স্বল্পতায় ভোগার হার ধনী পরিবারের তুলনায় দ্বিগুণ।

প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে যে বাংলাদেশে প্রায় ৪8 লাখ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু স্টান্টিং বা খর্বাকৃতির শিকার। আর এর জন্য দায়ী বিভিন্ন বিষয়গুলোর মধ্যে মায়ের অল্প বয়সে বিয়ে ও গর্ভধারণ, তার ‍শিক্ষার অভাব এবং অপুষ্টি অন্যতম।

বাংলাদেশে ১২-৪৯ বছরের নারীদের মধ্যে ১২ শতাংশেরই ওজন তাদের বয়স ও উচ্চতার তুলনায় কম। এছাড়া, বাংলাদেশে গর্ভবতী নয় এমন প্রজননক্ষম মহিলাদের মধ্যে উচ্চ মাত্রার মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি রয়েছে।

বাল্য বিয়ের দিক দিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান সারাবিশ্বে অষ্টম এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম: এখানে ৫১ শতাংশ নারীদের ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায় (এখানে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের তথ্য দেয়া হয়েছে।)

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি শেলডন ইয়েট বলেন, “ওজন স্বল্পতায় আক্রান্ত, স্কুল থেকে ঝরে পড়া ও শিশু বয়সে বিয়ে করতে বাধ্য হওয়া মেয়েদের জন্য অপুষ্টি একটি দুষ্ট চক্র। এই মেয়েরা আবার অল্প বয়সেই মা হয়ে যায়। ফলে এই ‍শিশুগুলো জন্মের পর থেকেই  বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে থাকে। মা ও শিশুদের জন্য অপুষ্টির এই আজীবন বোঝার অবসান ঘটাতে আমাদের আরও বেশি কিছু করতে হবে।”

বৈশ্বিক সংকটগুলো বিশেষ করে নারীদের পুষ্টিকর খাবার প্রাপ্তির সুযোগকে ব্যাহত করে চলেছে। ফলস্বরুপ, খাদ্য নিরাপত্তায় লিঙ্গ ব্যবধান আরও প্রকট হচ্ছে। ২০২১ সালে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা নারীর সংখ্যা ছিল পুরুষের চেয়ে ১২ কোটি ৬০ লাখ বেশি, যেখানে ২০১৯ সালে নারীর সংখ্যা ছিল পুরুষের চেয়ে ৪ কোটি ৯০ লাখ বেশি, অর্থাৎ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ক্ষেত্রে লিঙ্গ ব্যবধান প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি  হয়েছে।

গত বছর থেকে ইউনিসেফ আফগানিস্তান, বুরকিনা ফাসো, চাদ, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো, ইথিওপিয়া, হাইতি, কেনিয়া, মাদাগাস্কার, মালি, নাইজার, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সুদান এবং ইয়েমেনসহ বৈশ্বিক পুষ্টি সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে নিজস্ব কার্যক্রম আরও জোরদার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি ত্বরান্বিত পরিকল্পনা যার মাধ্যমে রয়েছে নারী ও শিশুদের মাঝে রুগ্নতা (ওয়েস্টিং বা উচ্চতার তুলনায় ওজন কম) প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা।

প্রতিবেদনে কিশোরী ও নারীদের জন্য খাদ্য, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তন করার জন্য সরকার, উন্নয়ন ও মানবিক সাহায্য সংস্থা (পার্টনার),  দাতা সংস্থা, সুশীল সমাজের বিভিন্ন সংস্থা ও অন্যান্য  পার্টনারদের  প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে:

  • কিশোরী ও নারীদের জন্য পুষ্টিকর, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মূল্যের খাবার প্রাপ্তিকে অগ্রাধিকার প্রদান, এবং কঠোর বিপণন বিধিনিষেধ, বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং ও ট্যাক্সের মাধ্যমে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে কিশোরী ও নারীদের রক্ষাকরতে।
  •  কিশোরী ও নারীদের মধ্যে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি ও রক্ত স্বল্পতা কমাতে  আটা, রান্নার তেল ও লবণের মতো খাবার যেগুলো নিয়মিতভাবে খাওয়া হয় , তাদের খাদ্যমান বাড়ানোর জন্য নীতিমালা ও বাধ্যতামূলক আইনি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে
  • নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর কিশোরী ও নারীদের গর্ভাবস্থায়, এর আগে ও মায়ের দুধ খাওয়ানোর সময়ে একাধিক মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সম্পূরক প্রদানসহ শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর সময় বিনামূল্যে অপরিহার্য পুষ্টি পরিষেবা প্রাপ্তির সুযোগ নিশ্চিত করতে
  • কিশোরী  ও নারীদের জন্য পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাদ্য প্রাপ্তির সুযোগ বাড়াতে নগদ অর্থ স্থানান্তর ও ভাউচার প্রদানসহ সবচেয়ে ঝঁকিপূর্ণ/বিপদগ্রস্থ  কিশোরী ও নারীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে।
  • শিশুবিয়ে এবং খাবার, পারিবারিক সম্পদ, আয় ও গৃহকর্মের অসম বণ্টনের মতো বৈষম্যমূলক লিঙ্গ ও সামাজিক নিয়মের অবসান ত্বরান্বিত করতে।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, “যখন একটি মেয়ে বা নারী পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না, তখন লিঙ্গ বৈষম্য আরও স্থায়ী হতে থাকে । শেখার ও উপার্জনের সম্ভাবনা কমতে থাকে। গর্ভাবস্থা ও প্রসবের সময়সহ জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ জটিলতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে থাকে  এবং অপুষ্টিতে ভুগছে এমন শিশু জন্ম দেওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। নারী ও শিশুদের যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেই জীবন রক্ষাকারী পুষ্টি সহায়তা ও সেবা তাদের কাছে নিয়ে যেতে কী লাগে তা আমরা জানি। কাজ করার জন্য আমাদের শুধু রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা ও সম্পদের সম্মিলন ঘটাতে হবে। নষ্ট করার মতো সময় আর নেই।’’

###

সম্পাদকদের জন্য নোট

তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে– এমন গর্ভবতী ও মায়ের দুধ খাওয়ানো কিশোরী ও নারীদের সংখ্যার জন্য উপাত্ত নেওয়া হয়েছে ‘সমন্বিত খাদ্য নিরাপত্তা পর্যায়গত শ্রেণিবিন্যাস তীব্র অপুষ্টি’; ‘মানবিক চাহিদাগুলো পর্যালোচনা’; ‘মানবিক প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা’, ‘ত্রাণ ও ক্রান্তিকালীন জরিপের মানসম্পন্ন পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন’ এবং ‘পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নজরদারি’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে।

মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট ডাউনলোড করা যাবে এখানে

গণমাধ্যম বিষয়ক যোগাযোগ

ফারিয়া সেলিম
ইউনিসেফ বাংলাদেশ
টেলিফোন: +8801817586096
ই-মেইল: [email protected]

ইউনিসেফ সম্পর্কে

বিশ্বের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কাছে পৌঁছাতে বিশ্বের কঠিনতম কিছু স্থানে কাজ করে ইউনিসেফ। ১৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলে সর্বত্র সব শিশুর জন্য আরও ভালো একটি পৃথিবী গড়ে তুলতে আমরা কাজ করি।

ইউনিসেফ এবং শিশুদের জন্য এর কাজ সম্পর্কিত আরও তথ্যের জন্য ভিজিট করুন: www.unicef.org/bangladesh/

ইউনিসেফকে অনুসরণ করুন Twitter, Facebook, Instagram এবং YouTube-এ।