শিশু ও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কোভিড-১৯ এর প্রভাব ‘হিমশৈলের একটি অতি ক্ষুদ্রাংশ’ – ইউনিসেফ

নতুন বিশ্লেষণ নির্দেশ করে যে, তরুণদের মানসিক অসুস্থতাজনিত কারণে অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়

05 অক্টোবর 2021
Depressed boy
UNICEF/UN0473493/Trivedy

মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট ডাউনলোড করা যাবে এখান থেকে

নিউইয়র্ক/ঢাকা, অক্টোবর ২০২১ – আজ প্রকাশিত ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, শিশু ও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সার্বিক সুস্থতার ওপর কোভিড-১৯ এর প্রভাব অনেক বছর ধরে থাকতে পারে।

'দ্য স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ডস চিলড্রেন ২০২১; অন মাই মাইন্ড: প্রমোটিং, প্রটেক্টিং অ্যান্ড কেয়ারিং ফর চিলড্রেনস মেন্টাল হেলথ' শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে একবিংশ শতাব্দীতে শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তাদের যত্নকারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি ইউনিসেফের বিস্তৃত বিশ্লেষণ উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবের আগেও শিশু ও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার বোঝা বইতে হয়েছে, যেখানে এই সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট বিনিয়োগ ছিল না।

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিকভাবে ১০-১৯ বছর বয়সী প্রতি ৭ জন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে ১ জনেরও বেশি মানসিক ব্যাধি নিয়ে জীবনযাপন করছে। প্রতিবছর প্রায় ৪৬ হাজার কিশোর-কিশোরী আত্মহত্যা করে, যা এই বয়সীদের মৃত্যুর শীর্ষ পাঁচটি কারণের একটি। অন্যদিকে, মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতে প্রয়োজন ও বরাদ্দ দেওয়া তহবিলের মধ্যে বিস্তর ফাঁক রয়ে গেছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বৈশ্বিকভাবে সরকারগুলো স্বাস্থ্যখাতে যে বাজেট বরাদ্দ দেয় তার ২ শতাংশ ব্যয় করা হয় মানসিক স্বাস্থ্যের পেছনে।

করোনা মহামারি সম্পর্কে ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেন, “এটি আমাদের সবার জন্য, বিশেষ করে শিশুদের জন্য ছিল অতি দীর্ঘ ১৮ মাস। দেশব্যাপী লকডাউন এবং মহামারি-সংক্রান্ত চলাচলের বিধিনিষেধের কারণে শিশুরা শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান– পরিবার, বন্ধু, ক্লাসরুম, খেলাধুলা থেকে দূরে থেকে তাদের জীবনের অবর্ণনীয় একটি অধ্যায় কাটিয়েছে। এর প্রভাব বেশ তাৎপর্যপূর্ণ এবং হিমশৈলের একটি ক্ষুদ্রাংশ মাত্র (টিপ অব দ্য আইসবার্গ)। এমনকি মহামারির আগেও অনেক বেশি সংখ্যক শিশু শনাক্ত না হওয়া মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার বোঝা বইছিল। এই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো মোকাবেলায় সরকারগুলো খুব কমই বিনিয়োগ করছে। মানসিক স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতের জীবনের পরিণামের মধ্যে সম্পর্কের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।”

কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের সময়ে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য

প্রকৃতপক্ষে, মহামারিটি ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে। বাংলাদেশসহ ২১টি দেশের শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে ইউনিসেফ ও গ্যালাপ পরিচালিত আন্তর্জাতিক এক জরিপের প্রাথমিক ফলের কিছু অংশ 'দ্য স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ড চিলড্রেন ২০২১' এ উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, জরিপে অংশগ্রহণকারী ১৫-২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে যে অংশ হতাশা বোধ করে বা কিছু করতে তেমন আগ্রহ পায় না, তার মধ্যমা ২১টি দেশের মধ্যে ১৯ শতাংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশে লাখ লাখ তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা নিয়মিত হতাশায় ভোগে বা উৎসাহহীন বোধ করে।

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি শেলডন ইয়েট বলেন, “জীবনের শুরুর দিকের বছরগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনগুলোর প্রতি তেমন নজর দেওয়া হয় না, যা সারা জীবন একজন ব্যক্তির সার্বিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করতে পারে।”

তিনি বলেন,“বাংলাদেশে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নীতিগত দিক থেকে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি মনোযোগ পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। আমাদের এখন এই ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে এই অগ্রগতিকে একীভূত করা প্রয়োজন। প্রতিটি শিশু এবং তরুণের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার আছে।”

কোভিড-১৯ তৃতীয় বছরে প্রবেশ করতে যাচ্ছে এবং শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্য ও সার্বিক সুস্থতার ওপর এর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব অব্যাহত। সর্বশেষ উপাত্ত অনুসারে, বিশ্বব্যাপী প্রতি ৭ জন শিশুর মধ্যে অন্তত ১ জন লকডাউনের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৬০ কোটিরও বেশি শিশুর পড়াশোনার ক্ষতি হয়েছে। প্রাত্যহিক রুটিন, শিক্ষা, চিত্তবিনোদন বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি পারিবারিক আয় ও স্বাস্থ্যজনিত উদ্বেগের কারণে তরুণ জনগোষ্ঠীর অনেকে ভীতি ও রাগ অনুভব করছে এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালের শুরুর দিকে চীনে পরিচালিত এক অনলাইন জরিপের কথা ‘দ্য স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ডস চিলড্রেন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ওই জরিপ ইঙ্গিত দেয় যে, জরিপে অংশগ্রহণকারী উত্তরদাতাদের প্রায় এক তৃতীয়াংশ জানিয়েছে তারা ভীত বা উদ্বিগ্ন বোধ করছে।

সমাজকে যে মূল্য দিতে হয়

এডিএইচডি, দুশ্চিন্তা, অটিজম, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডার, হতাশা, খাওয়ার ব্যাধি বা ইটিং ডিসঅর্ডার, বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা এবং সিজোফ্রেনিয়াসহ নির্ণয়কৃত মানসিক ব্যাধিগুলো শিশু ও তরুণদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবনের প্রাপ্তি এবং উপার্জনের ক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যমাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

যদিও শিশুদের জীবনের ওপর প্রভাব অগণিত, তবে প্রতিবেদনে উল্লেখিত লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের একটি নতুন বিশ্লেষণ নির্দেশ করে যে, মানসিক অসুস্থতাজনিত কারণে তরুণদের অক্ষম হয়ে পড়া বা মারা যাওয়ার কারণে অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়, তা প্রায় ৩৯ হাজার কোটি ডলারের সমপরিমাণ।

সুরক্ষামূলক বিষয়গুলো

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পরিচর্যা, পড়াশোনা, সম্পর্কের মান, সহিংসতা বা নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঝুঁকি, বৈষম্য, দারিদ্র্য, মানবিক সংকট এবং কোভিড-১৯ এর মতো জরুরি স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতিসহ জেনেটিক্স, অভিজ্ঞতা ও পরিবেশগত বিষয়গুলো সম্মেলিতভাবে সারা জীবন ধরে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য গঠনে সহায়ক হয় এবং প্রভাবিত করে।

যদিও সহৃদয়বান পরিচর্যাকারী, নিরাপদ স্কুলের পরিবেশ এবং সহপাঠীদের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্কের মতো সুরক্ষামূলক বিষয়গুলো মানসিক রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে, প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, সামাজিক কলঙ্ক এবং তহবিলের অভাবসহ উল্লেখযোগ্য বাধাগুলো অনেক বেশি সংখ্যক শিশুদেরকে ইতিবাচক মানসিক স্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করছে।

‘দ্য স্টেট অব দ্য ওয়ার্ল্ডস চিলড্রেনস ২০২১’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সরকার এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারদের প্রতি সব শিশু, কিশোর-কিশোরী ও পরিচর্যাকারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি তুলে ধরতে বলা হয়েছে। তাছাড়া, যাদের সহায়তা প্রয়োজন তাদের সুরক্ষা এবং সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকা শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের যত্ন নেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রদান, যোগাযোগ ও কাজ করার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে এই প্রতিবেদনে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • প্রতিরোধ, প্রচারণা ও যত্নের জন্য পুরো সমাজ জুড়ে সহায়তা করতে শুধু স্বাস্থ্য নয়, সব খাতে শিশু, কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের পেছনে জরুরি বিনিয়োগ করা।
  • সাড়ামূলক প্রচারণা, যত্নশীল পরিচর্যা এবং বাবা-মা ও পরিচর্যাকারীর মানসিক স্বাস্থ্যকে সমর্থন করে- এমন সন্তান লালনপালনমূলক কর্মসূচিসহ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাত জুড়ে প্রমাণ-ভিত্তিক হস্তক্ষেপগুলোকে একীভূত ও জোরদার করা; এবং মানসম্মত সেবা ও ইতিবাচক সম্পর্কের মাধ্যমে স্কুলগুলো যাতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় সহায়তা দেয় তা নিশ্চিত করা।
  • মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সামাজিক কলঙ্ক চিহ্নিত করা এবং আরও ভালো বোঝাপড়া গড়ে তুলতে প্রচারণা চালানোর মাধ্যমে এবং শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে মানসিক অসুস্থতা ঘিরে নীরবতা ভঙ্গ করা।

ফোর বলেন, "মানসিক স্বাস্থ্য শারীরিক স্বাস্থ্যের একটি অংশ- এ বিষয়টি আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। দীর্ঘ সময় ধরে ধনী এবং দরিদ্র দেশগুলোতে একইভাবে প্রতিটি শিশুর মাঝে থাকা সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই ব্যাপারটি সম্পর্কে সচেতনতার ও বিনিয়োগের ঘাটতি দেখে আসছি। এটি পরিবর্তন করা দরকার।’’

###            

সম্পাদকদের জন্য নোট

কিশোর-কিশোরীদের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কিত হিসাব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০১৯ সালের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে। নির্ণয়কৃত মানসিক অসুস্থতার প্রাদুর্ভাব সংক্রান্ত তথ্য ইনস্টিটিউট অব হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন (আইএইচএমই)-এর ২০১৯ সালের 'গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ স্টাডি' থেকে নেওয়া।

হতাশা বোধের বা বিভিন্ন কাজ করার ক্ষেত্রে তেমন আগ্রহ না থাকা বিষয়ক যেসব তথ্য জরিপে উঠে এসেছে তা আন্তঃপ্রজন্মগত বিভাজন বিশ্লেষণ করার লক্ষ্যে যৌথভাবে ইউনিসেফ ও গ্যালাপ পরিচালিত বৃহৎ সমীক্ষার অংশ। 'দ্য চেঞ্জিং চাইল্ডহুড প্রজেক্ট' টেলিফোনে ২১টি দেশের প্রায় ২০ হাজার মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। সব নমুনা সম্ভাব্যতা ভিত্তিক এবং প্রতিটি দেশে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করা দুটি বয়সভিত্তিক জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে নেওয়া: ১৫-২৪ বছর বয়সী এবং ৪০ বা তার বেশি বয়সী। আওতাভুক্ত এলাকা হচ্ছে গ্রামীণ জনপদসহ পুরো দেশ এবং সংগৃহীত নমুনা সব বেসামরিক, অ-প্রাতিষ্ঠানিক, টেলিফোন ব্যবহারের সুযোগ থাকা প্রতিটি বয়সভিত্তিক জনগোষ্ঠীর গ্রুপের প্রতিনিধিত্ব করে। এই প্রকল্পের পূর্ণ প্রতিবেদন আগামী নভেম্বরে প্রকাশ করবে ইউনিসেফ।

গণমাধ্যম বিষয়ক যোগাযোগ

হেলেন উইলি
ইউনিসেফ নিউইয়র্ক
টেলিফোন: +19172442215
ই-মেইল: hwylie@unicef.org
ফারিয়া সেলিম
ইউনিসেফ বাংলাদেশ
টেলিফোন: +8809604107077
ই-মেইল: fselim@unicef.org

ইউনিসেফ সম্পর্কে

প্রতিটি শিশুর অধিকার ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বিশ্বের ১৯০ টি দেশে কাজ করছে ইউনিসেফ। সকল বঞ্চিত শিশুদের পাশে থাকার অঙ্গীকার নিয়ে আমরা কাজ করি বিশ্বের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে।

আমাদের কাজ সম্পর্কে আরো জানতে ভিজিট করুন: www.unicef.org.bangladesh

ইউনিসেফের সাথে থাকুন: ফেসবুক এবং টুইটার