অগ্রগতি চারগুণ না হলে ২০৩০ সালের মধ্যে কয়েকশ’ কোটি মানুষ নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা সেবা থেকে বঞ্চিত হবে – ডব্লিউএইচও, ইউনিসেফের সতর্কতা
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৩ জন কোভিড-১৯ মহামারি চলাকালে বাড়িতে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধুতে পারেনি
- বাংলা
- English
জেনেভা/নিউইয়র্ক/ঢাকা, ১ জুলাই ২০২১ – ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অগ্রগতির হার চারগুণ না হলে ২০৩০ সালে বিশ্বজুড়ে কয়েকশ’ মানুষ উন্নত উৎসের খাবার পানি, স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা সেবাগুলো গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।
গৃহস্থালী খাবার পানি, স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক অগ্রগতি ২০০০-২০২০ শীর্ষক যৌথ পর্যবেক্ষণ প্রকল্প (জেএমপি) প্রতিবেদনটি গত পাঁচ বছরে পরিবারগুলোর উন্নত উৎসের খাবার পানি , স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা পরিষেবা প্রাপ্তির সুযোগ বিষয়ক হিসাব তুলে ধরেছে এবং ‘২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য পানি ও স্যানিটেশনের সহজলভ্যতা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক ষষ্ঠ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অগ্রগতি মূল্যায়ন করেছে। প্রথমবারের মতো প্রতিবেদনে মাসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক ক্রমবিকাশমান জাতীয় উপাত্তও তুলে ধরা হয়েছে।
২০২০ সালে, প্রতি ৪ জনের মধ্যে ১ জনের বাড়িতে উন্নত উৎসের খাবার পানির এবং বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধার অভাব ছিল। বাংলাদেশে ৬ কোটি ৮৩ লাখ মানুষের উন্নত উৎসের খাবার পানির এবং ১০ কোটি ৩০ লাখ মানুষের নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধার অভাব রয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারিটি প্রত্যেকে যাতে হাত পরিষ্কার রাখার সুযোগ পায় তা নিশ্চিত করার জরুরি প্রয়োজনটিকে তুলে ধরেছে। মহামারির শুরুর দিকে বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৩ জনের বাড়িতে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার সুযোগ ছিল না ।
ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক ড. টেড্রস আধ্যানম ঘেব্রেইয়েসুস বলেন, “কোভিড-১৯ এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধ করার অন্যতম কার্যকর উপায় হচ্ছে হাত ধোয়া, যদিও বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ পানি প্রাপ্তির সুযোগ নেই। আমাদেরকে যদি এই মহামারির সমাপ্তি ঘটাতে হয় এবং আরও স্থিতিস্থাপক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়, তবে পানি, স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা সেবার পেছনে বিনিয়োগ করাকে বৈশ্বকভাবে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে।”
কিছু অগ্রগতি, তবে যথেষ্ট নয়
প্রতিবেদনে পানি, স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা (ওয়াশ) পরিষেবাগুলোর সার্বজনীন প্রাপ্যতা অর্জনের পথে কিছু অগ্রগতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে, বাড়িতে উন্নত উৎসের খাবার পানির সুযোগ আছে এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৈশ্বিকভাবে ৭০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। নিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ আছে এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৪৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে; এবং সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার সুযোগ আছে এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৬৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭১ শতাংশ হয়েছে।
২০২০ সালে প্রথমবারের মতো, পিট ল্যাট্রিন ও সেপটিক ট্যাঙ্কের মতো উন্নত অন-সাইট স্যানিটেশন - যা কার্যকরভাবে বর্জ্য ধারণ ও শোধন করতে পারে – ব্যবহারকারীর সংখ্যা পয়ঃনিষ্কাশন সংযোগ ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছাড়িয়ে যায়। সরকারের মানব বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ অন-সাইট নিরাপদ স্যানিটেশনের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
জরুরি ভিত্তিতে বিনিয়োগ প্রয়োজন
প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, যদি বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে কয়েকশ’ কোটি শিশু ও পরিবার গুরুত্বপূর্ণ, জীবন-রক্ষাকারী ওয়াশ পরিষেবাবিহীন থেকে যাবে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে ২০৩০ সালের মধ্যে:
- বিশ্বের জনসংখ্যার কেবল ৮১ শতাংশই ঘরে নিরাপদ খাবার পানি পাবে, সুবিধার বাইরে থাকবে ১৬০ কোটি মানুষ;
- মাত্র ৬৭ শতাংশ নিরাপদ স্যানিটেশন পরিষেবা পাবে, সুবিধাবিহীন থাকবে ২৮০ কোটি মানুষ;
- এবং মাত্র ৭৮ শতাংশ হাত ধোয়ার সুবিধা পাবে, সুবিধাবিহীন থাকবে ১৯০ কোটি মানুষ।
প্রতিবেদনে ব্যাপক বৈষম্যের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে ঝুঁকির মুখে থাকা শিশু ও পরিবারগুলোই এর সবচেয়ে মারাত্মক শিকার। ২০৩০ সাল নাগাদ উন্নত উৎসের খাবার পানির সার্বজনীন প্রাপ্যতা অর্জন করতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে অগ্রগতির বর্তমান হার দশগুণ বাড়ানো দরকার। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে, যেখানে মানুষের নিরাপদ খাবার পানির ঘাটতির সম্ভাবনা দ্বিগুণ, সেখানে অগ্রগতির হার ২৩ গুণ বাড়ানো প্রয়োজন।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেন, “এমনকি মহামারির আগেও লাখ লাখ শিশু ও পরিবার পরিষ্কার পানি, নিরাপদ স্যানিটেশন এবং হাত ধোয়ার জায়গার সংকটে ভুগেছে। এখন পর্যন্ত এই জীবন রক্ষাকারী পরিষেবাগুলো জোরদার করার জন্য আমাদের দারুণ অগ্রগতি সত্ত্বেও উদ্বেগজনক ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা আমাদের সাড়া দেওয়ার সক্ষমতাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। কোভিড-১৯ এর মতো সংক্রামক ব্যাধির সঙ্গে লড়াই করাসহ প্রতিটি শিশু ও পরিবারকে তাদের স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক কল্যাণের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ের প্রয়োজনগুলো নিশ্চিত করতে আমাদের প্রচেষ্টা বহুগুণ বাড়ানোর সময় এসেছে।”
প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ আরও যেসব বিষয় উঠে এসেছে তার মধ্যে রয়েছে:
- প্রাথমিক পর্যায়ের পানির সুবিধা না পাওয়া ১০ জনের মধ্যে ৮ জনেরই বসবাস গ্রামাঞ্চলে। এদিকে, নিরাপদ স্যানিটেশন পরিষেবা বিশ্বের নগরাঞ্চলের ৬২ শতাংশ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছালেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৪৪ শতাংশ।
- বিশ্বে অগ্রগতির হার সবচেয়ে কম সাব-সাহারান আফ্রিকায়। মাত্র ৫৪ শতাংশ মানুষ নিরাপদ খাবার পানি পায়, এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে এই হার মাত্র ২৫ শতাংশ।
- মাসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক ক্রমবিকাশমান উপাত্তে দেখা গেছে, অনেক দেশে নারী ও মেয়েদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রয়োজনীয় মাসিক স্বাস্থ্য সেবা পায় না, যেখানে দরিদ্র ও শারীরিকভাবে অক্ষমদের মতো ঝুঁকির মুখে থাকা জনগোষ্ঠীর মাঝে এই বৈষম্যের মাত্রা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেশি।
ওয়াশ পরিষেবার আওতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক সংস্থা, সরকার, সুশীল সমাজ এবং বেসরকারি খাতের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এই বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। সদস্য দেশগুলোর অগ্রগতির তথ্য রাখা নিশ্চিত করতে ওয়াশ পরিষেবাকে অবশ্যই উচ্চ-পর্যায়ের রাজনৈতিক বৈঠকের আলোচ্য বিষয়ে নিয়মিত রাখতে হবে। ২০২৩ সালের ওয়াটার অ্যাকশন ডিকেডে'র আসন্ন মধ্যমেয়াদী পর্যালোচনার প্রেক্ষাপটে এটি গুরুত্বপূর্ণ, যা গত প্রায় ৫০ বছরে পানি ও স্যানিটেশন বিষয়ক জাতিসংঘের প্রথম সম্মেলন।
###
সম্পাদকদের জন্য নোট:
পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা জন্য ডব্লিউএইচও/ইউনিসেফের যৌথ পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি (জেএমপি) টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং খাবার পানি, স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা পরিষেবা (ওয়াশ) সম্পর্কিত সূচকগুলোতে বৈশ্বিক অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য দায়বদ্ধ। জেএমপি পরিবার, স্কুল এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে ওয়াশ বিষয়ক অগ্রগতির জাতীয়, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক তথ্য প্রদান করে।
লিংকসমূহ:
WHO/UNICEF Joint Monitoring Programme (JMP) for Water Supply, Sanitation and Hygiene
WHO: Water, sanitation and hygiene (WASH)
গণমাধ্যম বিষয়ক যোগাযোগ
ইউনিসেফ সম্পর্কে
প্রতিটি শিশুর অধিকার ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বিশ্বের ১৯০ টি দেশে কাজ করছে ইউনিসেফ। সকল বঞ্চিত শিশুদের পাশে থাকার অঙ্গীকার নিয়ে আমরা কাজ করি বিশ্বের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে।
আমাদের কাজ সম্পর্কে আরো জানতে ভিজিট করুন: www.unicef.org.bd
ইউনিসেফের সাথে থাকুন: ফেসবুক এবং টুইটার
ডব্লিউএইচও সম্পর্কে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জাতিসংঘের কার্যপরিধির ভেতরে থেকেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব ও সমন্বয়কের ভূমিকায় রয়েছে। ডব্লিউএইচও’র লক্ষ্য হচ্ছে ১৯৪টি সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে সুস্বাস্থ্যের জন্য কাজ করা, বিশ্বকে নিরাপদ রাখা এব সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকা জনগোষ্ঠীকে সেবা দেওয়া।
ডব্লিউএইচও সম্পর্কে আরও জানতে ভিজিট করুন: www.who.int.