হাম থেকে সুরক্ষায়, সুরক্ষার আগাম ডোজ
২০২৬ সালের শুরুর দিকে সারা বাংলাদেশে যখন হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে, তখন এক জরুরি টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে আয়েশার মতো ছোট শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়
- বাংলা
- English
মৌসুমী আর আয়েশার সাথে আমাদের দেখা হয় সিঁড়ির গোড়ায়; দিনটা ছিলো এপ্রিলের এক দুপুর ।
মৌসুমী তাঁর সাত মাসের ছোট্ট মেয়েকে টিকা দিতে নিয়ে এসেছেন—বহুদিন ধরে এই দিনটার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। আয়েশাকে কোলে নিয়ে কড়াইল বস্তির সরুগলি পেরিয়ে হেঁটে চলেছেন তিনি; গন্তব্য আলো ক্লিনিক।
আলো ক্লিনিকে প্রায় প্রতিদিনই মা ও শিশুদের ভিড় দেখা যায়। কারও কোলে তো কারও হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকে ছোট্ট শিশুরা। ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকায় অবস্থিত এই ক্লিনিকটিতে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয় বিনামূল্যে—নিয়মিত টিকা দান, গর্ভকালীন পরীক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সাধারণ জ্বর-সর্দি কিংবা জটিল রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা তাদের মধ্যে অন্যতম।
তবে আজকের চিত্রটা অন্যসব দিনের চেয়ে একটু আলাদা, পরিবেশটা যেন একটু বেশি অস্থির।
পুরো বাংলাদেশে হাম ছড়িয়ে পড়েছে। যে রোগটার কথা মানুষ প্রায় ভুলেই গিয়েছিল, সেটাই আচমকা যেন রুপকথার রাক্ষস হয়ে ফিরে এল। হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত, আর এর মধ্যে শত শত শিশুর অকালমৃত্যু। ঢাকার হাসপাতালগুলোতে সিট খালি নেই। অ্যাম্বুলেন্স, রিকশা, সিএনজি— অভিভাবকেরা যে যা পেয়েছেন, তাতে চড়ে বহু দূরের পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকার ডাক্তারের কাছে ছুটে এসেছেন । রাজধানীর হাম ওয়ার্ডগুলোতে মেঝেতে জাজিম বা তোষকে বিছিয়ে বসে আছেন মায়েরা, তাদের অসহায় চোখে কেবল পানি আর অপেক্ষা, পাশে গায়ে জ্বর, ফুসকুড়ি ও নিউমোনিয়া নিয়ে মাসুম শিশুরা যন্ত্রণায় ছটফট করছে, এ দৃশ্য সহ্য করা খুবই কঠিন।
রোগটা ছড়াচ্ছিল ভীষণ দ্রুত। কড়াইলের মতো জায়গায়, যেখানে এক ঘরের দেয়ালের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে অন্য ঘর, সেখানে রোগ ছড়াতে বিন্দু মাত্র দেরি লাগে না।
আয়েশার নাম ধরে ডাকতেই মৌসুমী ওকে নিয়ে এগিয়ে গেলেন আর মুহূর্তের মধ্যেই টিকাটা দেওয়া হয়ে গেল। হঠাৎ কী ঘটে গেল, তা বুঝে উঠতে না পেরে আয়েশা একটু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। কিন্তু মৌসুমীর মুখে তখন এক চিলতে স্বস্তির হাসি। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যে দুশ্চিন্তা, অপেক্ষা আর শিশু মৃত্যুর খবরে বুকে একটা পাথর চেপে ছিলো —এসব ভয় যেন এক মুহূর্তেই উড়ে গেল। তাঁর আদরের সন্তানটি এখন সুরক্ষিত, মায়ের কাছে এর চেয়ে বড় স্বস্তি আর কী-ই বা হতে পারে!
মায়েদের স্বস্তির এই মুহূর্তটুকু উপহার দেওয়ার এই পথটা ছিলো বেশ কঠিন। এটি ছিল মূলত হামের সংক্রমণ থামাতে চালু করা এক জরুরি টিকাদান কর্মসূচির অংশ।
সাধারণত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নিয়ম অনুযায়ী, হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের। কিন্তু দেশের পরিস্থিতি ছিলো বেশ চ্যালেঞ্জিং। ভাইরাসটি অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে ছড়াচ্ছিল আর কাব্য করছিলো সবচেয়ে ছোট শিশুদের বেশি। সাধারণত যেসব শিশু ৯ মাসের ছোট হওয়ায় টিকার পাবার জন্য উপযুক্ত ছিলো না, তাদেরই বেশি অসুস্থ হতে দেখা যাচ্ছিলো।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার, ইউনিসেফ, গ্যাভি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় এক জরুরি সিদ্ধান্ত নেয়। টিকার বয়সসীমা কমিয়ে ৬ মাস করা হয়, যাতে আয়েশার মতো শিশুরাও টিকার আওতায় আসতে পারে, তাদের জীবন ঝুঁকি কমানো যায়। এসব কিছুর লক্ষ্য একটাই—ভাইরাসটি শিশুদের স্পর্শ করার আগেই যেন সমাজজুড়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করা যায়।
কিন্তু কোনো টিকা তখনই কাজ করে, যখন বাবা-মায়েরা সেটার ব্যাপারে আগ্রহী হয়। যে সমাজে রোগ ছড়ানোর চেয়েও দ্রুত গুজব আর ভুল তথ্য ছড়ায়, সেখানে টিকা পৌঁছানো আর মানুষের বিশ্বাস অর্জনের মধ্যকার ব্যবধানই মাঝে মাঝে হয়ে দাঁড়ায় জীবন আর মৃত্যুর পার্থক্য।
এ কারণেই ইউনিসেফ সরকারি ও বেসরকারি মাঠকর্মীদের এমনভাবে তৈরি করেছে, যাতে তাঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মা-বাবাদের সাথে সরাসরি কথা বলতে পারেন। কেবল প্রচার চালানোই নয়, অভিভাবকদের পাশে বসে তাঁদের ভয় দূর করা এবং সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়াই ছিল তাঁদের কাজ। পাশাপাশি সরকারি টিকাদানকারীদেরও প্রশিক্ষিত করা হয়েছে, যাতে তথ্যের অভাবে কোনো পরিবার যেন বাদ থেকে না যায়।
এভাবেই মৌসুমীর দরজায় পৌঁছে একদল স্বাস্থ্যকর্মী।
টিকা দেওয়া শেষে মৌসুমী আয়েশাকে নিয়ে গেলেন পাড়ারই পরিচিত এক ফলের দোকানে। কমলালেবু আয়েশার খুউবই পছন্দ, তাই দোকানের তাজা কমলাগুলো দেখে আনন্দে চকচক করে উঠল শিশুটির দুচোখ।
ছোট্ট আয়েশার হয়তো কখনই মনে থাকবে না এই মহামারির কথা; হয়তো কখনো ও জানবেনা ওর মতো শিশুদের বাঁচাতে বয়সসীমা কমিয়ে টিকা দেবার জন্য কীভাবে এক জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল; ওদের দরজায় এসে কড়া নাড়া সেই স্বাস্থ্যকর্মীদের কথাও ওর ভুলে যাবার কথা; অজানা রয়ে যাবে কোন আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় এই জীবন রক্ষাকারী টিকা ওর হাত পর্যন্ত পৌঁছাল -সেই গল্পও।
সে এখন শুধু এটুকুই জানে—ওর এখন একটা সুন্দর পাকা কমলালেবু চাই!
টিকা আসলে এটাই করে—আয়েশার মতো শিশুদের সব ধরনের মহামারি আর বিপদের ঝুঁকি থেকে মুক্ত রেখে শুধু শৈশবের আনন্দটুকুতেই বাঁচিয়ে রাখে।