রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কোভিড-১৯ এর মধ্যেই বাংলাদেশে ২ কোটিরও বেশি শিশুকে খাওয়ানো হয়েছে ভিটামিন এ

মহামারির প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী অনুষ্ঠিত অল্প কয়েকটি ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনের মধ্যে একটির অর্জন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য

UNICEF
Bangladesh. A child receiving Vitamin A capsule.
UNICEF/UN0353783/Paul
31 ডিসেম্বর 2020

স্বাস্থ্য ক্লিনিক ব্যবস্থাপক রিক্তা রায় ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণে ১৫টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইনের টিকাদান কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছেন। জাতীয় এই ক্যাম্পেইনের লক্ষ্য হচ্ছে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর পরিপূরকসহ বাংলাদেশের ২ কোটি ১০ লাখেরও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া।

ঢাকার সূর্যের হাসি ক্লিনিকের স্বাস্থ্য ক্লিনিক ম্যানেজার রিক্তা বলেন, “এ বছর কোভিড-১৯ এর কারণে সবকিছুই অন্যরকম। মার্চ মাসে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ থাকার কারণে এই এলাকার শত শত মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। তাদের শিশুদের জন্য দুধ, ডিম বা এমনকি শাকসবজি কেনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ তাদের কাছে নেই।”

জীবন ও জীবিকাকে বিপর্যস্ত করে, প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে এবং খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে মহামারিটি শিশু ও পরিবারগুলোর জন্য বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি করে।

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপুষ্টি কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে শিশুদের মাঝে খর্বাকৃতির হার ৪১ শতাংশ থেকে ৩১ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। কোভিড-১৯ কষ্টার্জিত এই অর্জনগুলোকে হুমকির মুখে ফেলেছে, যা একটি স্বাস্থ্যজনিত সংকটকে পুষ্টিজনিত সংকটে পরিণত করছে। এক্ষেত্রে শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।

নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে রিক্তা বলেন, “দৃশ্যত অপুষ্টিতে ভুগছে এমন এক শিশুসহ এক তরুণীকে সম্প্রতি আমি দেখেছি। আমি জানতে পারি যে, ওই তরুণী গত মার্চে গৃহকর্মী হিসেবে তার কাজ হারান। এই অবস্থায় তাকে তার শিশুর জন্য সঠিক, সুষম খাদ্য নিশ্চিত করতে বলাটা আমার জন্য কঠিন ছিল। কীভাবে আমি তাকে বলবো তার শিশুকে মাছ, মাংস ও ডিম খাওয়াতে, যখন সবকিছু এত ব্যয়বহুল?”

শিশুদের জন্য ইতিবাচক ফলাফল অর্জনে চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে ওঠা

শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর দুটি জাতীয় ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে। এই বছর কোভিড-১৯ এর কারণে দ্বিতীয় ক্যাম্পেইনটি স্থগিত করা হয়, যা জুলাইয়ে পরিচালনার কথা ছিল।

তবে সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পনা এবং অতিরিক্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে ২০২০ সালের অক্টোবরে সফলভাবে দুই সপ্তাহ ধরে এই ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়। এই ক্যাম্পেইনের আওতায় ২ কোটি ৮ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়, যা লক্ষ্যমাত্রার ৯৭ শতাংশ।

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি টোমো হোযুমি বলেন, “বিস্তৃত পরিসরে টিকাদানের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মী, শিশু ও তাদের বাবা-মায়েদের সুরক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্যে এই ক্যাম্পেইন গৃহীত হয়। এটি বাংলাদেশের শিশুদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিজয়।”

একইসঙ্গে টিকাদান কেন্দ্রগুলোতে বড় ধরনের জমায়েত এড়ানোর লক্ষ্যে একদিনের পরিবর্তে ১২ দিন ধরে ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনটি পরিচালনা করা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম।

১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি বিতরণ কেন্দ্রের মাধ্যমে ক্যাম্পেইনটি পরিচালিত হয়, যেখানে যথাযথভাবে মাস্ক পরিধান করা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং হাত ধোয়ার সুবিধা নিশ্চিত করাসহ সংক্রমণ প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকরা সেবা প্রদান করেন।

কোভিড-১৯ এর প্রেক্ষাপটে নিরাপদে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্দেশনা ও যোগাযোগ উপকরণ তৈরি এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিং ও রিপোর্টিংয়ের জন্য কারিগরি সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে ইউনিসেফ বাংলাদেশ সরকারকে এই ক্যাম্পেইন পরিচালনায় সহায়তা দিয়েছে। এছাড়াও ইউনিসেফ স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের জন্য ৩ লাখ ৬০ হাজার মাস্ক সরবরাহ করে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্য পুষ্টি ইনস্টিটিউটের জাতীয় পুষ্টি সেবার পরিচালক ড. এস এম মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইনের জন্য রিয়েল-টাইম মনিটরিং ও রিপোর্টিং চালু করায় তা প্রকৃত অর্থেই পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। ক্যাম্পেইনের প্রতিদিনের কার্যক্রম সম্পর্কে জানাতে মোবাইল ফোন ব্যবহার করা হয়, যা আমরা লক্ষ্যচ্যুত হলে দ্রুত তা সংশোধনে আমাদের সক্ষম করে তোলে। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জরুরি সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপকরণ জরুরি ভিত্তিতে নিকটস্থ আরেকটি কেন্দ্র থেকে পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।”

Bangladesh. A child waiting to receiving Vitamin A capsule.
UNICEF/UN0353777/Paul
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মীরা জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন চলাকালে কোভিড-১৯ পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে এবং সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে শিশুদের ভিটামিন এ পরিপূরক প্রদান করে।

তিন সন্তানের জননী নিতু রানী সাহা (৩৫) ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণে থাকেন। তিনি তার সন্তানের পুষ্টির জন্য ভিটামিন এ’র ​​গুরুত্বের কথা স্বীকার করেন এবং তার মেয়ে রাখি সাহা (৩) যাতে এই পুষ্টি-পরিপূরক পায় তা নিশ্চিত করতে মেয়েকে নিয়ে তিনি ক্লিনিকে এসেছিলেন।

নিতু রানী সাহা বলেন, “ফেসবুকে এক বন্ধু আমাকে এই ক্যাম্পেইন সম্পর্কে বলেন। টেলিভিশন ও সংবাদপত্র থেকেও আমি এ সম্পর্কে জেনেছি। আমি মনে করি এটি একটি দারুণ উদ্যোগ।”

“লকডাউনের সময় আমাদের অনেক কষ্ট হয়েছে। আমাদের খাদ্যের যোগান যদিও কম ছিল, তবে শিশুদের আমরা সবসময় যে খাবার দিয়েছি তা বজায় রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। আমি আশা করি এতে তাদের পুষ্টির ওপর প্রভাব পড়েনি,” তিনি যোগ করেন।

Bangladesh. A mother and her child.
UNICEF/UN0353774/Paul
ঢাকায় জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইনের আওতায় ভিটামিন এ প্লাস পরিপূরক গ্রহণের পর হাস্যোজ্জ্বল রাখি সাহা (৩)।

শিশুদের পুষ্টিজনিত ঝুঁকি হ্রাস করা

জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শিশুরা যাতে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি লাভ করে তা নিশ্চিত করতে লাখ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও বাবা-মা নিয়োজিত ও সম্পৃক্ত ছিল, যা বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে সমন্বিত প্রচেষ্টার কারণেই সম্ভব হয়েছে।

মহামারিটি সারাদেশে জীবন, জীবিকা এবং খাদ্য নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে চলেছে এবং এই পরিস্থিতিতে শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমানোর জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পরিষেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের পুষ্টি বিভাগের প্রধান পিয়ালি মুস্তাফি বলেন, “ক্যাম্পেইনটি শিশুদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, তবে আমাদের কাজ শেষ হয়নি। তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের জীবনভর নানান স্বাস্থ্যগত সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, যা শিশুদের বৃদ্ধি, বিকাশ এবং এমনকি বেঁচে থাকায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশু শনাক্ত করতে, তাদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখতে এবং চিকিৎসতা প্রদানে আমাদের প্রচেষ্টা অবশ্যই দ্বিগুণ করতে হবে।”

প্রতিটি শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরিষেবা প্রাপ্তি বজায় রাখতে ও জোরদার করতে ইউনিসেফ বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।