অগ্রগতির নতুন পথ: দক্ষতা তৈরির মধ্য দিয়ে তরুণদের ক্ষমতায়ন

কক্সবাজারে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের কারিগরি দক্ষতা তৈরির মাধ্যমে তাদের প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে সহায়তা করছে মাল্টি-পারপাস সেন্টার।

তাসনীম কিবরিয়া
Delwar, 22, sits at his workspace in an electronics shop in Cox’s Bazar, Bangladesh.
UNICEF Bangladesh/2023/Sujan  
29 সেপ্টেম্বর 2024

বাংলাদেশের কক্সবাজারে নিজের ইলেকট্রনিক্সের দোকানে বসে আছেন দেলোয়ার (২২)। দেলোয়ার ইউনিসেফের সহায়তা পুষ্ট একটি মাল্টি-পারপাস সেন্টারে ছয় মাসের একটি কোর্সের আওতায় কম্পিউটার পরিচালনাও জীবন-দক্ষতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

কোভিড-১৯ অতিমারি বাংলাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়লে, এই ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে দেওয়া হয় লকডাউন। তাতে স্কুলসহ সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় এবং মানুষের জীবন-জীবিকা বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এসময় কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন দেলোয়ার হোসেন। বৃদ্ধবাবা-মা ও পাঁচভাই-বোনের সংসার তার। হাইস্কুলের ছাত্র দেলোয়ার পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য হন এবং পরিবারকে সহায়তার জন্য কাজ করা শুরু করেন।

“আমার আর কোনো উপায় ছিল না,” বলেন বর্তমানে ২২বছর বয়সী দেলোয়ার। তিনি আরও বলেন, “আমার বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষ। তারযে সহায়তা দরকার তা আর আমার ভাই-বোনেরা দিতে পারছিল না।আমাদের পরিবারের আয় কম এবং নানান সমস্যা থাকার কারণে আমি ভাবলাম, আমি যদি আয় করা শুরু করি তাহলে সেটাই সবচেয়ে ভালো হবে। আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমার বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেয়াটা তখন সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল।’

অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেলোয়ার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বাদ দেওয়ার পর তার সঙ্গে ইউনিসেফের সহযোগী একটি সংগঠনের কর্মীদের দেখা হয়।তারা তাকে ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত একটি মাল্টি-পারপাসসেন্টারে বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ থাকার কথা জানিয়ে বলেন, দেলোয়ার সেখানে কম্পিউটার চালানো শিখতে পারেন। ওই সেন্টার পরিচালনায় তহবিলের যোগান আসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে। আগে কোনো ধরনের কম্পিউটার প্রশিক্ষণনা থাকা সত্ত্বেও দেলোয়ার কম্পিউটারভিত্তিক নানা ধরনের দক্ষতা ও অ্যাপ্লিকেশন সম্পর্কে শিখতে শুরু করেন। তার আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং সেন্টারের নিবেদিত প্রাণ প্রশিক্ষকদের দিক নির্দেশনায় দেলোয়ার খুব দ্রুত শিখতে থাকেন।

“আমি কম্পিউটার সম্পর্কে কিছু জানতাম না। তাই আমি শেখার জন্য খুবই আগ্রহী ছিলাম,” সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন দেলোয়ার। তিনিবলেন, “আমি আগে কীভাবে কম্পিউটার চালাতে হয় তা শিখি। তারপর আমি জিমেইল ব্যবহার করা শিখি। এমনকি উন্নত মানের ফটোশপের কাজও শিখি।এই কোর্সের মাধ্যমে আমার সৃজনশীল দক্ষতার বিকাশ ঘটে এবং এর ফলে আমি নতুন উদ্যোগ নেওয়ার আত্মবিশ্বাস পাই।”       

Delwar works on his computer at the electronics store.
UNICEF Bangladesh/2023/Sujan   ইলেট্রনিক্সের দোকানে নিজের কম্পিউটারে কাজ করছেন দেলোয়ার।

নতুন এসব দক্ষতা অর্জনের পরেও দেলোয়ার তা ঠিক মতন চর্চা করতে পারছিলেন না। মাল্টি-পারপাস সেন্টারে তাঁর প্রশিক্ষকের পরামর্শ অনুযায়ী দেলোয়ার প্রশিক্ষণ কোর্স শেষ করার পরে স্থানীয় একটি ইলেকট্রনিক্সের দোকানে কাজ শুরু করেন।

দেলোয়ারবলেন, “পরে আমি ওই দোকানেরই একটি ছোট অংশ দোকানের মালিক (দেওয়ান) এর কাছ থেকে ভাড়া নেই; দেওয়ান ভাই আমার এলাকাতেই থাকেন। আমি শুরু থেকেই প্রত্যেক মাসেকিছু টাকা জমাতাম। জমানো টাকা দিয়ে আমি একটি পুরনো কম্পিউটার কিনেছি; সেটা দিয়েই এখন আমি কাজ করি।”

মাল্টি-পারপাস সেন্টারে প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত দক্ষতা দেলোয়ারের জীবনে আশীর্বাদ স্বরূপ। এইদক্ষতা কাজে লাগিয়ে তিনি এখন দোকানে গ্রাহকদের বিভিন্ন ধরনের ফরম পূরণ করে দেন, নানা ধরনের ডকুমেন্ট (নথিপত্র) তৈরি করে দেন। 

Delwar assists a customer at the electronics store.
UNICEF Bangladesh/2023/Sujan   ইলেট্রনিক্সের দোকানে একজন গ্রাহককে সেবা দিচ্ছেন দেলোয়ার।

দেলোয়ারের এখনও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তিনি বলেন, সব সময় তার গ্রাহক উপস্থিতি এক রকম থাকে না।

দেলোয়ার বলেন,“শিক্ষার্থীরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদন করে বা স্কুলের প্রজেক্টগুলো নিয়ে কাজ করে তখন আমি বেশি গ্রাহক  পাই। সাধারণত গড়ে দিনে দুই বা তিনটা গ্রাহক পাই। কিন্তু বেশি কাজের সময়ে অনেক গ্রাহক আসে।”

তিনি বলেন, “আমি গ্রাহক পাচ্ছি এবং টাকা আয় করছি। প্রতি মাসে আমার ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা আয় হয়।”

 

ভবিষ্যতের লক্ষ্য

Delwar interacts with a customer at the electronics store.
UNICEF Bangladesh/2023/Sujan   ইলেকট্রনিক্সের দোকানে একজন গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলছেন দেলোয়ার।

দেলোয়ার তার বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন করতে চান; আরও উন্নতি করতে চান।তিনি তার ব্যবসা আরও বাড়ানোর পাশাপাশি আরও নতুন নতুন গ্রাহক সেবা চালু করার আশা করছেন। মাল্টি-পারপাস সেন্টার থেকে যে সহায়তা পেয়েছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন দেলোয়ার; একই সঙ্গে তার আরও শেখা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন।

“বহু জিনিস আছে, যেগুলো আমি এখনো জানি না,” বলেন তিনি। দেলোয়ার বলেন, “ভবিষ্যতে আমি আরও ভালো গ্রাফিক ডিজাইন করা শিখতে চাই এবং একটি ভালো প্রিন্টার কিনতে চাই।”

তবে তার সামনের পথ বাধাহীন নয়। পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় দেলোয়ারের আয়ের একটি বড় অংশ ব্যয় হয় তার পরিবারের পেছনে, কিন্তু তাতেও মেটানো সম্ভব হয় না পরিবারের সব চাহিদা। এজন্য তিনি তার ব্যবসা সম্প্রসারণের আশা করছেন। সেটা সম্ভব করতে দোকানটাকে বড় করার জন্য আরও খানিকটা জায়গা ভাড়া নেওয়া এবংনতুন নতুন যন্ত্রাদি কেনার জন্য কীভাবে টাকার সংস্থান করা যায়, তার উপায় খুঁজছেন তিনি।

নিজের এই সংগ্রামের মধ্যেই দেলোয়ার তার কমিউনিটির জন্যও উন্নততর ভবিষ্যতের স্বপ্ন লালন করছেন।তিনি একটি কোচিং সেন্টার চালুর স্বপ্ন দেখেন, যেখানে তার মতন অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে থাকা তরুণেরা এসে একই ধরনের দক্ষতা অর্জন করবে এবং তার মধ্য দিয়ে উপার্জনের পথ তৈরি করে একটি স্থায়ী ও টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করতে পারবে।

দেলোয়ার বলেন, “আমার এলাকায় অনেক তরুণ ছেলে-মেয়ে বেকার রয়েছে। আমি তাদেরকে দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করতে চাই, যাতে তারা সমাজের উৎপাদনক্ষম সদস্য হতে পারেন এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারেন।”

সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে ইউনিসেফ। তাদের এই অর্থ সহায়তার কারণে কক্সবাজারে ৪ হাজার ১০০ এর বেশি কিশোর-কিশোরীও তরুণ-তরুণী বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে অংশ নিতে পেরেছে।