সহানুভূতি এবং সাহসের সাথে বাংলাদেশকে নিয়ে নতুন করে ভাবছে তরুণরা
পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে ভয় পায় না এমন একটি প্রজন্মের উদ্যাপন।
- বাংলা
- English
এটা আগস্টের শুরুর দিকে। সকল রাস্তাতেই যেন বৈদ্যুতিক এক অনুভূতি। তাদের শহরের এক সময়ের জরাজীর্ণ দেয়াল এখন শক্তিশালী জীবন্ত শিল্পকর্ম দিয়ে পরিপূর্ণ। আর সে সব দেয়ালের দিকেই লোকজন থেমে থেমে তাকাচ্ছে। কিছুটা দূরে তারা শুনতে পাচ্ছিল ঝাড়ুর অবিরত শব্দ। ঝাড়ু দেবার ফলে রাস্তাগুলোকে এমন প্রাণবন্ত ও সুন্দর দেখাচ্ছিল যা সকলকে যেন দেখার আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল। সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে, তরুণরা নিজেরাই এই রূপান্তরমূলক পরিবর্তনের অগ্রভাগে ছিল।
পরিবর্তনের যে স্বপ্ন তরুণরা দেখেছে, নিজেদের মধ্যে শক্তিশালী ঐক্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তারা সেগুলো বাস্তুবে রূপ দিতে কাজ করছে। তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ গল্পগুলোকে ছড়িয়ে দেবার মাধ্যমে তাদের কন্ঠস্বরকে প্রসারিত করতে ইউনিসেফ বাংলাদেশ এগিয়ে এসেছে।
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবের ঝলক নিচে দেখা যাচ্ছে। শৈশবকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে তাদের নিরলস অবদানকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
জীবন যেখানে আশা সেখানে
ধানমন্ডি ২৭-এর কোলাহলের মধ্যে সাইদা নুজহাত এবং তার বন্ধুরা রঙ-তুলি দিয়ে এঁকে একটি জরাজীর্ণ প্রাচীরকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। এটি ঐক্য ও প্রত্যাশার প্রতিধ্বনি করছে।
যে পরিবর্তন তরুণরা দেখতে চায় তা আনতে তারা যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে সেটা দেখাটাও অভূতপূর্ব আনন্দের ও অনুপ্রেরণার। কারণ প্রত্যাশা করা যদিও অত্যন্ত ভালো একটি বিষয় হতে পারে, তবে এটি তখনই সত্যিকারের শক্তিশালী হয়ে ওঠে যখন তরুণরা যে বিষয়গুলোকে তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়, সেগুলোর জন্য তাদের সবটুকু ঢেলে দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।
যে শুধু একটি ভালো, কিংবা আরও প্রতিশ্রুতিশীল ভবিষ্যতেরই আশা করেন না, বরং এটি কার্যকর করার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করেন, সেই সাইদা নুজহাত বলে, “আমাদের জাতির সৌন্দর্য্যের সাথে নতুন কিছু যোগ করতে এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আমরা ধানমন্ডি ২৭-এ একটি প্রাচীর পুনরুজ্জীবিত করেছি। আমাদের জনগণের সম্মিলিত চেতনাই আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছিল। একই সাথে, আমরা সকলের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই।”
সব কিছু ঝেড়ে ফেলে আমরা একটি টেকসই বাংলাদেশ গড়তে চাই
নিজের বন্ধুদের সাথে রাস্তা পরিষ্কার করার কাজে নেতৃত্ব দেওয়া ২০ বছর বয়সী সাকিব আবির বলে, “আমি একটি টেকসই বাংলাদেশের ছবি দেখি।”
আজকের অর্থপূর্ণ কর্মের মাধ্যমে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ শুরু হয় বলে তারা বিশ্বাস করে। তবে, তারা কেবল একটি টেকসই ভবিষ্যত সম্পর্কেই কথা বলছে না; সব কিছু ঝেড়ে ফেলে দিয়ে তারা তাদের কথাকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে।
সকল প্রাণীর জন্য !
প্রত্যেকে, এমনকি কথা বলতে পারে না তারাও যেন নিজেদের সবকিছুতে অন্তর্ভুক্ত মনে করে, এমনটিই নিশ্চিত করতে চায় সাকুরা তাকাহাশি।
সে নতুন করে সমবেদনা ও উদারতার বাংলাদেশকে কল্পনা করে। রাজধানীতে অবহেলিত প্রাণীদের খাওয়ানো এবং তাদের চিকিৎসা করার মাধ্যমে এই মূল্যবোধের উপর কাজ করছে সাকুরা।
তার এই ত্যাগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে, সাকুরা বলে, “প্রবাদটিতে যেভাবে বলা হয়েছে আমি ঠিক সেভাবেই বিশ্বাস করি। আপনি যা বলেন তার চেয়ে আপনি যা করেন সেটার প্রভাব অনেক বেশি। আমরা যদি সত্যিকারের সংস্কার দেখতে চাই, তা আমাদের থেকেই শুরু করতে হবে।
”ন্যায়বিচারের অভিভাবক
নটরডেম আর্ট ক্লাবের একটি শক্তিশালী টিমওয়ার্কের ফলাফল হলো এসব শিল্পকর্ম। এসব শিল্পকর্মের প্রতিটি স্ট্রোক এবং ছায়া এক একটি বিশদ গল্প বলে। তাদের সৃষ্টিতে রচিত হয়েছে সমৃদ্ধ রূপক, উদ্দীপনার প্রতীক, এবং ইতিহাসের প্রতিধ্বনি। বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে বলার জন্য তিটি উপাদানকে সাবধানে বেছে নেওয়া হয়েছে এসব শিল্পকর্মে।
উপরের একটি দিয়ে শুরু করলে দেখা যায়, এই আকর্ষণীয় অংশটি পুবলিয়াস হোরাটিয়াস কোকলসকে চিত্রিত করেছে। অগ্রসরমান সেনাবাহিনীর হাত থেকে তার শহরকে রক্ষা করতে একজন যোদ্ধা হিসেবে এই পুবলিয়াস হোরাটিয়াস কোকলস একাই অবিচল দাঁড়িয়েছিলেন। তার অবিচল সাহস আজ বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একই রকমভাবে খুঁজে পাওয়া যায়। অনেকটা হোরাটিয়াসের মতো, স্থিতিস্থাপকতা এবং ঐক্যকে ভিত্তি হিসেবে ধরে ন্যায় ও সাম্যের জন্য শিক্ষার্থীরা তাদের লড়াইয়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের কালজয়ী কথার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এই শিল্পকর্মটি ১৮ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের সাহস এবং অটল সংকল্পের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।
এটি তারুণ্যের মর্মকে ধারণ করে। সাহস এবং ন্যায়বিচারের সহজাত অনুভূতির দ্বারা পরিচালিত এই তরুণ পরিবর্তনকারীরা অন্যেরা যেখানে ব্যর্থ হয় সেখান থেকেই তারা সর্বপ্রথম শুরু করে।
একটি পছন্দ এবং সুযোগও একটি
শেরপুরে তার গ্রামের শান্ত পরিসরে সাদমান ইশরাক নতুন এক বাংলাদেশকে কল্পনা করেছিল। জীবন এবং প্রতিশ্রুতিতে পূর্ণ একটি সবুজ এবং আরও প্রাণবন্ত জাতির প্রত্যাশা তার।
গাছ লাগানোর মতো একটি সাধারণ কাজের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল তার স্বপ্ন। প্রথম নজরে, তার প্রচেষ্টা ছোট, এমনকি তুচ্ছ বলেও মনে হতে পারে। যাইহোক, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি বীজ কেবল তার গ্রাম নয়, একটি সমগ্র জাতিকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে। এমনকি সম্ভবত, বিশ্বকেও রূপান্তর করার ক্ষমতা রাখে?
সাদমানের কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই সুযোগকে কাজে লাগানোর একমাত্র সুযোগ আছে আমাদের। তাই, আসুন আমরা এটি গ্রহণ করি এবং সঠিক সুযোগটিকে বেছে নিই।
আমাদের ঐতিহ্যের প্রতি অঙ্গীকার
শিল্প, সংস্কৃতি এবং কবিতা। এক প্রানবন্ত ও সুন্দর বাংলাদেশ গঠনে এগুলো যেন দীর্ঘদিন ধরে একই সুতায় বাধাঁ রয়েছে। এগুলোকে ম্লান হতে দেওয়ার অর্থ হল আমাদের পরিচয়কে মুছে ফেলা।
১৯ বছর বয়সী জারা আরিয়ানা সরকার, দেশের প্রতি ভালোবাসার টানে ঢাকার দেয়ালগুলো পুনরুদ্ধার করেছে এবং আমাদের ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এঁকেছেন। তার কাজ আমাদের শিল্প ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধির বিষয়টিকেই মনে করিয়ে দেয়। তার অঙ্কনের প্রতিটি স্ট্রোক আমাদের ঐতিহ্যের একটি কাব্যিক অনুস্মারক হিসাবে কাজ করে যা আমাদের নমনীয়তার বিষয়টিকে ইঙ্গিত করে। আমরা যে সৌন্দর্য্যকে বহন করি এবং যে গল্পগুলো আমরা অবশ্যই কখনই ভুলবো না- তার কাজের মাধ্যমে সে আমাদের সে সব কথা্ই মনে করিয়ে দিয়েছিল।
উপরের তার শিল্পকর্মটি একটি ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশী খাবারের শৈল্পিক চিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে। এই শৈল্পিক চ্রিত্রের কেন্দ্রবিন্দু হল একটি ঝুড়ি-শৈলীর থালা । এই থালায় রয়েছে সাদা ভাতের একটি প্লেট যার উপরের অংশটা ইলিশ মাছের টুকরো দিয়ে সাজানো। প্লেটটির চারিপাশে সাজানো সবজি, মসুর ডাল এবং মশলার মতো বিষয়গুলো বিভিন্ন রঙে আঁকা।
এবং নতুন করে ভাবছেন এমন বাংলাদেশ সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে, সে প্রত্যাশা এবং সংকল্প উভয়ের সাথেই উত্তর দিয়েছিলেন: "এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে আমরা নির্ভয়ে লিখতে পারি, আঁকতে পারি এবং স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারি ।"
সত্যের জন্য একসাথে
৩০ শে জুলাই, চারিপাশের বাতাসে যখন অস্থিরতার শব্দে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) এর ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী রুবায়েত ফেরদৌস রনিল ভয়কে জয় করার সংকল্প নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল।
প্রতিটি নিঃশ্বাস যখন ছিল ভারী, প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল বিপজ্জনক, ঠিক সেই সময়ে রনিলের দৃঢ় ও সঠিক সংকল্প তাকে রাস্তায় দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। তার সাহস তাকে গ্রেপ্তারের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তার কার্যকলাপ সেই মুহূর্তের সকল সীমাকে অতিক্রম করেছিল।
আইবিএর শিক্ষার্থীরা তার সাহসিকতাকে এমনভাবে সম্মান করেছিল যা গল্পটিকে প্রাণবন্ত করেছে। তারা তার গ্রেফতারের মুহূর্তটিকে পুনরায় তৈরি করেছে, তাদের বন্ধুর অবাধ বিরুদ্ধাচরণ এবং অদম্য মনোভাবকে চিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছে। তাদের শিল্পের মাধ্যমে তারা শুধু রনিলের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনই করেনি বরং শত প্রতিকূলতার মাঝেও একসাথে দাঁড়ানোর শক্তির কথাও সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছে।