তাওহিদা ও তানিয়া: মধুর এক বন্ধুত্ব
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকটের কারণে যেহেতু প্রাকৃতিক দুর্যোগের হার, তীব্রতা আর ভয়াবহতা বেড়েই চলেছে, তাই এমন একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে যাতে শিশুদের এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও লেখাপড়ার কোন ব্যাঘাত না ঘটে।
- বাংলা
- English
সুনামগঞ্জ, সিলেট - বারো বছর বয়সে তাওহিদা ও তানিয়া প্রথম স্কুলে যায়; ছয় মাসের মধ্যে তারা দুজনই মৌলিক সাক্ষরতা অর্জন করে এবং সংখ্যা চিনতে আর গুনতে শিখে ফেলে। তারা হয়ে উঠে খুব ভালো বন্ধু।
কিন্তু চলতি বছরের বর্ষায় যখন বন্যা হয়, তখন বেশ কয়েকদিন তাদের পড়ালেখা বন্ধ থাকে। পুরো গ্রামের মতো তাদের শিক্ষাকেন্দ্রটিও পানিতে তলিয়ে যায়।
এই শিক্ষাকেন্দ্রটি ইউনিসেফের সহযোগিতায় প্রত্যন্ত গ্রামের উদ্দেশ্যে তৈরী ‘লেট আস লার্ন’ (চলো শিখি) প্রকল্পের অধীনে চালু করা হয়েছে। ইউনিসেফের সহায়তায় এই শিক্ষাকেন্দ্রটি পরিচালনা করে স্থানীয় জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন।
তাওহিদা বলে, ‘আমি বন্যা একদম পছন্দ করি না। কারণ বন্যা হলে স্কুলে যেতে পারি না, পড়তে পারি না, বন্ধুদের সঙ্গে খেলতেও পারি না। বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রেও অনেক ভিড় থাকে।' ওই সময়ের বর্ণনা দিয়ে তাওহিদা আরও বলে, ‘আমার বন্ধু তানিয়ার সঙ্গে দেখা করতে না পেরে তখন আমার আরও খারাপ লাগছিলো।'
দুর্যোগ মোকাবিলায় একটি পরিকল্পনা
তাওহিদা ও তানিয়া বেড়ে উঠছে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট বিভাগের শান্তিগঞ্জ উপজেলায়। ভৌগোলিকভাবে এলাকাটির আকার একটি বাটি’র মতন যাকে আমরা বলি হাওর১ এলাকা। বর্ষার সময় প্রায়ই এলাকাটি বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানানসই মডেল ব্যবহার করে ইউনিসেফের সহায়তায় এই শিক্ষাকেন্দ্রগুলো গড়ে তোলা হয়েছে। এই উদ্যোগের অন্যতম আরেকটি লক্ষ্য হলো, শিক্ষকদেরও দুর্যোগ মোকাবিলার কার্যকরী কৌশল শেখানো এবং তাদের প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা। তাওহিদা ও তানিয়ার শিক্ষিক হুসনা বেগমও এই প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
হুসনা বেগম বলেন, ‘বন্যার সতর্ক সংকেত পাওয়া মাত্র আমি সেন্টার ম্যানেজমেন্ট কমিটি ২ ও স্থানীয় কমিউনিটির সদস্যদের ফোন করি যাতে শিক্ষা উপকরণগুলো নিরাপদে সরিয়ে রাখা যায়। তারাও আমাকে সাহায্য করেছেন।'
শান্তিগঞ্জ এলাকা এই বছর এক নজিরবিহীন ধারাবাহিক বন্যার সম্মুখীন হয়ঃ একই বছরে চার বার বন্যা আঘাত হানে এলাকাটিতে। বন্যার পানি সবসময় সহজে কমে না, তাই কমিউনিটির সদস্যরা শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প এক শিক্ষাকেন্দ্রের ব্যবস্থা করে রেখেছে যাতে কোনভাবেই তাদের লেখাপড়া ব্যাহত না হয়। এলাকার এক দয়ালু কাঠমিস্ত্রি তার বাড়ির উঠানটি শিক্ষার্থীদের পড়ানোর জন্য ছেড়ে দিয়েছেন কেননা এই উঠানটি গ্রামের সবচেয়ে উঁচু স্থান।
বিপর্যস্ত এক শৈশব
দুর্যোগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা দিয়ে সব বাধা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। শিক্ষক হুসনা বলেন, ‘বন্যার সময় লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার জন্য বিকল্প শিক্ষাকেন্দ্র পাওয়া গেলেও সেখানে যাতায়াত ছিলো বেশ কষ্টসাধ্য।' প্রতি সকালে হুসনাকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হতো শিক্ষাকেন্দ্রে, পথে আবার তানিয়াসহ যেসব শিক্ষার্থীর নৌকা ছিল না তাদেরকে নৌকায় তুলে নিতেন তিনি। হুসনা বলেন, 'আমি আমার শিক্ষার্থীদের খুশি রাখা ও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি।'
তানিয়া বলে, ‘আমার যদি একটি ইচ্ছাপূরণের সুযোগ আসতো, তাহলে শিক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য একটি নৌকা চাইতাম।'
যেসব এলাকায় স্কুলের যাতায়াত ব্যবস্থা এমনিতেই খারাপ, বন্যার মতো দুর্যোগ হলে এই যাতায়াত হয়ে পড়ে দুষ্কর । এমন অঞ্চলে প্রতি তিন পরিবারের একটি দূরত্বের কারণে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারে না।৩ এই হার আরও বাড়িয়ে দিয়েছে দারিদ্র্য, যেখানে প্রতি দুই পরিবারের একটি অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কারণে তাদের সন্তানদের পড়ালেখা মাঝপথে বন্ধ করে দেয়।৪
এমন পরিস্থিতি কেবল তাওহিদা-তানিয়ার লেখাপড়াই বিঘ্নিত করে না বরং তাদের শৈশবকেও প্রভাবিত করে। তাদের মনে প্রশ্ন জাগে, কখন তাদের বাবা-মা বাড়ি ফিরবেন। কারণ, তানিয়ার বাবা-মা কাজের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। তানিয়া এখন পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে থাকেন। অন্যদিকে, তাওহিদার বাবা সাইদুর রহমান প্রবাসে শ্রমিকের কাজ করেন। তিনি ও তার স্ত্রী সুফিয়া আক্তার পড়ালেখা করতে পারেননি; তবে তারা চান- তাদের মেয়ে লেখাপড়া করে শিক্ষিত হয়ে উঠুক। আত্মবিশ্বাসী তাওহিদা বলে, ‘আমি বাবার সঙ্গে অনেক জায়গা ঘুরতে চাই। বাবাকে খুব মিস করি।'
বিশাল জাদুময় এক পৃথিবী
সুনামগঞ্জে ‘লেট আস লার্ন' (চলো শিখি) প্রকল্পের অধীনে এই শিক্ষাকেন্দ্রটি চলছে ২০১৯ সাল থেকে। এটি স্কুল থেকে ঝরে পড়া ৩৫ হাজার ৫৫০ শিশুর জীবন বদলে দিয়েছে, যাদের অর্ধেকই মেয়ে শিশু, এবং দুই শতাংশের বেশি প্রতিবন্ধী শিশু।
এসব শিক্ষাকেন্দ্রে শিশুদের ‘টিচিং অ্যাট দ্যা রাইট লেভেল’ (সঠিক পর্যায় অনুযায়ী) শিক্ষাদান করা হয়।৫ জ্ঞানের ধরন ও শেখার ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীদের কয়েকটি দলে ভাগ করা হয় যাতে তারা নিজস্ব গতিতে অগ্রসর হতে পারে। ফলে শিশুরা পরবর্তীতে মূলধারার স্কুলে ভর্তি হবার অথবা প্রাথমিক শিক্ষার সমমানে লেখাপড়া সম্পন্ন করার সুযোগ পায়। এই শিক্ষণ পদ্ধতি নিশ্চিত করে যে, বয়স ও দক্ষতা ভেদে সকল শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে উন্নতি করতে পারে।
স্মৃতি রোমন্থন করে সুফিয়া বলেন, ‘এলাকার স্কুলটা বেশ দূরে হওয়ায় এক সময় মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে ভয় পেতাম। এখন আমি খুশি যে, মেয়েকে এই প্রকল্পে দিতে পেরেছি। সে অনেক কিছু শিখতে পারছে, অনেক গল্প শুনছে।'
তাওহিদার সবচেয়ে প্রিয় বাংলা গল্প হলো ‘মিথ্যেবাদী রাখাল বালকের কাহিনী’ আর তানিয়ার প্রিয় কবিতা হলো শামসুর রাহমানের ‘ট্রেন'। আসলে বই জাদুর দুনিয়ার দ্বার খুলে দেয় যা কেবল শিশুরা কল্পনা করতে পারে। অবসর সময়ে তারা সহপাঠীদের সঙ্গে কুত কুত ও বউচির মতো দেশীয় খেলা খেলে। সৃজনশীলতা বৃদ্ধি ও দলগতভাবে কাজ করা শেখানোর জন্য ইউনিসেফের সহায়তায় খেলাধুলাভিত্তিক এই শিক্ষণ পদ্ধতি তৈরি করা হয়েছে।
এই শিক্ষাকেন্দ্র কেবল তাওহিদা-তানিয়াকে শেখার ও খেলার সুযোগ করে দেয়নি বরং তারা সেখানে একে অপরের ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছে। কারণ, তারা একসঙ্গে একটি উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে।
_____________________
১ হাওর হলো বিশেষ ধরনের জলাভূমি, যা নিম্নচাপের ফলে গোলাকার আকৃতির হয়ে থাকে। বর্ষাকালে এটি বড় জলাশয়ের রূপ নেয়। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে হাওর দেখতে পাওয়া যায়।
২ দুর্যোগের সময় শিক্ষাকেন্দ্র পরিচালনার জন্য কমিউনিটির লোকজন এই কমিটি গঠন করে। ইউনিসেফের প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সহযোগীদের সহায়তায় স্থানীয়রাই এই কমিটির নেতৃত্ব দেন
৩ ভ্যালেঞ্জা, মার্কো, সিরেনিয়া শ্যাভেজ, অ্যানিকা রিগোল, তানিয়া লাইজু সুমি, মোহাম্মদ মহসিন এবং ইকবাল হোসেন, রেডি টু স্টার্ট স্কুল, লার্ন এন্ড ওয়ার্ক: এভিডেন্স ফরম এডুকেশন প্রোগ্রামস ফর আউট-অব- স্কুল চিলড্রেন অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্টস ইন বাংলাদেশ; ইউনিসেফ অফিস অব রিসার্চ- ইনোসেন্টি, ফ্লোরেন্স, ২০২১
৪ ওই স্থানে
৫ সঠিক পর্যায় অনুযায়ী শিক্ষাদান (টিএআরএল) হলো এমন একটি পদ্ধতি যার লক্ষ্য- একটি শিশুর শেখার বিভিন্ন পর্যায়ে নির্দেশনার মাধ্যমে তার মধ্যে মৌলিক সাক্ষরতা ও গণনা করার দক্ষতা তৈরি করা।