জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য: শিশুদের অধিকারকে কার্যক্রমের কেন্দ্রে রেখেছে এনডিসি ৩.০
- বাংলা
- English
ঢাকা, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫- প্যারিস চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রণীত তৃতীয় জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (থার্ড ন্যাশনাল ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন- এনডিসি ৩.০)-এর কেন্দ্রে শিশু ও তরুণদের অন্তর্ভুক্ত করার দূরদর্শী নেতৃত্বের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে সাধুবাদ জানায় ইউনিসেফ।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সহযোগিতায় প্রণীত এই নতুন এনডিসি বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট অর্জন। এই প্রথমবারের মতো একটি আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার এবং জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনা শুধু উচ্চাভিলাষী কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, অভিযোজন ও সহনশীলতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করছে না, বরং শিশুদের অধিকার সুরক্ষার জন্য দৃঢ় অঙ্গীকার করছে এবং জোরালোভাবে শিশু ও তরুণদের ক্ষমতায়নের কথা বলছে যাতে তারা পরিবর্তনের জন্য কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “এনডিসি ৩.০ কেবল নিঃসরণ কমানোর একটি পরিকল্পনা নয়, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়সঙ্গত ভবিষ্যৎ নির্মাণের অঙ্গীকার।” তিনি নারী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, জাতিগত সংখ্যালঘু ও জলবায়ু অভিবাসীদের অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। একইসঙ্গে তিনি জলবায়ু কার্যক্রমকে অধিকারভিত্তিক করার আহ্বান জানান, যাতে কেউ পেছনে পড়ে না থাকে।
এনডিসি ৩.০-তে গুরুত্বের সঙ্গে তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং একই সঙ্গে সামাজিক খাতগুলোকে জলবায়ু কার্যক্রমের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে যেখানে স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ), শিক্ষা, শিশু সুরক্ষা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার মতন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
এটা শিশু ও তরুণদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের অসম ও বিপর্যয়কর প্রভাব যার ফলে শিশু ও তরুণদের জন্য আবশ্যক সেবাসমূহ বিপর্যস্ত ও ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়ে, সেগুলোকে তুলে ধরেছে। এই পরিকল্পনায় শিশু-সংবেদনশীল খাতভিত্তিক লক্ষ্যগুলেোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলো তাদের মৌলিক সেবা অব্যাহত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করবে, যেমন স্কুল চালু রাখা, স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখা এবং নিরাপদ পানির পাওয়ার সুযোগ বজায় রাখা- এমনকি বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং তাপপ্রবাহের মতো তীব্র জলবায়ুজনিত ঘটনাবলিওতে এগুলো নিশ্চিত হবে।
“এটা বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলফলক এবং এই অসাধারণ অর্জনের জন্য আমরা আন্তরিকভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অভিনন্দন জানাই।এই প্রথমবারের মতো শিশু ও তরুণদের বিষয়টি শুধু স্বীকার করে নেওয়া হয়নি, বরং দেশের জলবায়ু রোডম্যাপ (রূপরেখা) নির্ধারণে তাদের মতামত ও অগ্রাধিকারকে সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, যেখানে তাদের জীবন-অভিজ্ঞতাকে জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।এনডিসি ৩.০ অনুপ্রেরণাদায়ক কারণ এখানে তাদের জরুরি প্রয়োজনগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কারণ শিশু ও তরুণেরা যেন অন্যদের সঙ্গে মিলে সমাধানগুলো বের করতে পারে, তার জন্য যথাযথ প্ল্যাটফর্ম দেবে এই পরিকল্পনা,” বলেন বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স।তিনি আরও বলেন, “এই উদ্যোগের অংশীদার হতে পেরে ইউনিসেফ খুবই গর্বিত এবং এটা যথাযথভাবে বাস্তবায়নে সহায়তা করতে আমরা গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আসল কাজ এখন শুরু হচ্ছে- এই শক্তিশালী দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তব কাজে রূপান্তর করা এবং বাংলাদেশকে আরও নিরাপদ ও অধিক জলবায়ু-সহনশীল একটি দেশ যেখানে প্রতিটি শিশু বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে এমনভাবে গড়ে তোলার এই যাত্রায় শিশু ও তরুণেরা যেন সক্রিয় ও অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে থাকতে পারে তা নিশ্চিত করা।”
এই পরিকল্পনা প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে ইউনিসেফ অন্তর্বর্তী সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে, যার মধ্যে রয়েছে দেশব্যাপী শিশু ও তরুণদের পরামর্শ সভার সমন্বয় করা, যাতে তাদের প্রয়োজনীয় বক্তব্যগুলো জোরালোভাবে উঠে আসে।
পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও আচরণগত পরিবর্তনের জন্য ইউনিসেফ সক্রিয়ভাবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করছে তিনটি আকর্ষণীয় শিক্ষামূলক ভিডিও তৈরিতে, যেগুলো শৈশব থেকেই স্বাস্থ্যকর পরিবেশগত অভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। এগুলোকে কৌশলগতভাবে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং সমন্বিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্তকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু কার্যক্রম উদ্যোগের মাধ্যমে এগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করা হবে।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ এবং প্যারিস চুক্তির বৈশ্বিক পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার সাথে সামঞ্জস্য রেখে এনডিসি জলবায়ু কার্যক্রমকে দৃঢ়ভাবে শিশু অধিকারের মৌলিক নীতিগুলোর সঙ্গে যুক্ত করেছে। আরও উল্লেখযোগ্য হলো, বিশ্বে প্রথমবারের মতো এনডিসিতে তরুণদের পরিস্থিতি মূল্যায়ন, রিপোটিং ও যাচাই-বাছাই (এমআরভি), মনিটরিং এবং এনডিসি মেকানিজম (প্রক্রিয়া) সম্পর্কে প্রতিবেদন দেওয়ার কাজে অর্থবহভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাছাড়া জলবায়ু-সহনশীল শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি অভিযোগ ও প্রতিকার প্রক্রিয়ার (গ্রিভেন্স অ্যান্ড রেডরেস মেকানিজম) মাধ্যমে জলবায়ু ন্যায়বিচার অগ্রসর করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। যখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে বাল্যবিবাহ বা শিশুশ্রমের মতো ঝুঁকিগুলো বেড়ে যায় তখন এটা শিশুদের জন্য জরুরি সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।
এনডিসি ৩.০ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং এর ২০৩৫ লক্ষ্যসমূহ অর্জনের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন শক্তিশালী জাতীয় নেতৃত্ব এবং টেকসই আন্তর্জাতিক সহায়তা। জলবায়ু অর্থায়ন সংগ্রহ, শিশু-সংবেদনশীল সমাধান প্রণয়ন এবং শিশু ও তরুণেরা যেন বাস্তবায়ন ও মনিটরিং উভয় ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকে তা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত রয়েছে ইউনিসেফ। কেবল একটি জলবায়ু পরিকল্পনা নয়, এনডিসি ৩.০ একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে: এটি একটি পরিবর্তনের পরিকল্পনা, যেটা আজকের শিশু ও তরুণদের সুরক্ষিত করার পাশাপাশি সবার জন্য একটি নিরাপদ, আরও সহনশীল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে।
সম্পাদকদের জন্য নোট:
পুরো এনডিসি এখানে পড়ুন।
ছবি ডাউনলোড করুন এখানে।
ইউনিসেফ সম্পর্কে
বিশ্বের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কাছে পৌঁছাতে বিশ্বের কঠিনতম কিছু স্থানে কাজ করে ইউনিসেফ। ১৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলে সর্বত্র সব শিশুর জন্য আরও ভালো একটি পৃথিবী গড়ে তুলতে আমরা কাজ করি।
ইউনিসেফ এবং শিশুদের জন্য এর কাজ সম্পর্কিত আরও তথ্যের জন্য ভিজিট করুন: www.unicef.org/bangladesh/
ইউনিসেফকে অনুসরণ করুন Twitter, Facebook, Instagram এবং YouTube-এ।