সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য এক তরুণ মায়ের স্বপ্নগুলো
ভয়াবহ বন্যা, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং হাসপাতালের বারান্দায় নির্ঘুম রাত- কোনো কিছুই ছেলে আবু বকরের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁকে আশাবাদী হওয়া আটকাতে পারেনি।
- বাংলা
- English
প্রিয় আবু বকর,
তোমাকে ঘিরে আমার অনেক স্বপ্ন রয়েছে।
তুমি একজন বড় মানুষ হয়ে বেড়ে ওঠো। মন দিয়ে লেখাপড়া করো। ছেলে আমার, দোয়া করি তুমি সব সময় সুস্থ থাকো। তোমার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ হোক, সেই দোয়া করি।
সবাইকে সম্মান করতে শেখো। স্বাধীনভাবে বেঁচে থাক এবং ভালোভাবে পড়াশোনা করো। তুমি আমার প্রিয়জন। তুমি মাকে যা বলবে, সে তোমাকে সেটা দেওয়ার চেষ্টা করবে।
আমি যেন তোমাকে এমন শিক্ষা দিতে পারি যাতে তুমি সবার সামনে মর্যাদা নিয়ে দাঁড়াতে পার! আমি জানি তোমার মন যা বলবে তুমি সেটাই করবে। অনেকে স্বপ্ন দেখেন যে, তাদের সন্তান বড় চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হবে। আল্লাহ না করুক, তুমি এমন কিছু হতে না পারলেও আমি চাই যে, তুমি নিজের পায়ে দাঁড়াবে এবং সৎ উপার্জন দিয়ে চলবে। তুমি যেন কখনো কারও দ্বারা উপেক্ষিত না হও।
তুমি যে আশা কর, তা যেন সত্যি হয়।
আন্তরিকতার সঙ্গে
তোমার মা, মর্জিনা
[আমরা মর্জিনার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তিনি যদি তার ১০ মাস বয়সী ছেলে আবু বকরকে একটি চিঠি লেখেন তাহলে তাতে কী লিখবেন। তার জবাবে এটা লিখেছিলেন তিনি।]
“আমার নিজের ওপর খুব রাগ হত। আমি বলতাম, “কেন নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোনো কিছু করতে পারি না?” আমি ঘরের বাইরে কোথাও যেতে পারতাম না। নিজের মতো করে কোনো কিছু করতে পারতাম না।”
ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ১৭ বছর বয়স। চারদিকে বন্যার পানি। যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।
২০২৪ সালে এটাই ছিল মর্জিনার অবস্থা। সে সময় কুমিল্লায় তার গ্রাম বন্যায় ভেসে যায়। অনেকের মতো তার বাড়িও বন্যার নোংরা পানিতে তলিয়ে যায়। গৃহস্থালির জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে যায়, তাদের হাঁস ও মুরগিও শেষ হয়ে যায়। এমনকি এলাকার হ্যান্ডপাম্প থেকে খাওয়ার পানি আনার জন্য ঘর থেকে বের হওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়ে। তার শারীরিক অবস্থা নাজুক থাকায় পরিবারের সদস্যরা তাকে ঘরের মধ্যে শুধু একমাত্র শুকনো জায়গা বিছানার ওপর থাকতে বলে। তারপরেও তার পায়ে ঠাণ্ডা, নোংরা পানি লেগে যায়।
“ওই সময়গুলো আমার মা ছিল আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। তিনি বন্যার পানি ভেঙে প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আমার জন্য খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করতেন, যাকে রাজি করাতে পারতেন তার কাছ থেকে টাকা ধার করতেন এবং আমি ও আমার গর্ভের সন্তান যেন বেঁচে থাকি তা নিশ্চিত করতেন,” বলেন মর্জিনা।
এরপরেও অনেক চ্যালেঞ্জ থেকে যায়। মর্জিনা দীর্ঘ সময় ঠাণ্ডা পানির সংস্পর্শে থাকার কারণে তার গর্ভের সন্তানের নিউমোনিয়া হয়ে যায়। এর ফলে জন্মের পরপরই তার খিুঁচনি হয়। রক্ত স্বল্পতায় ভুগতে থাকা মর্জিনার জন্য এটা ছিল ভীতিকর অভিজ্ঞতা।
জন্মের পর তার ছেলে আবু বকর মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিউবর্ন স্ট্যাবিলাইজেশন ইউনিটে (এনএসইউ) সাত দিন ভর্তি ছিল। পুরো চিকিৎসা খরচ পড়ে প্রায় ৫০,০০০ টাকা, যা তার পরিবারের জন্য অত্যন্ত বড় অঙ্কের ছিল—পরিবারের সদস্যদের সহায়তা ও ঋণ নিয়ে এই টাকা জোগাড় করা হয়। মর্জিনা একজন গৃহিণী, আর তার স্বামী ফুটপাতে সবজি বিক্রি করার সময় সম্প্রতি পুলিশের হাতে আটক হন। তাই তাদের সন্তানের জীবন রক্ষার জন্য এটিই ছিল একমাত্র উপায়।
আবু বকরের বয়স যখন সাত মাস, তখন ছোট একটি সহায়তা আসে। মর্জিনার মা একটি ফোনকল পান, যেখানে তাকে জানানো হয় যে সরকার ইউনিসেফের জরুরি মানবিক নগদ সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে তার সন্তানের জন্য ৬,০০০ টাকা প্রদান করবে। এই অর্থ চিকিৎসা ব্যয়ের কিছু মেটাতে কাজে লাগে।
“সেই সময় ওই ৬,০০০ টাকা ১ লাখ টাকার মতো মনে হয়েছিল,” স্মরণ করে বলেন মর্জিনা। তিনি বলেন, “আমরা লোকজনের কাছ থেকে নেওয়া ধার শোধ দিতে হিমশিম খাচ্ছিলাম।”
আবু বকর আজ একটি স্বাস্থ্যবান শিশু। মিড-আপার আর্ম সারকামফেরেন্স (এমইউএসি) টেপ দিয়ে মাপ নেওয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে যে তার মধ্যে অপুষ্টির কোনো লক্ষণ নেই। সে কৌতূহলী, খেলাধুলাপ্রিয় এবং মানুষের আশপাশে থাকতে ভালোবাসে, বিশেষ করে কেউ তার সঙ্গে লুকোচুরি খেললে সে খুব পছন্দ করে।
মর্জিনার জন্য জীবন চ্যালেঞ্জহীন নয়, কিন্তু আবু বকরকে ঘিরে তার স্বপ্ন সীমাহীন। তিনি চান, তার ছেলে সুস্থভাবে বেড়ে উঠুক, নিজের পথ নিজেই বেছে নিক এবং ঝামেলামুক্ত জীবন যাপন করুক। প্রতিটি ছোট ছোট পদক্ষেপ নেওয়ার মধ্য দিয়ে মর্জিনা এসব স্বপ্ন পূরণের পথে এগোচ্ছেন- প্রতিটি পুষ্টিকর খাবার, প্রতিটি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, আর প্রতিটি লুকোচুরি খেলা, যা আবু বকরের মুখে হাসি ফোটায়- সব মিলিয়ে মর্জিনার এই যাত্রা আমাদের জানিয়ে দেয় যে, অনিশ্চয়তার মুখেও শিশুদের বেড়ে ওঠা, বেঁচে থাকা ও বিকশিত হওয়ার আশাটি আজও জীবিত।
হিউম্যানিটেরিয়ান ক্যাশ ট্রান্সফার (এইচসিটি)
২০২৪ সালে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় রিমালের আঘাতে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘরবাড়ি ভেসে যায়, স্কুল ও খেলার মাঠ পানিতে তলিয়ে যায়, এমনকি শিশু ও তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রাণহানিও ঘটে। এই দুর্যোগের পর মর্জিনার পরিবারের মতো অনেক পরিবারের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোও একটি অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। সেই বোঝা কিছুটা লাঘব করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সহায়তায় ইউনিসেফ সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মায়েদের শনাক্ত করে মানবিক নগদ সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেয়।
এই কর্মসূচিতে দুই বছরের কম বয়সী শিশু রয়েছে এমন মায়েদের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সরকারি স্বাস্থ্য রেকর্ড ব্যবহার করে সেই সব মায়েদের খুঁজে বের করা হয়, যারা নিয়মিত গর্ভকালীন পরীক্ষা করিয়েছেন বা সরকারি স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। ক্যাশ ওয়ার্কিং গ্রুপের সুপারিশ অনুযায়ী প্রত্যেক মা ৬,০০০ টাকা (প্রায় ৫১ মার্কিন ডলার) করে নমনীয় ভাতা পান। এই অর্থ সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাঠানো হয়, যার ফলে দেরি হয় না।.
ইইউ’র সহায়তায় পরিচালিত জরুরি ত্রাণ কর্মসূচির আওতায় কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজার ও সিলেটের ১৬,৫০০-এর বেশি পরিবারের কাছে পৌঁছানো হয়।এর মধ্যে ১,৬০০-এর বেশি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার রয়েছে, যাদের মধ্যে গর্ভবতী এবং দুধ খাওয়ানো মা ছিলেন। এই পরবিারগুলো মানবিক নগদ সহায়তা পেয়েছে। অনেকের কাছে এর অর্থ ছিল স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টিকর খাদ্য, অন্যান্য আবশ্যকীয় জিনিসপত্র পাওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে ঋণমুক্তি।
মর্জিনার মতো মায়েদের কাছে এই নমনীয় নগদ সহায়তা কেবল স্ক্রিনে দেখানো সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশি কিছু ছিল। এটি শুধু তাদের কিছুটা অর্থনৈতিক স্বস্তিই দেয়নি, বরং তাদের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মর্যাদাও দিয়েছে।


