ইউনিসেফের সঙ্গে একটি জীবন: ইউনিসেফ বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের কর্মী হিসেবে নাজনীন কবিতার যাত্রা
ইউনিসেফ বাংলাদেশের সঙ্গে ৪৪ বছর ৯ মাসের স্মরণীয় যাত্রা, অসহায় মানুষকে সহায়তার দৃঢ় অঙ্গীকার, মাইলফলক ছোঁয়া ও চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ এক জীবন।
- বাংলা
- English
২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর নাজনীন কবিতার সকালের রুটিন খুব ভিন্ন মনে হলো। ৪৪ বছর ৯ মাস ধরে তিনি ইউনিসেফ বাংলাদেশ অফিসের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন। সব সময় সকাল ৮টার আগে পৌঁছে গেছেন। পরিপূর্ণ শক্তি নিয়ে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে দিনটা শুরু করার জন্য তিনি প্রস্তুত থেকেছেন। কিন্তু আজকে কবিতা নিজের বাসাতেই কাটাতে শুরু করলেন। স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি সময় নিয়ে চা পান করলেন। সেই সঙ্গে মনে মনে চার দশকের বেশি সময়ের নিজের পেশাগত জীবনের স্মৃতি হাতড়ে নিলেন।
ভয় নিয়ে শুরু থেকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নেতৃত্ব দেওয়া
ইউনিসেফ বাংলাদেশের সঙ্গে কবিতার যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭৯ সালের ২৭ নভেম্বর। তখন মাত্র উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেছিলেন তিনি। এই চাকরির জন্য কেরাণীগঞ্জের বাড়ি থেকে ঢাকায় চলে আসা তরুণ কবির জন্য ছিল একটি বড় পদক্ষেপ। তখন অফিসে মাত্র পাঁচজন নারীর মধ্যে নিজেকে একজন হিসেবে পেয়েছিলেন তিনি। “প্রথম কয়েক দিন আমার ভয় ভয় লাগত এবং নিজের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ হত,” সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন কবিতা। তিনি বলেন, “সে সময় আমি কেরাণীগঞ্জে ফিরে যেতাম এবং বাবাকে বলতাম যে, আমি বাড়িতে ফিরে আসতে চাই। কিন্তু তিনি সব সময় আমাকে সাহস দিতেন এবং কাজ চালিয়ে যেতে বলতেন। সৌভাগ্যবশত আমার ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) খুব সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবের ছিলেন।”
সময়ের সঙ্গে কবিতা ও আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে ওঠেন। একজন কর্মী ছুটিতে যাওয়ায় তাঁর কাজ চালিয়ে নেওয়ার জন্য কবিতা যোগ দিয়েছিলেন। পরে দুই সপ্তাহের মধ্যে তাকে ফাইন্যান্স বিভাগে নিয়ে নেওয়া হয়। এরপর এত বছর ধরে তিনি সেখানে একজন অমূল্য টিম মেম্বার হয়ে ছিলেন। তিনি ইউনিসেফ বাংলাদেশের ভেতরে অসংখ্য পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে আছেন। “আমি আমাদের অফিস একটি ছোট, অল্প কয়েকজন মানুষের অফিস থেকে একটি গতিশীল, বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্থায় পরিণত হতে দেখেছি,” বলেন কবিতা।
কবিতা খুব স্পষ্টভাবে ১৯৮৭ সালের ভয়াবহ বন্যা মোকাবিলায় যেসব কাজ করা হয়েছিল সেগুলো মনে করতে পারেন। ওই বন্যা ছিল বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত হওয়া সবচেয়ে খারাপ প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি। “ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যেন দ্রুত তহবিলের ব্যবস্থা করা যায়, সেজন্য আমি ক্লান্তিভাবে কাজ করেছিলাম,” সে সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন কবিতা। তিনি বলেন, “আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে হেঁটে মানুষের কাছে গিয়েছিলাম। যেসব মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্দশায় ছিল, তাদের কাছে জরুরি সামগ্রী পৌঁছানো নিশ্চিত করেছিলাম। কষ্টে থাকা মানুষকে সাহায্য করতে পারাটা ছিল অবিশ্বাস্য রকমের ভালো লাগার। সেই অনুভূতি মানুষের জীবনে আমরা কী পরিবর্তন আনতে পারছি, তাও মনে করিয়ে দিত,” স্মৃতিচারণ করে বলেন কবিতা।
দশকের পর দশক যেসব অর্জন
পেশাগত জীবনে নাজনীন কবিতা ১১ জন কান্ট্রি ডিরেক্টর ও ৭ জন নির্বাহী পরিচালকের অধীনে কাজ করেছেন। নির্বাহী পরিচালকদের মধ্যে পাঁচজনের বাংলাদেশ সফরের সময় তিনি তাদের সাক্ষাৎ পেয়েছেন। দেশে শিশু ও তাদের পরিবারের পরিবর্তিত চাহিদাগুলো পূরণে ইউনিসেফ বাংলাদেশ কীভাবে কাজের পরিসর যেসব পরিবর্তন ও বিস্তৃত করেছে, তা তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রধান প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, “মীনা” কার্টুনের সৃষ্টি (শিশু অধিকার এগিয়ে নিতে জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্র) এবং বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক দূষণ মোকাবিলায় গৃহীত বিপুল কর্মপ্রচেষ্টাসহ অন্যান্য কর্মতৎপরতা তিনি দেখেছেন। অবশ্য তার দেখা ঘটনাবলীর মধ্যে মাইলফলক হয়ে আছে ১৯৯৭ সালে ইউনিসেফ বাংলাদেশ-এর কর্মীবাহিনীর মধ্যে জেন্ডার ভারসাম্য অর্জন।
“জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যে আমরাই প্রথম ৫০/৫০ অনুপাত অর্জন করেছিলাম। আমি যখন শুরু করেছিলাম তখন আমরা গুটিকয়েক নারী ছিলাম। আজকে সংস্থার বিভিন্ন জায়গায় নেতৃত্বশীল অবস্থানে অনেক নারীকে দেখে আমি গর্ব অনুভব করি। যখন হাতে গোনা কয়েকজন নারী ছিলেন, এমন একটি সময়ে এসে এই পরিবর্তন দেখতে পারাটা বড় অর্জনের মতো। এটা শুধু ইউনিসেফের জন্য নয়, বাংলাদেশের নারীদের জন্যই বড় অর্জন,” গর্বের সঙ্গে বলেন কবিতা।
ইউনিসেফে নিজের স্মৃতি স্মরণ করে কবিতা আরও একটি বিশেষ অভিজ্ঞতাকে বড় করে তুলে ধরেন, যেটা এই সংস্থার নিজেদের কর্মীদের প্রতি অঙ্গীকারকে প্রকাশ করে। ১৯৮৬ সালে প্রথম সন্তান অনীকের জন্মের পর কবিতা যখন আবার অফিসে যোগ দেন, তখন ইউনিসেফ অফিসে কোনো দিবাযত্ন কেন্দ্র ছিল না। কবিতা তখন মা হিসেবে তার নতুন ভূমিকার পাশাপাশি অফিসের দায়িত্ব কীভাবে সামলাবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
“মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কাজে ফেরার দ্বিতীয় দিনে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের একটি বৈঠকে আমার ম্যানেজার (ব্যবস্থাপক) একটি দিবাযত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাব করলেন, যাতে আমি আমার সন্তানকে অফিসে নিয়ে আসতে পারি,” স্মরণ করেন কবিতা।
“এখনো তার কথা আমার মনে আছে। তিনি বলেছিলেন, ‘ইউনিসেফ বাংলাদেশ-এর প্রথম নারী কর্মী হিসেবে কবিতার সন্তান হয়েছে এবং এটা জরুরি যে, অফিসে আমাদের সন্তানের যত্ন নেওয়ার একটি ব্যবস্থা থাকবে। মায়েরা যেন সন্তানের যত্ন নিতে পারেন সেজন্য কর্মক্ষেত্রে তাদের নিরাপদ জায়গার বন্দোবস্ত করার পক্ষে ইউনিসেফের প্রকল্প রয়েছে। তাই আমাদের নিজেদের কর্মীর জন্য সেই একই ব্যবস্থা করাটা আমাদের দায়িত্ব।’ এই বন্দোবস্ত করা হচ্ছে সে বিষয়ে আশ্বস্ত করার জন্য ম্যানেজার আমার স্বামীর সঙ্গেও কথা বলেছিলেন। সেই বৈঠকের কার্যবিরণী (মিটিং মিনিটস) এখনো আমার কাছে রয়েছে।”
ওই দিবাযত্ন কেন্দ্র তৈরি ছিল নিজেদের কর্মীদের প্রতি ইউনিসেফের মূল্যায়ন ও সমর্থনের স্মারক। কবিতা আনন্দচিত্তে স্মরণ করে বলেন, “পরদিন যখন আমি আমার ছেলেকে অফিসে নিয়ে আসলাম, তখন তাকে স্বাগত জানাতে আসেনি এমন কেউ ছিল না। এটা আমার কাছে ছিল অনেক বড় পাওয়া।”
প্রভাব বিস্তারকারী একটি পেশাগত জীবন
২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট কবিতা আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরে যান। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ইউনিসেফের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের কর্মী হিসেবে তার যাত্রার সমাপ্তি ঘটে। “শেষ কর্মদিবসে আমি আবেগে ভারাক্রান্ত হইনি। এটা অফিসে আমার অন্য একটি দিনের মতোই মনে হয়েছে এবং আমার মনে হয়েছিল, পরদিন আমি আবার আসব,” স্মিত হাসি দিয়ে বলেন কবিতা। তিনি বলেন, “কিন্তু এখন এটা ঘটছে যে, প্রতিদিন যে মানুষগুলোর সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে থেকে আমি এই বয়সে পৌঁছেছি তাদেরকে আমি দেখব না।”
একজন ফাইন্যান্স অ্যাসোসিয়েট হিসেবে অবসরে যাওয়া কবিতা একটি সম্মানজনক পেশাগত জীবন কাটিয়েছেন। “টিমের একজন সদস্যের অনুপস্থিতির সময়ে এসে যে কাজ করেন, সেটার অসাধারণ মূল্যায়ন পান, কবিতা প্রকৃত অর্থে একজন সুদক্ষ পেশাজীবী। তিনি ইউনিসেফের মিশনের প্রতি নিবেদন ও অঙ্গীকার প্রদর্শনের ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং পেশাগত মানদণ্ড বজায় রেখে কাজ করে যাওয়াটা অন্যদের অনুপ্রাণিত করেছে,” বলেন কবিতার ম্যানেজার ম্যারি-লুইস কাবাম্বা।
দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন এলেও কবিতা অবসরকে দেখছেন একটি নতুন শুরু হিসেবে। ইউনিসেফে কাটানো সময়ের জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা ও গর্ব অনুভব করেন। তিনি বলেন, “সময়ের প্রয়োজনে সংস্থার নতুনভাবে এগিয়ে চলা এবং নতুন নতুন মাইলফলক অর্জন করতে দেখাটা অবিশ্বাস্য রকমের অর্জন। ইউনিসেফ বাংলাদেশ-এর অংশ হতে পেরে আমি গর্ব অনুভব করি। আমরা একসঙ্গে যা যা অর্জন করতে পেরেছি, তার জন্যও আমি গর্ব অনুভব করি। অবশ্য পরিবারের সমর্থন ছাড়া আমি এত দূর আসতে পারতাম না। আমার এই যাত্রাপথে তাদের উৎসাহ ও সমর্থন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।”
নবীন কর্মীদের জন্য তার বার্তা স্পষ্ট: “তোমার কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান হও, সৎ থাকো এবং সব সময় শেখার জন্য আগ্রহী হও। ইউনিসেফে আমরা যে কাজ করি তা শুধু একটি চাকরি নয়, এটা সমাজে পরিবর্তনের নিয়ামক।”
প্রতিদিন সকালে ইউনিসেফের দরজায় তার পা না পড়লেও কবিতার উত্তরাধিকার এবং তার কাজের প্রভাব আগামী বছরগুলোতে অনেককে অনুপ্রাণিত করবে।

