প্রতিটি শিশুর জন্য আরও উন্নত ভবিষ্যৎ গড়তে শিশু অধিকার ইশতেহার
বাংলাদেশে শিশু অধিকার নিশ্চিত করতে ১২টি রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকার
- বাংলা
- English
শিশু অধিকার ইশতেহার কী?
আমি যখন এই লেখা লিখছি, সে সময় বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে- ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ এর ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ইতিহাসের আলোকে বলা যায়, আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো যখন তাদের নির্বাচনী প্রচারণা সাজায়, তখন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদের অন্যতম শিশুরা প্রায়ই তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উপেক্ষিত থেকে যায়।
বাংলাদেশে মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৮ শতাংশের বেশি শিশু। তবুও জাতীয় নীতি প্রণয়নের আলোচনায়, বিশেষ করে নির্বাচনের সময় যখন রাজনৈতিক অগ্রাধিকারগুলোকে জনমতের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় তখনও শিশুদের অধিকারসমূহ ও বক্তব্যগুলো প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। এই বৈষম্য চিহ্নিত করে কাজ করতে গিয়ে শিশু অধিকারকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে স্থান করে দিতে এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরী করেছে ইউনিসেফ। আর এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় শিশু অধিকার ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রার্থীদের কাছ থেকে শিশুদের কল্যাণ ও বিকাশে বিনিয়োগে অগ্রাধিকারের প্রতিশ্রুতি আদায়ের লক্ষ্যে শিশু ও তরুণদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ইশতেহারে ১০টি অঙ্গীকার নির্ধারণ করা হয়েছে।
শিশু অধিকার সনদের জন্য তরুণদের সঙ্গে আলোচনা
২০২৫ সালের অক্টোবরে দেশজুড়ে ছয় দফায় শিশু ও তরুণদের সঙ্গে পরামর্শমূলক আলোচনার ভিত্তিতে ১০টি অঙ্গীকার নির্ধারণ করা হয়।
ইউনিসেফের ইয়াং পিপলস অ্যাডভাইজরি গ্রুপ (ওয়াইপিএজি) এর একজন সদস্য হিসেবে আমি চট্টগ্রামে এমন একটি পরামর্শমূলক অধিবেশন পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলাম। অংশগ্রহণকারী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ছিল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতির তরুণ-তরুণীরা; এই বৈচিত্র্য মোটেই আনুষ্ঠানিক বা প্রতীকী ছিল না। তাদের সবারই নিজ নিজ কমিউনিটির প্রয়োজন সম্পর্কে খুব ভালো জ্ঞান ছিল এবং তারা যে পরিবর্তনগুলো দেখতে চায়, সেগুলো অর্জনের পথে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত ও সমাধান করা নিয়ে সবাই একসঙ্গে বসে আলোচনা করেছে।
এটা আমার জন্যও একটি বড় শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা ছিল। আমি জানতে পেরেছি যে, আজও পার্বত্য এলাকার বেশ কয়েকটি কমিউনিটির মানুষের পানীয় জলের প্রধান উৎস হলো কর্দমাক্ত জলাভূমি। বাংলাদেশের এমনকি তুলনামূলকভাবে অগ্রসর কিছু এলাকায়ও এখনো অনেক স্কুলে প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা ও অবকাঠামো নেই।
“বাল্যবিবাহ নয়।” “শিশুশ্রম নয়।” “একটি উন্মুক্ত খেলার মাঠ।”
তাদের লেখা সব সমস্যা, চ্যালেঞ্জ ও আশাগুলো যখন সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা হচ্ছিলো, তখন আমি আমাদের দেশের অনেক শিশুদের নির্মম বাস্তবতা সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি।
শিশুরা যে পরিবর্তনগুলো চায়, সেগুলো খুবই মৌলিক। তারপরেও এই একেবারে প্রাথমিক অধিকারগুলোর জন্যও তাদের আবেদন জানাতে হয়। এটা আমাকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে কেন শিশু অধিকার ইশতেহার এতটা গুরুত্বপূর্ণ। এটা সেই অদৃশ্য নিরাপত্তা বলয়, যা আমরা আশা করি জাতীয় নির্বাচনের পর যে-ই ক্ষমতায় আসুক না কেন, বাংলাদেশের শিশুদের জন্য একটি আরও সমতাভিত্তিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত ও সুরক্ষিত করবে।
“বাংলাদেশে অনেক শিশু দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠে - যেখানে যথাযথ সেবা-যত্ন, পুষ্টি অথবা নিরাপদ ও বৈষম্যহীন পরিবেশ নেই। কেউ কেউ আবার জন্মনিবন্ধন ও প্রয়োজনীয় টিকা পাওয়ার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়। বাল্যবিবাহ এই পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে। যখন মায়েরা নিজেরাই শিশু থাকে, তখন জন্মনিবন্ধন জটিল হয়ে পড়ে এবং মা ও শিশু-উভয়কেই গুরুতর শারীরিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে বেড়ে উঠতে হয়। আমাদের দেশে অনেক শিশু অসহায়ত্বের এক চক্রের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে, যার অবসান ঘটানো জরুরি,” বলে ১৪ বছর বয়সী তায়েবা।
“প্রতিবন্ধী শিশুরা পিছিয়ে পড়ে, কারণ অনেক স্কুলে তাদের শিক্ষা লাভের পরিবেশ, প্রশিক্ষিত সহায়ক শিক্ষক এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রীর অভাব রয়েছে,” বলে ১৫ বছর বয়সী আহমেদ আল আবিদ। সে আরও বলে, “শহরাঞ্চলের স্কুলগুলোতে যেখানে ক্রমেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, সেখানে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সুযোগ অনেক কম, ফলে এই বৈষম্য আরও গভীর হচ্ছে। একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে আমাদের অবশ্যই এখনই এসব বৈষম্যের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
শিশু অধিকার ইশতেহারে স্বাক্ষর
শিশু অধিকার ইশতেহারে স্বাক্ষর করার জন্য ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর ১২টি রাজনৈতিক দলের নেতারা ঢাকায় একত্রিত হন। ইউনিসেফ ইয়ুথ অ্যাডভোকেট গার্গি তনুশ্রী পালের সূচনা বক্তব্যের পর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স শিশু অধিকার ইশতেহার তুলে ধরেন। বক্তব্যে রানা ফ্লাওয়ার্স এই ইশতেহারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর করা স্বাক্ষর, শিশুদের জন্য বিনিয়োগের বিষয়ে তাদের অব্যাহত অঙ্গীকারের সূচনা হবে বলে প্রত্যাশা জানান।
আমি ও আমার সহকর্মী ওয়াইপিএজি সদস্যরা- আনিকা, অঝর ও নিয়ামুল - শ্রোতাদের সামনে শিশু অধিকার ইশতেহারের ১০টি অঙ্গীকার উপস্থাপনের সুযোগ পাই। আমাদের সামনে উপস্থিত রাজনৈতিক নেতারা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতে থাকলে আমার মনে এই আশার সঞ্চার হয়, তাদের মধ্যে নিশ্চয়ই এই উপলব্ধি আছে যে, দেশের শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, সুস্থ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শৈশব নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তায়।
উপস্থাপনার পর অনুষ্ঠানে উপস্থিত রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দ, থিঙ্ক ট্যাংক, ট্রেড ইউনিয়ন ও সমাজের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদের পক্ষ থেকে নানা মন্তব্য ও অঙ্গীকার করা হয়। এরপর আসে ঐতিহাসিক মুহূর্ত- ইশতেহারে স্বাক্ষর।উপস্থিত বাংলাদেশের প্রধান ১২টি রাজনৈতিক দলের নেতারা শিশু অধিকার ইশতেহারে স্বাক্ষর করেন, যা মূলত বাংলাদেশের শিশুদের কল্যাণ ও অধিকার সমুন্নত রাখার একটি প্রতিশ্রুতি।
অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে ১৫ বছর বয়সী শিশু সাংবাদিক ইফতেশামের সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে, যেখানে সে এই ইশতেহারকে ঘিরে শিশুদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে।
“আমরা আশাবাদী যে, আজ যে অঙ্গীকারগুলো করা হলো সেগুলো ভবিষ্যতের নীতি, বাজেট ও কর্মপরিকল্পনায় প্রতিফলিত হবে। আমরা আরও জোরালো শিশুবান্ধব বাজেট প্রণয়ন, উন্নত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, শিশুদের অগ্রাধিকার দিয়ে গৃহীত জলবায়ু অভিযোজনমূলক পদক্ষেপ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সবার সমান প্রবেশাধিকার দেখার আশা করি,” বলেছে ইফতেশাম।
সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ
পাঁচ বছর ধরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে আমি বাংলাদেশে বর্তমানে শিশুদের কল্যাণমূলক কার্যক্রম কোন পর্যায়ে আছে তার সঙ্গে পরিচিত। তারপরেও ইউনিসেফের এই শিশু অধিকার ইশতেহার উদ্যোগের অংশ হওয়ার কারণে আমার সামনে দেশের শিশুদের পরিস্থিতির বর্তমান চিত্র সম্পর্কে নতুন ও উদ্বেগজনক দৃষ্টিভঙ্গি এসেছে। এর মধ্য দিয়ে আমার মধ্যে সেই বিশ্বাস আবারও তৈরি হয়েছে যে, ঘাটতি পূরণে এখনো আমাদের অনেক দূর যেতে হবে।
শিশু অধিকার ইশতেহারে স্বাক্ষর একটি সঠিক ও ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও, এখানেই থেমে গেলে চলবে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা, সুরক্ষা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রের ১০টি অঙ্গীকার বস্তুত রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নীতি প্রণয়ন এবং প্রতিটি শিশুর অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি সহায়ক নির্দেশিকা। আমাদের সামনে দীর্ঘ পথ রয়েছে এবং এই যাত্রায় যেখানে প্রয়োজন সেখানে সহায়তা দিতে শিশু ও তরুণরা প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু এই অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের কাঁধে। শিশু অধিকার ইশতেহারের ১০টি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের বিষয়ে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য শিশু ও তরুণরা অব্যাহতভাবে কাজ চালিয়ে যাবে।
সারিয়া চৌধুরী বাংলাদেশে ইউনিসেফের ইয়াং পিপলস অ্যাডভাইজরি গ্রুপের (ওয়াইপিএজি) একজন সদস্য। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্নাতকের একজন শিক্ষার্থী। সব শিশুর জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্যে কাজ করেন সারিয়া চৌধুরী।


