জলবায়ু পরিবর্তন জনিত বাস্ত্যুচুতি, ক্ষয়ক্ষতি ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল সম্প্রতি বিগত তিন দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হয়েছে; বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের জীবন-জীবিকা হয়ে পড়েছে বিপর্যস্ত। বন্যার পানি কমছে, কিন্তু সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে এখনও অনেক সময় লাগবে।
- বাংলা
- English
বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল - জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের যে দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে সেগুলোর একটি বাংলাদেশ। তার উপর, এই বর্ষা মৌসুমে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ব্যাপকতা ছিলো চরম ও নজিরবিহীন।
বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে গত ৩৪ বছরের মধ্যে আঘাত হানা সবচেয়ে ভয়াবহ এই বন্যায় ৫৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ২০ লাখের বেশি শিশু। এই দুর্যোগে অনেক শিশু তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে, ঘরবাড়ি হারিয়েছে, স্কুল হারিয়েছে; রয়ে গেছে কেবল তাদের অসহায়ত্ব।
বন্যার পানি শিশুদের জীবনকে উলট-পালট করে দিয়েছে। দীর্ঘ সময় পর পানি নেমেছে। এতে তাদের ঘর-বাড়ি নষ্ট হয়েছে। স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, এগুলো এখন আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত হয়ে গেছে। মাঠের ফসল তলিয়ে গেছে, পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে বন্যার পানিতে মা ও নবজাতকের জীবন রক্ষার জন্য জরুরি সব চিকিৎসা সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত সকল শিশুরা চলমান এই পরিস্থিতির বাস্তবতা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছে না। তবে তারা সবাই বেশ ভয় পেয়েছে, তারা ঠিকমতো খেতে পাচ্ছে না; তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। তাদের বাবা-মায়েরাও বেশ কষ্টে আছেন; তাদের পোষা প্রাণিগুলো তাদের চোখের সামনে মারা যাচ্ছে। বেশির ভাগ শিশুই এখন জ্বর ও কাশিতে আক্রান্ত; হাসপাতালে গেলেই উপচে পড়া ভিড়ের মাঝে দেখা যায় প্রায় প্রতিটি বাবা-মা অসুস্থ বাচ্চা কোলে অপেক্ষা করছে চিকিৎসার জন্য। শিশুদের কেবল এইটুকুন চাওয়া - তারা জলদি তাদের বাড়ি ফিরতে চায়; তারা খেলতে চায়, শিখতে চায়। তারা তাদের শৈশব ফেরত চায়।
এই দুর্যোগের শুরু থেকে ইউনিসেফ মাঠ পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছে। ইউনিসেফের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে প্রায় ৯ লাখ মানুষের কাছে জরুরি প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তার পরেও এখনো অনেক শিশু ও পরিবার শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে।
বাস্তুচ্যুত এক অনিশ্চিত জীবন
বন্যায় পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বাস্ত্যুচুত হয়ে পড়েছে এবং তারা এখন বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে বসবাস করছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর প্রতিটি কক্ষে ঠাঁই নিয়েছে শত শত পরিবার; অল্প জায়গায়, সীমিত ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে ঠাসাঠাসি করে চরম দুর্দশার মধ্যে কোনরকম দিন কাটাচ্ছে তারা। এ ধরনের পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের প্রতি অবহেলা, নিপীড়ন ও সহিংসতার ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলে অবস্থিত চট্টগ্রাম বিভাগেও একটি স্কুল আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে কাপড় বিছিয়ে ঘুমাচ্ছে মহিমার পরিবার।
“আমি জীবনে কখনো বন্যার কবলে পড়ি নাই। এমনকি আমার মা বাবা দাদিও কখনও বন্যার শিকার হয় নাই,” দুই মাসের শিশু সন্তান ফাতিমাকে কোলে নিয়ে বলেন মহিমা। প্রতিবার যখন ফাতিমা কাশি দেয়, মা মহিমার বুক যেন কেঁপে উঠে। ফাতিমার চিকিৎসা করানোর জন্য পরিবারটির হাতে কোনো টাকা-পয়সা নেই। ফাতিমাকে নিউমোনিয়ায় ভুগছে।
ইউনিসেফ ও তার অংশীজনেরা এবং স্বেচ্ছাসেবকেরা শুরু থেকেই মাঠে রয়েছেন। তারা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ‘ফ্যামিলি’ ও ‘ডিগনিটি কিট’ সরবরাহ করছেন; অসহায় শিশু ও পরিবারগুলোর জন্য নিশ্চিত করছেন খাবার, পোশাক, স্বাস্থ্য সেবা, আশ্রয় ও নগদ অর্থ সহায়তা সহ নানামুখী সেবা। পাশাপাশি ব্যবস্থা করা হয়েছে মনোসামাজিক সহায়তার।
বেঁচে থাকার লড়াই
“লরিটি অনেক দুলছিল। তাতে আমার খুব ভয় (আমার গর্ভের সন্তানকে হারিয়ে ফেলার ভয়) লাগছিলো,” ভয়াবহ সেই পরিস্থিতি স্মরণ করে বলেন ফেনী জেলার চার সন্তানের মা ফাতেমা। বন্যার পানির মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছাতে তাদের যে কষ্ট হয়েছিলো, সেই ঘটনা মনে করে তিনি চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না। সেদিন ওই লরিটা পেতে ফাতেমাকে প্রায় তিন থেকে চার কিলোমিটার হাঁটতে হয়েছিলো।
আগস্টের শেষ দিকে আঘাত হানা বন্যায় যেসব এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ফেনী। মাত্র ২ কেজি ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করা ফাতেমার ছেলে সন্তানটি এখন নানান সমস্যায় ভুগছে। তারপরেও ফাতেমা খুশি যে, তার সন্তান বেঁচে আছে। তিনি এমন দুজন অন্তঃসত্তা নারীকে চেনেন যারা বন্যার মধ্যে হাসপাতালে যেতে না পারায় গর্ভের সন্তানকে হারিয়েছেন।
সাম্প্রতিক এই বন্যায় অনেক স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও হাসপাতালে জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলে মা ও নবজাতকদের চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া বাড়ছে
সামনে মাত্র দুটি দাঁত; তা নিয়েই হাঁসি যেন থামেনা নয়-মাসের ছোট্ট নুসাইবার। হাঁসি দিয়েই যেকোন জায়গা মুহূর্তেই আলোকিত করে তুলে সে। কিন্তু একটানা কাশিতে মাঝে মাঝে সেই মিষ্টি হাঁসি বন্ধ করে মায়ের কাঁধে মুখ লুকায় নুসাইবা। বন্যার সময় অনেকক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত নুসাইবা।
“বৃষ্টির মধ্যে তিন সন্তানকে কাঁধে নিয়ে বুক সমান পানির মধ্যে আমরা প্রায় আধা ঘণ্টা হেঁটে এক প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নেই। একসময় মনে হচ্ছিল, আমরা হয়তো আমাদের সন্তানদের আর বাঁচাতে পারব না,” বলেন নুসাইবার মা নাজমা আখতার।
শুধু নিউমোনিয়া নয়, ডায়রিয়াও বাড়ছে বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে। এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগে ৯ হাজার ৬০০ টি তীব্র ডায়রিয়ার ঘটনা (কেস) ধরা পড়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউনিসেফ ৬ লাখ ২০ হাজার ওরাল রিহাইড্রেশন সল্ট স্যাশে (মুখে খাবার স্যালাইনের প্যাকেট), ১ লাখ জিংক ডিসপারসিবল ট্যাবলেট (জিঙ্ক বড়ি) এবং অন্যান্য ওষুধ বিতরণ করেছে।
“জীবনে এই প্রথম আমি বন্যার কবলে পড়েছি। যে পরিস্থিতির শিকার হয়েছি, তা ছিল ভয়ানক এবং আমার কল্পনার বাইরে। আমি কখনো ভাবিনি আমার এ রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে”
এখন কী প্রয়োজন!
গত জুন মাসে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে হওয়া বন্যা এবং মে মাসে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় রিমালের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই সম্প্রতি এই বন্যা হয়েছে। এই তিন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশজুড়ে এক কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে ৭০ লাখ শিশু রয়েছে।
অসহায় অবস্থায় থাকা ক্ষতিগ্রস্থ এই জনগোষ্ঠীকে সহায়তার জন্য ইউনিসেফের সাড়ে তিন কোটি (৩৫ মিলিয়ন) মার্কিন ডলারের তহবিল প্রয়োজন। এর মাধ্যমে ইউনিসেফ ও এর অংশীজনদের পক্ষে দ্রুত জরুরি ত্রাণ সহায়তা সরবরাহ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জীবন রক্ষাকারী সেবাসমূহ পরিচালনা করা সম্ভব হবে।







