সঙ্গীত যেভাবে আপনার শিশুর মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে: প্যারেন্টিংয়ের সংক্ষিপ্ত মাস্টার ক্লাস
সঙ্গীতের সাথে পরিচিত করানোর বিষয়টি কীভাবে আপনার সন্তানের জন্য উপকার হতে পারে তা জেনে নিন।
- বাংলা
- English
সঙ্গীত আপনার সন্তানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।এমনকি জন্মের আগেও সঙ্গীতআপনার সন্তানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।আপনার সন্তানকে সঙ্গীতের সাথে সম্পৃক্ত করার ফলে শিশুর বিকাশের সকল ক্ষেত্রকে আলোড়িত করে। সঙ্গীতের সাথে দ্রুত পরিচয় করানোর বিষয়টি আপনার শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।
কীভাবে সঙ্গীত একটি ছোট শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশে সাহায্য করে এবং `লুলাবি’ কোথা থেকে আসে এ বিষয়ে আমরা সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ ডঃ ইব্রাহিম বালতাগীর সাথে কথা বলেছিলাম।
"সঙ্গীত যেভাবে আপনার শিশুর মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে: প্যারেন্টিংয়ের সংক্ষিপ্ত মাস্টার ক্লাসের ভিডিওর প্রতিলিপি
একটি লুলাবি যে আপনার শিশুর হৃদস্পন্দনের গতি কমিয়ে তাকে শান্ত করতে সহায়তা করে- সে বিষয়টি কি আপনি জানেন?
সঙ্গীত আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনার শিশু কি পর্যাপ্ত সঙ্গীত পাচ্ছে?
আমার নাম ডা: ইব্রাহিম বালতাগী। এটি প্যারেন্টিংয়ের উপর আমার একটি সংক্ষিপ্ত মাস্টার ক্লাস। এখানে কীভাবে সঙ্গীত আপনার শিশুর মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে সে বিষয়ে আমি আলোচনা করেছি।
গর্ভের শিশুদের উপর সঙ্গীত কি প্রভাব ফেলে?
এটা প্রমাণিত যে জন্মের আগে মস্তিষ্কের বিকাশে সঙ্গীতের ভূমিকা রয়েছে।
গর্ভাবস্থায় গান শোনা শুধুমাত্র গর্ভবতী নারীর প্রশান্তির কারণ এবং তাদের উন্নতিতে প্রভাব ফেলবে এমনটি নয়। এটি গর্ভস্থ শিশুর উপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
গর্ভাবস্থার প্রায় ১৬ থেকে ১৮ সপ্তাহের মধ্যে, শিশুটি তার প্রথম শব্দ শুনতে পায়।
২৪ সপ্তাহের মধ্যে, ছোট কানগুলো দ্রুত বিকশিত হতে শুরু করে। গর্ভাবস্থার শেষ কয়েক মাসে কণ্ঠস্বর এবং শব্দের প্রতিক্রিয়ায় শিশুদের মাথা ঘুরতে দেখা গেছে। একটি অনাগত শিশু তার মায়ের কণ্ঠস্বর, তার স্থানীয় ভাষা, শব্দের ধরণ এবং ছন্দ চিনতে পারে।
একজন গর্ভবতী মায়ের কি গান শোনা উচিত?
তৃতীয় মাসে, শিশু অবশ্যই আপনার বাজানো গান শুনতে সক্ষম হবে। ক্লাসিক সঙ্গীত, লুলাবির মতো মৃদু শব্দ, সুখের অনুভূতি দেয় এমন সুন্দর সুর সবই প্রশান্তি পাওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
কীভাবে সঙ্গীত একটি ছোট শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে সাহায্য করতে পারে?
স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে সঙ্গীত শিশুর বিকাশের সকল ক্ষেত্র এবং দক্ষতাকে আলোড়িত করে। বিশেষ করে ভাষা দক্ষতা এবং পড়ার দক্ষতা অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শেখা গাণিতিক শিক্ষার উন্নতি ঘটাতে পারে। এমনকি স্কুলের স্কোরও বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
শিশুকে ঘুমাতে সাহায্য করার জন্য কীভাবে আপনি সঙ্গীত ব্যবহার করতে পারেন?
সঙ্গীত অনুভূতিকে অনুপ্রাণিত করে। তাই শিশুটিকে শান্ত করার জন্য সঙ্গীত শোনানো একটি জনপ্রিয় পরামর্শ হতে পারে। উপরন্তু, এটি শিশুর ঘুমানোর সময় অনুশীলনের ক্ষেত্রে একটি চমৎকার সংযোজন।
শিশুর প্রিয় ঘুমের ধরন বজায় রাখতে একটি শান্ত পরিবেশ তৈরির জন্য সঙ্গীতটিকে অবশ্যই মৃদু, প্রশান্তিদায়ক, আরামদায়ক হতে হবে।
একটি পরিচিত সুর বা বাজনা বা গান মিউজিক থেরাপি সেশনের মতো কাজ করে। মৃদু, প্রশান্তিদায়ক, পুনরাবৃত্তিমূলক সঙ্গীত আসলে হৃদস্পন্দনকে ধীর করে দেবে যা শান্ত এবং গভীর শ্বাস নিতে সাহায্য করে।
গান গাওয়ার সময় মা, বাবা বা কোনো পরিচযা©কারীর কণ্ঠের শক্তিকে অবমূল্যায়ন করবেন না। তার কণ্ঠ পরিচিত এবং ছন্দ প্রশান্তিদায়ক হয়।
লুলাবিগুলো কোথা থেকে আসে?
"লুলাবি" এই ইংরেজি শব্দটি "লালা" বা "লুলু" শব্দ থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়। শিশুদের শান্ত করার জন্য মা বা নার্সরা এটি তৈরি করেছেন।
"বাই" হল আরেকটি লোভনীয় শব্দ, বা "শুভরাত্রি" বলতে ব্যবহৃত হয়। একটি লুলাবি, বা তথাকথিত ক্র্যাডেল গান শিশুদের শান্ত করতে এবং ছোট বাচ্চাদের ঘুম পাড়াতে সাহায্য করে। এ বিষয়ে একটি গল্প রয়েছে৷
লুলাবি প্রতিটি সংস্কৃতিতে পাওয়া যায় এবং প্রতিটি ভাষায় গাওয়া হয়। ব্রাহ্মদের লুলাবি সম্ভবত ক্র্যাডেল গানের মধ্যে সবচেয়ে সুপরিচিত এবং সহজেই স্বীকৃত।
শিশুদের জন্য সেরা বাদ্যযন্ত্র কী?
আপনি চাইলে আপনার সন্তানের জন্য বিনামূল্যে সঙ্গীত তৈরি করতে পারেন। ভোকাল কর্ড হল একমাত্র সহজাত যন্ত্র যা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়।
আরও কিছু যন্ত্র আছে যা আমরা ব্যবহার করতে পারি। এগুলো তালি বাজানো, স্ন্যাপিং, স্টম্পিং এবং আপনার উরুতে হাত দিয়ে বাজানোর ঢংয়ে শব্দ করার মতো।
এছাড়াও, আপনার বাড়ির চারপাশে প্রচুর পরিমাণে জিনিসপত্র রয়েছে। যেমন আপনি একটি কাঠের চামচ নিন এবং এটি একটি পাত্রের উপর বাড়ি দিয়ে শব্দ তৈরি করুন। এর মাধ্যমে আপনি আপনার সন্তানের সাথে খেলতে পারেন।
আপনার বাচ্চাদের জন্য যেসব সেরা বাদ্যযন্ত্র আপনি কিনতে পারেন তার মধ্যে থাকবে খেলনা ড্রাম, শেকার বা ঝুমঝুমি, গ্লোকেনস্পিল, জাইলোফোন, মারাকাস ইত্যাদি।
সঙ্গীত কি আপনার সন্তানের সামাজিকীকরণে সাহায্য করতে পারে?
অন্যদের সাথে সঙ্গীত সম্পর্কিত ক্রিয়াকলাপ তথা-গান শোনা বা বাজানোর মতো কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়ার ভেতর এমন কিছু আছে যা আপনাকে চারপাশের মানুষের সাথে সংযুক্ত আছেন এমন অনুভূতি তৈরিতে সাহায্য করে।
জীবনের শুরুর দিকে সঙ্গীত শিশুদের নিজেদের প্রকাশ করতে এবং অনুভূতি ভাগাভাগি করতে সাহায্য করে। এমনকি অল্প বয়সেও শোনা সঙ্গীতের প্রতিক্রিয়ায় তারা তাদের হাত দোলাতে, ঝাঁকুনি দিতে এবং নাড়াতে পারে। এমনকি তারা তাদের নিজস্ব গান তৈরি করতে পারে। তারা হাসতে শেখে, শব্দগুলো পুনরাবৃত্তি করে। এই শব্দগুলো ব্যবহার করতে এবং একই সাথে এগুলো মুখস্থ করতে তাদের উৎসাহিত করা হয়।
আমরা এখন জানি যে, মস্তিষ্কের যে অঞ্চলগুলো সহানুভূতি, বিশ্বাস এবং সহযোগিতার সাথে সম্পর্কিত সঙ্গীত সেসব অঞ্চলগুলোকে প্রভাবিত করে। একইসাথে একে অপরের সাথে সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। এটি বিশ্বের প্রতিটি সংস্কৃতিতে সঙ্গীত কীভাবে টিকে আছে এবং কেন সংগীত সব সংস্কৃতিতেই বিদ্যমান সে বিষয়টিকে এটি ব্যাখ্যা করে।
অনেক দিক থেকে সঙ্গীত আমাদের জীবনে বিদ্যমান/ আমাদের অস্তিত্বের অনেকটা জুড়েই আছে সঙ্গীত। বাড়িতে, সঙ্গীত আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
পিতামাতারা শিশুদের জন্ম থেকেই তাদের সন্তানদের সাথে মিশতে এবং যোগাযোগ করতে, তাদের সান্ত্বনা দিতে ও প্রশান্ত করতে সঙ্গীত ব্যবহার করেন। পাশাপাশি তাদের ভালবাসা এবং আনন্দ প্রকাশ করতেও পিতামাতারা সঙ্গীত ব্যবহার করেন।
সঙ্গীত কীভাবে শিশুর বিকাশকে প্রভাবিত করতে পারে, সামাজিক দক্ষতা বাড়িয়ে তুলতে পারে/সামাজিক দক্ষতা উন্নয়নে সাহায্য করতে পারে এবং সকল বয়সী শিশুদের উপকার করতে পারে তা শিখে পিতামাতারা এই সহজাত প্রবৃত্তিগুলো গড়ে তুলতে পারেন।
আমার পরামর্শ হল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনার বাচ্চাদের সাথে গান করা শুরু করুন।
ডঃ ইব্রাহিম এইচ. বালতাগি লেবানিজ আমেরিকান ইউনিভার্সিটির একজন প্রভাষক। এছাড়া তিনি লেবানিজ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মিউজিক প্রোগ্রামের প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি বেশ কয়েকটি শিশুতোষ সঙ্গীত বই লিখেছেন।