দেশে অস্থিরতার সময় আপনার শিশুকে সহায়তা করে কীভাবে আগলে রাখবেন
বাবা-মা ও সেবাদাতাদের জন্য
- বাংলা
- English
দেশে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার সময়ের আবেগ-অনুভূতি বোঝা
দেশে অস্থিরতা দেখা দিলে, সহিংসতার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অনিশ্চয়তা, বিভ্রান্তি, ক্ষোভ ও হতাশা মানুষকে গ্রাস করতে থাকে। এমন সময়ে কীভাবে নিজেদের সন্তানদের সহায়তা করা যায়, তা বোঝাটা বাবা-মায়ের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
একের পর এক ঘটনায় বাবা-মা নিজেরাই ভারাক্রান্ত ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। কঠিন এই সময়ে তারা নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার পাশাপাশি সন্তানদের দিকনির্দেশনা ও সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করে থাকেন।
এমন সময়ে বাবা-মা হিসেবে দায়িত্ব পালন কখনও কখনও বেশ ক্লান্তিকর লাগতে পারে। অনেক বাবা-মা অনুভব করেন যে, তারা অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়ছেন কিংবা তাদের শরীরে আর কোন শক্তি অবশিষ্ট নেই।। এই অবস্থায় নিজেকে সামলে নেওয়া এবং পরস্থিতির সঙ্গে সন্তানদের খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করার জন্য যথেষ্ট শক্তি তাদের আর থাকে না।
আপনার অবস্থা যদি এমন হয় তাহলে মনে রাখবেন, আপনি একা নন। এ সময়ে ভারাক্রান্ত মনে হওয়া ও কী করবেন তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগাটা খুবই স্বাভাবিক। তবে মনে রাখবেন, আপনার সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সহায়তা চাওয়া
বিষাদগ্রস্ত করে এমন অনুভূতি ও চিন্তা-ভাবনা যদি আপনাকে গ্রাস করে তাহলে কারও সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করুন।
প্রশিক্ষিত কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলার জন্য চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এ ফোন করুন
এই সেবা বিনামূল্যে দেওয়া হয় এবং আপনার গোপণীয়তা রক্ষা করা হবে। অর্থাৎ আপনি যেসব বিষয় আলোচনা করবেন, সেগুলো শুধু যাকে বলবেন তিনিই জানবেন, অন্য কাউকে তা বলা হবে না।
এসব চ্যালেঞ্জিং সময়ে কীভাবে সন্তানদের সর্বোত্তম সহায়তা দেওয়া যায়, সে বিষয়ে বাবা-মা ও সেবাদাতারা পরামর্শ ও সহযোগিতা চাইতে পারেন।
জরুরি পরিস্থিতিতে নিজের যত্ন নেওয়া
কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে নিজের যত্ন নেওয়াটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখবেন, নিজের ভালোর জন্য যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে আপনি নিজের সন্তান ও আশপাশের অন্যদের সহায়তা করার জন্য আরও বেশি সক্ষম হয়ে উঠবেন।
১. আপনার কী কী অভিজ্ঞতা হতে পারে?
- স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি মন খারাপ বা ক্ষোভ অনুভব হতে পারে। সেই সঙ্গে হঠাৎ হঠাৎ আচরণের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
- ভয়, দুশ্চিন্তা বা ভারাক্রান্ত বোধ করা।
- দুঃখ বোধ, বিষাদগ্রস্ততা, হতাশ হয়ে পড়া এবং দৈনন্দিন কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।
- সাম্প্রতিক ঘটনাবলী মনে পড়া এবং সেই সব নিয়ে চিন্তা করতে থাকা। শরীরে এর প্রভাব পড়া যেমন, হৃদস্পন্দন বেয়ারে যাওয়া ও ঘাম হতে থাকা।
- কোনো কিছুতে মনোযোগ দিতে সমস্যা, সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা বা একটানা ঘুম ও খাবার খাওয়ায় সমস্যা।
এ ধরনের সময়ে এসব খুবই স্বাভাবিক অনুভূতি। নিজের প্রতি যত্নশীল হন এবং মনে রাখুন,
আপনি একা নন
২. নিজেকে সহায়তার জন্য আপনি কী করতে পারেন?
ধৈর্য ধরুন: মনে রাখবেন, আপনাকে প্রতিদিন একজন নিখুঁত সেবাদাতা হতে হবে না। আপনার সন্তানের যেন মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন এবং নিজের প্রতি যত্নশীল হন।
- চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করুন এবং নিজের শক্তির জায়গাগুলো নির্ধারণ করুন: সময়টা কঠিন, তা মেনে নিন। তবে মনে রাখবেন, অতীতেও আপনি কঠিন সময় পার করে এসেছেন। শুধু আপনার একারই এই অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি হচ্ছে না, সেটাও মেনে নিন।
- ক্ষয়ক্ষতির জন্য শোক: কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলে নিজে শোক প্রকাশ করুন এবং আপনার আশপাশের অন্যদের তা করতে দিন।
- সহায়তা নিন: একে অন্যকে সহায়তা করুন এবং বন্ধু, আত্মীয় ও অন্যান্যদের কাছ থেকে সহায়তা নিন।
- প্রিয়জনদের সঙ্গে যুক্ত থাকুন: যত বেশি সম্ভব প্রিয়জনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন।
- আশাবাদী থাকুন: ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখুন এবং আপনার আশপাশের শিশুদের সাহায্য করার মনোবল গড়ে তুলুন।
- নিজের দিকে খেয়াল রাখুন: যতটা বেশি সম্ভব হয় বিশ্রাম নিন এবং নিজের প্রতি খেয়াল রাখুন।
- দায়িত্ব ভাগাভাগি: আশপাশে যদি আস্থা রাখার মতো অন্যান্য প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ থাকেন তাহলে শিশুদের দেখভালের দায়িত্ব তাঁদেরকেও দিন এবং নিজে কিছুটা বিশ্রাম নিন।
- রুটিন বজায় রাখুন: নিয়মিত খাবার খাওয়া ও সময়মতো ঘুমাতে যেতে হবে। এতে শিশুরা নিজেদের নিরাপদ মনে করবে।
- মানসিক, ধর্মীয় ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড: এ ধরনের যে কর্মকাণ্ডে স্বস্তি পান, তা করে যেতে হবে।
- পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নেতিবাচক আচরণ এড়িয়ে চলুন: বেশি অ্যালকোহল পান বা অন্যান্য নেতিবাচক আচরণ পরিহার করুন।
অস্থিরতার সময় আপনার শিশুকে নিরাপদ রাখা
১. শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন
- একসঙ্গে থাকুন: দীর্ঘ সময়ের জন্য আপনার সন্তানদের থেকে আলাদা না থাকার চেষ্টা করুন।
- বাইরে সময় কাটানো কমিয়ে আনুন: আপনি ও আপনার সন্তানেরা বাইরে যে সময় কাটান, তা ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসুন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যতটা সম্ভব ঘরে থাকুন।
- সন্তানকে একা রাখবেন না: দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তি সব সময় আপনার সন্তানের দেখভাল করছে, তা নিশ্চিত করুন।
- গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো শিখিয়ে দিন: আপনার সন্তানেরা যেন নিজেদের পুরো নাম, আপনাদের বাসার ঠিকানা বা ফোন নম্বর জানে এবং আপনার থেকে আলাদা হয়ে গেলে কীভাবে সহায়তা চাইতে হবে, তা শিখিয়ে দিন।
- কোথাও যাওয়ার আগে পরিকল্পনা করুন: আপনি যদি কেনাকাটা করতে দোকানে যান, চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যান বা অন্য কোনো সেবা পেতে বাইরে যান তাহলে হয় শিশুদের সাথে রাখুন আর তা না হলে আস্থা রাখার মতো কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির কাছে রেখে যান। আলাদা হয়ে গেলে দেখা হওয়ার জন্য নিরাপদ কোনো জায়গা আগেই ঠিক করে নিন।
- পরিকল্পনা ও পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে শিশুকে জানিয়ে রাখুন: কোনো পরিকল্পনা করলে বা সিদ্ধান্ত নিলে, সেটা সম্পর্কে শিশুদের বুঝিয়ে বলুন; এতে তারা নিরাপদ বোধ করবে।
২. নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করুন
- শিশুর কাজকর্মে খেয়াল রাখা: আপনার শিশুর বাইরে খেলতে যাওয়া যদি নিরাপদ হয় তাহলে তারা কোথায় যাচ্ছে এবং কখন ফিরবে সে সব বিষয় জেনে নিন। সম্ভব হলে তাদের একা যেতে দেবেন না।
- ঘরকে শিশুবান্ধব করা: আপনার ঘরকে শিশুর জন্য নিরাপদ স্থান হিসেবে নিশ্চিত করুন, যেখানে তারা কোনো ঝুঁকি ছাড়াই স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবে।
- শিশুর উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে নিন: যদি আপনার সন্তানেরা আপনাকে বলে যে, তারা কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাহলে তাদের বিশ্বাস করুন এবং তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো বুঝতে চেষ্টা করুন।
৩. মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন
- সব সময় আশ্বস্ত করুন: নিয়মিত আপনার সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বস্ত করে বলেন যে, তাদের নিরাপদ রাখার জন্য সম্ভাব্য সব কিছু আপনি করছেন।
- রুটিন বজায় রাখুন: নিয়মিত রুটিন মেনে চললে তা শিশুদের নিরাপদ বোধ করার ক্ষেত্রে সহায়তা করে।
- ইতিবাচক যোগাযোগ: শিশুদের দেখান যে, আপনি ভালোবাসা থেকে তাদের যত্ন নিচ্ছেন। তাদের সঙ্গে হেসে কথা বলুন, বলুন যে আপনি তাদের ভালোবাসেন, তাদেরকে জড়িয়ে ধরুন এবং তাদের হাত ধরুন।
- প্রশংসা ও সমাদর: শিশুরা যেভাবে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে সেজন্য এবং যখন তারা কোনো ভালো কাজ বা উপকারী কিছু করে তখন তাদের প্রশংসা করুন। তার কাজটা যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন, সেটার প্রশংসা করতে হবে।
অনিশ্চয়তার সময় কীভাবে শিশুর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন
১. আপনার শিশু সন্তানদের সঙ্গে কথা বলুন
আলাপচারিতা শুরু করুন: আপনার সন্তানদের কাছে যান এবং বড় বড় বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলুন। সংবাদমাধ্যম বা তাদের সমবয়সীদের কাছ থেকে জানার আগে আপনি বিষয়গুলো নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলুন।
উদাহরণ:
- “আমি জানি, তুমি ভয় পাওয়ার মতো কিছু বিষয় শুনেছ। আমি এ বিষয়ে তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই।”
- “এখন কিছু ঘটনা ঘটছে, যেগুলো নিয়ে আমাদের আলোচনা করা দরকার। এতে তুমি এসব বিষয়ে বুঝতে পারবে এবং নিরাপদ বোধ করবে।”
- “কী ঘটছে তা আমি তোমার কাছে ব্যাখ্যা করছি এবং কোনো জায়গায় প্রশ্ন থাকলে তুমি তা জিজ্ঞেস করতে পার।”
- তাদেরকে পুনরায় আশ্বস্ত করা: কথা বলার সময় চোখে চোখ রাখুন, তাদের মতো করে কথা বলুন এবং তাদের কাঁধে হাত রেখে স্বস্তিদায়ক অনুভূতি দিন।
- স্পষ্ট নির্দেশনা দিন: আপনার চাওয়া অনুযায়ী তারা কী কী করবে, সে বিষয়ে তাদেরকে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিন। এক্ষেত্রে ইতিবাচক শব্দ ব্যবহার করুন।
- সব প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে স্বীকার করুন: এটা বলাটা ভালো যে, “আমি জানি না। তবে এ বিষয়ে খোঁজ নিব এবং আরও জানার চেষ্টা করব।”
২. শিশুর বিকাশের জন্য সহায়ক পদ্ধতি অনুসরণ করুন
সৎ ও সহজ উত্তর: সততার সঙ্গে ও সহজভাবে প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন
- ছোট শিশুদের জন্য (১০ বছরের কম বয়সী): সংক্ষিপ্ত আকারে ও সহজে ব্যাখ্যা করুন। স্পষ্ট ও কোমল ভাষা ব্যবহার করুন। উদাহরণস্বরূপ, “বাইরে কিছু মানুষ আছে, যারা খুব রেগে আছে এবং গোলমাল করছে। আমরা বাড়িতে নিরাপদ আছি।”
- বড় শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য: তাদেরকে আরও বিস্তারিত তথ্য দিন এবং তাদের প্রশ্নগুলোরও যথাযথ উত্তর দিন। উদাহরণস্বরূপ: “বাইরে বিক্ষোভ হচ্ছে। কারণ লোকজন কিছু বিষয় নিয়ে ক্ষুব্ধ। এই সময়ে নিরাপদ থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ এবং কী ঘটছে সে বিষয়ে জানা থাকাটাও দরকার।”
- খুব বেশি আবেগতাড়িত ভাষা পরিহার করুন: কী ঘটছে সেই বিষয়ে কথা বলুন এবং খুব বেশি আবেগতাড়িত ভাষা পরিহার করুন।
- শিশুদের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে সজাগ থাকুন: আপনার শিশু কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে সেদিকে মনোযোগ দিন এবং সেটার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জবাব দিন।
আপনার শিশুর আবেগ-অনুভূতি ও মানসিক কল্যাণের জন্য সহায়তা
১. যত্ন, প্রশংসা ও সমাদর
- স্নেহ-মমতা দেখান: স্নেহ-মমতা, হাসি ও বুকে জড়িয়ে ধরার মধ্য দিয়ে আপনার সন্তানদের বোঝান যে আপনি তাদের ভালোবাসেন।
- প্রশংসা: শিশুরা যেভাবে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে সেজন্য এবং যখন তারা ভালো বা উপকারী কিছু করে তখন তাদের প্রশংসা করুন। তার কাজটা যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন, সেটার প্রশংসা করতে হবে।
২. আপনার শিশু সন্তানদের কথা শুনুন
- প্রশ্ন করার জন্য নিরাপদ জায়গা: তাদেরকে উপলব্ধি করতে দিন প্রশ্ন করায় কোনো সমস্যা নেই এবং যে কোনো কথা বলার জন্য আপনি একজন নিরাপদ ব্যক্তি।
- যে কোনো ভাব প্রকাশে উৎসাহ: তাদের ভাবনা, প্রশ্ন ও অনুভূতি প্রকাশে উৎসাহ দিন। বলুন যে, কান্না পেলে কাঁদতেও সমস্যা নেই এবং তারা যেটাতে ভালো ও হালকা বোধ করে।
- আবেগ-অনুভূতি: তাদের আবেগ-অনুভূতির প্রতি সম্মান জানাতে সহায়তা করুন।
- উদাহরণস্বরূপ, “আমি শুনলাম যে, তুমি/তোমরা ক্ষুব্ধ/ভয় পাচ্ছ/হতাশ। এ রকম মনে হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। আমিও ক্ষুব্ধ/ভয় পাচ্ছি/হতাশ।”
- আদর্শ আচরণ: আপনি যেমন আচরণ দেখতে চান তা প্রদর্শন করুন। যেমন, মমতা নিয়ে কথা বলা এবং শান্ত থেকে কাজ করা।
৩. আপনার শিশুদের পুনরায় আশ্বস্ত করুন যে, তারা নিরাপদ
- নিরাপত্তা নিশ্চয়তা: আপনার শিশুদের বারবার আশ্বস্ত করেন যে, তারা নিরাপদ এবং তাদের পরবিার/বন্ধুরাও নিরাপদ।
৪. রুটিন ও অন্যান্য নিয়মাবলী মেনে চলা
- রুটিন মেনে চলা: প্রতিদিনের রুটিন মেনে চলার চেষ্টা করুন। যেমন, সময়মতো ঘুমাতে যাওয়া, খাবার খাওয়া ও অন্যান্য দৈনন্দিন কাজকর্ম।
- প্রত্যাশিত কর্মকাণ্ড: প্রত্যাশিত একটি রুটিন গড়ে তোলার জন্য প্রতিদিন একই সময়ে একসঙ্গে বসুন, গল্প বলুন, ছবি আঁকা বা গান গাওয়ার চর্চা করুন। প্রত্যাশিত কাজ কী কী, তা বুঝতে পারাটা শিশুদের মধ্যে আরও নিরাপদ বোধ করতে সহায়তা করতে পারে।
৫. খেলাধুলা ও ব্যায়াম করাকে উৎসাহ দেওয়া
- খেলাধুলায় উৎসাহ দান: আপনার সন্তানকে আপনার সঙ্গে, তার ভাই-বোনের সঙ্গে বা অন্যান্য শিশুদের সঙ্গে খেলতে উৎসাহিত করুন। শিশুদের শেখা, মনোযোগী হয়ে ওঠা এবং চাপ সামলে নেওয়ার দক্ষতা তৈরিতে খেলাধুলা গুরুত্বপূর্ণ।
- শরীর চর্চায় অভ্যস্ত করা: শিশুদের শারীরিক ও মানসিক কল্যাণের জন্য একসঙ্গে শরীর চর্চা করুন। এটা অল্প জায়গায়ও করা যেতে পারে। যেমন, লাফানো বা একটি বৃত্তাকার জায়গায় দৌড়ানো।
৬. আবেগ-অনুভূতির স্বীকৃতি
- তাদের অনুভূতিকে স্বীকৃতি দেওয়া: তারা কেমন অনুভব করছে, তা জানতে চাওয়া এবং তাদের এই অভিজ্ঞতাকে মেনে নেওয়া। উদাহরণস্বরূপ, “আমি দেখতে পাচ্ছি যে, এটা তোমার জন্য খুবই কঠিন।” বা “মনে হচ্ছে, তুমি উদ্বিগ্ন।”
- আবেগ নিয়ন্ত্রণ: তাদেরকে এটা বুঝতে সহায়তা করুন যে, দুঃখ পাওয়া, ক্ষোভ তৈরি হওয়া বা কান্না পাওয়াটা স্বাভাবিক। তাদের জানান যে, মাঝে মাঝে আপনারও এমন অনুভূতি হয় এবং তা আপনি কীভাবে সামলে নেন সেটা তাদের দেখান।
৭. একসাথে ভালো সময় কাটানো ও যোগাযোগ
- মনোযোগ দেওয়া: কিছু সময় প্রতিটি সন্তানকে আপনার পূর্ণ মনোযোগ দিন, চোখে চোখ রাখুন এবং সন্তানদের কথা শুনুন।
- নানা বিষয়ে কথা বলুন: শুধু কষ্টদায়ক ঘটনা নয়, নানা বিষয়ে আলাপ করুন। তাদের স্বস্তি দিতে ও আশাবাদী করে তোলার জন্য ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা বলুন।
৮. অন্যদের সহায়তামূলক কাজে উৎসাহ দিন
- সহায়তামূলক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করা: অন্যদের সহায়তা হয় এমন কাজে আপনার সন্তানদের সহযোগিতা করুন। এতে তাদের মধ্যে নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা ও আত্মসম্মানবোধ তৈরি হবে। এটা ছোট কাজ থেকেও হতে পারে যেমন, সংসারের কাজে সহায়তা বা কমিউনিটির কাজে সম্পৃক্ততা।
৯. সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম দেখার ওপর নজর রাখা ও লাগাম টানা
- সংবাদমাধ্যম দেখা নিয়ন্ত্রণ: আপনার সন্তান কী দেখছে ও পড়ছে তার ওপর নজর রাখতে হবে। বিষাদগ্রস্ত করে তোলে এমন সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আধেয় (কনটেন্ট) দেখার ওপর লাগাম টানতে হবে।
- একসঙ্গে সংবাদ দেখা/পড়া: আপনার সন্তান যদি উৎসাহী হয় তাহলে খবরটি একসঙ্গে দেখুন বা পড়ুন। বিষয়টি তাদের বুঝতে সহায়তার জন্য আলোচনা করুন এবং তথ্যগুলোকে তার জন্য মানানসই করে উপস্থাপন করুন।
কখন পেশাজীবীর সহায়তার খোঁজ করতে হবে
একজন পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়ার কথা ভাবুন যদি শিশু:
- এক মাসের বেশি সময় ধরে খুব হতাশ, ব্যথিত, ভীত বা উদ্বিগ্ন হয়ে থাকে।
- হতাশা পেয়ে বসে, অপরাধবোধে ভোগে, ঘুমে সমস্যা হয় বা খুব বেশি ঘুমায়।
- খুব বেশি বিষাদগ্রস্ত হওয়ার কারণে নিজের দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে পারে না।
- নিজের ক্ষতি করছে বা নিজের ক্ষতি করার কথা বলছে।
- অন্যদের ক্ষতি করতে চাওয়ার কথা বলছে।
- বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে চলতে সমস্যা হয়।
- দুঃস্বপ্ন দেখে, পুরনো স্মৃতি ফিরে আসে বা হঠাৎ ভয় জাগানো স্মৃতি ফিরে আসে।
- কী ঘটেছে তা মনে করিয়ে দেয় এমন স্থান, মানুষ ও কর্মকাণ্ড পরিহার করে।
- পরিস্থিতি ভালো হওয়ার চেয়ে আরও খারাপ হচ্ছে বলে মনে হয়।
- খারাপ ঘটনাগুলো নিয়ে চিন্তা করলে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, প্রচুর ঘাম হয় বা অজ্ঞান হয়ে পড়ে।
পেশাজীবীর সহায়তা খোঁজা
আপনি যদি আপনার সন্তানের ভালো থাকা নিয়ে উদ্বিগ্ন হন তাহলে একজন পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধা করবেন না।
আপনার সন্তানদের চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮- এ ফোন করতে উৎসাহ দিন। সেখানে তারা একজন প্রশিক্ষিত কাউন্সেলরের (পরামর্শক) সঙ্গে কথা বলতে পারবে। এর জন্য কোনো টাকা লাগে না এবং এখানে গোপণীয়তা রক্ষা করা হয়। অর্থাৎ যেসব বিষয় আলোচনা করা হবে সেগুলো দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং তা আর কাউকে বলা হবে না।
একজন সেবাদাতা বা বাবা-মা হিসেবে আপনি এ ধরনের চ্যালেঞ্জিং সময়ে কীভাবে সন্তানকে সর্বোত্তম সহায়তা দেওয়া যায়, সে বিষয়ে কাউন্সেলরদের কাছ থেকে পরামর্শ ও সহায়তা নিতে পারেন।
পিডিএফ (PDF) ভার্সনটি ডাউনলোড করা যাবে এখানে