নতুন বাবা-মায়েরা শিশুদের সম্পর্কে যে ৭টি প্রশ্ন করেন: প্যারেন্টিংয়ের সংক্ষিপ্ত মাস্টার ক্লাস
নতুন বাবা-মায়েরা সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসা করেন এমন কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন একজন শিশু বিশেষজ্ঞ।
- বাংলা
- English
প্রত্যেক বাবা-মাই তাদের সন্তানদের সেরাভাবে গড়ে তুলতে চান। নতুন বাবা-মায়েদের এবিষয়ে থাকেন একটু বেশি উদ্বিগ্ন।তাদের মনে থাকে হাজার রকমের প্রশ্ন। এসময় যেসব বিষয়ে বাবা-মায়েরা সবচেয়ে বেশি জানতে চান আমরা এমন কিছু প্রশ্ন রেখেছিলাম রয়্যাল চিলড্রেন'স হসপিটাল মেলবোর্নের সেন্টার ফর কমিউনিটি চাইল্ড হেলথের ডিরেক্টর এবং সব্যসাচী শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ফ্র্যাঙ্ক ওবারক্লেইড এর কাছে।
শিশুদের সম্পর্কে প্রত্যেক নতুন বাবা-মা যে ৭টি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন: প্যারেন্টিংয়ের মিনি মাস্টার ক্লাসের ভিডিও৷
“আপনি কি জানেন যে আপনার শিশুর বয়স যখন দুই বা তিন সপ্তাহ তখন থেকেই তার স্মৃতিশক্তির বিকাশ হতে শুরু করে?
দুই বা তিন সপ্তাহ বয়স থেকেই শিশুরা আপনার ঘ্রাণ মনে রাখতে পারে।
আপনি আমাকে অনেকগুলো প্রশ্ন করেছেন। সাধারণত ছোট বাচ্চাদের বেড়ে ওঠার সময়ে অধিকাংশ বাবা-মা এসব প্রশ্ন জানতে চান। এখানে আমি সেসব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।
শুভেচ্ছা নিন। আমার নাম প্রফেসর ফ্র্যাঙ্ক ওবারক্লেইড এবং এটি আমার প্যারেন্টিংয়ের সংক্ষিপ্ত মাস্টার ক্লাস।"
বাচ্চারা এত ঘুমায় কেন?
“শিশুরা তো আর জানে না যে দিনের বেলা জেগে থাকতে হয় আর রাতে ঘুমোতে হয়। তাই তারা সাধারণত তিন থেকে চার ঘণ্টা টানা ঘুমায়, ক্ষুধা লাগলে জেগে উঠে আর খাবার খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।
মস্তিষ্কের বিকাশের সাথে সাথে শিশুদের ঘুমানোর মাত্রা কমে যায়। এর বেশ কয়েকটি কারণ আছে। সেগুলো হলো- বয়সের সাথে সাথে শিশুদের কৌতূহল সৃষ্টি হয়; তারা তাদের পরিবেশের সাথে পরিচিত হয় বা তার আশেপাশের বিভিন্ন বিষয়ে মুগ্ধতা তৈরি হয়। এসময় বাবা-মা তাদের সাথে কথা বলেন, তাদের গল্প পড়ে শোনান; এভাবে তাদের ঘুমের পরিমান আস্তে আস্তে কমতে থাকে আর বাড়তে থাকে তাদের বিভিন্ন দৈনন্দিন এক্টিভিটির পরিমান যেমনঃ তারা তাদের বাবা-মা, পরিচর্যাকারী এবং তাদের চারপাশের পরিবেশের সাথে যোগাযোগ করে, সেগুলো দেখে মুগ্ধ হয়। এরপর তারা আবার ঘুমিয়ে পড়ে।"
গর্ভে থাকা অবস্থায় কি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ হতে পারে?
“বেশ কয়েক বছর আগে একটা সময় মনে করা হতো যেসব শিশুরা গর্ভে থাকা অবস্থায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সংস্পর্শে আসে সেসব শিশুরা বেশি স্মার্ট হয়।
তবে এমন কোন বাস্তব প্রমাণ নেই যে শিশুরা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শুনলে তারা আরও বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে।
আবার এটি কোন ক্ষতিও করে না। তাই বাবা-মায়েরা বাড়িতে সঙ্গীতের/গানের প্রচলন করতে চাইলে এটি একটি দুর্দান্ত উদ্যোগ হবে। কারণ বাবা-মা সঙ্গীত/গান উপভোগের সময়ে যেমন শান্ত হন, সেই অনুভূতি তাদের শিশুর মধ্যে চলে যায় এবং তারাও শান্ত হবে বলা যায়।
এ-কারণে ছোট বাচ্চাদের জন্য সঙ্গীত ভালো হওয়ার অনেক কারণ আছে। স্মার্ট হওয়ার জন্য সঙ্গীত এর প্রয়োজন নেই।"
পুষ্টি কীভাবে মস্তিষ্কের বিকাশকে প্রভাবিত করে?
“বুকের দুধ থেকে একটি শিশু তার প্রয়োজনীয় সকল পুষ্টি চাহিদা লাভ করতে পারে। তাই আমরা শিশুদেরকে বুকের দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করার জন্য পরামর্শ দেই। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে এমন কিছু দেশে যেখানে খাবারের গুণগত মান ঠিক নেই, খাবারের বৈচিত্র্য নেই এবং পর্যাপ্ত খাবার নেই - এমন অবস্থা শিশুর জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। শিশুর শারীরিক এবং জ্ঞানগত বিকাশ বিলম্বিত হতে পারে।"
শিশুদের জন্য কেন মানব স্পর্শ প্রয়োজন?
“সদ্যজাত শিশুদের জন্য স্পর্শের গুরুত্ব বর্তমানে বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। শুধুমাত্র মানুষের জন্য নয়, অন্যান্য সকল প্রাণী প্রজাতির জন্যও স্পর্শ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আমরা প্রায়ই "ক্যাঙ্গারু কেয়ার" নিয়ে আলোচনা করে থাকি। এ পদ্ধতিতে নবজাতক শিশুকে মায়ের বুকের মধ্যে রেখে মায়ের ও নবজাতকের ত্বকে-ত্বকে একটি নিবিড় আলিঙ্গনের মাধ্যমে উষ্ণতার আবহ প্রস্তুত করা। এটি শিশুর ও মা উভয়ের জন্যই স্বস্তিদায়ক ও কার্যকরী। সুতরাং স্পর্শ নানা কারণেই খুব গুরুত্বপূর্ণ।
সন্তানের সাথে কীভাবে যোগাযোগ স্থাপন করা উচিত?
"শিশুরা সহজাতভাবে কৌতূহলী হয়। তারা তাদের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়। তার কাছে সবকিছুই একদম নতুন, তাদের সামনে নতুন এক বিশাল পৃথিবী। এ কারনে শিশুরা যা করতে চায় তাতে বাবা-মায়দের বাঁধা দেয়া উচিৎ নয়। খালি খেয়াল রাখতে হবে যেন শিশুটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত থাকে।
শিশুকে খুব বেশি শাসন করা বা কোনকিছু শেখানোর জন্য তার সাথে কঠোর হওয়া যাবে না। তার শেখার বিভিন্ন সুযোগ রয়েছে। যেমন, বাচ্চার সাথে গান গাওয়া, তাকে বই পড়ে শোনানো এবং গাছ, কুকুর, গাড়ি এবং বাড়ি আছে এমন রাস্তায় শিশুকে নিয়ে হাঁটতে বের হওয়া। তাই অনুগ্রহ করে শিশুর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবেন না। কারণ শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই খুব কৌতূহলী হয় ও পরিবেশ থেকে শেখে।”
ভাষা শিখতে কীভাবে বাচ্চাদের উৎসাহিত করা উচিত?
“যখন অল্পবয়সী শিশু এবং বাচ্চারা "কুকুর," "বিদায়," "টা টা” ইত্যাদির মতো খুব সহজ শব্দ বলতে শুরু করে তখন থেকে বাবা-মা তাদের ভাষা বিকাশে উৎসাহিত করতে পারেন। শিশুরা যেসব শব্দ উচ্চারণ করে বাবা-মায়েরা সেগুলো সাথে সাথে আবার পুনরাবৃত্তি বলা ও বারবার ঐ একই শব্দ বলার মাধ্যমে এ প্রকিয়া ত্বরান্বিত করতে পারেন।
যেহেতু ছোট বাচ্চারা পুনরাবৃত্তি পছন্দ করে, তাই তারা একই গান বারবার শুনলে বা একই বই এর গল্প বারবার শুনলে শব্দ চিনতে ও শিখতে পারবে। এজন্য, আমরা বাবা-মাকে তাদের ছোট বাচ্চাদের সাথে বার বার কথা বলা এবং গান শোনানোর/তাদের সাথে গান গাইতে উৎসাহিত করি।
তবে কথা বলার সময়ে একচেটিয়া কথা বলা যাবে না। এর পরিবর্তে, পালাক্রমে কথা বলার চেষ্টা করুন। যেমন, শিশু কিছু বলবে, বাবা-মা উত্তর দিবেন, এ-বিষয়টি অনেকটা সারভ এন্ড রিটার্ন এর মত। শিশুটি যা বলে তার কথাটি বাবা মা যদি পুনরাবৃত্তি ঘটায় তা খুবই কার্যকরী।
আপনার সন্তানকে বিভিন্ন ভাষা শেখানোর সর্বোত্তম উপায় কী?
"আমি মনে করি ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে শিশুটি বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে না। তাই কখনও একজন অভিভাবক একটি নির্দিষ্ট ভাষায় কথা বলতে পারেন, আবার কোন বিশেষ একটি কাজের জন্য অন্য একটি ভাষা ব্যবহার করা যেতে পারে। এভাবে শিশু একই সাথে ভিন্ন ভাষা শিখতে পারবে এবং সময়মত সে নিজেই এর সঠিক প্রয়োগ করতে পারবে।
বাচ্চাদের জীবনের প্রথম পর্যায়ে প্রয়োজন যত্ন ও সাড়া (রেস্পন্সিভ কেয়ার)। প্রয়োজন একটি সহায়ক পরিবেশের। তাদের নিবেদিত বাবা-মায়ের প্রয়োজন যারা ছোট বাচ্চার সকল প্রয়োজন সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। কারণ পিতামাতাই হলেন শিশুর জীবনের প্রথম শিক্ষক।
বাবা-মা যখন সন্তানের সাথে কথা বলেন, সন্তানের সাথে গান করেন, শিশুকে পড়ে শোনান-তখন এসব রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাগুলো শিশুর শেখাকে উদ্ধুদ্ধ করে। এই সকল নেটওয়ার্ক শিশুর মস্তিষ্কে বিকশিত হয়। তাই শিশুর জীবন বিকাশের শুরুর বছরগুলোতে শেখার সেই ভিত্তিগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো তার ভবিষ্যতের শিক্ষার ভিত্তি তৈরি করে।
শিশুদের এ সব বিষয় সম্পকে© সচেতন থাকুন এবং তাদেরকে এ সব বিষয়ের সুযোগ দিন। তাহলে শিশুর মস্তিষ্ক সুন্দরভাবে বিকশিত হবে । তাদের সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ হবে। পাশাপাশি আমরা সন্তানের থেকে যেসব বিষয় প্রত্যাশা করি তারা সেগুলো পূরণ করবে।"
অধ্যাপক ফ্র্যাঙ্ক ওবারক্লেইড, রয়্যাল চিলড্রেন'স হাসপাতাল মেলবোর্ন এর কমিউনিটি চাইল্ড হেলথ সেন্টার ও মারডক চিলড্রেন'স রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক৷